চলুন বেড়িয়ে আসি - পাঁচ জন আদিবাসী সর্দারের সাহায্যে গড়ে উঠল ‘গড় পঞ্চকোট’ রাজ্য

চলুন বেড়িয়ে আসি - পাঁচ জন আদিবাসী সর্দারের সাহায্যে গড়ে উঠল ‘গড় পঞ্চকোট’ রাজ্য
13 Dec 2020, 02:10 PM

পাঁচ জন আদিবাসী সর্দারের সাহায্যে গড়ে উঠল ‘গড় পঞ্চকোট’ রাজ্য

বাসবী ভাওয়াল

পিন্দারে পলাশের বন, পালাবো পালাবো মন- মন এবার পালাতে চাইল নতুন কোনও দিকে৷

শালবনী থেকে সকাল নটায় প্রাইভেট কারে রওনা গঙ্গাজলঘাটির উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে বড়ন্তি৷ গ্রামের মধ্যে দিয়ে রাস্তায় মুখোমুখি ধান বোঝাই গরুরগাড়ির সঙ্গে। অগত্যা পিছু হটল আমাদের গাড়ি৷ ধান বোঝাই গাড়িকে যেতে দিয়ে আমরা রওনা দিলাম। দূর থেকে নজর কাড়ল বড়ন্তি৷ জলের মধ্যে প্রতিফলিত পাহাড়ের প্রতিবিম্ব দেখে মনে পড়ে গেল- "কালো জলে কুচলা তলে ডুবলো সনাতন", যেন মনে হচ্ছে পাহাড় ডুব দিয়েছে জলে৷ মন ভরানো অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একরাশ মুগ্ধতায় ভরিয়ে তুলল মন৷

এবার বড়ন্তি থেকে রওনা গড় পঞ্চকোটের দিকে৷ পুরুলিয়া জেলার নিতুড়িয়ার গোবাগ গ্রামে পাহাড়ের কোলে এই স্থানটি৷ ইতিহাস আর প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে৷ ইতিহাস আজ বিস্মৃতির আড়ালে। কিন্তু প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোলোভা৷ যে কোনও প্রকৃতি প্রেমিক মানুষ এই স্থানের প্রেমে পড়বেই৷ আমি যেহেতু ইতিহাসের ছাত্রী, তাই ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহ আমার নেশা৷ গড় মানে দুর্গ। আর তার মানেই রাজকাহিনী। রোমহর্ষক জনশ্রুতি অনিবার্য৷ গড় পঞ্চকোট বহন করে চলেছে একসময়ের ঐতিহ্য। যদিও ইতিহাস আর কেউ মনে রাখেনি। আর তা রাখার কথা নয়। প্রকৃতির অপরূপ সম্ভারে হারিয়ে গেছে বিমূর্ত ইতিহাস৷

গড় পঞ্চকোট শব্দের অর্থ - গড় মানে দুর্গ, পঞ্চ অর্থাৎ পাঁচ আর কোট অর্থ গোষ্ঠী৷ জনশ্রুতি অনুসারে দামোদর শেখর আনুমানিক ৯০ খ্রীষ্টাব্দে শেখর রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন৷ পুরুলিয়ার ঝালদা থেকে এসে পাঁচ জন আদিবাসী সর্দারের সাহায্য নিয়ে এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন৷ পরবর্তী কালে এই রাজশাসনের পুনঃ প্রতিষ্ঠা করেন কীর্তিনাথ শেখর৷ ৯২৬ থেকে ১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত তাদের শাসন ছিল এই অঞ্চলে৷ বর্গী আক্রমণের সময় এই রাজ্যের সতেরো জন রাণী নিজেদের মান বাঁচাতে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন৷ পাঞ্চেৎ পাহাড়ের কোলে তাদের রাজধানী নজরদারির জন্য দোতলা নজর মিনার, রাণীমহল যা হাজারদুয়ারি নামে পরিচিত পাহাড়ের মাঝেই সেনাদের গ্যারিসন৷ রাস্তার ডানদিকে রাসমন্দির, বাঁ দিকে কঙ্কালেশ্বরী মন্দির৷ পুকুর বা ইদারা যেখানে রানীরা আত্মহত্যা করেছিল, তার অস্তিত্ব হয়তো পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছে৷

আনুমানিক ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দে এই স্থান পরিত্যক্ত হয়৷ এই বংশের রাজা জগজীবন সিং দেও প্রজাদের সরিয়ে নিয়ে যান কাশীপূরে৷ এই বংশের জনপ্রিয় রাজা নীলমণি সিং দেও। ইতিহাসের বেশির ভাগই জনশ্রুতি। তাই তথ্য সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়৷ কাশীপুরে রাজবাড়ি এখনও রয়েছে।

তবে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের ছোয়া অমলিন৷ আর ওখানে প্রতিটি বাঢ্চা গাড়ি দেখলেই খেজুর পাতা দিয়ে অপূর্ব হাতের কাজ বানিয়ে পর্যটকদের হাতে ধরিয়ে কিছু রোজগার করে৷ নিমেষে বুনন পদ্ধতিতে বানায় বাহারি স্টিকার৷ ওখানে মন্দিরের পেছনে নবনির্মিত চারুলতা রিসর্টে নানাধরনের খাবার৷ মান যথেষ্ট ভালো, থাকার জন্য দুটি টেন্ট আছে৷ মেয়েদের ইচ্ছা, তাই টেন্টে থাকা৷ ওখানকার ওয়াচটাওয়ার থেকে দারুন উপভোগ করা যায় পাহাড়ের সৌন্দর্য৷

আর ওখান থেকেই যাওয়া যায় পাঞ্চেত জলাধার প্রকল্পে৷ যেখানে বসে উপভোগ করা যায় সূর্যাস্ত ৷ কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকায় সেই সৌন্দর্য উপভোগ পুরো করা গেল না৷

এছাড়াও যাওয়া যায় জয়চন্ডী পাহাড় যেখানে সত্যজিৎ রায় হীরক রাজার দেশে সিনেমার স্যুটিং করতে এসেছিলেন বলে গর্বিত জয়চন্ডী মাথা তুলে আছে৷ সব মিলিয়ে হাতের কাছে মহুয়া ফুলের মন মাতানো গন্ধ তোলপাড় করে দেয় ভ্রমণপিপাসু মানুষের হৃদয়৷ আর যেতে যেতে স্থানীয় অটোচালকদের কাছে পাহাড়ের টিলায় ময়ালের উপস্থিতির গল্প মন কাড়ে৷ শোনা যায় ওখানে জলাশয়ে কুমীরও নাকি ছিল৷

সময় পেলে উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়ুন দক্ষিণের রাণী পুরুলিয়ার প্রাচীন ঐতিহ্য তথা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য  উপভোগ করতে৷ সঙ্গে শুনুন ফাগুনের মোহনায়, মন মাতানো মহুয়ায় রঙ্গীনি বিহুর নেশা কোন আকাশে নিয়ে যায়!

ছবি- লেখক

ads

Mailing List