আমেরিকার গ্রামেও যানবাহন চলে না, চিঠি নিয়ে যেতে হয় খচ্চরের পিঠে! কেমন সেই গ্রাম

আমেরিকার গ্রামেও যানবাহন চলে না, চিঠি নিয়ে যেতে হয় খচ্চরের পিঠে! কেমন সেই গ্রাম
26 Sep 2021, 12:49 PM

আমেরিকার গ্রামেও যানবাহন চলে না, চিঠি নিয়ে যেতে হয় খচ্চরের পিঠে! কেমন সেই গ্রাম

 

কল্পনায় স্বর্গের একটা রূপ রয়েছে প্রত্যেকের মনেই। তাই তো মনের গোপনে কোথাও লুকিয়ে থাকে স্বর্গে পৌঁছনোর বাসনা। কিন্তু সে স্বর্গের অস্তিত্ব কেবলই কল্পনায়। কারণ, যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ ততক্ষণ সেখানে পৌঁছনোর কথা ভাবারও উপায় নেই। অথচ, এ বিশ্বেই এমন বহু স্বর্গীয় দৃশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। প্রকৃতির সেই উজাড় করা সৌন্দর্য হয়তো কল্পনার স্বর্গকে হার মানাতে পারে। সেখানকার মানুষের আচার-আচরণ, কৃষি, অর্থনীতি, ভূপ্রকৃতি- সত্যিই অন্য অনুভূতি জাগায়। তারই পাশাপাশি মিলতে পারে অনেক অজানা তথ্য। বিশ্বজুড়ে এমন কত ছোটখাটো দেশ, ভাস্কর্য রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এমনই একটি ঘটনার কাহিনী লিখছেন-

দীপান্বিতা ঘোষ

 

আমেরিকাতেও গ্রাম রয়েছে! যে গ্রামে আবার বসবাস করে রেড ইন্ডিয়ানরা! শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য।

 

সে গ্রামের রাস্তায় আবার যানবাহন চলে না। এমন গন্ডগ্রাম। হয় আকাশ পথে হেলিকপ্টারে যেতে হবে। নতুবা পায়ে হেঁটে। আর রয়েছে খচ্চর। খচ্চরের পিঠেও যাতায়াত করতে পারেন।

 

হয়তো এটা শুনে অবাক লাগছে। অবাক লাগারই কথা। কারণ, দেশটার নাম যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। নাম শুনলেই মনে হয়....কি নেই সেখানে? বিশ্বের সব থেকে ক্ষমতাধর দেশ। আধুনিক বিশ্বের যা যা দরকার সব কিছুই আছে। উন্নত প্রযুক্তির দিকেও যে অন্যতম আমেরিকা। সেই দেশেও এমন গ্রাম থাকতে পারে, বিশ্বাস না হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিস্ময়ের কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আরও অনেক কিছুই রয়েছে।

আমেরিকার অ্যারিজোনা (Arizona) প্রদেশের গ্র্যান্ড ক্যানিয়নেই (Grand Canyon) রয়েছে দেশটির সবচেয়ে দুর্গম গ্রাম সুপাই (supai village)। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের শাখা হাভাসু ক্যানিয়ন। সুপাই গ্রামটি হাভাসু ন্যাশনাল রিজার্ভেশনের অন্তর্গত। এই গ্রামে যে রেড ইন্ডিয়ানদের বাস, তাদেরই নাম আসলে হাভাসুপাই। সেই অনুযায়ী গ্রামের নামকরণ। মানুষগুলো ‘People of blue green water’ বা ‘নীল সবুজ জল’ এর মানুষ নামেও পরিচিত। কারণ, নীল সবুজ জল রয়েছে হাভাসু খাঁড়িতে। এই জল হাভাসু ক্যানিয়ন দিয়ে বয়ে গিয়ে পড়েছে কলোরাডো নদীতে। মরুভূমি এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে মাত্র ৭৩০ জন বাস করে। প্রাকৃতিক এক ভিন্ন ধরনের সৌন্দর্যমণ্ডিত গ্রামটি পর্যটকদের কাছে বেশ প্রসিদ্ধ।

