ধর্ম ও রাজনীতির এত বন্ধুত্ব কেন?

ধর্ম ও রাজনীতির এত বন্ধুত্ব কেন?
31 Jul 2020, 06:42 PM

ধর্ম ও রাজনীতির এত বন্ধুত্ব কেন?

সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায়

ধর্মকে রাজনীতি কাঁধে তুলে নিচ্ছে, কিংবা ধর্মের কাঁধে চাপছে রাজনীতি। আমাদের দেশে এটি খুব পরিচিত দৃশ্য। আমাদের দেশ বলে নয়, পৃথিবীর আরও কিছু দেশেও অল্পবিস্তর এই ছবি দেখতে পাওয়া যায়। যদিও আমাদের দেশে এটা থাকার রাজনৈতিক সুবিধা অনেকটাই বেশি। তাই অধিকাংশ দল এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না। এত বড় মগজমারা কল সস্তায় নিজের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে কে না চায়। কেন এমন বলছি? ধর্ম যদি ব্যক্তিগত পরিসরে মানুষের ভালমন্দ ন্যায় বোধ জীবনাচারণকে নিয়ন্ত্রণ করত, তাহলে একথা বলার প্রয়োজন হত না।

একটু তলিয়ে দেখবেন দুয়ের মধ্যে কী বিপুল মিল! বস্তুত ধর্মের সঙ্গে বর্তমান রাজনীতির গভীর এক অদৃশ্য গাঁটছড়া রয়েছে।

এখনকার রাজনৈতিক নেতারা কী বলেন! আমরা এই করে দেব, একবার শুধু ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিন, হাজারো প্রতিশ্রুতি। সবই দেখবেন ভবিষ্যতের নামে। জন্মান্তরবাদ এবং কর্মবাদের মিশেল। এই জন্মে ভাল কাজ করুন, সামনের জন্মে ফল পাবেন। ধর্মের ক্ষেত্রেও দেবতার দুয়ারে হত্যে দিয়ে আপনি কী চান? আমার যেন এই হয়, ভাল চাকরি পাই, ব্যবসায় উন্নতি করি- সবই ভবিষ্যতের দেনাপাওনার কথা। সুতরাং, ভাবাদর্শগত কাঠামোর দিক থেকে ধর্ম ও রাজনীতির গঠনটা একই। ফলে যদি আপনি ধর্মের কাঠামোটা টিকিয়ে রাখতে পারেন, তাহলে আপনার যে মন ও মানসিকতার জমি তৈরি থাকবে, তাতে রাজনীতির প্রতিশ্রুতির বীজ খুব সহজেই রোপণ করা যেতে পারে।

এই কারণেই আমাদের দেশে রাজনীতির কারবারিরা হামলে পড়ে কে কতটা ধর্মপ্রাণ তা দেখানোর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। যে ঘরানার রাজনীতি এখন দস্তুর হয়ে গিয়েছে, তাতে এটা করাই স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক হচ্ছে, আমরা কেন তা বুঝছি না, বা বুঝলেও তা প্রতিক্রিয়ায় কেন বুঝিয়ে দিচ্ছি না।

এখন তো ‘পোস্ট ট্রুথ’-এর রাজনীতি। যুক্তি, বিজ্ঞান এসব কিছু নয়, আবেগ দিয়ে মানুষকে বুঁদ করে রাখো। যুক্তি, বিজ্ঞান বাড়লে, প্রশ্ন উঠবে অপুষ্টি নিয়ে, বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে, চরম বেকারত্ব নিয়ে। তাই ‘ক্যারিশমা’ তৈরি কর। আবেগ। নতুন নতুন মেটা ন্যারেটিভ। ধর্ম যেমন মেটা ন্যারেটিভ, তেমনই। এতে আসল সমস্যাগুলো থেকে মানুষের মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া যাবে। আর হ্যাঁ, পণ্ডিত, পড়ুয়া, শিক্ষিত, যুক্তিবাদী, বিশেষজ্ঞ মানুষদের জায়গা দিও না। তাঁরা বেয়াড়া প্রশ্ন করবে। তার চেয়ে ধর্মের ধুয়ো তোলা, যাতে আমরা আরও আচ্ছন্ন রাখতে পারি জনগণকে।

লেখক বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক

Mailing List