নেভিগেশন উপগ্রহ প্রযুক্তিতে কবে স্বাধীন হল ভারত? নেপথ্যে কিন্তু কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাস  

নেভিগেশন উপগ্রহ প্রযুক্তিতে কবে স্বাধীন হল ভারত? নেপথ্যে কিন্তু কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাস   
23 May 2022, 05:45 PM

নেভিগেশন উপগ্রহ প্রযুক্তিতে কবে স্বাধীন হল ভারত? নেপথ্যে কিন্তু কার্গিল যুদ্ধের ইতিহাস

 

ড: নিরুপম আচার্য্য

 

সালটা ছিল ১৯৯৯। ভারত পাকিস্তানের মধ্যে কার্গিল যুদ্ধ। সবারই মনে আছে। টানটান উত্তেজনা। কে জিতবে? পাকিস্তানের কাছে হেরে যাবে ভারত!

যুদ্ধে জিততে হলে শুধু রণকৌশল শেষ কথা নয়। আধুনিক যুগে প্রযুক্তিই শেষ কথা। পাহাড়ি এলাকায় কে কোথায় লুকিয়ে রয়েছে তা দূরবীণ দিয়ে দেখার যুগ শেষ। হেলিকপ্টারেও দেখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, লুকিয়ে থাকা বিরুদ্ধপক্ষের সেনা এক লহমায় নামিয়ে ফেলবে তা কিংবা ধ্বংস করে দেবে।  

তাহলে জরুরী কী? যুদ্ধক্ষেত্রে জরুরী হল শত্রুপক্ষের অবস্থান নির্ণয়। সেনাছাউনির অবস্থান এবং তার বিস্তার এর তথ্য একান্ত জরুরী। যতদিন গেছে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দিক থেকে প্রতিরোধ বাহিনীও উন্নত হয়েছে প্রায় সমস্ত দেশের। আমাদের দেশ তখনও (1999) নেভিগেশন প্রযুক্তিতে স্বয়ংনির্ভর ও স্বতন্ত্র ছিল না। শত্রুপক্ষের নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ ও সেনাছাউনির নির্ভুল অবস্থান (হাই অ্যাকুরেসি) এর তথ্যর ওপর নির্ভর করে সঠিক জায়গায় আক্রমণ ও আক্রমণ এর নির্ভুলতা। যার ওপর প্রত্যক্ষভাবে কোনো যুদ্ধের সফলতা নির্ভর করে। নতুবা সাফল্য আসার পরিবর্তে সমস্ত দিক দিয়েই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে।

ঠিক একই সময় তৎকালীন ভারত সরকার আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রর কাছে এই প্রযুক্তির সাহায্য চায়। দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি, ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র তা দিতে অস্বীকার করে। ঠিক তখনই এই নেভিগেশন উপগ্রহ প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভর হাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। তাই ভারত সরকার 2২০০৬ সালে নিজস্ব নেভিগেশন স্যাটেলাইট প্রযুক্তির প্রকল্পে সিলমোহর লাগায়।

ইন্ডিয়ান রিজিওনাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (IRNSS) যা একটি আঞ্চলিক স্বনির্ভর প্রযুক্তি, নাবিক (NAVIC/Navigation with Indian Constellation) নামে পরিচিত। বৈশ্বিক নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (GNSS/GPS) যেখানে ২৪ টি উপগ্রহের দ্বারা বিশ্বব্যাপী তার রেডিও সংকেত (Radio Signal) কে বিস্তার করেছে। ভারতীয় এই প্রযুক্তি মাত্র ৭ টি উপগ্রহের সাহায্যে (যা ভূ-পৃষ্ঠ হতে ৩৫,7৭৮৬ কিমি উচ্চতায় প্রতিস্থাপিত ) ভারতবর্ষ এবং এর সীমানা হতে ১৫০০ কিলোমিটার ক্ষেত্র অবধি এই সিগন্যাল সফলভাবে বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

এই রেডিও সংকেত যেকোনো বস্তুর ত্রিমাত্রিক (অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ ও উচ্চতা) অবস্থান এবং ব্যবহারকারীর অবস্থান পরিবর্তন এর হার অথবা গতিবেগ নির্ণয়ে সক্ষম। এটি সমস্ত আবহাওয়ায় উপযোগী, অর্থাৎ দিবারাত্র ব্যবহার যোগ্য প্রযুক্তি। এছাড়া এই রেডিও সংকেত রিসিভার টি ভারতীয় স্পেস অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার (SAC) এর দ্বারা উন্নত করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, এই প্রযুক্তি প্রধানত দুই ধরনের সেবা তার পরিসীমার মধ্যে দিতে সক্ষম।

১. স্ট্যান্ডার্ড পজিশনিং সার্ভিস (SPS)

২. রেস্ট্রিক্টেড সার্ভিস (RS)

এই SPS যা সমস্ত জনসাধারণ এর জন্য উন্মুক্ত এবং যার অবস্থানগত অ্যাকুরেসি হয় <20m। এছাড়া রেস্ট্রিক্টেড সার্ভিস কেবলমাত্র অনুমোদিত ব্যবহারকারি এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে। যার অবস্থানগত অ্যাকুরেসি অনেকটা উন্নত (10cm.)। গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম এ ২৪টি স্যাটেলাইট থাকলেও ব্যবহারকারীর অবস্থান নির্ণয় এর জন্য ৪ টি স্যাটেলাইট সিগন্যাল এর প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে ভারতীয় এই আঞ্চলিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি তার পরিসীমার মধ্যে কোনো ব্যবহারকারী সমস্ত স্যাটেলাইট এর ই সিগন্যাল গ্রহণ করতে সক্ষম। যা এই প্রযুক্তির অ্যাকুরেসি মান বাড়াতে সাহায্য করে।

এই সংকেত কেবলমাত্র শহরে নয়, সমস্ত প্রত্যন্ত গ্রাম এবং দুর্গম অঞ্চলেরও অবস্থান নির্ণয় এ সক্ষম। যা ভারতীয় ভৌগোলিক তথ্য বিশ্লেষণ, দুর সংবেদন বিজ্ঞান, বিমান ও সামুদ্রিক নেভিগেশন, বিপর্যয় মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনা, যানবাহন অনুসরণকরণ, ভূমি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরক্ষাতে এর সুবিশাল ব্যবহার হতে থাকবে যা আমাদের মহাকাশ গবেষণা বিজ্ঞান ও উপগ্রহ প্রযুক্তির এক অসামান্য সাফল্য। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরে এসে অন্তত আমরা এটা বলতে পারি, এখন নেভিগেশন উপগ্রহ প্রযুক্তিতে ভারতও স্বাধীন। এটা কম গৌরবের বিষয় নয়।

...........

লেকক: সহকারী অধ্যাপক, রিমোট সেন্সিং এন্ড জি.আই.এস বিভাগ, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়

ads

Mailing List