স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বীরভূমের অগ্নিকন্যা দুকড়িবালা দেবীর অনন্য কাহিনী  

স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বীরভূমের অগ্নিকন্যা দুকড়িবালা দেবীর অনন্য কাহিনী   
11 Aug 2022, 11:00 AM

স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বীরভূমের অগ্নিকন্যা দুকড়িবালা দেবীর অনন্য কাহিনী

 

বাসবী ভাওয়াল

 

ইতিহাস সত্য তুলে ধরে আর সেই সত্য আলোকিত করে ইতিহাসের পাতাকে। যদিও খুব কমজনের হয়তো জানা আছে এই চরম সত্য। কারণ ইতিহাসবিদদের মানসিকতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয় বাস্তবকে। আমাদের সমাজে নারীর মূল্যায়ন করতে গেলে যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন তার ঘাটতি আছে। তবে ঘাটতি থাকলেও একেবারে উপেক্ষিত নয়। এমন উপেক্ষিতা অথচ নিজ ব্যক্তিত্বে দৃষ্টি আকর্ষণ কারী চরিত্রাবলীর অভাব নেই। আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা, এমন সুদৃঢ় সব চরিত্রের অভাব আজো লক্ষণীয়। তবে বিশেষ গুণাবলীত সকলের থাকে না তা ব্যতিক্রম আর এই ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব সর্বকালের সেরা ও আকর্ষণীয়। আজ এমন ব্যক্তিত্বের কথা বলতে গিয়ে প্রথমে যাঁর নাম উল্লেখ করতে হয় তিনি হলেন বীরভূমের অগ্নিকন্যা দুকড়িবালা দেবী। তিনি হলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বিপ্লবী।

১৮৮৭ সালের ২১শে জুলাই বীরভূমের নলহাটি থানার ঝাউপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। 'মাসিমা' নামে তিনি বিপ্লবী মহলে পরিচিত। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম পর্যায়ের বিপ্লবী মহিলাদের মধ্যে অন্যতম।

দুকড়িবালা দেবীর বোনপো নিবারণ ঘটকের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। স্বদেশী বই, বেআইনি বই লুকিয়ে পড়বার আড্ডা ছিল মাসিমার বাড়ি। ইতিমধ্যে রাজবাড়ির কর্মচারী রূপে এলেন ফেরারী বিপ্লবী বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী। তিনি লাঠি-ছোরা খেলা ও মুষ্টিযুদ্ধ শিক্ষার শিক্ষক হয়ে রাজবাড়িতে আত্মগোপন করে আছেন। এঁদের আত্মবিশ্বাস ও সাহস দেখে দুকড়িবালা দেবী মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে যান। বোনপো নিবারণের সঙ্গে বিতর্কে হেরে শর্ত অনুযায়ী বিজয়ীর পথ ও মত গ্রহণ করার জন্য বললেন এবার তাঁকে দলে নিয়ে নিতে। বোনপো বললেন, "তুমি কি এপথে আসতে পারবে মাসিমা?" সিংহীর মতো গর্জে উঠে বললেন,"তুমি যদি দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারো, তোমার মাও পারে।"

 

রডা কোম্পানির থেকে লুঠ করা সাতটি গোরুর গাড়ি বোঝাই করা অস্ত্র গুদামে পৌঁছে দিতে গিয়ে একটি গাড়ি নিয়ে বিপ্লবী হরিদাস দত্ত উধাও হন। সেই গাড়িতে নটি বাক্সে ছিল কার্তুজ এবং একটিতে পঞ্চাশটি মাউজার পিস্তল। মালগুলো পরে বিপ্লবীদের বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রেরিত হয়। দুকড়ি দেবীর বাড়িতে ছিল সাতটি মাউজার পিস্তল, পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং সেগুলো প্রতিবেশীর বাড়িতে পাচার করে দেওয়া হয়। গ্রামের নলিনী রায়ের বিশ্বাস ঘাতকতায় ধরা পড়ে যায় প্রতিবেশীর বাড়িতে রাখা পিস্তল।শত জেরাতেও মাসিমার মুখ থেকে বের করতে পারে নি পুলিশ যে কে দিয়েছে তাকে পিস্তলগুলি।কোলের শিশু বাড়িতে রেখে চলে গেলেন পুলিশের সঙ্গে গ্রামের বৌ দুকড়িবালা দেবী।

