শেষ হল বিশ্ব বাণিজ্য সম্মেলন, ভারতের যোগদান কতটা অর্থপূর্ন ছিল? লিখছেন অর্থনীতিবিদ ড: গৌতম সরকার

শেষ হল বিশ্ব বাণিজ্য সম্মেলন, ভারতের যোগদান কতটা অর্থপূর্ন ছিল? লিখছেন অর্থনীতিবিদ ড: গৌতম সরকার
26 Jun 2022, 04:25 PM

শেষ হল বিশ্ব বাণিজ্য সম্মেলন, ভারতের যোগদান কতটা অর্থপূর্ন ছিল? লিখছেন অর্থনীতিবিদ ড: গৌতম সরকার

ড. গৌতম সরকার

       

বারোই জুন রোববার সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় শুরু হয়েছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চারদিনের মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন। সম্মেলনের উদ্বোধন করেছেন সংস্থার ডায়রেক্টর-জেনারেল এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সুইজারল্যান্ডের জেনারেল কাউন্সিলের চেয়ার অ্যাম্বাসাডার দিদিয়ের চ্যাম্ভোরি। কোভিড-১৯ অতিমারীর কারণে পাঁচবছর পর এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাধারণত দু-বছর অন্তর এই মহাযোগ সংঘটিত হয়। শেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০১৭ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী শহর, বুয়েনাস আইরেসে। সম্মেলনে প্রতিনিধি দেশগুলির বাণিজ্যমন্ত্রী এবং উচ্চপদাধিকারী আধিকারিকগণ অংশগ্রহণ করেছেন। এবারের সম্মেলনে আলোচনায় যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে সেগুলি হল, করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, কৃষি ও মৎস্য ভর্তুকি, মেধাস্বত্ব, বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা এবং তার সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিজস্ব সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মূল কাজ হল আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ এবং সদস্য দেশের মধ্যে সৃষ্ট বাণিজ্য বিরোধের সমাধানসূত্র বের করা।

    

এই মুহূর্তে চলতে থাকা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পৃথিবীব্যাপী খাদ্য সংকটকে প্রকট করে তুলেছে। স্বভাবতই বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গটি সম্মেলনে বিশেষরকম গুরুত্ব পাবে। সম্মেলন শুরুর আগে ইউনাইটেড নেশনস্-এর পক্ষ থেকে ‘বৈশ্বিক খাদ্য প্রোগ্রাম’-এর যে ড্রাফট প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিল তাতে সদস্য দেশগুলোকে মানবিকতার খাতিরে আবাণিজ্যিক খাদ্য রপ্তানিতে সবরকম নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে ভারতের বক্তব্য ছিল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এটা দেখা কর্তব্য যাতে করে প্রতিনিধি দেশগুলি আংশিক নিষেধাজ্ঞা জারি মারফত নিজ নিজ জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত করতে পারে। ভারতের পক্ষ থেকে এই সম্মেলনে যোগদান করেছেন দেশের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী পিয়ুস গয়াল।

   

সূত্রে প্রকাশ, ভারত তিনটি ব্যাপারে তার মতামত দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করতে বদ্ধপরিকর।

 

এক, ভারতের দাবি অতিমারীর কথা মাথায় রেখে মেধাস্বত্ব এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিশ্বের দরিদ্র এবং অনুন্নত দেশসমূহের অনুকুলে ভাবতে হবে। ভারতের মেধাস্বত্ব, বাণিজ্য ও সেবা নিয়ে আপোষ আলোচনা করতে আপত্তি নেই, তবে ভারত 'দেওয়া-নেওয়া' নীতিতে বিশ্বাস রেখে কিছু পাওয়ার আশ্বাস পেলে তবেই কিছু ছাড়ার ব্যাপারে সম্মত হবে।

 

