সত্যিকারের ভুতের গল্প কী রাজভবনেও থাকে! লিখছেন কৃষিবিজ্ঞানী কাঞ্চন কুমার ভৌমিক

সত্যিকারের ভুতের গল্প কী রাজভবনেও থাকে! লিখছেন কৃষিবিজ্ঞানী কাঞ্চন কুমার ভৌমিক
11 May 2022, 03:30 PM

সত্যিকারের ভুতের গল্প কী রাজভবনেও থাকে! লিখছেন কৃষিবিজ্ঞানী কাঞ্চন কুমার ভৌমিক

 

ড: কাঞ্চন কুমার ভৌমিক

 

প্রথম পর্ব: কাহিনী-১

কলকাতার রাজভবন নিয়ে সেই ছোটবেলা থেকেই নানারকম ভুতের গল্প শুনেছি। কিন্তু সেবার পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় রাজ্যপাল স্যারের সাথে দেখা করতে গিয়ে সত্যি সত্যি আমি ভুতের সম্মুখীন হলাম। কলকাতায় কাটিয়েও এই বাড়িখানার নাগাল পাওয়া যায় না সবসময়। রাজভবনের পাশেই আছে ফ্যান্সি লেন। ওটাই এককালে আসলে ফাঁসির বিবর্তিত রূপ।

একসময় কলকাতায় ছিল প্রচুর গাছপালা। অধুনা রাজভবনের কাছে উঁচু-উঁচু ডালপালা মেলা গাছেদের রাজত্ব। ফাঁসির জন্য তা অতি সুবিধেজনক। এমন প্রাকৃতিক উপায়কে কাছে পেয়ে ইংরেজরা কখনোই হাতছাড়া করতে চায়নি। তাই ফাঁসিও হত ইংরেজ রাজত্বের প্রথম যুগে। আর গঙ্গার ফুরফুরে, তাজা হাওয়ায় খাবি খেতে খেতে পঞ্চত্ব প্রাপ্তি হত আসামির। তা সে’সব কিছুকে সাক্ষী রেখেই তৈরি হল জমজমাট রাজভবন।

প্রথম রাজভবনটি অবশ্য সুবা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ধূলিসাৎ করেছিলেন। ১৭৫৬ সালে। সেই দুঃসাহসের মূল্য চোকাতে হয়েছিল ১৭৫৭তে। যাইহোক মাননীয় রাজ্যপাল স্যারের আমন্ত্রনপত্র পেয়েই মনে মনে অনেক স্বপ্ন গেঁথে চলছি। গিয়ে কি কি দেখার চেষ্টা করব। কোনকিছুই যেন বাদ না যায়। তাই পূর্বপরিকল্পিত একটা স্বপ্ন ছিলই। তাই সময়ের অনেক আগেই হাজির। সাথে ঝাড়গ্রাম সেবায়তনের পরমপূজনীয় মহারাজ, আমার এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও আরো কয়েকজন অতিথি। রাজভবনের গেটের সামনে ওয়েটিং রুমে বসে বৃটিশ আমলের রাজভবনের নানা রুপকথা ভাবছি আর নিরাপত্তা রক্ষীদের কড়া পর্যবেক্ষণ দেখে যাচ্ছি।

এবার অন্দরমহলে যাওয়ার ডাক। আমিও আত্মহারা হয়ে ছোটবেলার রাজভবনের গল্পগুলো মেলানোর চেষ্টায়। সেই পুরানো কাহিনীর বাড়ি, তোরণ যার পাহারা দিচ্ছে পশুরাজ সিংহ- একার্থে সিংহবাড়িই। যাদের নিত্য আনাগোনা সে চত্বরে, জানা নেই- অতীতের কোনো স্পর্শ তারা পায় কিনা। পেলেও তা কেমন? ফাঁসির মঞ্চ থেকেও কেউ কেউ উঁকি দেয় কি? সিঁধেল চোর কোনো?  হেস্টিংসের জমানায় তরতরিয়ে এগোচ্ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য-তরণী।

