সাদা কাশ্মীর / সপ্তম পর্ব, কাশ্মীর থেকেই ভ্রমণ কাহিনী, লিখছেন সুমন প্রতিহার

সাদা কাশ্মীর / সপ্তম পর্ব, কাশ্মীর থেকেই ভ্রমণ কাহিনী, লিখছেন সুমন প্রতিহার
27 Dec 2021, 12:15 PM

সাদা কাশ্মীর / সপ্তম পর্বকাশ্মীর থেকেই ভ্রমণ কাহিনী, লিখছেন সুমন প্রতিহার

 

 

আপনি কী কখনও কাশ্মীর গিয়েছেন? গেলেও কী এই ভরা শীতে গিয়েছেন? না হয়, তাই গিয়েছেন। কিন্তু আবারও যাওয়ার জন্য মন ছটফট করছে তো। শুধু সময় ও সূযোগের অভাবে যেতে পারছেন না। আবার যাঁরা এই একই কারণে এখনও যেতে পারেননি, কবে যাবেন তা নিয়ে বারেবারে পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের শোনাবো কাশ্মীরের গল্প। একেবারে টাটকা কাশ্মীর। যাঁরা কাশ্মীর গিয়েছেন, লিখছেন সেই দলের সদস্য সুমন প্রতিহার ।

 

শ্রীনগর কার শহর? সেনা, সিআরপিএফ নাকি আম কাশ্মীরীদের? উত্তর কি চোখ দিয়ে খুঁজে নিতে হয় নাকি প্রশ্ন মাথায় ফেরি করে উত্তরের খোঁজে বেড়াতে হয়? সে কথা থাক।

সকাল বেলায় হোটেলের ব্রেকফাস্ট শুধু বাটার টোস্ট আর সাদা ওমলেট। কাশ্মীরে সর্ষের তেল দেখতে তোপেলাম না। শ্রীনগরের চারিদিক ঘোরার সেরা সময় এপ্রিল-মে।সে সময় গার্ডেন গুলো ফুলপুর হয়ে থাকে। প্রথমে গেলাম মুঘল গার্ডেন। বাইরে করোনা পরীক্ষার কিট একদল কর্মী বসে আছেন। ডাবল ভ্যাক্সিনেট জানাতে ফোন নাম্বার আর আধার নাম্বার নিয়ে মুক্তি মিললো। বাগানে কিছুই নেই, শুকনো বাগানে রয়েছে ক্যামেরাম্যানদের দাপট। কাশ্মীরি সাজিয়ে ফটো তোলার হিড়িক। বেশকিছু জন কাশ্মীরি সেজে হাতে বালতি মাথায় কলসি নিয়ে ফটো তুলে চলেছে।

আমি মুঘল গার্ডেন্সের তিনশো আশি বছরের পুরনো একটা শুকনো চিনার গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মোগলদের কথা ভাবছিলাম। খেয়াল করিনি একজন ক্যামেরাম্যান পেছনে আমার সাজ নিয়ে হাজির, আমাকে নাকি সুলতান ভালো মানাবে। ক্যামেরাম্যানের ব্যবসায়িক বুদ্ধি চমৎকার। আমি চুপিসাড়ে কিছু শর্ত দিলাম, তাতে ক্যামেরাম্যান লজ্জায় পড়ে খান্ত হলো।

 

ডাল লেকের ধারে কাশ্মীরি ফুচকা বসেছে। ভারতবর্ষের সমস্ত রাজ্যের ফুচকা টেস্ট করা আমার একটা হবি। ডাল লেকের ফুচকা টেস্ট হলো। ফুচকা নয় বরং ছোট পাঁপড় বলা ভালো তবে মনকে ম্যানেজকরে নিতে পারলে ফুচকা বলে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। এরপরে গেলাম পরিমল যাওয়ার পথে রাজ্যপালের বাসস্থান।কড়া নিরাপত্তার কিছুটা পায়ে হেঁটে আমাদের বড় গাড়ি ছেড়ে ছোট একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে মাথাপিছু ৮0 টাকার বিনিময়ে পরিমহল ঘোরা হলো। মোগল সাম্রাজ্যের প্রায় সকল সম্রাট বাগান তৈরিতে মন দিলেও দারাশুকো ছিলেন জ্ঞানপিপাসু আর অনুসন্ধিৎসু। দারাশুকো তৈরি করেছিলেন এই পরি মহল। যদিও এখানে আগে বৌদ্ধদের ধর্মপদ ছিল। সুফি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে দারাশুকো ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ইতিহাসের প্রফেসরের লেখায় জানতে পারলাম পরিমল নয় এর নাম পীর মহল। যা সময়ের সঙ্গে অশুদ্ধি হিসেবে পরিমহল বলে পরিচিত হয়েছে। আবার সম্রাটের বেগমের নাম ও পরী। শোনা যায় মাত্র তিনবার কাশ্মীরে আসা দারাশুকো এখানে বসেই তার বিখ্যাত বই'মাজমাউল বাহারেন” লিখেছিলেন।

