ভালো আছো, ম্যাকলাস্কিগঞ্জ! চতুর্থ পর্ব, ভ্রমণ কাহিনী লিখছেন ড. গৌতম সরকার

ভালো আছো, ম্যাকলাস্কিগঞ্জ! চতুর্থ পর্ব, ভ্রমণ কাহিনী লিখছেন ড. গৌতম সরকার
05 Dec 2021, 10:30 AM

ভালো আছো, ম্যাকলাস্কিগঞ্জ! চতুর্থ পর্ব, ভ্রমণ কাহিনী লিখছেন ড. গৌতম সরকার

 

 

ড. গৌতম সরকার

 

ওপর থেকে দুগা-দুগি নদীকে দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল৷ উজ্জল সোনালী বালুচরের বুকে সরু একফালি কালো ফিতের মতো দেখতে লাগছে৷ রাস্তাটা একটু এগিয়ে একটা সুন্দর ব্রিজে গিয়ে উঠেছে, নদীতে নামতে হলে ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে যেতে হবে, এপারটা অনেক খাড়াই৷ চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই দেখি সন্দীপ ওপারে গিয়ে নদীখাতে নেমে গেছে, খুব ক্যাসুয়াল ভঙ্গিতে নদীর দিকে হেঁটে যাচ্ছে৷ এটা ওর এক ধরনের স্টান্ট, চিরকালই দেখেছি সে ট্রেকিংয়েই হোক বা এমনি বেড়ানোই হোক, ও সবসময় সবাইয়ের চেয়ে দশ পা এগিয়ে থাকে এবং পরোক্ষে  সবাইকে দেখাতে চায় ও অন্যদের চেয়ে কত বেশি ফিট৷ যাই হোক সন্দীপের কথা থাক, আমরা আস্তে আস্তে ব্রিজে গিয়ে উঠি৷ খুব সুন্দর জায়গা, এখান থেকে গোটা উপত্যকাটা দেখা যাছে - চতুর্দিকে সবুজ পাহাড় ঘেরা নদী, বালিয়াড়ি আর তার সাথে সাথে গাছের ফাঁক দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের শিৎকার৷ কিন্তু হাওয়া বইলেও সূর্যের প্রচন্ড তাপ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাই দেখলাম নদীতে নামার চেয়ে অনেকেই গাছের ছায়া খুঁজতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ল৷ তারই মধ্যে ফোটো সেশন চলছে, এই রকম নির্জন পাহাড়ি জায়গায় নদীর ওপর ছোট্ট একটা সেতু খুবই দৃষ্টিনন্দন এবং ফোটোজেনিক৷ কিছুক্ষন পর দেখি সবাই নদীর দিকে এগোচ্ছে, ওপারে গিয়ে অনেকটা ঢালু পথে নদীর বুকে নামলাম৷ পাড়ের দিকে বালি একটু শক্ত হলেও যত নদীর দিকে এগোচ্ছি বালি নরম হচ্ছে, পা অনেকখানি করে বালিতে দেবে যাচ্ছে, সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে৷

 