তা হঠাৎই কলকাতায় অবতীর্ণ হলেন আর্ল অব মনিংটন অর্থাৎ রিচার্ড ওয়েলেসলি। তাঁর কিন্তু মোটেই হেস্টিংসের মতো ‘সাদামাটা’ জীবনযাপন পছন্দ হল না। যথাযথ লাটসাহেবি হচ্ছে না বলে তিনি বারবার মানসিক সমস্যায় পড়ছিলেন। তাই ঠিক করলেন মনের মতো রাজভবন নির্মাণ করবেন তিনি। সারবদ্ধ চাকরবাকর, বিলাসবহুল বাড়ি, সবমিলিয়ে নবাবিয়ানার শেষ থাকত না। তা তেমনই রাজকীয় দিন কাটাবেন বলে ওয়েলেসলি সাহেব রাজকীয় রাজভবন নির্মাণে মনোনিবেশ করলেন। নির্মাণের বরাত পেলেন চার্লস ওয়েট নামের এক স্থপতি। হুকুম হল, ডার্বিশায়ারের কেডলস্টন হলের মতো হতে হবে রাজভবনকে।

কাজ শুরু হল ১৭৯৯-তে। শেষ হতে প্রায় চারটি বছর। ১৮০৩-এ গিয়ে কলকাতা পেল সুবিশাল রাজভবন। তবে বড়োই দুর্ভাগা ওয়েলেসলি সাহেব। রাজভবন বানাতে একটু না হয় খরচই করে ফেলেছেন। অগত্যা শাস্তিও পেলেন তিনি। ১৮০৫ সালে তল্পিতল্পা গুটিয়ে স্বদেশ গমন। বড়োই যন্ত্রণার কথা। ওয়েলেসলি তো গেলেন। কিন্তু উত্তরসূরিদের জন্য রেখে গেলেন বিলাসিতার সমাহার। যার যার পদার্পণ ঘটল সে বাড়িতে, সেই মনের মতো রূপ দিতে চেষ্টা করে গেল। কার্জন আনলেন গ্রিক নকশাদার পাত্র, বৈদ্যুতিন পাখা। হার্ডিঞ্জ ঢেলে সাজালেন তোরণদ্বার। লর্ড নর্থবুকের আমলে রাজভবনের কলে গরম ও ঠান্ডা জলের ধারা।

শুধু লাটসাহেবরা নন, লাটগিন্নিদেরও যথেষ্ট ভূমিকা রাজভবনের সাজসজ্জায়। লেডি উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক, লেডি আর্মহার্স্ট, অকল্যান্ডের বোন এমিলি ইডেন, লেডি ক্যানিং- নানা লেডিদের নানা ভূমিকা। আর তাঁদের বদান্যতায় রাজভবনেও জমে উঠত চাঁদনি রাতের মেহফিল। দেদার খানাপিনা শুধু না, হৃদয়ের আদানপ্রদানেও রাজভবন ছিল অন্যতম।

ইট-পাথর খুঁড়লে নিশ্চয়ই সেসব হাসিকান্নার দিনগুলো আজও উঁকি দিয়ে যাবে। এমনই রাজভবন নিয়ে অনেক শোনা কাহিনী মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। খেয়াল করিনি কতক্ষন ধরে একাকী নিরাপত্তা রক্ষীর বেষ্টনী থেকে বেরিয়ে কেমন ভুতুড়ে ময় রুপকথার গল্পে হারিয়ে গিয়েছিলাম।

সম্বিত ফিরে এল এক নিরপত্তারক্ষীর ডাকে। তিনিও বাকরুদ্ধ। কিভাবে সমস্ত বেষ্টনীর ঘেরাটোপ থেকে কিছুক্ষণ নিরুদ্দেশ হয়ে গেলাম। একি কোনও ভৌতিক না কি বৈজ্ঞানিক আলেয়া, না কি ব্ল্যক হোলের কোন ওয়েভলেংন্থ। যা কিনা আমার ভাবনায় বিলীন হয়ে যাওয়া। আজও আমায় ভাবায়। উত্তর পাই না।

 

লেখক: কৃষিবিজ্ঞানী

ads

Mailing List