অভিমানী বিজ্ঞানীর যন্ত্রণা ও অপমানের কাহিনী

অভিমানী বিজ্ঞানীর যন্ত্রণা ও অপমানের কাহিনী
17 Nov 2022, 10:24 AM

অভিমানী বিজ্ঞানীর যন্ত্রণা ও অপমানের কাহিনী

 

ডঃ গৌতম সরকার

 

ঈর্ষা অতি বিষম বস্তু। মনোবিদ্যা বলছে, এক ধরণের অনুভূতিজনিত আঘাত থেকে মানুষ ঈর্ষা করতে শুরু করে যার মূলে থাকে নিজের কোনও খামতি বা দূর্বলতা। আর এই ঈর্ষা যখন জমতে জমতে পাহাড় সমান হয়ে ওঠে তখন মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। যুগে যুগে এই হিংসা, পরশ্রীকাতরতা পারস্পরিক অবিশ্বাস-সন্দেহের আগুন জ্বেলে বহু ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে। যার ফলভোগ করেছে পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি সমগ্র দেশ। এখানে সেরকম এক গল্প শুনবো।

নমিতা মুখোপাধ্যায় পেশায় একজন শিক্ষিকা, কলকাতার সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে একটি ফ্ল্যাটে ডাক্তার স্বামীকে নিয়ে থাকেন। একদিন স্কুল থেকে ফিরে স্বামীকে সিলিং থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখলেন। স্বামীর নাম ছিল ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়। অনেকেরই জানা নেই ইনিই সাফল্যের সঙ্গে ভারতবর্ষের প্রথম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় নলজাত শিশুর জন্মদান করেছিলেন। কিন্তু দেশের আমলাতন্ত্র এবং সহকর্মীদের প্রবল ঈর্ষা তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত করেছিল। তাঁর সাথে যুক্ত হয়েছিল চরম অপমান, বিদ্রুপ, আর মানসিক যন্ত্রনা। গবেষণায় মত্ত ভোলেভালা নরম মনের মানুষটি সেই চাপ নিতে পারেননি। যার ফলে অকালে নিজের হাতে নিজের জীবন শেষ করে দিলেন, আর একরাশ লজ্জা ছুঁড়ে দিয়ে গেলেন আপামর বাঙালির উদ্দেশ্যে। ব্যাপারটা সম্যক বোঝার জন্য একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক।

সুভাষ মুখোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩১ সালের ১৬ জানুয়ারি তদানীন্তন বিহারের হাজারীবাগে। ১৯৫৫ সালে কলকাতার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে ফিজিওলজিতে গ্রাজুয়েশন করেন এবং পরে ডি.ফিল ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে রিপ্রোডাকটিভ ফিজিওলজিতে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘কলম্বো প্ল্যান স্কলারশিপ’ নিয়ে এডিনবার্গ এম.আর.সি. ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রিনোলজি রিসার্চ সেন্টারে প্রফেসর জন.এ.লোরেইনের অধীনে রিপ্রোডাক্টিভ ফিজিওলজির উপর পোস্ট ডক্টরেট করেন। বিদেশে চাকরি এবং অর্থের মোহ ছেড়ে দেশে ফিরে কলকাতার নীলরতন সরকার হাসপাতালে কাজে যোগ দেন। রিসার্চ ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান, ডাক্তারি প্র্যাকটিস প্রায় করতেননাই বলা চলে। সীমিত অর্থ ও পরিকাঠামোর মধ্যেই তিনি এক অসাধ্য কাজ সম্পন্ন করলেন- এক সন্তানহীন দম্পতিকে ১৯৭৮ সালের ৩ অক্টোবর এক টেস্টটিউবজাত কন্যাসন্তান উপহার দিলেন। এর মাত্র ৬৭ দিন আগে পৃথিবীর প্রথম টেস্ট টিউব বেবি লুইস ব্রাউনের জন্ম হয়েছে ব্রিটিশ ডাক্তার রবার্ট এডওয়ার্ডসের গবেষণায়। এই আবিষ্কারের জন্যে ২০১০ সালে এডওয়ার্ডস চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, অন্যদিকে নিজের দেশে চরম অবহেলা আর অপমানের সম্মুখীন হতে হয়েছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে।

 সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দুটি বিষয় উঠল। এক, তিনি তাঁর আবিষ্কারের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ কোনো প্রথম সারির পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশ করেননি, আর দুই, উক্ত দম্পতির আপত্তি থাকায় ওই শিশুর পরিচয় জানাতে পারেননি। আবিষ্কারের কথা প্রচারের পর দেশে-বিদেশে বেশ কিছু পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু নিজের সহকর্মী এবং রাজ্য সরকারকে প্রভাবিত করতে পারেননি। তাঁর দাবীর সত্যতা বিচার করতে রাতারাতি তৈরি হয়ে গেল এক প্রহসনের তদন্ত কমিটি। একজন রেডিও ফিজিওলজিস্ট ছিলেন সেই কমিটির প্রধান, অন্য তিন সদস্য ছিলেন গাইনোকোলজিস্ট, ফিজিওলজিস্ট এবং নিউরো-ফিজিসিস্ট। বলাবাহুল্য এঁদের কারুরই আধুনিক প্রজনন সংক্রান্ত গবেষণার ন্যূনতম জ্ঞান ছিল না। এই কমিটি ১৯৭৮ সালে ১৮ নভেম্বর তাঁদের রিপোর্টে ডক্টর মুখার্জির সমস্ত দাবিকে ভূয়ো আখ্যায়িত করলো। একজন বিজ্ঞানীর বহুদিনের পরিশ্রম, মেধা, স্বপ্ন কলমের খোঁচায় ধুলোয় মিশে গেল।

 

ঘটনাটির কথা সুভাষের পরিবার ছাড়া সবাই ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ উনিশ বছর পর ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় আবার সংবাদের শিরোনামে উঠে এলেন আরেক ডাক্তার-গবেষক টি.সি.আনন্দের হাত ধরে। এই আনন্দকুমার হলেন সেই বিজ্ঞানী যার গবেষণায় ১৯৮৬ সালের ১৬ আগস্ট জন্মগ্রহণ করে আরেক টেস্টটিউব শিশু হর্ষবর্ধন রেড্ডি। ভারত সরকার ডঃ আনন্দকেই দেশের প্রথম নলজাত শিশু নিয়ে সফল গবেষণার স্বীকৃতি দেন। কিন্তু ঘটনার মোড় নেয় ১৯৯৭ সালে যখন একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগ দিতে ডঃ আনন্দকুমার কলকাতায় এলেন। এই সময় ডঃ সুভাষের কাজের কিছু নথিপত্র আনন্দকুমারের হাতে আসে। সেই ডকুমেন্টস দেখে আনন্দকুমার অবাক হয়ে যান। প্রায় কুড়ি বছর আগে সুভাষ যে মানের কাজ করেছিলেন তা এককথায় অবিশ্বাস্য। তিনি নড়েচড়ে বসেন। নিজের আগ্রহে আরও নথি জোগাড় করেন, ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পরিবারের সাথে দেখা করেন, সর্বোপরি দেখা করেন সেই কন্যাসন্তান দূর্গার সাথে। সমস্ত ডকুমেন্টস এবং ইন্টারভিউ থেকে তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারেন ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ই ভারতবর্ষে প্রথম সাফল্যের সাথে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে টেস্টটিউব শিশুর জন্ম নিয়ে কাজ করেছেন, তাই এই শিরোপা তাঁরই পাওয়া উচিত। আনন্দকুমারের ভাষায়- ডঃ সুভাষকে অবশ্যই ভারতের প্রথম টেস্টটিউব শিশু আবিষ্কারের স্বীকৃতি দিতে হবে। তাঁর আবিষ্কারের তুলনায় অন্যগুলো একেবারেই খর্বকায়। অর্থাৎ এগারো বছর ধরে যে জয়ের মালা তিনি নিজে পরেছিলেন, আনন্দকুমার সেই মালা নিঃসংকোচে অগ্রজ বিজ্ঞানীকে পরিয়ে দিলেন। দেশের সরকার আনন্দকুমারের সংগৃহিত নথিপ্রমান সম্যক বিচার করে ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে মরণোত্তর স্বীকৃতি দান করলেন।

