স্বামীজি অদ্বৈতের উপর জোর দিয়েছিলেন কেন? 

স্বামীজি অদ্বৈতের উপর জোর দিয়েছিলেন কেন? 
12 Jan 2022, 12:15 PM

স্বামীজি অদ্বৈতের উপর জোর দিয়েছিলেন কেন? 

       

 

সুদর্শন নন্দী

 

 

আধ্যাত্মিক নবজাগরণের পুরোধা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের যোগ্যতম শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন অদ্বৈতের পূজারী। আমরা জানি স্বামীজি শুধু অদ্বৈত সাধনার জন্য হিমালয়ের মায়াবতীতে আশ্রম নির্মাণও করেছেন। যেখানে  কোন মূর্তি বা ছবি অর্থাৎ সাকার কিছু নেই। হয় নিরাকার ব্রহ্মের সাধনা।   

 

অনেক ভক্তেরই মনে প্রশ্ন জাগে যে বেদান্তে দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত, অদ্বৈতের কথা থাকলেও স্বামীজি অদ্বৈতের উপর জোর দিয়েছিলেন কেন? 

 

কেন অদ্বৈতবাদকেই তিনি গ্রহণ করলেন সেই নিরিখে এই আলোচনা। স্বামীজির (তখন তিনি নরেন্দ্রনাথ) দক্ষিণেশ্বর আগমনের প্রথম দিকে আমরা দেখেছি যে নরেন অদ্বৈত মত স্বীকার তো করতেনই না বরং এ বিষয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করতেন। একদিন দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের ঘরের বাইরে নরেন  হাজরার সাথে কথা বলছেন। সঙ্গে চলছে তামাক খাওয়া। নরেন হেসে হেসে বলছেন, এসব কখনো হতে পারে  কি? ঘটিটা ঈশ্বর, বাটিটা ঈশ্বর যা দেখছি আর আমরা সকলেই ঈশ্বর? মা ভবতারিণী বোধ হয় হেসেছিলেন তাঁর কথা শুনে। কারণ, এই ছেলেটি একদিন কর্মযোগী সন্ন্যাসী হয়ে বিশ্ব কাঁপাবে আর অদ্বৈতের প্রচার ও প্রসার করবে। 

 

আসি আগের কোথায়। একদিন ঠাকুর ভাবান্তরে রয়েছেন। অর্ধ বাহ্যদশায় নরেন কে স্পর্শ করেন তিনি। এর ফলে চেতনার উন্মেষ হল নরেনের মধ্যে। নরেন উপলব্ধি করলেন এই বিশ্বে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে ঈশ্বর ভিন্ন কিছুই নেই। 

 

এ বিষয়ে একটি প্রশ্ন ভক্তদের মনে স্বাভাবিকভাবেই জাগতে পারে। স্বামীজির গুরুদেব, সমন্বয়ের কারিগর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কি অদ্বৈতবাদী বা অদ্বৈতবাদী  নন? সাধারণ ভাবে ঠাকুরের কথামৃত পড়ে ঠাকুরের বিভিন্ন আলোচনা ও উদাহরণ শুনলে সংশয় হতে পারে, মনে হতে পারে  যে তিনি বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী ছিলেন।  বেলের ওজনের উপমাটি এখানে সঠিক ভাবে প্রযোজ্য। ঠাকুর এই জগতকে স্বপ্নবৎ বলছেন না। কারণ জগত স্বপ্নবৎ বললে ওজনে কম পড়ে। মায়াবাদ নয়, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ। জীবজগৎ সত্য, মানুষ সত্য, ঈশ্বর সত্য। জীবজগৎ বিশিষ্ট ব্রহ্ম। বিচি খোলা ফেলে দিলে সব বেলটা পাওয়া যায় না। ঠাকুর বলছেন তাহলে  ওজনে কম পড়ে। কথামৃতকার শ্রীমের ধারণা হয়েছিল দার্শনিক বিচারে ঠাকুর বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী। অর্থাৎ তাঁর ভাবটি অদ্বৈত, কিন্তু তাতে কিছু বিশেষ আছে। উদাহরণ স্বরূপ গাছের কথা বলা যেতে পারে। ডাল, পাতা ফুল সব নিয়ে গাছ। আবার ডাল, পাতা ফুল গাছের অংশ কিন্তু ভিন্ন। এতদসত্বেও আমরা যদি ঠাকুরের দর্শনকে মুক্তমন নিয়ে অধ্যয়ন করি, বিচার করি তবে দেখব ঠাকুর ছিলেন অদ্বৈতবাদী। ঠাকুরের  মতে  দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত, অদ্বৈত তিনটি স্তর। একেকটি ধাপে সিঁড়ির মতো উঠে ছাদে অর্থাৎ অদ্বৈতে পৌঁছতে হয়। অদ্বৈত হল শেষ ধাপ। ছাদের পর আর কিছু নেই। এই চরম বা শীর্ষধাপে আমরা সকলের সাথে একত্ব অনুভব করতে পারব। 

