রূপচর্চা থেকে হৃদরোগ প্রতিরোধ, জেনে নিন সুস্বাদু আনারসের গুণ ও ইতিহাস  

রূপচর্চা থেকে হৃদরোগ প্রতিরোধ, জেনে নিন সুস্বাদু আনারসের গুণ ও ইতিহাস  
01 Aug 2020, 03:13 PM

রূপচর্চা থেকে হৃদরোগ প্রতিরোধ, জেনে নিন সুস্বাদু আনারসের গুণ ও ইতিহাস  

পৃথিবীতে তো কত প্রজাতির ফল রয়েছে। তার মধ্যে বৈচিত্রময় ও বিচিত্র রসায়নে পরিপূর্ণ এমন ফল আর দ্বিতীয়টি নেই। তা হল আনারস। বর্ষাকালের একটি অতি উপকারী ফলের বিষয়ে বিশ্লেষণ করছেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক ড. অমলকুমার মণ্ডল এবং লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজের প্রধান জীববিদ্যার অধ্যাপিকা ও বিভাগীয় প্রধান ড. সংযুক্তা মন্ডল পারুই

ড. অমলকুমার মণ্ডল

ড. সংযুক্তা মন্ডল পারুই

 

ফলাহারে রসনাতৃপ্ত করতে কে না চাই? কিন্তু দিন দিন যেভাবে ফলের দাম বেড়ে চলেছে তাতে সব সময় রসনা তৃপ্ত করা সম্ভব হয় না। প্রাচীনকালের মুণি ঋষিরা ফলাহার করে দিন কাটাতেন। আর এখন চিকিৎসকরা রোগীদের পরামর্শ দেন, ফল খেয়ে দুর্বলতা কাটানোর জন্য। আমাদের দেশে বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন ধরণের ফল, সব্জি তৈরি হয়। এটা প্রকৃতি প্রদত্ত। এর পিছনে রয়েছে বিজ্ঞান সম্মত যুক্তিও। আবার এটাও ঠিক যে, বিজ্ঞান, জৈব প্রযুক্তি, কৃষি বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণার সৌজন্যে ফল ও সব্জির ক্ষেত্রে ঘটে গিয়েছে বিরাট বিপ্লব। তাই এখন অসময়েও ফল ও সব্জি ফলে, যা মরশুমি নয়। আম, জাম, লিচু, পেয়ারা, সবেদা, জামরুল, শশা, তরমুজ, পেঁপে, কাঠাল, খেজুর যেমন গ্রীষ্মের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মেলে তেমনই বর্ষার ফল আনারস, আতা, চালতা ফলসা, শীতের কমলালেবুর বাজার গরম করা দেখে নিজেদের বেশ তরতাজা লাগে।

বর্ষা ঋতুর প্রধান ফল আনারস। এই সময় আনারসের আমদানি বা রফতানির রমরমা। হাটে-বাজারে ডাঁই করা থাকে শত শত আনারস। রূপে যেমন গুনেও তেমন। স্বাদে, গন্ধে, রসে এর জুড়ি মেলা ভার। আনারস শুধু ফলাহারেই কাজে লাগে না। জ্যাম, জেলি, আচার, মোরব্বা থেকে বিয়ে বাড়ির শেষ পাতে চাটনিতেও রসনা তৃপ্ত করে।

আনারস আবিষ্কারের ইতিহাস

কিন্তু এমন একটি সুস্বাদু ফলের আবিষ্কার সম্বন্ধে অনেকই জানেন না। অথচ, এরও একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। সেটা কী?

