বন্যপ্রাণী-ঝর্ণা-পাহাড়-জঙ্গলের মায়াবী বাংরিপোসি আর স্বপ্নের সিমলিপাল অভয়ারণ্য, মাঝে ঝিল্লি পাখিরালয়, হাতিবাড়ি

বন্যপ্রাণী-ঝর্ণা-পাহাড়-জঙ্গলের মায়াবী বাংরিপোসি আর স্বপ্নের সিমলিপাল অভয়ারণ্য, মাঝে ঝিল্লি পাখিরালয়, হাতিবাড়ি
20 Sep 2022, 12:13 AM

বন্যপ্রাণী-ঝর্ণা-পাহাড়-জঙ্গলের মায়াবী বাংরিপোসি আর স্বপ্নের সিমলিপাল অভয়ারণ্য, মাঝে ঝিল্লি পাখিরালয়, হাতিবাড়ি

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল

 

ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা সীমান্তে পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলার লোধাশুলি থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টা দূরে সবুজের গন্ধ মাখা বুদ্ধদেব গুহর স্মৃতি বিজড়িত বারিংপোসি - সিমলিপাল। অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। প্রকৃতিতে প্রাধান্য পেয়েছে জঙ্গল। সবাই জঙ্গলমহল রূপে চেনে ও জানে। গাঢ় সবুজ অরণ্য দিগন্তে প্রসারিত, নীচেও তার সবুজের সমুদ্র। আর লালমাটির কাঁকুড়ে মায়া মাখানো স্বপ্নময় পথ। এই দীর্ঘ সবুজ জঙ্গল ঘিরেই এখানকার প্রান্তভূমির সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনের এক অনুপম ছন্দ। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বপ্নের গ্রাম দিয়ে ঘেরা এই এলাকা। উপচে পড়া বন্য রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুকে আছে অতীতের না বলা বর্ণময় নীরব ইতিহাস। সেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের খোঁজে আমাদের এই তিন দিনের রোমাঞ্চকর সফর।

শৃঙ্খলিত মন উড়ু উড়ু করছিল বেশ কিছু দিন ধরে। শৃঙ্খলিত জীবন চাইছে কিছু সময়ের জন্য মুক্তি। হঠাৎ আমাদের একবন্ধু বলল, এখন ভালো পরিবেশ, রোদ ঝলমলে আবহাওয়া, চলুন একটু কাছে কোথাও ঘুরে আসি। আমার মন এটাই চাইছিল কিন্তু কোন সঙ্গী পাচ্ছিলাম না। বলা মাত্রই গত পুজোর সময় এক রবিবার খুব ভোরে আমরা একটি গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম অরণ্যসুন্দরী ঝাড়গ্রামের পথে। স্বাস্হবিধি মেনেই ভোর পাঁচটায় যাত্রা। আমাদের শহর থেকে দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। কোলাহল মুখর খাতড়া শহর থেকে সামান্য কিছু দূরে আসতেই পথের দুপাশে পেলাম সদ্য শিশির স্নাত স্নিগ্ধ প্রকৃতি। প্রকৃতির অযাচিত উষ্ণ আহ্বানে মন ভরে গেল। শহর থেকে সামান্য এগিয়ে বাঁকুড়া-ঝাড়গ্রাম রাজ্য সড়ক ধরলাম। জঙ্গল মহলের মসৃণ রাস্তা দিয়ে আমরা পঞ্চপান্ডব চলেছি। ইতিমধ্যেই পূর্ব দিকে সূর্য দেব কাঁচা সোনা রঙ ছড়িয়ে উঁকি দিতে শুরু করে দিয়েছে। এ-এক অন্য ভুবনে বিচরণ করছি। এক মায়াবী পরিবেশ। শুধুই মুগ্ধতা। দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে জঙ্গলমহলের রূপসী প্রকৃতি।

