মাঝসমুদ্রে ভেসে রয়েছে বিমানবন্দর, তার ওপরেই যাত্রী নিয়ে উঠছে নামছে বিমান! আজব বিমানবন্দরের কাহিনী জানেন

মাঝসমুদ্রে ভেসে রয়েছে বিমানবন্দর, তার ওপরেই যাত্রী নিয়ে উঠছে নামছে বিমান! আজব বিমানবন্দরের কাহিনী জানেন
18 Sep 2022, 11:10 PM

মাঝসমুদ্রে ভেসে রয়েছে বিমানবন্দর, তার ওপরেই যাত্রী নিয়ে উঠছে নামছে বিমান! আজব বিমানবন্দরের কাহিন‌ী জানেন

 

দীপান্বিতা ঘোষ

 

‘উদীয়মান সূর্যের দেশ’। হ্যাঁ, তিনটি শব্দেই বুঝে গিয়েছেন তো, কোন দেশের কথা বলতে চেয়েছি। ঠিকই ধরেছেন। জাপান।

তবে প্রথমেই বলে রাখা ভালো, জাপানের একটি বিষয়ের আলোচনাই আজ মুখ্য। সে যে এক অদ্ভূত বিষয়। যা না দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন। 

জাপান একটি যৌগিক আগ্নেয়গিরীয় দ্বীপমালা। যে দ্বীপমালাটি প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ৬,৮৫২ টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। যদিও তার মধ্যে বৃহত্তম ৪ টি দ্বীপ হল হোক্কাইডো, হনসু, সিকোকু ও কিউসু। জাপানের ৯৭% শতাংশই রয়েছে এই ৪ টি দ্বীপে। 

না, এবার আসল কথায় আসা যাক। দ্বীপের উপর জাপান তো বোঝা গেল। কিন্তু জলের উপরেও রয়েছে জাপান! ভাবতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য। শুধু প্রয়োজনের তাগিদে, সমুদ্রের উপরে বানিয়ে ফেলেছে একটি আস্ত বিমান বন্দর! ভাসমান সেই সেই বিমানবন্দরে প্রতিদিন নিয়ম করে বিমান ওঠা নামা করে। এবার মনে নিশ্চয় অনেক প্রশ্ন আসছে? রানওয়ে দিয়ে বিমান ওঠা নামার সময় বিমান বন্দরটি ডুবে যাবে না তো? সমুদ্রের মাঝে বিমান বন্দর হলে মানুষ যাতায়াত করবে কিভাবে? ভাসমান বিমানবন্দরে গেলে থাকার ব্যবস্থা, খাবার – এসব মিলবে কিভাবে? আছে। সব আছে।

 

প্রথমে জাপান সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত একটা ধারণা দেওয়া যাক।

 

আয়তন: ৩৭৭,৯৪৪ বর্গকিমি।

জনসংখ্যা: ১২৬,৮৮০,০০০ (২০১৫ সালের জনগণনা).

রাজধানী ও বৃহত্তম নগর: টোকিও।

সরকার: এককেন্দ্রিক, সংসদীয় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র।

সরকারী ভাষা: জাপানী।

ধর্ম: প্রধান দুই ধর্ম শিন্তো ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম।

সাক্ষরতার হার: ১০০ শতাংশ।

বর্তমান সম্রাট: নারুহিতো।

জাপান একটি উন্নত ও মহাশক্তিধর রাষ্ট্র। এটা বোধ হয় এখন কারও অজানা নয়। যদিও সম্প্রতি চিন জাপানকেও উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। যাই হোক, এখানে জীবনযাত্রার মান ও মানব উন্নয়নের সূচক উচ্চ। এই দেশের গড় আয়ু বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক। বিশ্বশান্তি সূচকেও এই রাষ্ট্রের স্থান সর্বোচ্চ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পর জাপানই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।

 

প্রযুক্তিবিদ্যার দেশ জাপান (Japan):

বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বিশেষত প্রযুক্তি, যন্ত্রবিদ্য, মৌলিক গবেষণা, এমনকি বায়ো মেডিক্যাল গবেষণায় জাপান বিশ্বে একটি অগ্রণী রাষ্ট্র। এরকমই প্রযুক্তিগত উন্নতির এক অনন্য নজির হল কানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। যেটি সম্পূর্ন নির্মিত হয়েছে সমুদ্রের উপর। তাই এটিকে ভাসমান বিমানমন্দরও বলা হয়। 

 কানসাই এয়ারপোর্ট (Kansai Airport) তৈরির পটভূমি:

টোকিওর (Tokyo) থেকে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছিল কানসাই। সেটা ১৯৬০ এর দশক। ব্যবসার প্রসার ঘটাতেই কোবে এবং ওসাকার কাছে নতুন বিমানবন্দরের পরিকল্পনা। ওসাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরটি ঘনবসতিপূর্ণ ইতামি এবং টয়োনাকায় অবস্থিত। বিমানবন্দরের চারপাশে উঁচু ভবন। ফলে সম্প্রসারণের উপায় ছিল না। তাছাড়াও জনবসতি থাকায় শব্দদূষণের অভিযোগও ওঠে। 

তখনই সমুদ্রের উপর বিমানবন্দর তৈরির কথা মাথায় আসে। কিন্তু মাথায় ভাবনা এলেই তো হবে না। জরুরি তা রূপায়ণ। সমুদ্রে ভাসমান বিমানন্দর তৈরি তো আর মুড়ি-মুড়কির মতো সহজ কাজ না।

বিমান বন্দর তৈরি:

১৯৬০ সালের ভাবনা রূপায়িত হল ১৯৯৪ সালে। "সহস্রাব্দের স্থাপত্য প্রকৌশলবিদ্যা স্মৃতিসৌধ" হিসেবেও শিরোপা পেয়েছে। ২০ বছরের পরিকল্পনার পরে ৩ বছর ধরে নির্মাণ কাজ চলে। বিনিয়োগ করতে হয় ১৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। বিনিয়োগের পরে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিভিল ওয়ার্কস প্রকল্পে পরিণত হয়।

২০০১ সালের ১৯ এপ্রিল বিমানবন্দর টি আমেরিকান সোসাইটি অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স কর্তৃক "সহস্রাব্দের স্থাপত্য প্রকৌশলবিদ্যা স্মৃতিসৌধ" পুরস্কার প্রাপ্ত দশটি কাঠামোর মধ্যে স্থান করে নিয়েছিল এই বিমানবন্দরও।

ওসাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের মুক্তি ঘটল। কারণ, কানসাই বিমান বন্দর খুলে গেল ১৯৯৪ সালের ৪ ঠা সেপ্টেম্বর। এখানে রয়েছে দুটি টার্মিনাল। টার্মিনাল ১ এবং টার্মিনাল ২।

টার্মিনাল ১:

এর নকশা করেন ইতালিয়ান স্থপতি রেনজো পিয়ানো। এই টার্মিনাল ১ বিশ্বের দীর্ঘতম বিমান বন্দর টার্মিনাল। যার দৈর্ঘ্য ১.৭ কিমি।

টার্মিনালটি একটি ৪ তলা ভবন। যার মেঝের আয়তন ২,৯৬,০৪৩ বর্গমিটার। যাত্রীদের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে নিয়ে যেতে উইং শাটল নামে পরিবহন ব্যবস্থাও রয়েছে। টার্মিনালের ছাদটি এয়ারফয়েলের মতো আকার যুক্ত। জায়ান্ট এয়ারকন্ডিশনার নালীগুলি টার্মিনালের ভেতরের বায়ু বাইরে বের করে। সিলিংয়ের বক্ররেখা বায়ুসঞ্চালন করে এবং বাইরের বায়ু সংগ্রহ করে।

 

টার্মিনাল ২:

টার্মিনাল ২ সাধারণ মানের। ব্যয় হ্রাসের জন্য সরল নকশায় তৈরি। একতলা ভবন। ফলে লিফটের খরচ নেই। বিমানের প্যাসেজ ওয়েতে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাও নেই। নেই জেট ব্রিজ। শুধু অন্তর্দেশীয় যাত্রার জন্য একটি বোর্ডিং গেট এবং আন্তর্জাতিক যাত্রার জন্য একটি বোর্ডিং গেট আছে। বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে যাত্রীদের বিমানে পৌঁছানোর জন্য ছাতা প্রদানের ব্যবস্থা আছে। টার্মিনালে ৪ হেক্টর আয়তনের একটি উদ্যান রয়েছে।

 

ভাসমান বিমানবন্দর (Floating Airport) কতটা ব্যস্ত হতে পারে?

