সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য-র তিনটি কবিতা

সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য-র তিনটি কবিতা
23 Aug 2020, 12:41 PM

সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য-র তিনটি কবিতা

 

বিংশ শতাব্দী থেকে বলছি

 

ঠিক আগের শতাব্দীর শেষ রাতটা পার হতেই

সৌরমন্ডল নড়ে চড়ে বসলো

নিরাপদ নিরাভরণ উজ্জ্বল চাঁদে কেন বারবার হানা দেয় ওই মনুর সন্তান

প্রশ্নটা পাক খেতে খেতে পেন্ডুলামের মত তিড়িং করে লাফিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আর একটু তীব্র ও নিষ্ঠুর রাগে ফুঁসে উঠল সভাসদ সহ দ্য প্রিন্স অব দ্য সোলার এক্লিপ্স্।

সেই নীল আমস্ট্রং থেকে শুরু

তারপর থেকে ফুঁসতে ফুঁসতে

তামিলনাড়ুকে শুখা বানাবার জন্য একটু একটু করে তৈরি হয়েছে সে

এইমাত্র বাহুবলীর কাঁধে চড়ে উড়ে গেলো চন্দ্রযান।

আকাশের পেট ফুঁড়ে ঢুকে গেল পৃথিবীর কক্ষপথে। লতা মঙ্গেশকার থেকে বচ্চন স্যার, শাহরুখ থেকে বিরাট

সবার মুখে চওড়া হাসি!

তেরেসকোভাও ব্যালের তালে তালে এগিয়ে আসছেন সম্বর্ধনা দিতে

ছাপ্পান্ন ইঞ্চি বাহবা দিয়েছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীদের।

বিংশ শতাব্দীর শেষরাগটুকু ততক্ষণে ঢেলে দিয়ে তামিলনাড়ুকে শুখা করেছেন

আকাশের একচ্ছত্র জ্বলন্ত সম্রাট

উৎক্ষেপণ স্থল থেকে মাত্র ১০০ কিমি

সোয়া দুঘন্টার দূরত্বে অধিবাসীদের হাহাকার গড়াগড়ি খাচ্ছে

সংবিধানের মৌলিক অধিকারের আবর্তে।

পরের শতাব্দীতে ঘটমান পাপের ভবিষ্যৎ বাণী

শুনিয়েছিল সোভিয়েত

শুনিয়েছিল তাবড় ইওরোপ, এশিয়া

অবশ্যই ভারতবর্ষ।

সাইবেরিয়া বা তাসখন্দ থেকে তাসার শব্দে ভেসে আসত ভারতের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়

বুলগেরিয়া, চেক, পোলান্ড ও রোমানিয়াও পিছিয়ে ছিল না

একমাত্র প্রতিরক্ষা ও অর্থ, যোগাযোগ এবং বৈদেশিক নীতি ব্যতিরেকে

ভূস্বর্গে স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া আর কারুরই জমি কেনার অধিকার ছিল না।

স্থায়ী বাসিন্দা কে আর কে নয় সেটাও ঠিক করার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের।

নেহেরুজী আর ৩৭০ ধারার মধ্যে রহিত ৩৫এ আজ বাতিল করলো গডসেকে যারা দেশপ্রেমিক তকমা পরিয়েছে সেই দলটি

আবার ডিলিমিটেশন জম্মু কাশ্মীর ও লাদাখে।

সৌরমন্ডল জুড়ে অসম্ভব ছটফটানি

গরবাচেভ, ইয়েলেৎসিন, শেখ আবদুল্লা, ইন্দিরা ও ব্রেঝনেভ নেহেরুর সঙ্গে একসঙ্গে আলোচনা করছেন বাহুবলীর উৎক্ষেপণ আর শুখা তামিলনাড়ুর ভবিষ্যৎ নিয়ে।

তিনশো সত্তর গড়াগড়ি খাচ্ছে।

সময় স্মৃতি হচ্ছে ক্রমশ।

 

এই আবহে তোমাদের ঘরবন্দী রেখে

অযোধ্যাকে পাশে রেখে বয়ে চলা সরযূর বুকে পাথর সাজাচ্ছে উল্লসিত রাষ্ট্র

কঠিন সাজে কাঁপছে সমগ্র অসুস্থ গ্রহটি

শুধু রাম নয় তোমার আমার সবার জন্মভূমি

       .........................

 

একটি অবতারণা

 

মনের ভেতর যে মোম জ্বলে,

আমার ভেতর বাড়ির ঘর, উঠোন ভেঙে

তোমার আঙুলে জড়িয়ে যায়

কেউ ছাড়াতে পারে না

প্রতিটি ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও

উৎসর সন্ধানে বিফল,

তোমাকে ফুল, মালা, টোপর পরানোর

তোড়জোড় শুরু করে ওরা

হলুদ জড়ানো কাঁসার বাটিটাকে

জড়িয়ে জড়িয়ে

দুলে ওঠা মোমের ছটা

আরও ঘন হয় আঙুলে তোমার

কুলুঙ্গী ভরা সিঁদুর

ঢেকীঘর থেকে ধান ছাঁটার শব্দ মিশে

দুব্বো থেকে তখন ধনে গন্ধ ভাসিয়ে দিচ্ছে

আমার হেঁশেল।

.............

 

যদি পরজন্ম থাকে

 

আমি কষ্ট উৎসর্গ করব তোকে—

আমি মেয়ে হতে চাই,

আবার--

পেতে চাই একান্ত নিজের করে

ভিটেমাটি ভেসে যাওয়া উজান-বালক--

শুধু তোকে,

শীত মরসুম থেকে বসন্ত উজিয়ে এসে প্রবল গ্রীষ্মদিনে

তীব্র আশ্লেষে

পেতে চাই শুধু তোকেই,

রাজপ্রাসাদ নয়,

পর্ণ-কুটিরে, প্রেম-বিধুরণে

শুষে নেব তোর অস্ফুট পৌরুষ,

অভিসারে,

চন্ডিদাস-জয়দেবে দ্বিজ উত্তরাধিকার,

তোর,

লন্ডভন্ড করে, বৃষ্টি-দুপুরে

হাঁটুগেড়ে চেয়ে নেব প্রগাঢ় গভীর সব অনুভব

মহাসমারোহে,

কেঁপে ওঠা কুন্ডলিনী আমি,

তোকে প্রেম দেব,

প্রতিদানে, তছনছ করে দেব অখন্ড উষ্ণীষ;

নির্লিপ্ত জ্যোৎস্নায় এসে দাঁড়াব আভরণহীনা আমি,

এ আমার বিদ্রুপ, এ আমার প্রেম,

পরম কৌতুক

এ আমার অনন্ত সন্ধান...

যদি পরজন্ম বলে কিছু থাকে...

Mailing List