দুই, ভারত মৎস্য চাষীদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং লাভজনক মাছ চাষের ব্যাপারে জোরালো সওয়াল করবে। গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে দেয় ভর্তুকির ব্যাপারে প্রথম বিশ্বের দেশগুলি আপত্তি তুলেছে। এই প্রসঙ্গে ভারতের বক্তব্য, ভর্তুকি তুলে নিলে দারিদ্র্য সীমার নীচে অবস্থানকারী ধীবর সম্প্রদায়ের বেঁচে থাকাটাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাছাড়া আর্থিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলি, যেমন- আমেরিকা, চিন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় ভারত মৎস্যজীবীদের অনেক কম ভর্তুকি দিয়ে থাকে।

 

তিন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি অনুযায়ী সদস্য দেশগুলি 'ই-কমার্স' সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আবগারি শুল্ক প্রয়োগ করতে পারে না। ভারত সহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ সম্মেলনে কাস্টমস ডিউটি প্রয়োগের পক্ষে জোরালো সওয়াল করবে। কারণ এই শর্তের চক্রজালে বিপুল পরিমাণে ইলেকট্রনিকস দ্রব্যের উপর কর ধার্য না করতে পারায় এই সমস্ত দেশগুলিকে প্রচুর পরিমানে কররাজস্ব হারাতে হয়।

     

সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো একযোগে খাদ্য ভর্তুকিতে রাশ টানার জন্য ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের বক্তব্য, যুদ্ধের কারণে সমগ্র পৃথিবীতে চরম খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে, এই পরিপ্রেক্ষিতে আরও বেশি বেশি করে গম, চাল ও অন্যান্য খাদ্যশস্য রপ্তানি মারফত ভারত সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় সদর্থক যোগদান দিক। যুদ্ধের শুরুতেও ভারত গম রপ্তানি করছিল, পরে বন্ধ করে দেয়। এই প্রসঙ্গে পিয়ুস গয়াল সওয়াল করেছেন, ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামে নিজের দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তারপর বিদেশের বাজারে খাদ্য রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হোক। কারণ, নিজের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত করা যেকোনও গণতান্ত্রিক সরকারের মুখ্য দায়িত্ব’।

     

ধনী দেশগুলোর উদ্দেশ্য হল, ভারত যেন কোনোভাবেই তার দেশের দরিদ্র মানুষগুলোকে ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য শস্য সরবরাহ না করে। ভারত সরকার চাষিদের কাছ থেকে সহায়ক মূল্যে চাল-গম কিনে গরিব মানুষগুলোকে সেই শস্য ভর্তুকি দিয়ে কম পয়সায় সরবরাহ করে। ধনী দেশগুলো চাইছে, দিল্লির সরকার যদি ভর্তুকি তুলে নেয় তাহলে গরিব মানুষগুলো বেশি পয়সা দিয়ে এই খাদ্যশস্য কিনতে অপারগ হবে, তখন সেই খাদ্য ভারত তাদের দেশগুলিতে রপ্তানি করবে। অর্থাৎ ভারত নিজের দেশের মানুষদের অভুক্ত রেখে অন্য দেশের মানুষদের মুখে খাবার তুলে দিক, এটাই তাদের অভিমত। স্বভাবতই ভারত এই প্রস্তাবে কর্ণপাত করবে নি। উপরন্তু, ভারতের পক্ষে এই সম্মেলনে মানবতার খাতিরে যাতে করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সরাসরি খাদ্যশস্য রপ্তানি করা যায় সেই ব্যাপারটিতে জোর দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে এই সরাসরি লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ভারত প্রতিবেশী দেশগুলিতে ঘুরপথে নয়, প্রয়োজনে সরাসরি চাল-গম রপ্তানি করতে চায়।

   

বিশ্বের ৮০ টি দেশ এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নেতৃবর্গ খাদ্যশস্য রপ্তানির উপর সমস্ত ধরণের নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে চাইছে। তারা 'ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম'-এর ব্যানারে মানবিক বোধের উন্মেষ ঘটাতে চাইছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেই সমস্ত দেশসমূহের বৈশ্বিক কোনও ব্যাপারে মানবিক অংশগ্রহণ নেই। এখন গম ও চিনি রপ্তানি বন্ধ করার কারণে তারা একযোগে ভারতকে সাম্প্রতিক খাদ্য সংকটের জন্য দায়ী সাব্যস্ত করছে।

