শীতের শিউলি মানে শুধু ফুল নয়, খেজুর-তাল গাছের রস সংগ্রহ করে সুস্বাদু গুড়ও তৈরি করে, হাজির পুরুলিয়ায় শীতের শিউলিরা

শীতের শিউলি মানে শুধু ফুল নয়, খেজুর-তাল গাছের রস সংগ্রহ করে সুস্বাদু গুড়ও তৈরি করে, হাজির পুরুলিয়ায় শীতের শিউলিরা
29 Oct 2022, 09:15 PM

শীতের শিউলি মানে শুধু ফুল নয়, খেজুর-তাল গাছের রস সংগ্রহ করে সুস্বাদু গুড়ও তৈরি করে, হাজির পুরুলিয়ায় শীতের শিউলিরা

                         

ড. সমরেন্দ্র নাথ খাঁড়া

         

আমরা শরৎকালে শারদীয়ার শিউলি জানি। শিউলি ফুল। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য ফুল হলো শিউলি। কিন্তু অনেকের কাছে অজানা হলো শীতের শিউলি কি বা কাদের বলে। শীত আসার সময় থেকে যারা খেজুর ও তালগাছে চড়ে গাছের উপযুক্ত স্থানে কেটে রস সংগ্রহ করে; খেজুর ও তাল রস সংগ্রাহক ও উক্ত পেশাজীবী; গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে তাদের শীতের শিউলি বলে। এদের 'গাছি' ও 'পাশি'ও বলে। ভোরের বাতাসে হালকা শীতের অনুভূতি লাগতেই খেঁজুরের রস সংগ্রহে হাজির শীতের শিউলি বা 'গাছি'।

পুরুলিয়ার পুঞ্চা ব্লকের টাটাডি, কেন্ডাডি, বুধগোড়া এলাকায় বেশ কয়েকটা জায়গায় দেখি বাঁশের বাঁখারি দিয়ে কাঠামো তৈরী হচ্ছে। পাশে খেজুর পাতা,তাল পাতা,প্লাস্টিক ও পলিথিন।শিউলি যারা তাদের থাকার জন্য অস্থায়ী আস্তানা।একে 'মহল ' বলে। রস সংগ্রহের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, দৈনন্দিন জীবন যাত্রার জিনিসপত্র এনে হাজির।বেশ কয়েকটা তৈরী হয়ে গেছে।খেঁজুরের গাছ কাটা হয়ে গেছে।প্লাস্টিক কলসি বাঁধা হয়ে গেছে।

 শীতের শিউলি বা 'গাছি'রা আসে বাঁকুড়া জেলার তালডাংরা ব্লকের পুনিরশোল,ইন্দপুর ব্লকের সাতসোগরা, হিরবাঁধ ব্লকের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতি বছর পুরুলিয়ার জেলার বিভিন্ন ব্লকে আসে। এরা বেশীর ভাগই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। বর্তমানে কিছু স্থানীয় মানুষ এদের থেকে শিখে গাছ কাটতে শুরু করেছে।পুরো শীত জুড়ে খেঁজুরের রস সংগ্রহের জন্য আগস্ট মাসের শেষ বা সেপ্টেম্বর মাস থেকেই খেঁজুর গাছের ডাল কেটে গাছ পরিস্কার করার কাজ শুরু করে।পৌষ সংক্রান্তি পর্য্যন্ত এই কাজ চলে।

  এরা বছরের অন্য সময়ে ঠিকাদারের কাছে রাজমিস্ত্রী বা অন্য কাজ করে। এদের পেশা শীত শুরুর সাথে সাথে বদলে যায়। মূল বিষয় হলো বর্ষায় আমন রোপণের কাজ শুরুর পরে মাঠ থেকে ধান না ওঠা বা নবান্ন পর্য্যন্ত বেশীর ভাগ ঠিকাদারের কাজ বন্ধ থাকে।এই সময়ে বাড়ীতে বসে সময় নষ্ট না করে খেঁজুরের গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে নলেন গুড় তৈরীর কাজ করে।শীতে কষ্ট করে ঝুপড়িতে রাত কাটাতে হয়।এরা দুর্গাপুজোর আগে থেকে কোমর বাঁধতে শুরু করে।

 তারা প্রথমে ধারালো দায়ের সাহায্যে কান্ডের শীর্ষভাগে পাতার ঠিক নিচে গাছের নরম অংশ কেটে ফেলে। এ কাটা অনেকটা ইংরেজি অক্ষর ‘ভি’ আকৃতির হয়ে থাকে। পরে বাঁশের একটি ছোট নল গাছে ঢুকানো হয় যার মধ্য দিয়ে রস চুইয়ে গাছের সাথে লাগানো মাটির,বর্তমানে প্লাস্টিক পাত্রে জমা হয়। তালগাছ থেকে দিনে দুইবার সকাল এবং বিকালে রস আহরণ করে। খেজুর গাছ সপ্তাহে ২/৩ দিন কাটা হয় এবং সকালে রস সংগ্রহ করা হয়। খুব সকালে রস থাকে মিষ্টি ও টাটকা। কিন্তু যদি সকালে গাছ থেকে রস সংগ্রহ না করা হয়, তবে দু ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাটলে তা ক্রমান্বয়ে গাঁজিয়া যায় এবং ধীরে ধীরে তাড়ি, যা মাদক পানীয়ে পরিণত হয়।

 জ্বাল দিয়ে খেঁজুর ও তাল গাছের রস থেকে গুড় তৈরি করা হয়।বিশেষ একধরণের গুড় রয়েছে যাকে বলা হয় পাটালি।এ পাটালি গুড় দুধভাতের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে বেশ সুস্বাদু।তালগাছের রস থেকে তৈরি করা হয় তালমিছরি।

খেজুর গাছ বিশেষ কায়দায় কাটতে হয়। তারা নানা উপকরণ নিয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবেই গাছ কাটে। গাছগুলো কাটতে তারা ব্যবহার করেন - দা, দড়ি, একটুকরো চামড়া এবং পুরনো বস্তা আবার দা রাখার জন্য বাঁশ দিয়ে তৈরি থলি কিংবা ঝাঁপি।

গাছ মালিককে পৌষ সংক্রান্তির সময় গাছ প্রতি দুই কেজি করে গুড় দিতে হয়।আয় বলতে তিন/ চার জনের দলে সকলে খাটলে মাসে গড় পরতা মাসে সাত থেকে দশ হাজার টাকা আয় হয়। খাটুনি অনুযায়ী রোজগার কিন্তু কম।

ছবি: লেখক ও অসীম কুমার মিশ্র।

লেখক: হর্টিকালচার বিভাগের পদস্থ আধিকারিক, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

Mailing List