স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল এর বিচারে তাঁর দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। বন্দীজীবনের অসহনীয় পরিবেশের মধ্যে থেকেও প্রতিদিন আধমণ ডাল ভাঙতে থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর বাবা নীলমণি চট্টোপাধ্যায় কে চিঠিতে লেখেন, "তিনি ভালোই আছেন, তাঁর জন্য যেন তারা এমন চিন্তা না করেন, শুধু বাচ্চাদের যেন তারা দেখেন, শিশুরা যেন না কাঁদে।" এমনি ছিলেন তখনকার দিনের অগ্রগামী নারী সৈনিকরা অথচ স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর অতিক্রান্ত হলেও তাঁদের কর্মকাণ্ডকে মর্যাদা দিয়ে তেমন ভাবে গড়ে তোলা হয়নি স্মৃতি স্মারক। নিজের কষ্ট উপেক্ষা করে দেশের জন্য এমন আত্মত্যাগের মূল্যায়ন বাহ্যত না করা হলেও ইতিহাস পাঠক পাঠিকাদের অন্তরে স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

 

ইতিহাসের আরেক উজ্জ্বল নারী হলেন বিপ্লবী ননীবালা দেবী যিনি ছিলেন বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দী। ১৮৮৮ সালে হাওড়া জেলার বালিতে তাঁর জন্ম হয়। তিনি ছিলেন উপনিবেশ বিরোধী বিপ্লবী নারী নেত্রী। জেল জীবনে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্বে ছিলেন অটল। বিপ্লবী অমরেন্দ্র চ্যাটার্জীর কাছে বিপ্লবের দীক্ষা পেলেন, তিনি ছিলেন ননীবালা দেবীর ভ্রাতুষ্পুত্র। তিনি রিষড়াতে আশ্রয় দিয়েছিলেন অমরেন্দ্র চ্যাটার্জী এবং তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে কিন্তু পুলিশের দৃষ্টি এড়াতে পারেন নি তাঁরা। বিপ্লবী অমর চ্যাটার্জী পলাতক হন এবং বিপ্লবী রামচন্দ্র মজুমদার গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারের সময় রামবাবু একটি মাউজার পিস্তল কোথায় রেখেছেন বলে যেতে পারেন নি। তখন বিধবা ননীবালা দেবী রামচন্দ্র বাবুর স্ত্রী সেজে তাঁর সঙ্গে প্রেসিডেন্সি জেলে দেখা করে নিয়ে এলেন গুপ্ত পিস্তলের খবর।

 