   

উদ্বোধনী ভাষণে সংস্থার ডাইরেক্টর জেনারেল এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা বলেছেন, ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট, খরা, বন্যা, প্রদাহ এবং অন্যান্য চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয় সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে চিন্তিত, এবং কোভিড অতিমারির সাথে সাথে এই সমস্যাগুলিরও আশু সমাধানে সচেষ্ট থাকবে। এর মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বাজারে খাদ্য সংকট তীব্র করে দাম আকাশছোঁয়া করে তুলেছে। ইউনাইটেড নেশনস্ ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের হিসেবে গত মে মাসের তুলনায় এই মাসে গমের দাম ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। দানাশস্যের গড় দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৩০ শতাংশ, অন্যদিকে নিম্ন এবং মধ্যম আয়বিশিষ্ট দেশগুলিতে সারের দাম গত একবছরে ১২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে’। ওকোনজো সমস্ত সদস্য দেশগুলোকে মানবিকতার খাতিরে খাদ্য এবং কৃষিজাত উপাদান কোনওরকম বাধানিষেধ ছাড়াই লেনদেন করতে অনুরোধ করেছেন।

   সম্মেলনের প্রথম দিনই ভারত তথাকথিত প্রথম বিশ্বের দেশগুলোর বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী পিয়ুস গয়াল বলেছেন, ‘আমাদের দেশ ভারতবর্ষ কোভিড অতিমারী সংকট কাটাতে বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সামগ্রী সরবরাহ করে চলেছে, সেখানে উন্নত দেশগুলো তাদের পেটেন্ট এবং মেধাস্বত্ব সংস্কারের ব্যাপারে একদম চুপ। অথচ এই সংস্কার বিশ্বব্যাপী কোভিড ভ্যাকসিন, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ইত্যাদির সরবরাহ বহুল ও সুলভ করে তুলতে পারে। মি. গয়াল এই ব্যাপারে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিরপেক্ষ অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। শুধু ভারত নয়, বিশ্বের শতাধিক উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশ প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের মতে ড্রাফট প্রস্তাবে শুধুমাত্র কোভিড ভ্যাকসিনের ওপর পেটেন্ট ছাড়ের যে উল্লেখ রাখা হয়েছে সেটি যথেষ্ট নয়, অতিমারির সাথে সংযুক্ত আরও বহু দ্রব্য সামগ্রীর ক্ষেত্রে এই ছাড় লাগু করা হোক।

মৎস্যচাষে ভর্তুকির ব্যাপারেও বাণিজ্য এবং শিল্পমন্ত্রী সর্বসমক্ষে তাঁর বক্তব্য সুস্পষ্ট ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। উন্নত দেশগুলোর মৎস্য শিকারীদের দেয় ভর্তুকি বন্ধ করে দেওয়ার দাবি প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ভারত এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলি উন্নত দেশগুলোর মত মৎস্যচাষে ভর্তুকির ব্যাপারে একই ধরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে না। আমাদের গরিব এবং প্রান্তিক মৎস্যজীবীদের কথা ভাবতে হবে। আমরা উরুগুয়ে রাউন্ডে কৃষির ব্যাপারে যে ভুল করেছিলাম এবারে সেই একইরকম ভুল মৎস্যচাষ ক্ষেত্রে না ঘটে। এই মুহূর্তে ভর্তুকি তুলে নিলে হাজার হাজার মৎস্যজীবী পরিবার জীবনধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে অসমর্থ হয়ে পড়বে’৷

    

