সুরঙ্গমা ভট্টাচার্যের তিনটি কবিতা

সুরঙ্গমা ভট্টাচার্যের তিনটি কবিতা
26 Jul 2020, 10:57 AM

সুরঙ্গমা ভট্টাচার্যের তিনটি কবিতা

 

এ শহরে কেউ ভাল নেই মুন্নি

 

ভীড় করে আসে বড় পুকুরের উত্তরপাড়

পাশের সর্ষে ক্ষেত,

তার নাক বরাবর হাঁটলে দিগন্ত বিস্তৃত জল ছোঁয়া আকাশ।

দক্ষিণ দিকের তিষি ক্ষেতের মাথায় হাওয়ার নাচন

পাশ দিয়ে বয়ে চলা জল ছলছল ধ্বনির রূপনারায়ণ

নগ্ন চাঁদের রূপটান টেনে নিয়ে বুকের ভিতর

কাঁসাই, শিলাবতীর জন্য নিরন্তর অপেক্ষা তার

গাঁয়ের মধ্যপাড়ায় শঙ্খধ্বনি হচ্ছে

সান বাঁধানো বড় পুকুরপারের তুলসীমঞ্চে

সন্ধ্যা আরতি করছে

পাখিরা বাড়ির নতুন বড় বউ

তানপুরা বাজাচ্ছে তান

মায়া উড়ছে কোলাঘাটের আকাশে

ক্রমশ মায়াময় হচ্ছি আমরা

 

আত্মকীটময় এই শহরের আকাশে

তোমার গর্ভে শুধু বেড়ে উঠছে এক মূঢ় সভ্যতা

তাঁতের মাকুর শব্দ নেই, নেই নদীর জলে

ডিঙি নৌকোর শান্ত ছলাৎছল

যারা একসময় শুনতো এই শব্দ

তারাও কেউ কেউ এখন

এই মূঢ় সভ্যতার বশংবদ সৈনিক হয়ে

হেমন্তর হলুদ ফসলের মত পড়ে থাকে

জাঁতাকলে একা

দল তৈরির নিষ্ফলতায়

রাজপথে অসহ্য নিয়নের তলায় দাঁড়িয়ে

একমনে একসময়ে সাহায্যকারী

গৃহস্থের অমঙ্গল কামনা করে

নৈশকালীন আততায়ীর মত চুপিচুপি

বসাতে চায় ভোঁতা ছুরির ফলা

মুক্তকেশী অন্ধকারে সাঁঝবাতির পিদিমেই

তাদের জন্মক্ষণ লেখা ছিল

 

চিত্রনাট্য লিখলে বাদ যাবে না নদী, তীর্থভূমি, সালঙ্কারা গ্রামীন সভ্যতা

এবং বন্ধুত্বের আধারে

পরের বাড়ি বা গাড়ির বাতানুকূল যন্ত্রের নীচে বসে সবটুকু সুবিধাভোগী

অসূয়াপ্রবণ নগর কীর্তনীয়ার দল

রঙমাখা মুখগুলো কীভাবে

সাদা কালো ছবিতে বেওয়ারিশ হয় তাও

বিপরীতে ধাবমান চন্দ্রমুখী যানের কথা

একই সঙ্গে লেখা হবে

লেখা হবে

চন্দ্রযাত্রার শেষ পনেরো মিনিটও

 

দু একটি মানুষ

এখনও ফুল কুড়োয়

মেঘ কুড়িয়ে যায়

সম্ভাষণহীন রাতে নিজেকে শারদ প্রচ্ছদে আঁকে

আর চেয়ে চেয়ে দেখে

বিদ্যাসাগর মহাশয়ের দেওয়া আলো

অনৈতিক দৈন্যে কীভাবে পুড়ে যাচ্ছে

সেইসব মুখের ভেতর

 

গতকালই তোমার চিঠি পেয়েছি,

'এ শহরে কেউ ভাল নেই মুন্নি, বড় মিথ্যে ওড়ে এখন।'

............................

 

 

 যে ছেলেটি এখনও সন্ধ্যে

 

যে ছেলেটি এখনও একফালি সন্ধ্যে

মনকেমনের বাঁশি হাতে বেগুনী পালক

ইতিহাসের বই থেকে নেমে আসে উঠোনে

আমি তাকে রসুইঘরে জায়গা দিয়েছি

উল্কি কাটতে দিয়েছি

আমার আধখোলা পিঠে

একটু বেদানা রঙ ঘেঁটে ভিজিয়ে রেখেছি

পিঠের উল্কিতে ঢেলে দেবে বলে

আমার রংচঙে ঠোঙার ভেতর

যে আবির এখনও রাখা

তার থেকে কিছুটা নিয়ে তার হাতে দিলেই

মনখারাপের মত উড়িয়ে উড়িয়ে দেয়

রসুইঘরের বাইরে যে ঢেকিঘর

তার উঠোন থেকে

আমার বিনুনি বেয়ে বেয়ে

শান বাঁধানো খিড়কি পুকুর পেরিয়ে

সন্ধ্যেকালের দিকে

আমার বেদনাগুলো প্রথমে কুচিকুচি

তারপর রেণু রেণু হয়ে উড়ে গেলেই

চোখবন্ধ করে নিজেই গিলে নেয় সে

যে ছেলেটি এখনও সন্ধ্যে

...............

 

 নদীচরিত

 

ঝর ঝর রোদ্দুরের পিঠে বেঁধেছে

হিমেল হাওয়া তার গোপনীয় কুঠি

নদীপথ ধরে ধরে প্রান্তের জনপদে

মহুয়া ফুল খুঁটে তোলে শ্রমিক বউটি,

কাঁচের চুড়ি, কাঁচ টিপে সুডৌল মুখে

গভীর যৌনতা

ধ্বনিপুঞ্জ থেকে খসে পড়া তুমুল হিল্লোল শরীরে মেখে হেঁটে যায় অকপট পার্বণের নেশায়

হিমেল হাওয়ার তোড়ে নিঃস্ব ক্ষত থেকে

ঝরে পড়ে তার প্রিয় বিষাদ সকল

টুপটাপ তুলে নেয় 

হাওয়া পুনরায়,

নদীপথ ধরে গোপন কুঠির ভেতর

স্মৃতিবন্দী রাত, ঘুম ছিঁড়েছে বন্দিশ রাগে

ঘুম ছন্দ, ঘুম দ্বন্দ্ব, ঘুম অনুরক্ত হয় তরুণীর

নেচে নেচে নদীটি সখি হয়েছে তার

সনাতন কুঠি থেকে ধেয়ে আসে কাঞ্চনবর্ণা ভোর

বাঁশিতে ঠোঁট। বিরহ বাজছে অঙ্গারে।

আজানুবাহিত হয়ে ফিরে যাচ্ছে গোপন কুঠিতে

ছলছল জলধ্বনি শরীরে মেখেছে বাসন্তী।

 

এক্ষুণি নদীচরিত লিখবেন সন্ধ্যাকর নন্দী

          ...................

 

নদীর ছবিঃ গৌরীশঙ্কর মাইতি

Mailing List