বিরল কস্তুরী হরিণের করুণ কাহিনী

বিরল কস্তুরী হরিণের করুণ কাহিনী
29 Apr 2022, 06:30 AM

বিরল কস্তুরী হরিণের করুণ কাহিনী

 

নিলয় মন্ডল

 

দেবী সীতার স্বর্ণ মৃগের আবদারের কথা নিশ্চয় মনে পড়ে। সীতা কি বর্ণের সঙ্গে গন্ধেও মোহিত হয়েছিলেন?

গন্ধ দিয়ে বিচার করলে কিন্তু হরিণ চেনা সম্ভব। কস্তুরী মৃগ। দুষ্প্রাপ্য প্রাণিজ সুগন্ধি হল - কস্তুরী। এই কস্তুরী এক বিশেষ প্রজাতির হরিণ থেকে পাওয়া যায়। যা 'কস্তুরী মৃগ' নামে পরিচিত। যার ইংরেজি নাম - 'Musk Deer'। এরা লাজুক স্বভাবের হয় এবং বসবাসের জন্য নিরিবিলি জায়গা পছন্দ করে। এবং বিচরণ করে একান্তই নির্জনে।  

উত্তরাখণ্ড, হিমাচলের নির্দিষ্ট কিছু বনাঞ্চল ছাড়াও নেপাল, ভুটান এবং চীনের পাহাড় এ এদের স্বল্প দেখা মেলে। এছাড়া পামির মালভূমির গ্রন্ধি পর্বতমালার তৃণভূমি সমৃদ্ধ উপত্যকায় এই হরিণের দেখা মেলে। হিমালয়ের কোলে ৫০০০- ৮০০০ ফুট উচ্চতায় আধা বরফের ঝাউবনে ছড়িয়ে থাকা কস্তুরী মৃগের সংখ্যা এখন হাতে গোনা। এদের পা সরু, মাথা সুন্দর ও চোখ চমৎকার উজ্জ্বল। অত্যন্ত শীতল পরিবেশে বসবাসের কারণে এদের গায়ে লোমের আস্তরণ অত্যন্ত মোটা পালকের মতো হয়।

 কস্তুরী মৃগ এর উপরের মাড়ি থেকে গজদন্তের মতো ছোট আকারের দুটি দাঁত বের হয়। এই ধরনের দাঁত সব প্রজাতির হরিণ এর ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এই দেখেই কস্তুরী মৃগ কে শনাক্ত করা হয়।

      

কস্তুরী মূলত পুরুষের পেটে অবস্থিত সুগন্ধি গ্রন্থি নিঃসৃত সুগন্ধির নাম। মিলন ঋতুতে পুরুষ হরিণের পেটের কাছের কস্তুরী গ্রন্থি থেকে সুগন্ধ বের হয়। যা স্ত্রী হরিণকে আকৃষ্ট করে। সেটা সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে কস্তুরী বের করা হয়। এই সুগন্ধি অত্যন্ত প্রবল। যা কোনও নির্গন্ধ পদার্থের সঙ্গে স্বল্প পরিমাণ মেশালে সমস্ত পদার্থ সুবাসিত হয় কস্তুরীর ঘ্রানে।

কস্তুরী সংগ্রহকারী অসাধু কারবারীরা এই সুগন্ধিকে প্রকৃত অবস্থায় সচরাচর রাখে না। অন্য পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করে। সুগন্ধি টি আমাদের ভালো লাগলেও এর পেছনে রয়েছে বেদনাদায়ক কাহিনী। ১০ বছর বয়সে নাভির গ্রন্থি পরিপক্ক হলে এই সময় হরিণটিকে হত্যা করে নাভী থেকে তুলে নেওয়া হয় পুরো গ্রন্থিটি। তারপর রোদে শুকানো হয়। একটা পূর্ণাঙ্গ কস্তুরীর ওজন প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ গ্রাম। কস্তুরী কোষের বাইরে দিকে থাকে এলোমেলো লোম। সেগুলো ছাড়িয়ে যখন শুকনো কস্তুরী টিকে জলে ফেলা হয় তখন পরিষ্কার কস্তুরী বের হয়।

সমস্ত হরিণের মধ্যে এই কস্তুরী সম পরিমাণে পাওয়া যায় না। কারও ক্ষেত্রে কম আবার কারও ক্ষেত্রে কস্তুরী উৎপন্নই হয় না। হরিণের বয়স এবং পরিবেশ ভেদে কস্তুরীর পরিমাণ এর তারতম্য হয়। দেখা গেছে, এক কিলোগ্রাম কস্তুরী পাওয়ার জন্য প্রায় ২ হাজার হরিণও শিকার করতে হতে পারে। এই কস্তুরী সংগ্রহকালে এর গন্ধ এত উগ্র থাকে যে হরিণের নাভি কাটার সময় শিকারীরা মোটা কাপড় দিয়ে নিজেদের নাক বেঁধে নেয়। অনেক সময় এই গন্ধ সহ্য করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারও কারও চোখ নাক দিয়ে জল ও মুখ দিয়ে লালা ঝরতে শুরু করে। বর্তমানেই কস্তুরী নামক প্রাণীর সুগন্ধির দাম শুনলে সোনা লজ্জায় রাঙা হবে।

ads

Mailing List