মানব জাতি আজ গভীর সঙ্কটে, জাতির জনককে স্মরণ করতে গিয়ে উঠল  সে  প্রশ্নও

মানব জাতি আজ গভীর সঙ্কটে, জাতির জনককে স্মরণ করতে গিয়ে উঠল  সে  প্রশ্নও
02 Oct 2020, 03:04 PM

মানব জাতি আজ গভীর সঙ্কটে, জাতির জনককে স্মরণ করতে গিয়ে উঠল  সে  প্রশ্নও

বাসবী ভাওয়াল

আজ ২রা অক্টোবর। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন৷ একদিকে জাতির জনক গান্ধীজির ১৫১ বর্ষ পূর্তি, অপরদিকে ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর ১১৬ বর্ষ পূর্তি। সব মিলিয়ে এই দিনটি বিশেষ গৌরবোজ্জ্বল স্থান অধিকার করে রয়েছে৷ জাতিপুঞ্জ আজকের দিনটিকে আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে৷

আজ যখন সঙ্কটময় পরিস্থিতি - হিংসার আগুনে জ্বলছে মানবহৃদয় তখন অহিংস আদর্শ অনুসরণ বিশেষ তাৎপর্যবাহী। জাতির তথা দেশের পক্ষে৷ আজও যখন অস্পৃশ্যতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখন গান্ধীর আদর্শ অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়৷ গান্ধী মনে করতেন, যদি অস্পৃশ্যতা হিন্দু ধর্মের অংশ হয়, তবে এটি একটি পচা অংশ বা আঁচিল৷ নৈতিকতা হারিয়ে ধার্মিক হওয়া বলে কিছু নেই৷ আজ বকধার্মিকরা যখন ধর্মের ধ্বজা ওড়ান, নীতিহীন মন্তব্য আওড়ান, তখন আসলে ধর্মই লাঞ্ছিত হয়৷ ধর্মের অর্থ ধারণ করা। অথচ ধারকবাহক না হয়ে ধর্ম যখন ভেদাভেদ ও হানাহানিতে লিপ্ত হয় গুটিকয় মানুষের হাত ধরে তখন সামাজিক অবক্ষয় ত্বরান্বিত হতে বাধ্য৷ তখনই বাপুজিকে আবার স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করতে হয় তাঁর নীতিকে।

লিও টলস্টয় এবং রাস্কিন বন্ডের লেখা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন গান্ধীজি৷ তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ' The story of my experiments with truth, সত্যই হল গান্ধীর দর্শন৷ আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাঁর লক্ষ্য৷ অথচ আজ শুধু আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে তা-ই নয়, উল্টে আত্মসুখের কাছে পরাজয় বরন করছে আত্মনিয়ন্ত্রণ৷ আজ তারই ফলশ্রুতি ঘটছে দিকে দিকে। আজ গান্ধীর জীবন চর্চার প্রয়োজন যখন, তখন আমরা সরে যাচ্ছি সেখান থেকে৷ তাঁর যুদ্ধ ছিল নিজের অন্ধকার, ভয় ও নিরাপত্তাহীনতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য। অথচ আজ নারী জাতি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, সমাজের স্বঘোষিত প্রধানেরা অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে৷ অহিংসার মোক্ষম প্রয়োগ ঘটাতে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা ছিল কস্তুরবা গান্ধীর৷ আজ গান্ধীর জীবনে আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন তার থেকে মানুষ এখন বহু যোজন দূরে। ফলে জটিল সমস্যা তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত৷ অহিংসার পূজারীও হিংসার বলি হচ্ছেন। আর হত্যাকারীরা কখনও কখনও আদর্শের ধ্বজাধারী হয়ে উঠছে। ফলে সভ্যতার সংকট যে ঘনীভূত হচ্ছে তা আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছি আমরা প্রতি মূহুর্তে৷ তাই বাপুজিকে স্মরণ কতটা জরুরি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

লালবাহাদুর শাস্ত্রী গান্ধীর রাজনৈতিক আদর্শে প্রভাবিত হয়ে ১৯২০তে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন৷ তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শ অনুসরণের পক্ষপাতী ছিলেন৷ নেহেরুর পর দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন৷ তিনি নেহেরুর সঙ্গী ছিলেন স্বাধীনতা পরবর্তী কালে৷ তাঁর মৃত্যু নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা৷ তাঁর পরিবার তদন্ত দাবি করলেও রহস্য জট খোলেনি। তাঁর মৃত্যু হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে না বিষ প্রয়োগে? এই প্রশ্নের উত্তর যখন স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে মেলেনি তখন আমজনতার সুবিচারের আশাও ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে৷ আজও বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে, যেমন কেঁদে চলেছে প্রগতিশীল সমাজে নারী স্বাধীনতার দাবি, নারীর সুবিচারের ও নিরাপত্তার দাবি৷ বাপুজির নীতি কবে আবার সকলের মধ্যে সঞ্চারিত হবে, শুধু নারী জাতি নয়, সমগ্র বঞ্চিত মানুষ আবার প্রাণ খুলে হাসবেন, সেই দিনটির জন্যই অপেক্ষা।

লেখিকা: প্রধান শিক্ষিকা, শালবনি নিচুমঞ্জরী হাইস্কুল

Mailing List