ভারত প্রথম থেকেই উন্নত দেশগুলোর উপর কোভিড ভ্যাকসিন, ওষুধপত্র, চিকিৎসার সামগ্রী ইত্যাদির উপর মেধাস্বত্ব অর্থাৎ ট্রিপস তুলে নেওয়ার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করছিল। কিন্তু আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলি, ইংল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ড কোনোভাবেই সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। তারা কেবলমাত্র পেটেন্ট ছাড়ের ব্যাপারটি ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল। সম্মেলনে পিয়ুস গয়াল বলেছেন, ‘আমাদের সম্মিলিত ভাবে কোভিড অতিমারী রুখতে রোগ নির্ণয়কারী যন্ত্রপাতি এবং রোগ নিরাময়কারী ওষুধপত্রের উৎপাদন, সরবরাহ এবং বিতরণ সংক্রান্ত বিষয়গুলির ক্ষেত্রে জনদরদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মেধাস্বত্বের প্রয়োজনীয় বদলই একমাত্র উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে সাহায্য করতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উদ্দেশ্য যদি জনগণের সার্বিক কল্যাণ হয় তাহলে এই সম্মেলনে আমাদের শপথ নিতে হবে, আগামী দিনে মুষ্টিমেয় কিছু ওষুধ কোম্পানির পকেট না ভরিয়ে এখন থেকে যে লক্ষকোটি মানুষ  অতিমারির অভিশাপে প্রাণ হারিয়েছেন বা শারীরিক এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের কল্যাণের কথা ভাববো’। বলাবাহুল্য, ভারতের তরফে এই ধরণের বক্তব্য বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর মোটেই পছন্দ হয়নি।

  

শুধু ভারত নয়, ভারতের সাথে বাণিজ্যকর্মে যুক্ত দেশগুলোও তাদের নিজ নিজ দাবি সম্মেলনে পেশ করেছে। ব্রাজিলের পক্ষে তাদের বিদেশমন্ত্রী কার্লোস অ্যালবার্তো ফ্রাঙ্কো ফ্রাঙ্কা দাবি জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় কেবল কোভিড নয়, অন্যান্য রোগসমূহ বিশেষ করে যেগুলি অনুন্নত দেশে উপেক্ষিত হয় সেগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এছাড়াও ব্রাজিল এই সম্মেলনে খাদ্যশস্যের বাজারে স্থিতিশীলতা এবং মৎস্য চাষে ভর্তুকির ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ব্যাপারে দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে চিনের বাণিজ্য মন্ত্রী ওয়াং ওয়েনটাও উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বাধিকার সংরক্ষণের ব্যাপারে সওয়াল করেছেন। তাঁর বক্তব্য, 'তাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়া হলে তারাও কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় মেধাস্বত্ব সংস্কারে আপত্তি জানাবে না।' ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো চাইছে কৃষিসংক্রান্ত আইনের আমুল পরিবর্তন, তার সাথে বাণিজ্য সংক্রান্ত নিয়মনিধির সঠিক ব্যবহার, খাদ্য মজুতকরণ, সরবরাহ ইত্যাদির ব্যাপারে পরিচ্ছন্ন এবং নির্দিষ্ট বিধির প্রবর্তন হোক। এছাড়া তারা আবহাওয়া পরিবর্তনের মত বিষয়গুলো নিয়েও সার্বিক আলোচনার দাবি রেখেছে। এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা খাদ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত দ্রব্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে নমনীয় নীতিগ্রহনের প্রস্তাব জানিয়েছে। সেই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রী ইব্রাহিম প্যাটেল একটি উন্নত ও পরিণত কর্মসূচি রূপায়ণের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যে গতি সঞ্চারণ, নমনীয় মেধাস্বত্ব আইন এবং অতিমারী সংক্রান্ত ছাড় ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করার দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া খাদ্য সংকট দূর করতে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করে এমন সব পরিকল্পনা সরকারি তরফে গ্রহণ করতে পরামর্শ দিয়েছেন। সবশেষে আসা যাক আমেরিকা প্রসঙ্গে। আমেরিকা দাবি জানাচ্ছে 'ডিজিটাল অর্থনীতি'র যেটি আগামী দিনে উন্নয়নের পথ দেখাবে। ইতিমধ্যেই 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশের অনেকটা কাজের দায়ভার বহন করে চলেছে। তাই তাদের প্রতিনিধি ক্যাথেরিন তাই-য়ের ভাষ্যে উঠে এসেছে, ‘অতি সম্প্রতি 'ডিজিটাল ইকনমি' অর্থনীতির পুনরুত্থান এবং উন্নয়নের গতিমাত্রার মাপকাঠি হয়ে উঠবে’। বেশ কয়েকবছর ধরেই আমেরিকা একটা সংহত আন্তর্জাতিক ই-কমার্স সংবিধান প্রচলনের কথা বলে আসছে।