         

ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে যখন খনি অঞ্চলের খোঁজে এখানে তথাকথিত সভ্য মানুষদের যাতায়াত শুরু হয় তখনই সুপাইরা কোণঠাসা হয়। পরে ১৯১৯ সালে যখন ন্যাশনাল পার্কের কাজ হয়, তখন সরকারিভাবে জমি দখল শুরু হয়। তখন এরা ১৬ লক্ষ জমি হারিয়ে পায় মাত্র ৫১৮ একর জমি। আর এটুকু অঞ্চলকেই তারা বাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পেরেছে।

এই সুপাইয়ের উপর দিয়ে আরও অনেক ঝড় বয়ে গিয়েছে। ২০০৮ সালের হড়পা বানে প্রায় সব ভেসে গিয়েছিল। ফলে পর্যটক থেকে সাধারণ মানুষকে সরাতে হয়। সেই বিপর্যয় ঠিক করতে দীর্ঘ সময় লাগে। তার মাঝে ২০১০ সালে ফের বন্যা হয়। ২০১১ সালের মে মাসের পর সব স্বাভাবিক হয়। এখানে বলে রাখা ভালো, এটি কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩১৯৫ ফুট উপরে।  বছরে প্রায় ৫ মাস তুষারপাত হয়। নভেম্বর মাস থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত।

জীবিকা:

প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইতে কিভাবে টিকে থাকতে হয় সেটা আয়ত্ত্ব করেই এরা বিগত হাজার বছর ধরে এখানে বাস করছে। গরমে মূলত কৃষিকাজ করে। শীতের দিকে তারা শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। শিকারের মধ্যে রয়েছে হরিণ, ইঁদুর প্রভৃতি এখানে চাষ হয় ভুট্টা, বাঙ্গি আর মটরশুঁটি।

        

বর্তমানে সুপাইবাসীদের আয়ের অন্যতম উৎস হোলো পর্যটন ব্যবস্থা। কারণ, প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন যে কিভাবে রঙ পাল্টায়, তা সবার জানা। এছাড়াও রয়েছে জলপ্রপাত। তার রূপই আলাদা। আর পাহাড়ি শোভা কার না ভালো লাগে। তাই পর্যটকদের আকর্ষণও বেশিই।

গ্রামে এখন স্কুল হয়েছে। বাচ্চারা সেখানে পড়াশুনা করে। রয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রও। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এখানে একটি পোষ্ট অফিসও আছে, তবে আমেরিকার এটিই একমাত্র পোষ্ট অফিস, যেখানে চিঠি বা পার্সেল বহনের জন্য খচ্চর ব্যবহার হয়। তাই চিঠি পৌঁছতে সময়ও লাগে বেশি। প্রায় এক সপ্তাহ। এখানেই শেষ নয়, এই চিঠিতে থাকে আলাদা স্ট্যাম্পও। যা দেখলেই বোঝা যায় চিঠিটি এখান থেকেই যাচ্ছে।

পৌঁছানোর উপায়:

গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন Tourist spot থেকে ৫৬ কিমি দূরে এই গ্রাম। এবং এর সবচেয়ে কাছাকাছি লোকালয় প্রায় ১০৪ কিমি দূরে। তবে একটি স্থান পর্যন্ত গাড়িতে যাওয়া হয়। সেখানে থেকে ওই অঞ্চলের দূরত্ব প্রায় ১৩ কিমি। সেটি পায়ে হেঁটে বা ঘোড়া/খচ্চরের পিঠে যেতে হয়।

আর একটি উপায়ও আছে। তা হচ্ছে হেলিকপ্টারে যাওয়া যায়। এই অঞ্চলে যাঁরা নূতন তাদের পক্ষে এখানকার চড়াই-উৎরাই পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে চড়তে হয় খচ্চরের পিঠে।

 

ads

Mailing List