গাড়ি দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে,একে একে রানী বাঁধ- ঝিলিমিলি ভুলাভেদা -বাশঁপাহাড়ি অতিক্রম করে একটু চায়ের জন্য বিরতি। সামনে সোজা ঝাড়গ্রামে যাওয়ার স্বপ্নের পথ। ঢেউ খেলানো মসৃণ স্বপ্নের রাজপথ। ল্যাণ্ডস্কেপ অনেকটা মধুপুর-- শিমুলতলার যেন কালার ফটোকপি। স্বল্প বিরতির পর আবার পথ চলা শুরু করলাম। মন জুড়ে সুন্দরী অরণ্যকন্যা বারিংপোসিও সিমলিপাল। সীমান্ত বাংলার সবুজের গন্ধ মাখা ওড়িষার জঙ্গলময় বারিংপোসি। রূপে, রসে-বর্ণে অনন্যা। নগরজীবনের কোলাহল মুক্ত এক স্বপ্নরাজ্য। কষ্টকল্পনা বনাম কঠিন কঠোর বাস্তব ভাবনায় বুঁদ হয়ে যাচ্ছি। গাড়ির কাঁচ সরিয়ে দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। শাল -মহুয়ার জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে সদ্য ওঠা সূর্যের আলোর মায়াবী খেলা। মানস পর্দায় ভেসে উঠছে আমার ভালোবাসার সুবর্ণরেখা-ডুলুং-তারাফেনি নদীর মোহনীয় রূপ। ঘড়িতে ৭টা, আরকিছু বাদেই ঝাড়গ্রামে পৌঁছাবো। বাইরে বেরোলেই  মনের সব শহুরে উদ্বেগ এক লহমায় মুক্তি পেয়ে যায়। চেনা তবু অচেনা এক আজব অনুভূতি মস্তিষ্কের কম্পুযন্ত্রের সব হিসাব নিকেশ তছনছ করে দেয়।রাজ্য রাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি, টেনশন, পে-কমিশন, কোভিড ১৯, পরিযায়ী শ্রমিকদের চরম দুর্দশা, ডি,এ- পুজোর বোনাস সব তালগোল পাকিয়ে বাষ্পায়িত ধূসর স্মৃতি। জানলা দিয়ে দেখলাম জঙ্গলমহলের গ্রামীণ প্রকৃতির জীবন্ত চলমান চালচিত্র। আকাশে শীতের মিষ্টি রোদের খুনসুটি। প্রকৃতির ক্যানভাসে  রিলিফের কাজ। দোহাই সভ্যতা এটুকু কেড়ে নিও না!! গাড়িতেই প্রাত:রাশের এলাহি ব্যাপার। ইচ্ছা মতো শুরু করলাম খাওয়া। ছুটে চলেছে আমাদের পঙ্খীরাজ। এক সময় ডাকসাইটে  সুন্দরীর মতোই নামডাক ছিল ঝাড়গ্রামের হাতিবাড়ি আর ঝিল্লির পাখ- পাখালির স্বর্গরাজ্য। এ -যেন শাল-পিয়ালে সাজানো প্রকৃতির সাজঘর। ঋতুভেদে বদলঘটে তার রূপে। এখন বাজারি সভ্যতার--সংক্রামক রোগ কিছুটা হলেও গ্রাস করেছে এই অরণ্য তনয়াকে। সকাল৭-৩০ - এ পৌঁছে গেলাম  ঝাড়গ্রামে।আবার পথ চলা শুরু। এবার চলেছি হাতিবাড়ির জঙ্গলমহলে। গল্প করতে করতে আধ  ঘন্টার মধ্যেই এসে গেল হাতিবাড়ি।

হাতিবাড়ি

ঝাড়খন্ড, উড়িষা, পশ্চিমবঙ্গের  সীমানা এলাকা তে  সুবর্ণরেখা নদীর পাশে রয়েছে হাতিবাড়ী ফরেস্ট রেঞ্জ।  হাতিদের আবাসস্থল। এই জায়গাটাতে এক সময় ময়ূরভঞ্জের সিমলিপাল  ও ঝাড়খন্ডের   দলমা হাতি দের ভালো আড্ডা ছিল। এখন ও কিছু দলমা হাতির আনাগোনা দেখা যায়। শাল, মহুয়া, শিমূল, সেগুন, পিয়াশাল, শিশু গাছ দ্বারা পরিবেষ্টিত এই জংঙ্গল এবং পাশ দিয়ে চওড়া  Subarnarekha নদী বয়ে যাচ্ছে।

 

আদিবাসী এলাকাতে এখন ও সেইভাবে আধুনিকতার ছৌঁয়া লাগেনি। গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় নেমে একটু চা।  সুবর্ণরেখার তীরে বসে নিরিবিলি সময় কাটানোর একটা ভালো জায়গা।  স্থানীয় জেলেরা নৌকাতে নদীতে মাছ ধরছে। নদীর তীরে এক হোটেলে খাওয়ার আয়োজন  করলাম, খেতে একটু দেরি আছে  দেখে  ঘুরতে  বেরিয়ে পড়লাম। হাতিবাড়ীর কাছে রয়েছে  একটি বৃহৎ জলাশয়, যা ঝিল্লী পাখিরালয় নামে পরিচিত। শীতকালে অনেক বিদেশী পাখীর সমারোহ দেখা যায় এই জলাশয়ে।