   

সম্মেলনে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, যার জেরে সম্মেলন শেষ হওয়ার ২৪ ঘন্টা আগে পর্যন্ত মেধাস্বত্ব ছাড় থেকে শুরু করে কৃষি ও মৎস্য চাষে ভর্তুকি ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে কোনও সমাধান সূত্রে পৌঁছনো যায়নি। মতনৈক্য মিটিয়ে একটা আপোষে পৌঁছতে সংগঠকরা শেষপর্যন্ত সম্মেলনের সময়সীমা একদিন বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। রাত্র-দিন আলোচনার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলি অবশেষে 'জেনেভা চুক্তিতে' স্বাক্ষর করেছে, যেটি বিশেষজ্ঞদের মতে মন্দের ভালো হয়েছে। এই প্যাকেজে মৎস্য চাষে ভর্তুকি সংক্রান্ত কিছু উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আপদকালীন সংকট মোকাবিলা, কোভিড ভ্যাকসিন তৈরির জন্য আবশ্যিক লাইসেন্স গ্রহণে ছাড়, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি এবং সংস্থার নিজস্ব সংস্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সমাপ্তি ভাষণে এনগোজি জানিয়েছেন, 'এই সর্মসম্মত চুক্তি আগামী দিনে মানবকল্যাণে সদর্থক ভূমিকা পালন করবে। এই সম্মেলন তামাম বিশ্বের কাছে এই সন্দেশ পাঠালো যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যরা, বিভিন্ন ধরণের ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, একযোগে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান এবং সার্বিক ঐক্য এবং উন্নয়নের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভূমিকা গ্রহণ করে চলেছে।'

    

জেনেভা সম্মেলনে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা করতেই হয়। ভারতের পক্ষে পিয়ুস গয়াল একদিকে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর বৈরিতা সফলভাবে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছেন, অন্যদিকে ভারতের নির্দিষ্ট দাবিগুলো দৃঢ়তার সঙ্গে পেশ করেছেন। দিল্লি যে বিদেশী শক্তির ভ্রুকুটিতে ভয় পায় না সেটা খাদ্য রপ্তানিতে আংশিক ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটুট থেকে অবশিষ্ট বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই সম্মেলনে গয়াল গোটা বিশ্বের সামনে প্রথম বিশ্বের দেশগুলির দ্বিচারিতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি ছিল, ভারত খাদ্যশস্যে ভর্তুকি তুলে দিয়ে দেশের গরীব মানুষগুলোকে অভুক্ত রেখে অন্যান্য দেশের মানুষদের মুখে খাদ্যের যোগান দেবে, অন্যদিকে কোভিড মহামারী-অতিমারি নিয়ে এত কথা, এত সভা-সম্মেলন করেও ওষুধপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জামের উপর পেটেন্টে ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে তারা নিজেরা কোনওরকম মানবিকতার ধার ধারবে না। এখানেই ভারতের আপত্তি ছিল। আরেকটি ব্যাপার ছিল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি অনুযায়ী ইলেকট্রনিকস দ্রব্যের উপর কাস্টমস ডিউটিতে ছাড় দিয়ে ভারত এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বহু কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে হচ্ছিল। 'জেনেভা প্যাকেজ' ভারতের সাথে সাথে অন্যান্য গরীব ও উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ কতটা সংরক্ষণ করবে তামাম বিশ্ব আগামী দিনে সেদিকে উৎসাহী দৃষ্টি রাখবে, বলাই বাহুল্য।

                                    ...…………xxx…………..

 

লেখক: অর্থনীতির সহায়ক অধ্যাপক

তথ্যঋণ: সংবাদপত্র ও ইন্টারনেট

Mailing List