মানুষের গন্ধ / গল্প

মানুষের গন্ধ / গল্প
20 Nov 2022, 01:10 PM

মানুষের গন্ধ / গল্প

 

সঞ্জীব ভট্টাচার্য                                                  

 

পাহাড় না-পাহাড় আর গাছপালার সমারোহ।তার মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে শাশ্বতর এই প্রিয় নদী। প্রায় কয়েকশ মাইল পেরিয়ে নদীটা তার জন্মস্থান, তার বেড়ে ওঠা, তার প্রেম-বিরহের শহরকে ছুঁয়েছে। প্রতিদিন বিকেলে শাশ্বত নদীর কাছে আসে। তখন শুধু তার নিজের সঙ্গে নিজের দেখা।

একটা পাথর বেছে নিয়ে বসতে গেল শাশ্বত, ঠক করে কী একটা শব্দ হল। ও হো, কাঁধের ঝোলা ব্যাগটার চেন লাগানো হয়নি,ডিওডোরান্টের কৌটোটা পড়ে গেছে। শ্বেতা প্রায়ই বলত, ’তুমি কোনওদিন হয়তো আমাকে ছেড়ে দিতে পারো, কিন্তু বডি স্প্রে ছাড়তে পারবে না!’ তখন কথাটা মজার মনে হোত,কিন্তু শেষপর্যন্ত সেটাই সত্য হল। বিয়ে করে শ্বেতা বিদেশে চলে গেল আর B.H.M.S. পাশ করে সে চলে এল বহুদূরের এই পাহাড়ী অঞ্চলে, তবে এই মুহূর্তেও শাশ্বত কিন্তু শ্বেতাময়।

সত্যি বলতে কী,তার ভেতরে শ্বেতা আছে বলেই নিজেকে শাশ্বতর কখনো একা মনে হয় না। এই দুর্গম স্থানের গ্রামগুলোতে অসহায় মানুষদের সেবায় নিজেকে সঁপে দিয়েছে সম্পূর্ণভাবে। শ্বেতার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই তার এখানকার এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির সঙ্গে যোগাযোগ হয়। কিছুটি না ভেবেই কোনোরকম সময় না নিয়েই সে এখানে চলে আসে।      

বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল অশিক্ষা-কুশিক্ষা, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যহীনতায় আক্রান্ত মানুষগুলো কখন যে তার একান্ত আপন হয়ে উঠেছে। বিকেলে এইটুকু সময় ছাড়া, নাওয়া-খাওয়া ভুলে এঘর সেঘর ছুটে বেড়ানো। কাউকে ওষুধ দেওয়া,কারুর সেবা করা--এমন কী পড়ানো,সব ব্যাপারেই সমান উৎসাহ শাশ্বতর।

 

না। সন্ধে হয়ে আসছে, এবার উঠতে হবে। হরিকাকা কেমন আছে কে জানে, জ্বর ছিল। কেউ দেখার নেই। এক ছেলে,দেখেশুনে বিয়ে দিয়েছিল। বেশিদিন টিকলো না, লক্ষ্মীমন্ত বউ, ছেড়ে পালালো, বৌ-ই বা কী করে! সোমত্ত মেয়ে মানুষ, সেও সাঙা করে নিল। ফলে ভাঙতে থাকা ঘরের মধ্যে শেষ দিন গুনতে থাকা ভেঙে পড়া এক অসহায় মানুষ।

হরিকাকার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে সে চৌকাঠের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি, হঠাৎ ধ্যান ভাঙলো টুকরো কথার শব্দে---

- খেয়ে লে বাপ, খেয়ে লে, জানিস্ তো বাপ্ সব মরদই সমান, এখানে আছি জানলে...

- বউরে তোকে দেখলে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়,

-আমি আর তোর ঘরের বউ নয় বাপ্, আমি তোর বেটি।

...হঁ, বেটিই তো, জানিস বেটি ছোটো বেলায় যখন খেতে চাইতামনি ,মা ভয় দেখাত ----হাঁউ মাউ খাঁউ, মানুষের গন্ধ পাঁউ,

...আচ্ছা, আচ্ছা, আমিও তোকে ভয় দেখাচ্ছি,...হাঁউ মাউ খাঁউ, মানুষের গন্ধ...।

-শাশ্বত আর ঘরে ঢুকলো না। ব্যাগটা তার এখন পাথরের মত ভারি মনে হচ্ছে। নিজের গায়ের গন্ধটাও সে আর সহ্য করতে পারছে না, কোনোক্রমে সে নদীর কাছে এলো। ব্যাগ থেকে ডিওডোরেন্টটা বের করে ফেলে দিল নদীর জলে। টুপ্ করে শব্দ করে মিলিয়ে গেল সেটা।

-----------

লেখক পরিচিতি: জন্ম ৩০-১০-১৯৬৭। পেশায় স্কুল শিক্ষক। বিষয় - ইতিহাস। বাচিকশিল্পী। কবি ও লেখক। কবিতা গল্পের পাশাপাশি নিবন্ধ রচনাতেও সিদ্ধহস্ত। নাট্যকর্মী হিসাবে একসময় কাজ করেছেন। প্রকাশিত কবিতার বই: 'আশ্চর্য ভ্রমণ'।

Mailing List