 

ঝিল্লি পাখিরালয়

 জংগলের ভিতর মনোরম পরিবেশে রয়েছে  ফরেস্ট অফিসের  অতিথি নিবাস। এই জায়গা থেকে স্বল্প দূরত্বে রয়েছে  উড়িষার Bangriposi।  অসাধারণ সুন্দরের স্বর্গরাজ্য। মুগ্ধতার আবেশ। খাবার টেবিলে বসে  ভাবছি  বারিংপোসি তাহলে আর কত সুন্দর?   মনে জুড়ে বুদ্ধদেব গুহর উপন্যাসের ছবি ভাসছে। আমার এক বন্ধু  বলেছিল- "এখনে যেতে হলে, আগে পড়ে নিস বুদ্ধদেব গুহর লেখা ‘বাংরিপোসির দু’রাত্তির’ বইটি।" আমার খুব প্রিয় বই, বহু বার পড়েছি। আশ মেটেনি। বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে বাংরিপোসির প্রকৃতি। ঘন সবুজ জঙ্গল, পাহাড়, নদী আর আদিবাসি গ্রাম। শিমলিপাল ফরেস্ট রেঞ্জের উত্তর দিকে ঠাকুরানী পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই সুন্দরের ঠিকানা– বাংরিপোসি। রোজকার ছকে বাঁধা জীবন আর প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে যখনই হাঁপিয়ে উঠি, তখনই মনে হয় বেড়িয়ে পড়ি খোলা আকাশের নিচে আমার আমিকে খুঁজতে। খাওয়া শেষে আবার পথ চলা শুরু করলাম। গন্তব্যস্থল ওড়িশা জেলার বাংরিপোসি এবং সেখান থেকে সিমলিপাল -- জাতীয় সড়ক ছুঁয়ে- ছুঁয়ে মাত্র দেড় ঘণ্টায় পৌঁছোলাম বাংরিপোসি স্টেশন। অসাধারণ  মায়াবী স্বপ্নের পথ। সন্ধ্যা নাগাদ। সূর্য তখনও অস্তমিত হয় নি। বেশ কিছু সময় পর একফালি চাঁদ উঠেছে।

একটা ছোট্ট স্টেশন লোকজন খুব কম, দোকানপাটও নেই। চারিদিক শান্ত, শুধু পাখির কলকাকলি সবুজের সমারোহ। প্রকৃতির এক অদ্ভূত রূপ যা কংক্রীট এর জঙ্গলে থাকা আমার মত মানুষের কাছে এক অদ্ভূত প্রাপ্তি।

বাংরিপোসি স্টেশন থেকে বেড়গ নিজেদের গাড়িতে করে গিয়ে পৌঁছালাম এক কিলোমিটার দূরে আমাদের আগে থেকে রিজার্ভ করে রাখা থাকার জায়গা খয়েরি রিসোর্ট-এ। রিসোর্টের ঠিক উল্টোদিকেই শালুক ফুলে ভরা একটা পুকুর দেখে মনটা ভাবুক হয়ে গেলো।সবুজ গাছপালায় ঘেরা পরিপাটি করে সাজানো রিসোর্ট আর তার চারপাশের নিঃস্তব্ধ পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হলাম।দোতলা রিসোর্ট আমাদের ঘরটা ছিল দোতলায়। রাতের খাওয়াটা হল ভাত, দেশি মুরগী, সব্জী, আচার আর পাপড় দিয়ে। রান্নার স্বাদ ছিল জিভে লেগে থাকার মতো। ব্যালকনি থেকে রাতের বারিংপোসির রূপ উপভোগ করতে  করতে  ঘুমের  রাজ্যে পাড়ি দিলাম। পরের দিন সকালে একটু টিফিন করে  নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ছবির মতো সাজানো বাংরিপোসিকে উপভোগ করতে। চারপাশ ঘুরে দেখার জন্য রিসোর্ট থকে গাড়ি পাওয়া যায় বা বাইরে থেকেও গাড়ি বা অটো রির্জাভ করা যায়। আমাদের নিজস্ব গাড়ি ছিল তবু কিছুটা হেঁটে পৌঁছালাম বাজারে, সেখানে একটু চা  বিরতি, ড্রাইভার এসে গেল তারপর বেরিয়ে পড়লাম। গ্রামবাংলার কাঁচাপাকা রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম ইতিহাসের পাতায় পরিচিত বুড়িবালাম নদীর দিকে। সমতল আর পাহাড় এই দুইয়ের সংমিশ্রণে অদ্ভূত এক ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বাংরিপোসির।তির তির করে বয়ে চলা নদী, চারপাশে কাশফুল, নদীর পাড়ে পড়ে থাকা নুড়ি পাথর, দূরে আবছা পাহাড়ের চূড়া আর সূর্যাস্তের লাল আভা সবকিছু মিলেমিশে একাকার। নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত মন আমার যেন চলে গেছিল সুদুর অতীতে। রোমাঞ্চিত হয়ে পড়েছিলাম, এই সেই বীর স্বাধীনতা সংগ্রামী বাঘা যতীন এর বুড়িবালাম নদী।