বাচ্চাগুলোকে আটকে রাখা যাচ্ছে না, মনের আনন্দে দৌড়ে বেড়াচ্ছে৷ তাদের বড় আকর্ষণ দূরের ওই কালো জল৷ কিন্তু খালি চোখে জলের গভীরতা বোঝা যাচ্ছে না, তাই তাদের ওই পা ডোবানো জলেই আটকে রাখতে হচ্ছে, এখানেও বেশ দীর্ঘ ফোটোসেশন চলল৷ আগেরবার যখন এসেছিলাম তখন যতদূর মনে পড়ে আমরা একটা নদীর ধারে পুরো দিনটা কাটিয়ে ছিলাম - নামটা কী কোয়েল ছিল -এটাই কি সেই নদী ! কোন পাড়ে বসেছিলাম আমরা, কোন রাস্তা দিয়ে এসেছিলাম! কারণ তখন তো এসব অটো-টোটো কিছুই ছিল না, ধূসর স্মৃতি হাতড়ে কিছুই পেলাম না, তাই অতীত ছেড়ে বর্তমানেই ফিরে এলাম৷ সবাই সবাইয়ের মতো আনন্দ করছে, এখন যেন কারোর গায়ে সূর্যের তাপ লাগছে না, মনে হল এই পাহাড়, জঙ্গল, নদী কোনো এক জাদুমন্ত্রে মধ্যাহ্নের সূর্যের আগুনকে চাঁদের মোলায়েম আলোয় বদলে দিয়েছে৷ আরও কিছুটা সময় কেটে গেল, এবার ফিরতে হবে কারণ পেট জানান দিতে শুরু করেছে - প্রকৃতি তোমার মন ভরাতে পারে কিন্তু পেট ভরানোর জন্য ট্যাঞ্জিবল কিছু দরকার, তাই হোটেলে ফিরতে হবে৷ ফেরার পথে কিছুটা আসার পর দেখতে পেলাম বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে বাউন্ডারি ওয়াল আর ভেতরে কতকগুলো বিল্ডিং, বাইরে লেখা "জাগৃতি বিহার", প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র৷ রাজার ইচ্ছা ছিল নামার কিন্তু অনেক বেলা হয়েছে, ঠিক হল পরের দিন সকালবেলা আমরা এখানে আসবো৷

 

বিকেলবেলা তৈরী হয়ে বেরোতে বেরোতে দেরি হয়ে গেল, সকলে বেরোলো না৷ মেয়েরা কেউই বেরোতে চাইলো না আর মৃণালকে ঘুম থেকে তোলা ঝকমারি; তাই আমি, রাজা, প্রবীর আর সন্দীপ বেরিয়ে পড়লাম, সঙ্গে আমাদের সর্বক্ষণের সাথী আমাদের ছোট্ট সোনু৷ ওর উত্সাহই আমাদের মধ্যে সবথেকে বেশি, দুপুরে খেয়ে দেয়ে শোবার সময় আমার ঘরে এসে বলে গেছে, “জেঠু, বিকেলে যখনই তুমি বেরোও আমাকে কিন্তু ডাকবে৷" আরেকটু দেরি হল কারন বেরোনোর আগে গর্ডনজিকে সন্ধ্যের স্ন্যাক্স আর রাত্রের খাবারের অর্ডার দিয়ে আসতে হল৷  হোটেল থেকে স্টেশন যাবার রাস্তাটা খুব সুন্দর, এই সময়টায় আবহাওয়া বড় মনোরম হয়ে ওঠে, সূর্য মুখ লুকিয়েছে দিগন্তে আর অসম্ভব সুন্দর এক হাওয়া বইছে চারদিকে৷  দুপাশের ছোট বড় পাকা বাড়িগুলো অধিকাংশই হস্টেল, হস্টেলের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় খেলা করছে, কেউ কেউ দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ ম্যাকলাস্কিকে হস্টেলের শহর বলা যায়, এখানে তিনটে বড় বড় স্কুল আছে, তার সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা এই সব হস্টেলে থাকে৷ গর্ডনজির কাছে শুনেছি এই সমস্ত হস্টেল একটা অ্যাসোসিয়েশন চালায়, আর প্রতি বাড়িতে সর্বোচ্চ কুড়ি জন বাচ্ছা থাকতে পারে৷ আমরা স্টেশনে পৌছে প্লাটফর্মে ঢুকলাম, লাইন পেরিয়ে দু নম্বর প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে গিয়ে বসলাম৷ এখন পাখিদের ঘরে ফেরার সময়, ওভারহেড তারে পর পর সারি দিয়ে কাকের দল বসছে, দূরে একটা বড় গাছের মাথায় বক, সারস, সমস্ত সাদা রংয়ের পাখিদের মেলা বসেছে৷ ক্যামেরাটা আনিনি তাই দৃশ্যটা ফ্রেমবন্দি করতে পারলাম না, এটা মোবাইল ক্যামেরার কর্ম নয়৷

  