আনুমানিক প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই ফলটির আবিষ্কার হয়েছিল ক্যারিবিও দ্বীপপুঞ্জের গয়াদেলুপ দ্বীপে। আবিষ্কারকের নাম ক্রিস্টোফার কলম্বাস। নতুন পৃথিবী আবিষ্কারের নেশায় সমুদ্রের বুকে পাড়ি দিয়েছিলেন কলম্বাস। এ ইতিহাস অনেকেরই জানা। সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এক সময় হাজির হন ওই দ্বীপে। গয়াদেলুপ দ্বীপে জাহাজ নোঙর করেন তিনি। তবে প্রথমটা খুব একটা সুখের হয়নি। জাহাজ থেকে নামার পরেই শত্রু ভেবে তাঁর দিকে তেড়ে যান দ্বীপের বাসিন্দা রেড ইন্ডিয়ানরা। রেড ইন্ডিয়ানদের কাছে রকমারি গয়নার বেশ কদর ছিল। আর সেটাকেই হাতিয়ার করেন কলম্বাস। তাঁদের শান্ত করতে করে উপহার হিসেবে তুলে দেন রকমারি গহনা। আর তাতেই শত্রুতা বদলে যায় বন্ধুত্বে। রেড ইন্ডিয়ানরাও অবশ্য পরিবর্তে কলম্বাসকে একটি বনজ ফল উপহার দিয়েছিলেন। সেটিই হল আনারস। আর সেই বুনো ফল খেয়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন কলম্বাস।

তারপর এই ফলের গুনাগুন সম্বন্ধেও নানা তথ্য সংগ্রহ করেন তিনি। কী সেই গুন? এই ফল হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। পেটের ব্যথায় উপশম দেয়। আবার রূপ চর্চাতেও কাজে লাগে! মেয়েদের ত্বকর উজ্জ্বলতা ও মসৃণতা বাড়ায়। আবার ওষধি গুনও রয়েছে। যুদ্ধের সময় সৈনিকরা ক্ষতস্থানে আনারসের টুকরো বেঁধে উপকার পেয়েছেন। সেরে গিয়েছে ক্ষত। শরীরের কোনও স্থান আগুনে পুড়ে গেলে আনারসের টুকরোর প্রলেপ দারুণ কাজ করে। এসব দেখে প্রকৃতিপ্রেমি কলম্বাস সারা ইউরোপ জুড়ে এই ফলের স্বাদ ও গুণের কথা প্রচার করেন। ধীরে ধীরে শুধু ইউরোপ কেন, সারা বিশ্বজুড়েই এই ফলের গুনের কথা ছড়িয়ে পড়ল। ষোড়শ শতকের শেষের দিকে এই ফলের চাষও ছনিয়ে পড়ল পৃথিবী জুড়ে।

বর্তমানে আনারস উৎপাদনকারী দেশগুলির মধ্যে অন্যতম হল ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, ঘানা, খেনিয়া, তাইওয়ান, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, পিউরেটো রিকো, ভারত, ফিলিপিন্স, হাওয়াই আইল্যাণ্ড, মেক্সিকো ও থাইল্যাণ্ড। ভারতবর্ষের মধ্যে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, কর্ণাটক, মেঘালয়, মণিপুর, ত্রিপুরা, অরুনাচল প্রদেশ, মিজোরাম, কেরালা এবং বিহার। ২০০১-০২ সালে ভারতবর্ষে ৮০০০০ হেক্টর জমি থেকে ১২৬ মিলিয়ন টন আনারস উৎপাদন হয়েছিল। এটা প্রায় এককালীন রেকর্ড। সারা পৃথিবীতে আনারস উৎপাদন হয় প্রায় ২৫০ কোটি টনের কাছাকাছি। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে জলপাইগুড়ি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ এলাকা, দার্জিলিং, কোচবিহার জেলার বেশ কিছু অঞ্চলে ব্যাপক আনারস উৎপাদন হয়। উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় আড়াই লক্ষ টনের মতো। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে তো বটেই বিদেশেও রফতানি করা হয়।

আনারস চাষের জন্য মাটি কেমন লাগে

আনারস চাষের জন্য কিছুটা অম্লধর্মী মাটির প্রয়োজন। পিএইচের মাত্রা সর্বনিম্ন ৫.৫ থাকতে হবে। আর সবোর্চ্চ ৬.০। হালকা মাটি প্রয়োজন। দেখতে হবে জল যেন না জমে থাকে। সেচের উপযোগী হয়। কাদামাটি এই চাষের উপযোগী নয়। তবে বালি, দোঁয়াশ অথবা ল্যাটেরাইট মাটিতে এই চাষ সম্ভব।

বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা  

যেখানে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৫০০ মিমি সেখানে আনারস চাষ ভাল হয়। তাছাড়াও ৫০০ থেকে ৫৫০ মিমি বৃষ্টিপাত যেখানে হয় সেখানেও আনারস চাষ সম্ভব। এই চাষের জন্য সর্বনিম্ন তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় ১৫.৫ এবং সর্বাধিক ৩২.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। কম তাপমাত্রা, ঝকঝকে রোদ্দুর এবং ছায়া এই চাষের অত্যন্ত উপযোগী।

কত রকমের আনারস রয়েছে

বিভিন্ন রকমের আনারস রয়েছে। কুইন, কিউ, মুরিটিয়াস, চারিওট্টি, রথিচন্ডি, ঝান্ডহুপ, দেশি, লাখাট প্রভৃতি ভ্যারাইটির আনারস চাষ হয়। ভারতবর্ষে বাণিজ্যিকভাবে যেটা বেশি চাষ হয় তা হল জায়ান্ট কিউ। যদিও উৎকর্ষের দিক দিয়ে কুইন ভ্যারাইটি এক কথায় অতুলনীয়।

গঠন ও জনন

উদ্ভিদ জগতে আনারস একবীজ পত্রী ব্রোমেলিয়েসি গোত্রভুক্ত। যার বিজ্ঞান সম্মত নাম এনানাস কোমোসাস। ডাক নাম পাইন ‌আপেল। এটি এক ধরণের যৌগিক ফল। এই উদ্ভিদের সমগ্র ফুলের পুষ্পমঞ্জুরী ফলে রূপান্তরিত হয়। এর বর্ণ সাধারণত বাদামি ও হালকা সবুজ। আনারসের গায়ে চৌকোকৃতি মৌমাছির ঘরের মতো সাজানো থাকে। সেগুলি আসলে এক একটি ফুলের নিষিক্ত ডিম্বাশয়। মঞ্জুরীদন্ডর চারদিকে ওই নিষিক্ত ডিম্বাশয় আঁটোসাটো ও সুন্দর ভাবে একটার পর একটা সাজানো থাকে। আর মাথার ওপরে যে এক গোছা পাতা থাকে তাকে মঞ্জরীপত্র বলে।

আনারস সাধারণত অঙ্গজ জননের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করে। এছাড়াও বাণিজ্যিকভাবে চাষের ক্ষেত্রে অবশ্য সাকার, স্লিপ এবং ক্রাউন পদ্ধতি চালু রয়েছে। সাকারের তুলনায় ক্রাউন পদ্ধতিতে যে গাছের চারা তৈরি করা হয় তাতে ফুল আসতে ৩ থেকে ২০ মাস সময় লাগে। দেরিতে ফুল আসার জন্য চাষের ক্ষেত্রে ক্রাউন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় না। মাতৃ গাছ থেকে সাকার বিচ্ছিন করে দু’সপ্তাহের মধ্যে মাটিতে রোপণ করতে হয়। স্বাস্থ্যকর ও সবল গাছ থেকেই সাধারণত সাকার সংগ্রহ করা হয়।

 

আনারসের ওষধি গুণ

আনারস বাণিজ্যিক দিক দিয়ে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত, একটি পাকা ও পরিপুষ্ট আনারস থেকে ১৬-২০ শতাংশ চিনি, সাইট্রিক অ্যাসিড, ভিটামিন বি, সি এবং এ ছাড়াও ‌প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও আইরন থাকে। জৈব রসায়ণের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে প্রচুর পরিমাণে ব্রমোলিন থাকে। ব্রোমেলিন এক ধরণের উৎসেচক। যা প্রোটিন জাতীয় খাদ্যবস্তুকে ভেঙে সরল যৌগে অর্থাৎ পেপটাইড এবং অ্যামাইনো অ্যাসিডে রূপান্তরিত করে। তাই আনারসকে হজমিকারকও বলা হয়। গুরুপাকের পর আনারস খেলে দ্রুত পরিপাকেও সাহায্য করে।