বুড়িবালাম ‌নদী

এর তীরেই হয়েছিল বাঘা যতীনের ব্রিটিশদের সাথে সেই বিখ্যাত বুড়িবালামের যুদ্ধ।বু ড়িবালাম নদীর তীর ছেড়ে এগিয়ে চললাম দুর্য়াসিনি মন্দিরের দিকে।যতই মন্দিরের দিকে এগোতে থাকলাম উচ্চতা বাড়তে থাকল। সমতল ছেড়ে উঠে এলাম পাহাড়ের কোলে।পাহাড়ের কোল ঘেষে একেবেঁকে সাপের মতো চলে গেছে কালো পিচের রাস্তা। পৌঁছে গেলাম দুয়ারসিনি মন্দিরের সামনে। মন্দিরের পুরোহিতের থেকে জানলাম সারা বছর এই মন্দিরে পূজো হয়। শুধুমাত্র মকরসংক্রান্তির দিন জঙ্গল কেটে পাহাড়ের মাথায় থাকা গুহা পর্যন্ত্য রাস্তা তৈরি করা হয়। তারপর ঐ গুহার মধ্যে থাকা দু্য়ারসিনি দেবীর পূজো করা হয়।মন্দির দেখে পাহাড় জঙ্গলে মেশা রাস্তা ধরে ফিরে এলাম  রাস্তার ধারে একটি ছোট্ট হোটেলে, ডিম-ভাত দিয়ে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়লাম  ৭০ কিমি  দূরে অবস্থিত সিমলিপাল রিজার্ভ ফরেস্টের উদ্দেশে জঙ্গল সাফারির। যতই সিমলিপালের দিকে এগোতে থাকলাম রাস্তার দুপাশের জঙ্গল ঘন হতে থাকল। আজকের দ্রষ্টব্য জশিপুর এ রামতীর্থ, জঙ্গল এর ভেতরে উস্কি, বারেহেপানি ও জোরান্ডা জলপ্রপাত, চাহালা ওয়াচ টাওয়ার আর ফেরার সময় অন্ধকার না হয়ে গেলে লুলুং নদী ও সীতাকুণ্ড।

 

ঘন্টাখানেক পর পৌঁছলাম জশিপুর এ। এখানে এন্ট্রির জন্য পারমিট নিলাম। মিনিট ১৫-২০ সময় লাগলো পারমিট নিতে। গাইড নিতে হল। যেহেতু আমাদের ড্রাইভার এই এলাকায় একেবারেই অপরিচিত। গাইড নিজেই সব ব্যবস্থাপনা করে দিলেন।

অল্প কিছু খাবার খেয়ে আমরা প্রথমে গেলাম রামতীর্থ। খৈরি নদীর ধারে রাম মন্দির। রামচন্দ্র নাকি বনবাসকালে এখানে এসেছিলেন। এখানে একটি কুমির প্রকল্প রয়েছে। গাইড দাদা বললেন, খৈরি নামের যে বাঘটিকে বাঙালি দম্পতি তাদের কাছে রেখেছিলেন তার মৃত্যুর পর তার অস্থি এইখানেই নাকি রাখা আছে।