এবার চাপ চাপ অন্ধকার অনুভব করলাম, স্টেশনটা প্রায় অন্ধকারে ডুবে গেল, কেবল স্টেশন মাস্টারের ঘর থেকে একছটাক আলো এসে লাইনে পড়েছে৷ আরেকটা সন্ধ্যা নামল ম্যাকলাস্কির বুকে আর এটাই হয়ত আমার শেষ সন্ধ্যা, কাল এই সময়ে ম্যাকলাস্কি ছাড়িয়ে কতদূর চলে যাবো! কাল আমাদের ফেরার দিন৷ উঠে পড়লাম, এক কাপ করে চা খেয়ে শেষ সন্ধ্যাকে সঙ্গী করে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম৷

   

স্বাধীনতা দিবসের ভোর এল অনেক স্বস্তি নিয়ে, কাল সারারাত কারেন্ট ছিল তাছাড়া রাতের দিকে বেশ বৃষ্টি হয়েছে৷ কিন্তু আমার সারা শরীর জুড়ে ক্লান্তি, জানি এটা শারীরিক নয় সবটাই মানসিক, যেখানেই বেড়াতে যাই না কেন ফেরার দিনটায় খুব মন খারাপ হয়ে যায়৷ হঠাৎ করে ওই দিন নিজেকে আর জায়গাটার সাথে মেলাতে পারিনা, মনে হয় আর কতক্ষণ, এই পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল, নদী…. প্রকৃতির অন্তহীন এই সৌন্দর্য এখানে রয়ে যাবে আর আমাকে সব ছেড়ে চলে যেতে হবে, তাই আর কিচ্ছু ভালো লাগেনা৷ অন্যদিন ভোর ভোর উঠে বাইরে বেরোনোর আগ্রহে টগবগ করে ফুটি আর শেষদিন শত ক্লান্তি আমাকে পেয়ে বসে৷ প্রবীর, সন্দীপ বেশ কয়েকবার ডেকে ডেকে বেরিয়ে গেল, আজ এমনকি রাজাও ওদের সঙ্গী হয়েছে আমি বিছানায় পড়ে রইলাম৷ জানি এটা চুড়ান্ত ছেলেমানুষি, এর জন্য বহু রসিকতা সহ্য করতে হয়, তবু এটা আমার মধ্যে রয়ে গেছে, সে দুদিনের বেড়ানোতেই হোক বা দু সপ্তাহের হোক৷ ঘুম কিন্তু হলনা, বিছানায় শুয়েই কিছুক্ষন এপাশ-ওপাশ করলাম, এক সময় অসহ্য লাগাতে উঠে পড়লাম৷    

   

 

সকালের আকাশ একদম পরিষ্কার, বাইরে ঝকঝক করছে রোদ, বারান্দায় এলাম, এখান থেকে অনেকটা আকাশ দেখা যায়, ঘন নীল আকাশের বুকে অনেক পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে৷  পাশের ঘর থেকে অর্পিতা বেরিয়ে আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল, ভাবতে পারেনি সবাই বেরিয়েছে অথচ আমি বেরোইনি৷ যাই হোক ও আমার ছেলেমানুষির কথা জানেনা জেনে খুশি হলাম৷ ওকে আশ্বস্ত করে বললাম, "না একটু পরে ‘জাগৃতি বিহার’ যাবো তাই এখন আর বেরোলাম না৷"

   

ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরোলাম, আমরা বলতে প্রবীর, রাজা, সন্দীপ, আমি আর সোনু৷  ঠিক হল আমরা হেঁটেই যাবো, তবে স্টেশন হয়ে, মোটেই আমাদের প্রথম দিনের রাস্তা ধরে নয়৷ সোনুর কথা ভেবে অটো নেব কিনা ভাবছিলাম, কিন্তু ওরই হেঁটে যাওয়ায় বেশি উত্সাহ৷ অগত্যা এগিয়ে চলো, চরৈবেতি.........চরৈবেতি৷ আস্তে আস্তে স্টেশন পেরিয়ে গেলাম, এবার সেই আমাদের পরিচিত গ্রামের মধ্যে দিয়ে পথ, এ পথে যে কতবার এলাম, খুব ভালো লাগছে, গল্প করতে করতে পৌছে গেলাম সেই জায়গাটায় যেখানে রাস্তাটা দুভাগে ভাগ হয়েছে, আমরা ডানদিকের রাস্তাটা ধরে দুগাদুগির দিকে যাবো৷ এখানকার রাস্তার বর্ণনা আগেই দিয়েছি, এককথায় - নয়নাভিরাম ! কিছুটা এগিয়ে দেখলাম একটা রাস্তা বাঁ দিকে ঢুকে গেছে, দূরে একটা মাইলফলকে লেখা 'চেট্টি নদী', মনে হল কাল এই রাস্তা দিয়েই অটো করে গেছি৷ মত-অমতের দোদুল্যমানতা নিয়ে এই রাস্তা ধরেই এগিয়ে গেলাম, কালো পিচের রাস্তা ছোট ছোট চড়াই-উৎরাই পার হতে হতে চলেছে, ধন্দের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছি, ধারে কাছে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না যে জিজ্ঞাসা করবো৷ বেশ কিছুটা যাবার পর দেখি উল্টো দিক থেকে একজন সাইকেল করে আসছেন, কাছে আসতে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল আমরা যথারীতি ভুল রাস্তায় এসেছি, এবারের ট্যুরে আমাদের ভুলে পেয়েছে, প্রথম দিন থেকে ভুলের ফাঁদে পড়ে নাজোহাল৷ রাস্তা ভুল তো একটা স্ট্যান্ডার্ড জোক-এ দাঁড়িয়ে গেছে৷ চিত্কার করে গাইতে ইচ্ছে হল – ‘আমাদের পথ ভোলাতেই আনন্দ’ ! যাই হোক ভদ্রলোক পরামর্শ দিলেন, পুরো পথ না ফিরে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ডায়াগোনালি গেলে ওই রাস্তাটাকেই পাওয়া যাবে, ওখান থেকে ডানদিকে গেলে আমরা গন্তব্যে পৌছতে পারব৷ অতএব এই সফরে জঙ্গল সাফারিও হয়ে গেল, সোনু তো রাস্তা হারিয়ে খুব খুশি৷ শুরু হল জঙ্গলের লালমাটির ওপর দিয়ে পথ চলা, পায়ে চলা রাস্তা, মাঝে মাঝে পায়ের দাগও খুঁজে পাচ্ছিনা, আন্দাজে আন্দাজে চলছি তবে দিকটা ঠিক রাখার চেষ্টা করছি৷ চলছি তো চলছি, জঙ্গল আর শেষ হয়না, রোদের তেজ বাড়ার সাথে সাথে টেনশন বাড়ছে, সবচেয়ে বড় চিন্তা সঙ্গে একটা বাচ্ছা আছে, হোটেল থেকে অনেক দুর এসে পড়েছি এরপর আবার ফেরা আছে৷ তবে এই মুহূর্তে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া কিছু করার নেই, তাই এগিয়েই যাই৷ আরও কিছুক্ষন হাঁটার পর গাছপালার ফাঁক দিয়ে কালো পিচের রাস্তা চোখে পড়ল, সকলেই মুখেই স্বস্তির হাঁসি ফুটে উঠল৷ এবার ডান দিকে এগোতে লাগলাম, বেশ কিছুটা যাবার পর রাস্তা আবার দ্বিমুখী ; আবার ডিসিশন মেকিং প্রবলেম, তবে সবাই মিলে ঠিক করলাম আর রিস্ক নেওয়া যাবে না, ডানদিকের রাস্তাটা হিসেবমতো জঙ্গল থেকে বের হওয়ার রাস্তা, এটা ধরেই যাবো তাতে জাগৃতি বিহার এ যাত্রায় হোক বা না হোক, অনেক বেলা হয়েছে, হোটেলে ফিরে বেরোনো আছে, বিকেল চারটে দশে ফেরার ট্রেন৷ কিছুদূর এগিয়ে একটা ব্রিজ পড়ল মনে হল ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি এটা বোধ হয় আমাদের দেখা নদীটির ওপর আরেকটা সেতু, এগিয়ে চললাম - আরও কিছুটা যাবার পর দেখলাম রাস্তাটা অনেকটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে, ঢালের মুখের কাছে গিয়ে চোখে পড়ল দূরে বাউণ্ডারি ঘেরা "জাগৃতি বিহার"৷