বিজ্ঞানীরা নানা গবেষণার মাধ্যমে‌ ব্রোমেলিনের নানা গুনাগুন সম্বন্ধে অনেক অজানা তথ্য জানতে পারছেন। যেমন গলা ব্যথা করলে জলের সঙ্গে আনারসের রস মিশিয়ে গার্গল করলে ব্যথায় উপশম হয়। যে সব ব্যক্তি সী-সিকনেসে ভোগেন তাঁদের ক্ষেত্রেও কাজ দেয়। ব্রমোলিন উৎসেচক হৃদরোগের চিকিৎসাতেও কাজে লাগে। বিশেষ করে থ্রম্বোসিসের মূল কারণ হল, শিরা ও ধমণীতে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল হয় না, যার ফলে হৃৎপিন্ডেও নিয়মিত রক্ত সরবরাহ ব্যহত হয়। আমাদের রক্তে রয়েছে ফাইব্রিন নামে এক বিশেষ প্রোটিন। ফাইব্রিন কোনও কারণে জমাট বাঁধলেই রক্ত চলাচল ব্যহত হয়। কিন্তু ব্রোমেলিন ফাইব্রিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে রক্ত জমাট বাঁধা আটকে দেয়। ফলে থ্রম্বোসিসের মতো হৃদরোগের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়।

বিজ্ঞানীরা আরও লক্ষ্য করলেন যে, প্রোস্টাগ্ল্যানডিনের জন্য শরীরে মাঝেমধ্যে জ্বালা বা যন্ত্রণা হয়। আবার প্রোস্টাগ্ল্যানডিন শরীরে জরুরিও। কারণ, তা নানা রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। কিন্তু জ্বালা বা যন্ত্রণা হলে চিকিৎসকরা অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ দেন। ওই ওষুধ প্রোস্টাগ্ল্যলানডিন উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে শরীরে নানা ধরণের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু ওই ক্ষেত্রে যদি আনারসের রস লোশন হিসেবে হাত, পা, মুখ-সহ শরীরে ব্যবহার করা হয় তাতে ভাল কাজ দেবে। কারণ, ব্রোমেলিন ত্বকের ওপরর স্তরের মৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত কলা ও কোষকে পুণরুজ্জীবিত করতে পারে। এতে ত্বকের মসৃণতা যেমন বাড়ে তেমনই যন্ত্রণা তেকও মুক্তি মেলে। এমনকী, আনারসের রস হেয়ার রিমুভার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ব্রোমেলিনের এত ভেষজ গুণাগুণ সত্ত্বেও তা থেকে অবশ্য এখনও ওষুধ তৈরির জন্য কোনও উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। যদিও বর্তমা‌ন সময়ে ভেষজ ওষুধের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে। উদ্ভিদের কোনও অংশই ফেলে দেওয়ার নয়। আনারস কেনার সময় তার বোঁটা, পাতা ফেলে দেওয়া হয়। অথচ, তাতেও থাকে প্রচুর পরিমাণ জৈব উৎসেচক –সহ নানা উপকারী দিক। সাধারণ মানুষের তা অজানা। অথচ, অনেককেই দেখা যায়, বাসে, ট্রেনে হজমি গুলি সহ নানা ধরণের জিনিস কিনছেন ব্যথা থেকে উপশম পাওয়া জন্য, হজমের জন্য। যার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। অথচ, এক আনারসে তা সম্ভব। যার মধ্যে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া তো নেইই, উল্টে একাধিক দিকে কাজ করবে। এই আনারসকে প্রকৃত কাজে ব্যবহার করা গেলে সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হবেন, রোগ জ্বালা থেকে নিস্তার পাবেন, তেমনই কৃষকেরাও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভবান হবেন।

Mailing List