কিছু সময় এখানে কাটিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম জঙ্গলের দিকে। প্রায় মিনিট কুড়ি পর পৌঁছলাম জশিপুর গেট, এটা সিমলিপাল এর মেন জঙ্গলে প্রবেশের গেট। এখানে এন্ট্রি পারমিট দেখিয়ে ঢুকতে হলো। এই জঙ্গল পথের পুরো রাস্তাটাই একেবারে লাল। কাঁচা মাটির রাস্তা। জঙ্গলে ঢোকা থেকেই লাল ধুলো উড়তে দেখছি। গাছের পাতা শুদ্ধ লাল লাল হয়ে আছে। আর আমরাতো বটেই। আমাদের জামাকাপড়, মুখ, হাত, ব্যাগ, চুল, চোখের পাতা শুদ্ধ লাল ধুলোতে মাখামাখি হয়ে গেছে। তা হোক। জঙ্গলে এসে নয় একটু লাল ধুলোই মাখলাম। আহা এই লাল মাটির রাস্তা। কিন্তু বর্ষাকালে কি যে অবস্থা হয় এখানে রাস্তার কে জানে। এন্ট্রি পয়েন্ট থেকে কিছুটা এগিয়ে গাড়ি থামলো, এক মহাশাল বৃক্ষ। চারশো বছরের পুরনো এই শাল গাছ। পবিত্র গাছ বলে মান্য করা হয়। কথিত আছে এই গাছ কাটতে এসে নাকি ঠিকাদার এর লোকজন ওই গাছের অভিশাপে মারা গেছিল। তা এসে সত্যি কি কল্পকাহিনী তা জানা নেই। তবে ওই পরিবেশে দাঁড়িয়ে এই গল্পকে সত্যি বলেই মানতে মন চায়।

"কোনো এক চেনা পথে একদিন যেতে যেতে, পথ বলে অরণ্যে যাব, বনের উদ্দাম চঞ্চলতা চলনা তোমাকে দেখাবো।"  ভারি সুন্দর লাগছে এই জঙ্গল পথ। শাল সেগুন এর ঘন জঙ্গল। মাঝেমাঝে দেখা যাচ্ছে কোনো নদী। ড্রাইভার দাদা বলেন এটা উসকি ফলস থেকে নেমে আসা নদী। গুরগুরিয়া পেরোলাম। একটা নদীতে দেখলাম স্থানীয় বাচ্চাদের হুটোপুটি করে স্নান করছে। কি সহজ সরল জীবন। সিমলিপাল এর ভেতরে নাকি অনেকগুলো গ্রাম রয়েছে। রয়েছে পঞ্চায়েত। বেশ কয়েক শ মানুষের বাস এই জঙ্গলে। তবে পুরো সিমলিপাল ই জঙ্গল, পাহাড়, সুন্দর উপত্যকা, সুন্দর আদিবাসীদের গ্রাম, ঝর্না, নদী নিয়ে একটা ভীষণ সুন্দর জায়গা। পেরিয়ে যাচ্ছি কত সুন্দর সুন্দর গ্রাম

জঙ্গলের ভেতর যে এত গ্রাম থাকতে পরে আমি জানতাম না। কি সুন্দর ধাপ কেটে কেটে ওরা চাষ ও করছে। গাড়ি চলতে চলতে কখনো গভীর জঙ্গল , তো কখনো বিশাল এক উপত্যকায় এসে পড়ছে , আর সেই উপত্যকা ঘিরে পাহাড়ের সারি। গাছের পাতাগুলো অনেকাংশে হলুদ হয়ে আছে। আমিতো ভাবছিলাম দূর থেকে হলুদ ফুল ফুটেছে বুঝি। সত্যিই যেন এক হলুদ বন মনে হচ্ছিল। "ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত"....

গাড়িতে লাল ধুলোর হাওয়া মেখে আমরা বনপথে চলেছি।"পাগল হওয়া কি আমার মত তুমিও হারিয়ে গেলে, ফুলেরও বনে হাজারও রঙের মেলায়, সুরভি লুটের খেলায় তারে নাহি পেলে"...গুলতি হাতে পাখি শিকার করছে কিছু গ্রামের ছেলে। ড্রাইভার দাদা বললেন এখানে গ্রামে বাঘ ঢুকে পড়লে কখনো কখনো এরা তীর ধনুক দিয়ে নাকি বাঘ শিকার ও করে। বাঘের ছাল বিক্রি করে নাকি কেউ কেউ বড়লোক হয়ে গেছে। তারা আবার বাইকে করে ঘুরে বেড়ায়। সত্যি মিথ্যে আমি জানিনা বাপু। দাদা আমাদের দেখলেন মহুয়া গাছ। আমিতো ফলের আশায় গাছের দিকে চেয়ে দেখলাম। নাহ্ মহুয়ার সময় হল ফাল্গুন। সেইসময় নাকি মহুয়ার গন্ধে মাতাল হয়ে ওঠে জঙ্গল। সেই গন্ধেই নাকি নেশা হয়ে যায়। ইশশশশ ওইসময় টায় যদি আসতাম। পলাশ, শিমুল, কুসুম এর লাল আর মহুয়া ফলের মদির গন্ধে নেশাতুর হতে আবার আসতে হবে ভরা বসন্তে। তখন আমি আবার গাইব, " ও পলাশ, ও শিমুল আমার এ মন কেন রাঙালে, জানিনা জানিনা আমার এ ঘুম কেন ভাঙ্গালে"