  

জাগৃতি বিহার একটি এনজিও প্রতিষ্ঠান, এটি তৈরি হয়েছে ১৯৭৫ সালে৷ এর উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ ও আদিবাসী শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যর উন্নতি ঘটানো৷ এরা পাঁচটা আবাসিক স্কুল চালায় এবং এদের মূল লক্ষ্য গ্রামীণ শিশুদের প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া, কিন্তু মূল প্রতিবন্ধকতা হল অর্থ৷ তাদের বিশ্বাস এই গ্রাম্য মানুষদের কুসংস্কার এবং স্থবির চিন্তা ভাবনা থেকে বের করে এনে সমাজের মুল স্রোতের সাথে যোগসাধনের একমাত্র উপায় হল বিজ্ঞান শিক্ষা৷ শুধু তাই নয়, নিজস্ব পরিবেশ, সংস্কৃতি সম্বন্ধে চেতনার জাগরণ, এই সমস্ত কৃষ্টিকে রক্ষা করা এবং জগতের সামনে তুলে ধরার শিক্ষাও এখানে দেওয়া হয়৷ এই যজ্ঞের কর্ণধারের সাথে আলাপ হল, আশি উত্তীর্ণ এক সৌম্য পুরুষ যিনি প্রথম থেকেই এই কর্মকাণ্ডের কাণ্ডারী ; মিস্টার এস. উপাধ্যায়৷ ওনার মুখে শুনলাম কত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আজ তাঁরা এখানে এসে পৌছেছেন৷ তার কথাবার্তায় প্রচুর আক্ষেপ ঝরে পড়ছে, বর্তমান অবস্থায় তিনি মোটেই তৃপ্ত নন, এখনও অনেক কাজ বাকি৷ খুব খারাপ লাগে শুনতে যখন কিছু অভিমান, কিছু ক্ষোভ আর কিছুটা কষ্ট নিয়ে উনি বলে যান কতটা ত্যাগ আর অসুবিধা স্বীকার করতে হয় এখানে টিচার আর ডক্টর পাওয়ার জন্য৷ তাদের জাগতিক চাহিদা মেটানোর ক্ষমতা এই প্রবীণ সন্ন্যাসীর নেই তবু তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেন, তাই তাঁর আক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কথা বলতে পারিনা, চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে থাকি৷ একজনের পর একজন শিক্ষক এসেছেন, ডাক্তার এসেছেন, উনি চেষ্টা করেছেন ক্ষমতা অনুযায়ী তাদের চাহিদা পূরন করতে, কিন্তু তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে তাল মেলাতে পারেননি ‘মার্কেট ইকনমি’-র চৌহদ্দির বাইরে থাকা এই তরুণ তাপস৷ আজ থেকে ষাট বছর আগে আমেরিকার এক ছোট্ট শহরে শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবনের শুরুতে যে মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন সেই মন্ত্র কালের আর আধুনিকতার কবলে বহুদিন আগেই ব্রাত্য হয়ে গেছে, সেই খবর বৃদ্ধ রাখেননা৷ অনেক কিছু ওনার বলার ছিল, কিন্তু আমাদের শোনার সময় ছিলোনা৷ ওই যে পিছন থেকে অমোঘ এক টান অনুভব করছি, প্রায় একটা বাজে, কখন ফিরব, কখন খাওয়া-দাওয়া করব, তারপর বেরোনোর প্রস্তুতি৷ মনে হল গতকাল এখানে আসা উচিত ছিল, ওনার স্মৃতিচারণায় ব্যাঘাত ঘটাতে খুব খারাপ লাগলেও আমাদের উঠে আসতেই হল, ওনাকে আন্তরিক শ্রদ্ধা জানিয়ে হোটেলের দিকে পা বাড়ালাম৷

 

(ক্রমশঃ…………..)

ads

Mailing List