ঠাকুর বলছেন, বিচার করতে গেলে এসব স্বপ্নবৎ। ব্রহ্মই বস্তু, আর সব অবস্তু। শক্তিও স্বপ্নবৎ, অবস্তু। যারা জ্ঞানী, জগতকে স্বপ্নবৎ বোধ করেছেন তাঁদের কাছে তিনি নিরাকার। জ্ঞানীর নেতি নেতি বিচার করতে করতে বোধ হয় আমি মিথ্যা, জগত মিথ্যা, সব স্বপ্নবৎ। জ্ঞানী ব্রহ্মকে বোধে বোধ করে। তিনি যে কে মুখে বলতে পারেন না। অনেকটা নুনের পুতুলের মতো। সমুদ্রের জল মাপতে গিয়ে নিজেই বিলীন হয়ে  গেল। এ বিষয়ে স্বামীজীর অদ্বৈত আশ্রমের ঘটনাটি খুবই প্রাসঙ্গিক। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভে স্বামীজি মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রমে যান। সেখানে গিয়ে দেখলেন একটি ঘরে ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে পূজা হচ্ছে। অত্যন্ত বিরক্ত হলেন স্বামীজি। স্বামীজির বিরক্তিতে পূজা বন্ধ হল ঠিকই কিন্তু অনেকে সেটা মেনে নিতে পারলেন না। স্বামী বিমলানন্দ তাই চিঠি লিখলেন মাকে। মা জয়রামবাটি থেকে উত্তর লিখে পাঠালেন – আমাদের গুরু যিনি তিনি তো অদ্বৈত।  আর সেই গুরুর শিষ্য তোমরা তাই তোমরাও অদ্বৈতবাদী। ঠাকুর অদ্বৈতবাদী শুধু ছিলেন না, তিনি স্বয়ং অদ্বৈত। মায়ের এই সিদ্ধান্ত স্বামীজির চিন্তা ভাবনাকেই সমর্থন করে না, রামকৃষ্ণ সংঘের লক্ষ্যটিকেও সুনিশ্চিত করে দিয়েছেন। স্বামীজি এ বিষয়ে শিষ্য পেরুমলকে এক চিঠিতে  লিখেছিলেনঃ অদ্বৈতবাদ ধর্মের ও চিন্তার শেষ কথা।…আমার বিশ্বাস উহাই ভাবী শিক্ষিত মানবসমাজের ধর্ম।          

 

স্বামীজি আরেক জায়গায় বলেছেন, আমরা মনে করি, ইহাই সকল দেশের, সকল যুগের প্রকৃত দর্শন এবং ধর্মের শেষ ও সুন্দরতম পুস্প- ইহাতেই মানবীয় চিন্তার উচ্চতম বিকাশ দৃষ্ট হয়। যে রহস্য অভেদ্য বলিয়া বোধ হয় তাহাও অদ্বৈতবাদ ভেদ করিয়াছে। 

 

যথার্থ বলেছেন অদ্বৈতের পূজারী স্বামীজি। কারণ  আত্ম-উপলব্ধিই যে মানুষের জীবনের চরম লক্ষ্য  তা  অদ্বৈতমতই সেই বোধকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। 

 