"এই বনপথে যেতে যেতে কত সবুজ সবুজ উপহার"....শাল, সেগুন, মহুয়া, পলাশ আরো অনেক নাম না জানা গাছের মায়া অরণ্য পথে এগোতে লাগলাম। এক ঘন্টা পর এসে যাবার পথে মাঝে মাঝেই রাস্তার দুধারে অনেক বাঁদর চোখে পড়ল। সিমলিপাল ঢ়োকার আগে স্থানীয় খাবার সুজির বড়া আর কচুরি খেলাম। সিমলিপাল রিজার্ভ ফরেস্টে ঢ়োকার পাস করানোর সাথে দুপুরের খাবারের কুপন ও নিয়ে নিলাম। সাইনবোর্ডে দেখে নিলাম নিয়মাবলী, ফরেস্টে কি কি করা যাবে আর কি করা যাবে না। ফরেস্টে ঢ়োকার আগে ভাল করে হাতে মুখে মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য ক্রীম লাগিয়ে নিলাম, যেহেতু সিমলিপাল রিজার্ভ ফরেস্ট ম্যালেরিয়ার মশার জন্য বিখ্যাত। একজন গাইড নিয়ে শুরু করলাম আমাদের ফরেস্ট সাফারি। যত জঙ্গলের গভীরে ঢ়ুকতে থাকলাম, অবাক হতে থাকলাম উদ্ভিদ বৈচিত্র দেখে। কিছু জানা অধিকাংশই অচেনা গাছ।একটু পরেই গাইড গাড়ি থামিয়ে আমাদের কে দেখাল এক বিশাল উঁচু এবং চওড়া শাল গাছ। শাল গাছটার বয়স ৩৪০ বছরের ও বেশি। এরপরেই দেখলাম ৩০০ বছরের একটা চম্পা গাছ। জঙ্গলে মাঝে মাঝে চোখে পড়ছিল ছোট ছোট গ্রাম। গাইডের কাছে জানলাম এরা খাদিয়া উপজাতির লোক। এরা এখানে বসবাস করে জঙ্গলের দেখাশোনা করে নিজেদের জীবন নির্বাহ করে। জঙ্গলের পথের দুধারে মাঝে মাঝে চোখে পড়ল বাচ্চারা শাল পাতায় করে আমলকি, ফুলের মালা বিক্রি করছে। অবাক হলাম দেখে যে জীবনে কোন সুখ স্বাছন্দ্য না থাকা সত্ত্বেও তারা মুখে হাসি নিয়ে বেঁচে আছে। গিয়ে পৌঁছালাম GURGURIA ECO-TOURISM CENTER এ। জানলাম এখানে জঙ্গল থেকে বাচ্চা হাতি নিয়ে এসে তাদের ট্রেনিং দেওয়া হয়।এরপর যাত্রাপথে দেখলাম দারুণ সুন্দর দুটো জলপ্রপাত বড়েপানি আর উইস্কি। দুপুরে জঙ্গলের ভেতরেই খাওয়া সারলাম রিজার্ভ ফরেস্টের থেকে ব্যবস্থা করা খাবার জায়গায়।যাত্রাপথে কিছু বাঁদর আর বনমোরগ ছাড়া অন্য প্রাণী দেখতে না পাওয়ায় মনটা একটু খারাপ লাগছিল। ঠিক তখনই গাইড জানালো যে এবার আমরা জঙ্গলের CORE এলাকায় ঢ়ুকব। সেখানে ভাগ্য ভাল থাকলে বন্য প্রাণীর দেখা পেতেও পারি। গাড়ি থেকে নেমে উঠলাম একটা টাওয়ারের মাথায়। হঠাৎই দেখতে পেলাম একদল হরিণ মনের সুখে ঘুরে বেড়াছ্ছে। একটু দূরে দেখলাম বেশ কিছু ময়ূর। আরো কিছুটা জঙ্গলের গভীরে দেখলাম তিন চারটে হাতি। সিমলিপাল যদিও TIGER RESERVE কিন্তু বাঘ দেখার সৌভাগ্য এ -যাত্রায় হলনা।ফিরে এলাম  রিসোর্টে।সন্ধ্যা বেলা খোলা বারান্দায় বসে গরম চা আর চপমুড়ি খেতে খেতে উপভোগ করলাম অদ্ভূত নিরবতা।শুধু ঝিঁঝিপোকার ডাক আর অনেক শাখা প্রশাখা নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল বটগাছ।রাত অল্প বাড়তেই সারা এলাকা নিঝুম হয়ে গেল।কসা মাংস আর রুটি দিয়ে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।পরের দিন খুব  সকালে

