আগামীকাল ২২ এপ্রিল, ‘বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস’, আবারও শপথ নেওয়ার দিন

আগামীকাল ২২ এপ্রিল, ‘বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস’, আবারও শপথ নেওয়ার দিন
21 Apr 2022, 10:00 AM

আগামীকাল ২২ এপ্রিল, ‘বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস’, আবারও শপথ নেওয়ার দিন

 

ড: কাঞ্চন ভৌমিক

 

সত্যিই ভাবার সময় এসেছে আমাদের পৃথিবী কতটা বসবাসযোগ্য। বলতে দ্বিধা নেই আজ পৃথিবীর কঠিন অসুখ। পৃথিবীর মাটি, জল, বাতাস কোনটাই সুস্থ নেই। গ্লোবাল ওয়ার্মিং, এল নিনো, জলবায়ুর পরিবর্তন, সঠিক পুষ্টির লক্ষ্যে খাবারে অত্যধিক মাত্রায় বিষ সহ আরো কত কি।

আজ ভোগবাদী রাজনৈতিক ডামাডোল ও রাষ্ট্রপ্রধানদের উদাসীনতায় পৃথিবীর স্বাস্থ্য একেবারেই ভাল নেই। প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছরের প্রাচীন এই পৃথিবী আজ সাত বিলিয়নেরও বেশি মানুষের বাসভূমি। মানুষ ছাড়াও এই পৃথিবী আরো নানা প্রজাতির প্রাণী আর উদ্ভিদের ঠিকানা।  বিশ্বকে দূষণমুক্ত ও সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে ১৯৬৯ সালে সান ফ্রান্সিসকোতে ইউনেস্কোর সভায় দিনটির সূচনা করেন শান্তিদূত জন ম্যাককনেল। তখন ২১ মার্চ দিনটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ১৯৭০ সালে মার্কিন সিনেটর গেলর্ড নেলসন ও ডেনিস হেইসের উদ্যোগে প্রতি বছর ২২ এপ্রিল দিনটি পালন করা হয়। বিশ্বের ১৯২টি দেশে এই দিবসটি পালিত হয়।

২০০৯ সালে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অ্যাসেম্বলির ৬৩তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ইকোলজিক্যাল চাহিদার মাঝে ভারসাম্য অর্জনের জন্য প্রকৃতির সাথে মানুষের সুসঙ্গতিতে সহায়তা করা এবং আমাদের পৃথিবীর ইকো-সিস্টেমকে রক্ষা করা ও বজায় রাখা প্রয়োজন।

আজ ভাবার সময় এসেছে, সবকটি মহাদেশের সব্বাইকেই রাজনীতির উর্দ্ধে উঠে কাজ করতে হবে, বিশেষজ্ঞদের মতামতকে প্রাধান্য দিলে তবেই সম্ভব। আর তা না হলে, আগামী দিনে আরেকটা নতুন গ্রহে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। ধ্বংস অনিবার্য। চাই প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের নিজ নিজ অনুধাবন। এই প্রসঙ্গে মহামান্য রাষ্ট্রপতির আনুকূল্য আপনার সামনে তুলে ধরলাম।

ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রনব মুখার্জির সাথে আমার দিনগুলিঃ                                  

ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতির সচিবের আমন্ত্রনপত্র। দিনটি ৯ ই মার্চ ২০১৭। আমায় সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে যেতে হবে।  যথাসময়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের গেট নাম্বার-২ তে গিয়ে হাজির। এখানে বলা যেতে পারে, আবেগবশত নির্দিষ্ট সময়ের অনেকটা আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম।  আমন্ত্রন লিপি ও পরিচয় পত্র দেখাতেই এক লহমায় আমি হয়ে গেলাম ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতির অন্যতম সম্মানীয় অতিথি। সর্বোচ্চ ও স্পেশাল ক্যাটেগরির নিরাপত্তায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রপতি ভবনের অন্দরমহলে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর হাজারো স্যলুট।  হিন্দিতে দেশাত্মবোধক গানের মৃদু সুর ভেসে আসছে। দুই সারিতে শত শত রক্ষীবাহিনী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। রাজরক্ষী বাহিনী, ঘোড়সওয়ার বাহিনী, আরো কত কি। আমি নির্বিকার চিত্তে হেঁটে চলছি। সুদুর মেদিনীপুরের এক অজ পাড়া গাঁয়ের ছেলে। যার ছোটবেলা কেটেছে মাটির বাড়ি, হ্যরিকেনের আলোয় দুটো পাজামা পরে। বর্ষা কাদায় গামছা পরে একহাঁটু জলের ১-২ কিমি মাঠ ডিঙিয়ে পড়াশোনা করতে যাওয়া যে ছেলেটির প্রত্যহ রুটিন। সে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মানীয় অতিথি। আমার ড্রেসকোড, চলাফেরা, জীবনদর্শন সবই কেমন বদলে গিয়েছে। সাতরাজার অলিন্দপুরের সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে উপস্থিত হলাম মহামান্য রাষ্ট্রপতির বৈঠকখানাতে। প্রায় মুহুর্তের মধ্যে হাজির চা, কফি, স্ন্যাক্স আরও কিছু নাম না জানা স্পেশাল খাবারদাবার। চামচ, খাবারের প্লেট বা চায়ের কাপ পেয়ালার নক্সা, কারুকার্য অবাক করার মতো। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের তারকা খচিত সৌন্দর্য,  চারিপাশের রাজকীয় পরিবেশে বারবার হারিয়ে যাচ্ছিলাম।

একটু যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিতে অবস্থিত এই প্রাসাদটি ছিল ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের ভাইসরয়ের সরকারি বাসভবন। এই সময় এটি "ভাইসরয়’স হাউস" নামে পরিচিত ছিল। ১৯৫০ সালে প্রাসাদটি “রাষ্ট্রপতি ভবন” নামে পরিচিতি লাভ করে।  এটি বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সরকার মনোনীত প্রধানের বাসভবনই নয়, বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রপতির বাসভবনও। বাসস্থানটি ইউরোপীয়, মুঘল, হিন্দু এবং বৌদ্ধ স্থাপত্য শৈলীর একটি অনন্য সংমিশ্রণ। আইকনিক ইন্ডিয়া গেটের মুখোমুখি রাজপথের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত, রাষ্ট্রপতি ভবন, একসময় ভাইসারেগাল প্রাসাদ, মুঘল গার্ডেন সহ নয়টি টেনিস কোর্ট, একটি পোলো মাঠ, একটি ১৪ গর্তের গল্ফ কোর্স এবং একটি ক্রিকেট মাঠ রয়েছে। জাতীয় রাজধানীর কেন্দ্রে ৩৫০ একর জুড়ে বিস্তৃত, লুটিয়েন্স বাংলো জোন নামে পরিচিত। সেই সময়ে আনুমানিক ১৪ মিলিয়ন রুপি  ব্যয়ে দুর্দান্ত ভবনটি নির্মিত হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে স্থাপত্যের উৎকর্ষতা এবং বিশালতার অন্যতম সেরা নমুনা, রাষ্ট্রপতি ভবন হল একটি শক্তি কেন্দ্র এবং একটি দুর্গ যা দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনেকাংশে কথা বলে একটি অনন্য মিশ্রণ।

              

যাইহোক, যথাসময়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সেক্রেটারির প্রবেশ। কিছু বিধিনিষেধ যেমন পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম নয়। কেবল নমস্কার। সময় বরাদ্দ আধ ঘন্টা। আমি বাঙালি, এসেছি বাংলা থেকে। তাই প্রনাম করব না হয়। অবশেষে সেই অন্তিম মুহুর্ত। আমার সামনে দিব্যক্রান্তী সৌম্যদর্শন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি। মহামান্য রাষ্ট্রপতি। আমি নির্বিকার। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য বাকরুদ্ধ। দুরে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করছিলাম। ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রনব মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাঙালি। তাই বাংলায় বললেন “ভৌমিক পাশে এসো”। অত্যন্ত মিষ্টি-আদুরে গলা। মনে হল আমার কাছের কেউ ডাকছেন। এক লহমায় আমার বিবেক, সত্ত্বা সমস্ত কিছুই বদলে গেলো। আলাপচারিতার পাশাপাশি ভারতের কৃষির অবস্থা, স্বল্প পরিসরে যতটা সম্ভব আমার মতো করে বলার চেষ্টা করেছিলাম। সবুজ বিপ্লবের জনক, স্বামীনাথন স্যরের কথার সুত্র ধরে বলেই ফেললাম “যদি কৃষি ভুলপথে চলে তাহলে দেশের আর কোনকিছুই সঠিক পথে চলার সুযোগ নেই”। যোগ করলাম রবিঠাকুর ও বিবেকানন্দের কৃষি ভাবনা। আমাদের পরম্পরা কৃষি। বলতে ভুললাম না দেশের স্বাধীনতা বা পরবর্তী দশকে খাদ্য নিরাপত্তায় সবুজ বিপ্লব জরুরী হলেও সত্যিকারের খাদ্য, পুষ্টির নিরাপত্তায় কৃষি আবারো ভুল পথে। অত্যধিক মাত্রায় রাসায়নিক সার ও বিষের কৃষি ফলন বিশ্বব্যাপী সংকটে।

