ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের পিছনেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস, 'জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে' কিভাবে সেই জায়গা পেল?

ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের পিছনেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস, 'জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে' কিভাবে সেই জায়গা পেল?
20 Sep 2022, 10:00 AM

ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের পিছনেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস, 'জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে' কিভাবে সেই জায়গা পেল?

 

মিমি গুহ

 

জাতীয় সংগীত এমন একটি যোগসূত্র যা একটি জাতির প্রাণে জাতীয়তা সঞ্জীবিত করতে পারে। জাতীয় সংগীত জাতির জীবনে ঐক্য সৌভাতৃত্ব ও গৌরবের তৎপর্য বহন করে। নিজস্ব কৃষ্টি, জাতীয় ভাবধারা, ঐতিহ্যর জয়গাথা অনুরণিত হয় জাতীয় সংগীতের প্রতিটি স্তত্রে। জাতি, ধর্ম, ভাষা, ভাবাবেগের পরিখা অতিক্রম করে রাষ্ট্রকে তার ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক বৈচিত্রের জন্য স্বাতন্ত্রীকরণ করে। ১৯৪৭ সালে ১৫ ই অগাস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার পর প্রয়োজন দেখা দিল জাতীয় ভাবাবেগ কে ধরে রাখার জন্য একটি জাতীয় সংগীতের।

কিন্তু কিভাবে রবীন্দ্রনাথ রচিত জনগণ ভারতের জাতীয় সংগীত নির্বাচিত হল সে বিষয়ে আলোকপাত করলে দেখা যায়, ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে পঞ্চম জর্জ সস্ত্রীক ভারতে আসেন। ১২ই ডিসেম্বর দিল্লির দরবার হলে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের উদ্যোগে পঞ্চম জর্জের সম্মানে এক সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই সময় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিষান নারায়ণ দার। তার শেষ মুহূর্তের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পঞ্চম জর্জের সম্মানার্থে একটি প্রশস্তিপত্র লিখে দিয়েছিলেন। 'জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে' শীর্ষক। প্রস্তাবনা অনুযায়ী দিল্লির দরবার হলে পঞ্চম জর্জ কে সন্মান জ্ঞাপনে সকলের সামনে গানটি গাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারনে সেটা পেশ হয়নি, বরং গানটি গাওয়া হয় তার কিছুদিন বাদে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের কলকাতা বার্ষিক অধিবেশনে।  

এরও এক বছর পর ১৯১২ সালের জানুয়ারী মাসে কলকাতায় আদি ব্রাহ্ম সমাজের এক বার্ষিক সভায় মূল লেখার সাথে আরো চারটি স্তবক যোগ করে এটিকে গান হিসাবে প্রকাশিত হয়। স্থান পায় 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায়। মুদ্রিত হরফে প্রকাশিত হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকার তখন কার সম্পাদক ছিলেন।

রবীন্দ্র ঠাকুরের রচিত প্রাথমিক খসড়ায় 'জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে' কবিতা অনেক তৎসম শব্দ সহযোগে সংস্কৃত ঘেঁষা বাংলা। পরবর্তী কালে এটিকে হিন্দী আর উর্দুতে অনুবাদ করেন ক্যাপ্টেন আবিদ হাসান সাফরানি। সুর দিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন রাম সিংহ ঠাকুর।    দুজনেই ছিলেন ভারতীয় আর্মি অফিসার।  এর ইংরেজি তর্জমা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে করেছিলেন। এর অনেক পরে ১৯৪২ সালের ১১-ই আগস্ট জার্মানির হ্যামবুর্গ শহরে প্রথম এটি গান হিসাবে গাওয়া হয়। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু প্রথম ব্যক্তি যিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন এটি কে স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্থান দিতে।

এবার আসি একটি গুরুত্ব পূর্ণ আলোচনায় পাঠকের মনে আসতেই পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি ভারতের মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম  বলিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক তিনি পঞ্চম জর্জ কে সন্মান জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে এই কবিতা লিখেছিলেন কি ভাবে? বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পঞ্চম জর্জের কাছ থেকেই ১৯১৫ সালে তাঁর সাহিত্যে অবদানের জন্যে নাইটহুড উপাধি পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ১৯১৯ সালের ১৩-ই এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস গণহত্যার প্রতিবাদে পঞ্চম জর্জের কাছেই প্রতিবাদ পত্র পাঠিয়ে নাইটহুড ফিরিয়ে দেন। এর বেশ কিছু বছর পর ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক চিঠিতে পুলিন বিহারি সেনকে জানিয়ে ছিলেন যে, ওই গানটি তিনি কোনো পঞ্চম জর্জ, ষষ্ঠ জর্জ বা কোনো জর্জের উদ্দেশে লিখেছিলেন না। তিনি আরো ব্যাখ্যা করেছিলেন, সবার অলক্ষ্যে যে বিধাতা আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁর উদ্দেশে এই গান রচিত। কিন্তু সূক্ষ বিশ্লেষণ করলে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, আমরা হিন্দুরা দেশকে মাতৃভূমি বলি। আমাদের কল্পনায় সেই বিধাতা স্ত্রীলিঙ্গ। তাই অধিনায়ক শব্দটার ব্যবহার কেন? পরবর্তীতে অর্থনীতিবিদ শ্রী অমর্ত্য সেন বিশ্লেষণে অধিনায়ক বলতে কবিগুরু মানুষের মনের অধিনায়ককে বুঝিয়েছেন (দ্য লিডার অফ পিপলস মাইন্ড)।

ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৫০ সালের ২৪-সে জানুয়ারী সংসদীয় নির্বাচক কমিটির সদস্যদের সুপারিশ মেনে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি বাবুভাই রাজেন্দ্র প্রসাদ সংসদ ভবনে কবিগুরুর 'জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে' গানটির প্রথম দুটি স্তবককে জাতীয় সংগীত হিসাবে  ঘোষণা করেন।

 

 ২০১৫ সালের ৩০-শে নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ভারতের সিনেমা গুলোতে ছায়াছবি প্রদর্শনের আগে প্রবেশ ও বেরোনোর গেট বন্ধ করে  জাতীয় সংগীত শোনানো আর সেই সময় হলে উপস্থিত সবার উঠে দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক বলেও ঘোষণা করে। কিন্তু পরে এই নিয়ে বেশ কিছু জায়গায় বিশেষ করে দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে বেশ কিছু গন্ডগোলের খবর শিরোনামে এলে পরে ২০১৮ সালের প্রথমদিকে সুপ্রিম কোর্ট সেই আদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। এ তো হল আমাদের দেশের জাতীয় সংগীত সৃষ্টির ইতিহাস। কিন্তু আরো উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কিছু রাজ্যের নিজস্ব এনথেম আছে। বিস্মিত হলেও এটাই সত্যি। উক্ত রাজ্য গলো হল অন্ধ্রপ্রদেশ, আসাম, বিহার, ছত্তিশগঢ়, গুজরাট, মনিপুর, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, ওড়িশা, তামিলনাড়ু, উত্তরাখন্ড, পন্ডিচেরি। এই সকল রাজ্যের নিজস্ব সংগীত আছে। আরো বেশ কিছু রাজ্য ও নিজেদের সংগীতের প্রস্তাবনা রেখেছে। তার মধ্যে অন্যতম হল পশ্চিমবঙ্গ। যা এখনো আলোচনার পর্যায়ে আছে। আশা করা  যায় অদূর ভবিষৎ এ পশ্চিমবঙ্গ তার নিজস্ব সংগীত খুঁজে পাবে।

Mailing List