আমরা জানি স্বামীজি এই অদ্বৈতের সাধনার জন্য  হিমালয়ের ৬৪০০ফুট উঁচুতে মায়াবতীতে অদ্বৈত আশ্রম নির্মাণ করেছিলেন। ১৮৯৯ খৃষ্টাব্দের ১৯শে মার্চ স্থাপিত হয় এই আশ্রম।  বিবেকান্দের স্বপ্নভুমি ছিল এই অদ্বৈত আশ্রম।  এই অদ্বৈত আশ্রম নির্মাণই এক দীর্ঘ আলোচনা। প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হল অদ্বৈত আশ্রমের জন্য হিমালয়ের ঐ স্থান কেন? আলমোড়ায় এক  সম্বর্ধনায় স্বামীজি বলেছেনঃ সত্যই হিমালয় বৈরাগ্য ভূমি। এই হিমালয় পর্বত বৈরাগ্য ও ত্যাগের সাকার মূর্তি রূপে দণ্ডায়মান। এই হিমালয় থেকেই পতিতপাবনী গঙ্গা হর হর ধ্বনিতে মর্তে অবতরন করেছেন।শিবশক্তি হরগৌরীর লীলাভূমি এই হিমালয়।

 

আমরা তো জানি হিমালয় দেবভূমি, তপোভুমি। স্বামীজি এ বিষয়ে বলেছেন হিমালয়ে আমার চিন্তা আরও স্বচ্ছ হয়। স্নায়ুগুলি আরও শান্ত হয়। অর্থাৎ অদ্বৈত সাধনার সর্বোত্তম স্থান হল হিমালয়। হিমালয়ের উত্তুঙ্গতা ও শুভ্র সাত্বিকতা  মনকে নিরাকার ব্রহ্ম অনুধ্যানের উপযোগী করে তোলে। আর কে না জানে হিমালয়ের নির্জন গভীর অরণ্য, সুউচ্চ শৃঙ্গ সাধককে অন্তর্মুখী করে তোলে। শেষ কথাটি হল এই সেই হিমালয় যার গিরিকন্দরেই অদ্বৈতের বাণী প্রথম উদ্গিত হয়। 

 

এখন দেখব স্বামীজি অদ্বৈতবাদের উপর এত জোর দিলেন কেন? কেন তিনি অদ্বৈতের পূজারী। এর কারণ স্বামীজি তাঁর প্রাণের পত্রিকা “প্রবুদ্ধ ভারত”-এর প্রসপেক্টাসে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। স্বামীজি বলেছেনঃ জগতের সকলেরই বেদান্ত চর্চা করা উচিত। তাঁর প্রথম কারণ- বেদান্তই একমাত্র সার্বভৌমিক ধর্ম। দ্বিতীয় কারণ- জগতে যত শাস্ত্র আছে তাঁদের মধ্যে কেবল এরই উপদেশাবলীর সাথে বহিঃপ্রকৃতির বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের যে ফল হয়েছে তার সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য আছে।  তৃতীয়- এর যুক্তিসিদ্ধতা।

 

স্বামীজি বলেছেন- “অদ্বৈতই একমাত্র মতবাদ, যাহা মনুষ্যকে তাহার স্বাধিকার প্রদান করে এবং তাহার সমস্ত পরাধীনতা, তৎসংশ্লিষ্ট সকল কুসংস্কার দূর করিয়া আমাদিগকে সর্বপ্রকার দুঃখ সহ্য করিবার ক্ষমতা ও কার্য করিবার সাহস প্রদান করে; পরিশেষে উহাই আমাদিগকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করিতে সক্ষম করে”।...“দ্বৈত ভাবের দুর্বলতা হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত করিয়া এতদিন এই মহান সত্য প্রচার করা সম্ভবপর হয় নাই। এই কারণে আমাদের ধারণা –এই ভাব মানব-সমাজের কল্যাণে সম্যক প্রচারিত হয় নাই”।…“এই মহান সত্যকে ব্যাক্তিগত জীবনে স্বাধীন ও পূর্ণতর প্রকাশের সুযোগ দিয়া মানবসমাজকে উন্নত করিতে আমরা হিমালয়ের এই ঊর্ধ্ব প্রদেশে –যেখানে ইহা প্রথম উদ্গিত হইয়া ছিল –এই অদ্বৈত আশ্রম স্থাপন করিতেছি”।

 

বোঝাই যায়, স্বামীজি অদ্বৈতের পূজারী ছিলেন আর গুরুদেব ঠাকুরের অদ্বৈত দর্শনের ভাবটিও স্বামীজি অদ্বৈত আশ্রম নির্মাণের মাধ্যমেও এগিয়ে নিয়ে গেছেন ।                            

 **********

Mailing List