মাটি, জল, পরিবেশ সহ আমাদের স্বাস্থ্য চরম বিপদের সম্মুখীন। চারপাশে কেবল অসাধু ব্যবস্থাপনায় ফসল চকচকে করার শত শত কৌশল সহ আরো কত কী। সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাইতো বাড়িতে বাড়িতে সুগার, প্রেসার সহ ক্যনসারের মারনব্যধি একেবারেই আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে। ভোগবিলাসী সমাজ ব্যবস্থপনায় যৌথ সনাতনী পরিবারের মায়ার বাঁধন উধাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট আরো ভয়ংকর। তাইতো চাই আরোও একটা সবুজ বিপ্লব। জৈব ও প্রাকৃতিক কৃষির সবুজ বিপ্লব বা চির সবুজ বিপ্লব। কখন যে ঐ আধঘন্টা সময় পেরিয়ে গেলো বুঝতেই পারলাম না। সম্বর্ধনার পাশাপাশি কিন্তু ঐ আলাপচারিতাই ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। কারন পরবর্তী সময়ে উনার সাক্ষাৎ আমার ছিল অবারিত দ্বার। রাষ্ট্রপ্রধান চিন্তিত বসুন্ধরার স্বাস্থ্য নিয়ে। এরপর আমার যাতায়াত বাড়ল রাষ্ট্রপতি ভবনের বিখ্যাত মোঘল গার্ডেনের গাছের ডাক্তার হয়ে। এশিয়া বিখ্যাত মোঘল গার্ডেন, রাষ্ট্রপতি ভবনের মধ্যে অন্যতম একটি আকর্ষণ এটি। ১৯১৭ সালে এই বাগানের নকশা চূড়ান্ত হয়। প্রাসাদের পশ্চিমপ্রান্তে এর অবস্থান। গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, জারবেরা, টিউলিপ থেকে গাঁদা বিশেষত শীতকালীন রকমারি ও তাজা ফুলে রেঙে ওঠে মুঘল গার্ডেন্স। এছাড়াও বনসাই, ক্যকটাস, ফলের বাগান, বাহারি বাগান সহ বট বাগান, বৃত্তাকার বাগান, ময়ুর বাগান, ঝর্না বাগান ইতাদির সমাহারে এই ঐতিহ্য বাহী বাগান। মুঘল গার্ডেন্সের গোলাপ সবচেয়ে বিখ্যাত। এখানে প্রায় ১৫৯ রকমের গোলাপ ফোটে। আমার সুযোগ হয় ঐ বাগানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও-এস-ডি (হর্টিকালচারিস্ট)’র সাথে কাজ করার।

এমনকি ওনার সঠিক পুষ্টির ডাক্তারের ভূমিকাতেও আমি। কোন কোন শাক, আনাজ কি কি ভাবে ফলানো হবে এই সব পরামর্শ দাতার ভূমিকায়। উনি জৈব ও প্রাকৃতিক কৃষিতে বিশ্বাসী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, তখনোও বারবার ডেকে নিতেন। লাভপুরের দেশবাড়িতেও একাধিক বার গিয়েছি। চলাফেরা কথাবার্তায় মনেই হত না আমাদের মধ্যে বিস্তর দুরত্ব। হয়তো বা আপন করার কৌশল জানতেন। আসুন বসুন্ধরা দিবসে নতুন করে শপথ নিই। এই বসুন্ধরাকে বাসযোগ্য করে তোলার।

লেখক: কৃষি বিজ্ঞানী

Mailing List