   যেকোনো আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি পাবার প্রাথমিক শর্ত হল সেটি কোনো পিয়ার রিভিউ জার্নালে ছাপাতে হয়। এতে একদিকে যেমন কাজটি সম্বন্ধে মানুষ জানতে পারে, অন্যদিকে কাজের কৃতিত্ব চুরি যাবার সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু ডঃ মুখোপাধ্যায় গবেষণায় সফল না হওয়া পর্যন্ত কাজের ব্যাপারটি বিস্তারিত ভাবে কোথাও প্রকাশ করেননি। আনন্দকুমারের কথায় ডঃ সুভাষ গোটা প্রক্রিয়ায় এমন কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন যেগুলোর ব্যবহার সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না। তিনি যদি সবটা প্রকাশ করে দিতেন তাহলে যেগুলো চুরি যাওয়া বা অনুকরণ করা শুরু হয়ে যেত। পুঙ্খানুপুঙ্খ নথি অনুসন্ধান করে আনন্দকুমার দেখেছেন, ডঃ সুভাষ গবেষণায় যে ‘ওভারিয়ান সিমুলেটেড প্রোটোকল' ব্যবহার করেছিলেন সেটি সমসাময়িক গবেষকদের চিন্তাভাবনার বাইরে ছিল। দীর্ঘ ৫৩ দিন ধরে আটকোষ বিশিষ্ট ভ্রূণকে হিমযন্ত্রে সংরক্ষণ করেছেন, তারপর সেটাকে হিমযন্ত্র থেকে বের করে অত্যন্ত কুশলতায় মাতৃজঠরে প্রতিস্থাপন করেছেন। এই কঠিন সাধনার ফল হিসাবে জন্ম নিয়েছে দুর্গা, একটি নিঃসন্তান দম্পতির কোলে তুলে দিয়েছেন তাঁদের বড় আদরের সন্তানকে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্যে যখন তাঁকে মাথায় তুলে নাচার কথা তখন তাঁর আবিষ্কারকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যে সরকার থেকে শুরু করে সহকর্মী সবাই উঠে পড়ে লেগেছিল। সরকার ও সহকর্মীদের ধন্দের জায়গাটা ছিল- আমেরিকার মতো দেশ যে কাজটা করতে পারেনি, সে কাজ কিভাবে কলকাতায় করা সম্ভব? আসলে স্বল্প রসদ ও পরিকাঠামোকে মূলধন করে নিজের প্রজ্ঞা দিয়ে ডঃ সুভাষ যে মিরাকেলটা ঘটিয়েছিলেন অনেকেই সেটা হজম করতে পারছিল না।

 আনন্দকুমার প্রহসন কমিটির বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করতে দ্বিরুক্তি করেননি। আসলে সরকার এবং তাঁর সহকর্মীদের উদ্দেশ্যই ছিল যেনতেন প্রকারে ডঃ সুভাষের আবিষ্কারকে হেয় প্রতিপন্ন করা। কমিটি তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনে নথিপত্র যোগাড়ের জন্যে মাত্র পনেরদিন সময় দেয়, যে সময়ের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ডকুমেন্টস একজোট করা এককথায় অসম্ভব। নথি জোগাড়ের জন্যে ছুটির আবেদন অনুমোদন পায়নি। অন্যদিকে আবিষ্কারের কথা প্রকাশ হওয়ার পর দেশবিদেশ থেকে সেমিনার, কনফারেন্সে ডাক আসতে থাকে। সরকার সমস্ত কিছুতে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। জাপানের কিয়োটো ইউনিভার্সিটির ‘প্রাইমেট রিসার্চ সেন্টার’ থেকে তাদের খরচে আমন্ত্রণ আসে তাঁর আবিষ্কারের বিষয়ে বলার জন্যে, সরকার অনুমতি দেয়নি। আনন্দকুমারের কথায়, এসব কিছুই করা হয়েছে একধরনের হীনমন্যতা থেকে, যে হীনমন্যতার চরম অবস্থায় যেকোনো ভাবে অন্যের অগ্রগতি রুখে দেওয়াই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়।

তদন্তের পর তাঁকে বাঁকুড়ার মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়। তার কয়েকদিন পরেই ডঃ সুভাষ হৃদরোগে আক্রান্ত হন, স্পেশাল লিভের আবেদনপত্র খারিজ হয় কিন্তু বদলির আবেদন জানালে সঙ্গে সঙ্গে মঞ্জুর হয়। বারবার কর্মস্থল পরিবর্তনে তাঁর গবেষণার কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে কফিনে শেষ পেরেকটি পোঁতা হয় যখন ১৯৮১ সালের জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তাঁকে ইলেক্ট্রো-ফিজিওলজির প্রফেসর হিসাবে বদলি করা হয় বাঁকুড়ার এক চক্ষু বিষয়ক ইনস্টিটিউটে, তার এতদিনের পড়াশোনা এবং গবেষণার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর এক কর্মস্থল। এই ধাক্কা আর অপমানটি নিতে পারলেননা আদ্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী, নরম মনের বিদ্বান মানুষটি। ১৯৮১ সালের ১৯ জুলাই নিজের হাতে নিজের জীবনের ইতি টানলেন, লিখে গেলেন একটি সুইসাইড নোট, " হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর জন্য আর অপেক্ষা করতে পারলাম না।"

লেখক:  অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক

ঋণস্বীকার: ইন্টারনেট

Mailing List