সূর্যের আলোমাখা মনোমুগ্ধকর গভীর অরণ্যে ভিতরে  দিয়ে  বিভিন্ন জনপদ ভূমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে বাংরিপোসির দিকে রওনা দিলাম। পেছনে পড়ে রইল সিমলিপাল রিজার্ভ ফরেস্ট আর সঙ্গে নিয়ে ফিরলাম একটা পুরো দিন জঙ্গলের সাথে একাত্ম হবার অদ্ভূত মাদকতা। পরের দিন সকালে রির্সট ছেড়ে বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করলাম। রাস্তার ধারে মাঝে মাঝে চোখে পড়ছিল গ্রাম্য মহিলারা হাঁড়ি চাপা দিয়ে কিছু বিক্রি করছে। জানলাম তারা হাঁড়িয়া নামে একপ্রকার নেশার তরল জিনিস বিক্রি করে। ফেরার পথে গেলাম বামনকুন্ডু নামে জলাশায় দিয়ে ঘেরা জায়গায়। স্থানীয় লোকেদের কাছে পবিত্র স্থান। দেখলাম প্রাচীন এক শিব মন্দির। বুদ্ধদেব গুহর  বইটি পড়া থাকলে দেখবেন লেখার সঙ্গে প্রকৃতি যেন হুবুহু মিলে গিয়েছে। যা আপনাকে আশ্চর্য করবে। এখান থেকে লাল মাটির পথ ধরে চলে যান ব্রাহ্মণকুণ্ডে। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সারিসারি শাল-মহুয়া। এলোমেলো ঘুরে বেড়ালেই মনে হবে স্বর্গরাজ্যের দুয়ার।যাঁরা অফবিট ভ্রমণ ভালোবাসেন, বাংরিপোসি তাঁদের জন্য আদর্শ জায়গা।

একদম শেষে গেলাম ডোকরা শিল্পের জন্য বিখ্যাত ডোকরা গ্রামে। ডোকরা গ্রাম থেকে  বারিপদা শহর ঘুরে  ফিরতে  লাগলাম  নিজেদের শহরের অভিমুখে। শেষবারের মতো দেখে নিলাম বাংরিপোসিকে। একরাশ ভাললাগা আর সবুজের গন্ধমাখা স্মৃতি, আর সঙ্গে একটুখানি মনখারাপ নিয়ে ছাড়লাম বাংরিপোসি। এবার ফেরার পালা।

উড়িষ্যা অতিক্রম করে সুবর্ণরেখা নদীর ব্রীজে আসলাম। সেতু থেকে সূর্যাস্ত দেখলাম মনে হলো যেন শিল্পির আঁকা ছবি। পাশে ঝিল্লি - হাতিবাড়ি পক্ষীপ্রেমিক মানুষের কাছে জনপ্রিয় জায়গা। এখানে স্বপ্ল বিরতি। বিরসা সেতু অতিক্রম করে আমরা এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রামে প্রবেশ করতে চলেছি। সুবর্ণরেখা নদী এক এক জায়গায় এক এক রূপে আমাদের যাত্রাপথে পড়ল। নানান জায়গায় ঘুরে এখন শিলদার পথে। দুদিন ধরে তিন রাজ্যে মোটামুটি ৭৫০কিমি ঘুরলাম। খরচ খুব বেশি নয়।  উড়িষ্যার সীমান্ত অতিক্রম করে গোপীবল্লভপুর হয়ে ঝাড়গ্রামে পৌঁছানোর পর গৃধনী হয়ে বেলপাহাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছি। অরণ্যকন্যা ঝাড়গ্রামের সৌন্দর্য অতুনীয়।