১৯১৫ সালে সেই সময়ে দাঁড়িয়ে বাঙালি বিধবাদের পক্ষে পরস্ত্রী সেজে পুলিশের শ্যেন দৃষ্টি কে ফাঁকি দিয়ে কাজ হাসিল করার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারতো না। পুলিশ তো নয়ই, এমনকী কোনো সাধারণ মেয়েও নয়। পুলিশ জানতে পেরে গেল যে ননীবালা দেবী রামচন্দ্র বাবুর স্ত্রী নন। কিন্তু এটা জানতে পারেন নি তিনিই ছিলেন রিষড়াতে আশ্রয়দাত্রী। ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আবার ননীবালা দেবী গৃহকর্ত্রী রূপে বিপ্লবীদের বাড়ি ভাড়া দিলেন। পলাতক বিপ্লবীদের যাঁদের মাথার দাম ছিল অনেক হাজার টাকা তাঁরা সারাদিন দরজা বন্ধ করে ঘরে কাটিয়ে দিতেন আর রাতে সুবিধা মতন বেরিয়ে পড়তেন। বিপ্লবী যাদুগোপাল মুখার্জি, নলিনী কান্ত কর,বিনয়ভূষণ দত, ভোলানাথ চ্যাটার্জি, বিজয় চক্রবর্তী প্রমুখ পলাতক বৃন্দ পুলিশ এলেই নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যেতেন ‌। এরপর ননীবালা দেবী কে আর চন্দননগরে রাখা নিরাপদ হলো না পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে তৎপর হয়ে উঠেলো। তাঁর বাবা সূর্যকান্ত ড।ব্যানার্জিকে পুলিশ দশটা থেকে পাঁচটা অবধি বসিয়ে রেখে জেরা করতো। ননীবালা দেবী তাঁর এক বাল্যবন্ধুর দাদা প্রবোধ মিত্রর সঙ্গে পেশোয়ারে গেলেন। ষোলো সতেরো দিন পর পুলিশ সন্ধান পেয়ে তাঁকে পেশোয়ারে গিয়ে গ্রেপ্তার করে তখন তিনি কলেরায় আক্রান্ত। তারপর কাশী জেলে তাঁকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জেরাতে সব অস্বীকার করছেন, বলতেন কাউকেই তিনি চেনেন না কিছুই জানেন না। অসভ্য ভাষায় জিতেন ব্যানার্জী জেরার সময় গালিগালাজ করলে নীরব থাকতেন। একদিন দুজন জমাদারনী ননীবালা দেবীকে একটি আলাদা সেলে নিয়ে গেল। দুজনে মিলে তাঁকে জোর করে ধরে মাটিতে ফেলে দিয়ে উলঙ্গ করে লঙ্কাবাটা ওর শরীরের অভ্যন্তরে দিয়ে দিতে লাগল। ননীবালা দেবী লাথি মারতে লাগলেন সমস্ত শক্তি দিয়ে। থামিয়ে দিয়ে নিয়ে এল আবার জেরার জন্য। এরপর পানিশমেন্ট সেলে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। অর্ধোন্মৃত অবস্থা। তবু মুখ দিয়ে স্বীকারোক্তি বের করতে পারলো না। এরপর কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেলে পাঠানো হয়। জেলে পরিচয় হয় দুকড়িবালা দেবীর সঙ্গে। এদিকে ননীবালা দেবীর উপবাসের উনিশ থেকে কুড়ি দিন চলছে। তারপর দুকড়িবালা দেবীর তত্ত্বাবধানে জেলে রান্নার ব্যবস্থা করলেন জেল কর্তৃপক্ষ। একুশ দিনের পর ভাত খেলেন সেই অসামান্য দৃঢ়চেতা বন্দিনী।

বাইরে এসে তাঁর মাথা গোঁজার স্থান মিললো না। আত্মীয় স্বজনের অনাদর ও লাঞ্ছনা এবং দারিদ্রের মধ্যেও পরিপূর্ণ গৌরবে স্থির হয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলেন বছরের পর বছর।

আজকের সমাজ ও সেদিনকার সমাজের মধ্যে বিস্তর ফারাক, সেদিনের নারী তৈরি করে দিয়ে গেছেন পরবর্তী যুগের নারীদের বিপ্লবী চেতনার ভিত্তি। কিন্তু আমাদের সমাজে এই নারীরা স্বাধীনতার পরও পাননি পূর্ণ মর্যাদা। যে বিপ্লবী নারীগণ নিজের জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে দেশের কাজে নিজেদেরকে বিলিয়ে দিলেন তাঁরা স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও রইলেন উপেক্ষিতা।

............

লেখিকা: প্রধান শিক্ষিকা, শালবনি নিচুমঞ্জরী বালিকা বিদ্যালয়

Mailing List