এরপর গেলাম শংকরাচার্য টেম্পেল। আমার ধর্মপ্রাণা কন্যা এখানে হঠাৎ সুস্থ হয়ে উঠলো। গুলমারগের গন্ডোলা সে আমার কোলে শুয়ে দেখেছে,অথচ এখানে পায়ে হেঁটেসমতল থেকে তিনশো মিটার উঁচুতে ২৪৩টি সিঁড়ি উঠলো, বিজ্ঞান শিক্ষক বাবা পেছনে। যীশুর জন্মের 200 বছর আগে তৈরি হয়েছিল এই শিব মন্দির। তবে আড়াই হাজার বছর আগে এটি বৌদ্ধধর্ম স্থল ছিল। আদি শঙ্করাচার্য এখানে শিবলিঙ্গ স্থাপন করার পরে শঙ্করাচার্য মন্দির হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়। আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে কাশ্মীর প্রবলভাবে বৌদ্ধ চিন্তাভাবনা দিয়ে জারিত ছিল। বদল আনেন ভাসুগুপ্ত। রচনা করেন শিব সূত্র যা অদ্বৈতবাদের জন্ম দেয়। কাশ্মীরিদের শিব চেতনাকে ত্রিকা যোগা নামেও অভিহিত করা হয়েছে। বন্ধন কি বন্ধনের কারণ কি? বন্ধন থেকে মুক্তির উপায় কি? এসব মত নিয়ে অদ্বৈত শৈববাদ শুরু হয়েছিল। ২৪৩সিঁড়ি ওঠার পরে চাতালের মত একটি অংশে চামড়ার সমগ্র সামগ্রী রেখে মূল মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে আরো ১৮টি সিঁড়ি, যেখানে শিবলিঙ্গ স্থাপিত। মাথায় টিকা নেওয়া থেকে চিনির ছোটো কিউব প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ সবেই আমি দ্বিতীয়। ওই অংশ থেকে পাখির চোখে গোটা শ্রীনগর লেখা যায়। মুহূর্তে মুহূর্ত বন্দী করার যন্ত্র নিয়ে প্রবেশের অধিকার নেই। চোখ দিয়ে বন্দী মুহূর্ততো চোখ বন্ধ করলেই মনে ভাসে। মূল মন্দির থেকে ৫ টি সিঁড়ি নিচে এসে ছোট্ট একটি স্থান যেটি শঙ্করাচার্যের ধ্যান হিসেবে পরিচিত। রয়েছে আদি শঙ্করাচার্যের ফটো পাথরের তৈরি ছোট্ট গুহায় মাথা নিচু করে প্রবেশ করতে হয়। পাথরের তৈরি ছোটো ওই স্থানেও ঢুকেও মাথা নিচু করেই দাঁড়াতে হয় আর শঙ্করাচার্যের আদিম ধর্ম প্রতিষ্ঠা হেতু সেই সংগ্রামের কথা ভাবলে গুহা থেকে বেরিয়ে পড়েও মাথা নিচু থাকে। শঙ্করাচার্য প্রথম কাশ্মীরে আসার সেই সময় ছিলনা কোন অন্ন এবং বসবাসের সংস্থান। কাশ্মীরের এক মহিলাকে শঙ্করাচার্যের সাহায্যের জন্য পাঠানো হয়েছিল। সে সাক্ষাত রহস্যময় রোমহর্ষক এবং সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মনে পড়ার পর রূপকথার মতোই লাগলো।

বিকেলে শিকারা ভ্রমণ। আমাদের হোটেলের উল্টোদিকে থেকে ভাড়া করা হলো শিকারা। সাতটি পয়েন্ট দেড় হাজার টাকা প্রতি শিকারা একটিতে বুঝতে পারে চারজন, চারজনের দুজন আরাম করে শুয়ে পড়তে পারেন। ভাসতে-ভাসতে অপর নৌকোয় করে চা-কফি সাজুগুজু করার সামগ্রী এমনকি হুকোর দেখা মিলল। কিছু পরেই আরেকটা নৌকোকরে ক্যামেরাম্যানরা এলেন। আবারো ফটো তোলার প্রলোভন।আমাদের দলের দু'জন সদস্য কে নিজেদের নৌকায় তুলে সাজিয়ে দাঁড় হাতে কলসি হাতে ফুল হাতে ফটো তোলা হলো। এক একটি ফটো প্রিন্ট নিয়ে ১৮০ টাকা। আবার এলো সুলতান সাজার প্রস্তাব। ততক্ষণে আমার বিল প্রায় চোদ্দোশো টাকার কাছাকাছি। আমি বললাম হাতে টিনের বাটি নিয়ে সুলতান সেজে ফটো তুলব ক্যামেরাম্যান বুঝতে পেরে তৎক্ষনাৎ অন্য শিকারের দিকে এগিয়ে গেল। ভাসতে ভাসতে শিকারা নিয়ে গেল ভাসমান বাজারে। আমাদের দলের এক মহিলার পোশাক সামগ্রীর দামের উপর অস্বাভাবিক দখল। চলন্ত বাজারে উনি বুঝলেন বঙ্গ দেশের চেয়ে এখানে দাম বেশি। ফিসফিস আওয়াজে ছড়িয়ে গেল 'বেশি দাম’ এর ছোট দুটো শব্দ। বাকি সমস্ত সদস্যদের বাজারে ঢুকিয়ে আমি কাশ্মীরি কাংরির উষ্ণতা উপভোগ করছিলাম।

কিন্তু সুখ স্বপনে, দাম বেশি, তাই সবাই প্রায় দশ মিনিটে বেরিয়ে এলো। নৌকা পাড়ে থামার সঙ্গেই শিকারার গরম ছবি গুলো হাতে চলে এলো। এরপর প্রায় সবাই মিলে উপহার কিনতে বেরিয়ে পড়লো কাশ্মীরের অন্য স্থলজবাজারে। সুলতান বাটি হাতে ১৫ নম্বর ডাল গেটে দাঁড়িয়ে।

 

ads

Mailing List