২০১৬ সালে এই বিমানবন্দর থেকে ২৫.২ মিলিয়ন যাত্রী উড়েছিলেন! যাত্রী পরিষেবার নিরিখে এই বিমানবন্দর এশিয়ার ৩০ তম এবং জাপানের তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

আর পণ্য পরিবহন? তার পরিমাণ ছিল প্রায় ৮,০২,১৬২ টন। যার মধ্যে ৭,৫৭,৪১৪ টন ছিল আন্তর্জাতিক (বিশ্বে ১৮ তম) এবং ৪৪,৭৪৮ টন গার্হস্থ্য পণ্য ছিল।

এবার আসা যাক বিমান চলাচলের সংখ্যায়। ২০১৪ সালের জুন মাস থেকেই এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় ৭৮০টি উড়ান এক সপ্তাহে চলাচল করে। আর সপ্তাহে ৫৯টি বিমান উড়ে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের। আর সপ্তাহে উত্তর আমেরিকার ৮০ টি উড়ান।

কিভাবে জলবেষ্টিত ভাসমান বিমান বন্দরে পৌঁছবেন?

এর জন্য একাধিক ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে রেলপথ, বাস। এমনকি, জলপথেও যাতায়াত করা যায়। বিমানবন্দরে গাড়ি রাখার জন্যও রয়েছে ব্যবস্থা। একটি সেতুর মাধ্যমে মূল ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিমানবন্দরটি।

 

ভাসমান বিমানবন্দর কতটা ঝুঁকির:

নির্মাণসামগ্রীর তো একটা ওজন রয়েছে। ফলে সমুদ্রের তলদেশের মাটি সংকুচিত হয়। যে কারণে দ্বীপটির ৫.৭ মিটার পর্যন্ত ডুবে যাওয়ার পূর্বাভাস ছিল। যদিও ১৯৯৯ সালে পূর্ভাভাসকেও হার মানিয়ে ৮.২ মিটার জলের তলায় চলে গিয়েছে তা। দ্বীপ কিছুটা জলের তলায় যাওয়ার কারণে টার্মিনাল ভবনকে দৃঢ় করা হয় ধাতব প্লেটের মাধ্যমে।

১৯৯৫ সালের ১৭ জানুয়ারি জাপানের কোবে-তে ভূমিকম্প হয়। যার কেন্দ্রস্থল ছিল বিমানবন্দর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে। যার ফলে জাপানের মূল দ্বীপ হোনশুতে ৬,৪৩৪ জনের মৃত্যু হয়।  কিন্তু ভূমিকম্প প্রতিরোধী প্রযুক্তির কারণে বিমান বন্দরটি সুরক্ষিতই ছিল। এমনকি জানলার কাঁচও ছিল অক্ষত।

এমনকি ১৯৯৮ সালে ২০০ কিমি/ঘন্টায় টাইফুন হলেও বিমানবন্দরের ক্ষতি করতে পারেনি।

এবার নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে, ভাসমান বিমানবন্দরটি কেমন। স্পেস থেকে এই বিমানবন্দরটি ধরা পড়ে। তেমন ছবিও মিলেছে। আর এই ধরণের নজিরবিহীন প্রযুক্তিবিদ্যা দেখে পরবর্তীকালে একাধিক জায়গায় এই কৌশল কাজে লাগিয়েছে জাপান। নিশ্চয় এবার ইচ্ছে করছে এবার ভাসমান বিমানবন্দরে উড়তে। তার জন্য আগাম শুভেচ্ছা রইলো।

Mailing List