সরস্বতী পুজোর পর দিন হাঁড়ি চড়ে না পুরুলিয়ায়, এর পিছনে রয়েছে অদ্ভূত এক কাহিনী

সরস্বতী পুজোর পর দিন হাঁড়ি চড়ে না পুরুলিয়ায়, এর পিছনে রয়েছে অদ্ভূত এক কাহিনী
06 Feb 2022, 09:00 PM

সরস্বতী পুজোর পর দিন হাঁড়ি চড়ে না পুরুলিয়ায়, এর পিছনে রয়েছে অদ্ভূত এক কাহিনী

 

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, পুরুলিয়া

 

বাসি ভাতের পরব অর্থাৎ সিজানোর দিন সরস্বতী পুজোর ঠিক পরের দিন পুরুলিয়া জেলার প্রায় নব্বই ভাগ বাড়িতে হাঁড়ি চড়ে না। এদিন বাসি ভাত খান সকলে। বাসি ভাতের সঙ্গে থাকে আগের দিনের রান্না করা মাছ এবং সবজি। এদিন অর্থাৎ বুধবার "সিজানো" উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন স্থানে 'সিজানো মেলা বসেছিল। তবে জেলার সব থেকে বড় মেলা হয় রঘুনাথপুরের জয়চন্ডী পাহাড়ের সিজানো পাহাড়ে।

রঘুনাথপুর শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের নন্দুয়াড়াতে পাহাড়ের পাদদেশে হাজারহাজার মানুষের সমাগম হয় মেলায়। এই মেলার সব থেকে আশ্চর্যজনক ঘটনা পাহাড়ের উপরে অবস্থিত কালীমন্দিরে হাজার হাজার মানুষ নারকেল ফাটিয়ে সেইজল শিব ঠাকুরের মাথায় উৎসর্গ করার ফলে সেই নারকেলের জলের ধারা পাহাড়ের উপর থেকে নীচে নেমে প্রায় একটি পুকুর ভর্তি হয়ে যায়। আর তা দেখার জন্য এদিন জেলার ও রাজ্যের  বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে পাশ্ববর্তী ঝাড়খন্ডরাজ্য থেকেও প্রচুর দর্শনার্থী আসেন এই মেলায়।

           

 উৎসব থাকলে উপলক্ষ থাকবেই।আর সেই উপলক্ষ গড়ে ওঠে একটি মিথ বা কাহিনীকে ঘিরেই। সরস্বতী পুজোর পরের দিন পুরুলিয়াবাসীর সিজানো বা বাসিভাত পরবের নেপথ্যেও রয়েছে এমনই এক আকর্ষণ লোককথা। আর সেই লোককাহিনীর সূত্র ধরেই বছর বছর ধরে এই পরব পালিত হচ্ছে পুরুলিয়া জেলাজুড়ে। লোক কথায় শোনা যায়, কোনও এক সময় এক রাজার ছেলেরা জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে ষষ্ঠী দেবতার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। দিনটা ছিল সরস্বতী পুজোর আগের দিন। কোন এক কারণে রাজপুত্রদের সাথে ষষ্ঠী দেবীর ভীষণ রাগ হয়।রাগে

ষষ্ঠীঠাকুর রাজপুত্রদের প্রাণ হরণ করে নেন।সারা দিনরাত ছেলেরা বাড়ি না ফেরায় ,রাজা রাণী জঙ্গলে চলে যান সন্তানদের খোঁজে।সেদিন ছিল সরস্বতী পুজো। রাজা-রাণীকে পরীক্ষা করতে ষষ্ঠীদেবী জরাগ্রস্ত বৃদ্ধার রূপ ধারণ করে একটি গাছের তলায় বসে থাকেন। সেই সময় তার কাছে গিয়ে সন্তানদের খোঁজ করেন রাজা-রাণী।বৃদ্ধা তাঁদের বলেন, তাঁর সারা পায়ে পুঁজ জমেছে, রাণী তা চেটে পরিস্কার করে দিলে, রাজপুত্রদের সন্ধান বলে দেবে সে।সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আশায় রাণী বৃদ্ধার দেহের সমস্ত পুঁজ চেটে পরিস্কার করেছিলেন। আর তা দেখে খুশি হয়ে ষষ্ঠীদেবী নিজের রূপ ধারণ করে রাজপুত্রদের ফিরিয়ে দেন।

 

সরস্বতী পুজোর পরদিন রাজা-রাণী সন্তানদের নিয়ে রাজ্যে ফিরে এলে,প্রজারা উৎসবে মাতেন। সেদিন কারো বাড়িতে রান্না হয় নি। সবাই বাসি খাবার খান। ষষ্ঠীদেবীও মানুষকে বলেন,সরস্বতী পুজোর পর দিন যারা বাসি খাবার খাবে, তাদের পরিবারে শোক থাকবে না। বাসি ভাতের পরব সেই থেকেই শুরু হল। আর সেই লৌকিক কথা মেনেই পুরুলিয়ার মানুষ সরস্বতী পুজোর দিন ঘরে ঘরে ষষ্ঠীঠাকুর পেতে ভাত-মাছ -সবজি রান্না করেন।পুজোর পরদিন গ্রামে গ্রামে মহিলারা কোনও এক জায়গায় জড়ো হয়। সেখানে এক বয়স্ক মহিলা রাজপুত্রদের উপ-কাহিনী টি সকলকে শোনান। ষষ্ঠী কাহিনী শুনতে যাওয়ার সময় মহিলারা পেতলের ঘটিতে জল ,হলুদ নিয়ে যান।সঙ্গে থাকে বাঁশপাতা। কাহিনী শোনার পর বাড়ি ফিরে ঘটির জল, বাঁশপাতা দিয়ে ঘরে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বাস, তাতে বাড়িতে চির শান্তি বিরাজ করে।

Mailing List