 

সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও অমরাবতী ঝাড়গ্রাম। ঝিটকার জঙ্গল একসময়ে মাওবাদীদের ডেরা ছিল। আজ তা শুধুই অতীতের কথকতা ।গাড়ি চলছে ধীরে ধীরে। চলার পথে প্রকৃতি পালটে যাচ্ছে। একটু শিহরণ জাগছে। নানান ধরণের গাছে ভরা অরণ্য। সূর্য বলছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। ক্রমশ ঘন হচ্ছে জঙ্গল।যাত্রাপথের চারপাশে জমাট বেঁধে আছে অস্বাভাবিক নীরবতা। এ-যেন আমার পৃথিবী নয়, এখানে আমরা অনুপ্রবেশকারী। এবার ফেরার পালা।এখান থেকে আমাদের শহর খাতড়ার দূরত্ব মাত্র ৮০কিমি। দিনান্তের ম্লান আলোয় উঁচু পাহাড়গুলোর মাথা গেরুয়ারঙে মৌন,তপস্বীর মতো সমাহিত। আমরা তখন ফেরার পথে, হঠাৎ কানে ভেসে আসে সাঁওতালি মেঠোসুর। মাদলের চাপা আওয়াজ দ্রিমি দ্রিমী। সে সুর কেমন যেন মাতাল করা। চেয়ে দেখি দূর পাহাড়ের গায়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে আল পথ বেয়ে চলেছে একদল সাঁওতালি পুরুষ আর রমনী। মেয়েদের মাথায় গোঁজা বনফুল, নাকে নোলক পায়ে মল সহ ঘুঙুর। মাথায় জঙ্গলের ডালপালার বোঝা। দলের শেষে সাঁওতাল যুবকদের হাতে মাদল। যেন অবশ করা ঘুম পাড়ানি বোল। সবকিছু দেখে মনে হলো ঘুঙুর আর মলের শব্দে ঢাকার চেষ্টা করছে অভাব আর জীবনের অপ্রাপ্তির ক্ষত। গাড়ি চলছে দুরন্ত গতিতে। ঝিলিমিলি -বাঁশপাহাড়ী অতিক্রম করে রানীবাঁধের ১২মাইল পেরিয়ে চলেছি। ঝিলিমিলি আর রানীবাঁধের পাহাড়ের পিছনে লাল রঙের পূর্ণিমার চাঁদ চুপিসারে উঠেছে, সবুজ অন্ধকারে। আমরা প্রায় বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি। দুই দিনের প্রাপ্তির স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে বিভিন্ন জনপদভূমি অতিক্রম করছি। মন ভারাক্রান্ত। আবার সেই কেজো জীবনে প্রত্যাবর্তন। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা বেজে গেছে। মন জুড়ে একটা মুগ্ধতা ও বিষন্নতা। রাতবাড়ে, পাহাড়, জঙ্গল আর নদীর গান শেষ হয় না। আকাশ ভরা তারায় তারায় শেষ হলো জঙ্গল জীবনের বর্ণময় এক ভ্রমণের কাহিনী

কোথায় থাকবেন ও খাবেন : কলকাতা থেকে মাত্র ২৩০ কিলোমিটার দূরে দু’দিনের জন্য ঘুরে আসা যায় অল্প খরচেই।  হাওড়া থেকে ট্রেনে  বারিংপোসি স্টেশন। নিজস্ব গাড়ি  ও ধর্মতলা থেকে বাসে যাওয়া যায়। বাংরিপোসিতে রয়েছে শিমলিপাল রিসর্ট। এসি, নন এসি দু’ধরনের রুম মিলবে। । সুস্বাদু বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। আবার বাজার করে নিজের মতো রান্না করার সুব্যবস্থ্যাও রয়েছে। শিমলিপাল রিসর্টের ফোন নম্বর: ৯৪৩৭৬১২৭৪৭।এছাড়া ঠাকুরানী পাহাড়ের দিকে যেতে পড়বে দিলখুস ধাবা। এই হোটেলের মাছভাত বাঙালি পর্যটকের কাছে খুবই প্রিয়। বাংরিপোসি বাজারে রয়েছে সন্তোষ হোটেল। সেখানেও ভালো খাবার পাওয়া যায়।

লেখক: শিক্ষক, লোক গবেষক, ভ্রমণ কাহিনী লেখক।

Mailing List