মাতৃভাষা সংরক্ষণে সংগ্রহশালার ভূমিকা, ভাষা শহিদ দিবসে সেকথা বলাও জরুরি

মাতৃভাষা সংরক্ষণে সংগ্রহশালার ভূমিকা, ভাষা শহিদ দিবসে সেকথা বলাও জরুরি
21 Feb 2021, 10:38 PM

মাতৃভাষা সংরক্ষণে সংগ্রহশালার ভূমিকা, ভাষা শহিদ দিবসে সেকথা বলাও জরুরি

 

ড. সুমহা‌ন বন্দ্যোপাধ্যায়

 

কত বিচিত্র বিষয়ে সংগ্রহশালা আছে পৃথিবীতে। ভাষা সংগ্রহশালা বিষয়ের দিক দিয়ে বিচিত্র না হলেও ভাবনার নিরিখে অভিনব সম্দেহ নেই। ১৯৭১ সালেই ভাষার সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার ভাবনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়েছিল ২০০৮ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে স্থাপিত হয় ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ল্যাঙ্গুয়েজ। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যানাডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ মিউজিয়াম। নেদারল্যান্ডস এর লেইডেনে অনুরূপ একটি ভাষা সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালে। ওই একই বছরে ভুবনেশ্বরে উৎকল সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ভাষা সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ভারতের মতো বহুভাষিক রাষ্ট্রে এ ধরনের সংগ্রহশালার গুরুত্ব অপরিসীম।

 

এথনোলগ বলছে, ভারতবর্ষ বিশ্বে ভাষা বৈচিত্রের বিচারে চতুর্থ স্থান অধিকার করে। আর কুড়ি বছর আগের ভারতীয় আদমসুমারির হিসেব হল, দেশে প্রায় ১২০টির মতো প্রধান ভাষা, আর ১৬০০ এর মতো স্থানীয় ভাষা রয়েছে। পরিতাপের কথা হল, এগুলির মধ্যে অনেকগুলির ক্ষেত্রে মাতৃভাষার ব্যবহারকারীদের সংখ্যা বেশ কম – প্রবলতর ভাষার চাপে বহু ভাষা ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে। বলা যায়, মোট ভাষাগুলির মধ্যে ‌প্রায় ৯০ শতাংশই সঙ্কটাপন্ন।

 

মাতৃভাষার এই সঙ্কটাপন্ন অবস্থা দূর করার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বা স্থানীয় মিউজিয়ামগুলি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে। গ্রাম-শহর-ব্লক-মহকুমা বা জেলার সীমায়িত ভৌগোলিক পরিসরের নানা উপাদান নিয়ে গড়ে উঠতে পারে আঞ্চলিক সংগ্রহশালা। এই অঞ্চলের কোনও বিশেষ ব্যক্তি, পুরাতাত্বিক স্থান বা ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে এই সংগ্রহশালাগুলি গড়ে ওঠে। কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি বা বেসরকারি -এই মিউজিয়ামগুলি পরিচালনা করেন। সংগ্রহশালা সংস্কৃতির এ হেন বিস্তারের বিচারে পশ্চিমবঙ্গকে দেশের মধ্যে অগ্রগণ্য বলা যায়। ২০১৮ সালে বিদেশি জার্নালে পশ্চিমবঙ্গের মিউজিয়াম নিয়ে একটি নিবন্ধে আমি রাজ্যে প্রায় দেড় শতাধিক মিউজিয়ামের কথা উল্লেখ করেছিলাম। এর মধ্যে শতাধিক মিউজিয়াম একান্তভাবে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য বহন করে। কিন্তু আমি এখানে, সীমাবদ্ধ আঞ্চলিক অর্থেই সংগ্রহশালার গুরুত্বের কথা বলতে চাই।

লিখিত ইতিহাসের সাক্ষর সমৃদ্ধ শিলালিপি, তাম্রপত্র, মিউজিয়ামে তো থাকেই। কিন্তু ভাষার চাক্ষুষ রূপটিকেও ধরে রাখে সে। বহুক্ষেত্রে এর আঞ্চলিক রূপটি বেশ প্রবল। এখানকার প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়ে পানের বাটা কথাটি শুনে থাকবে। কিন্তু আঞ্চলিক সংগ্রহশালায়‌ সার্থকভাবে ধরে রাখতে পারে অধুনা প্রায় অব্যবহৃত হয়ে পড়া এই পাত্রটিকে। ফলে একে চোখে দেখার সৌভাগ্যও হবে আমাদের। অর্থাৎ ভাষার বস্তুগত রূপটিকে একেবারে তৃণমূলস্তরে ধরে রাখতে পারে আঞ্চলিক সংগ্রহশালাগুলি। ফলত, অঞ্চল বিশেষের বা জনগোষ্ঠী নিজ নিজ শব্দ ভান্ডার সুরক্ষিত হয়, এই সংগ্রহশালাগুলির দ্বারা। দ্বিতীয়ত, কোনও কোনও সময়ে একেবারে মায়ের হাতের লিপি, মুখের ভাষা বা বাগধারা ধরা থাকে নানা ঘরোয়া শিল্প শৈলীতে। যেমন, কাঁথায়, আসন লিপি বা সন্দেশ, আমসত্ব্বের ছাঁচে। যেমন জোকার গুরুসদয় মিউজিয়ামে এসব নিদর্শন রয়েছে। তৃতীয়ত, অডিও ভিস্যুয়াল ডকুমেন্টেশনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় ভাষাগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার সদর্থক প্রয়াস করা যায় মিউজিয়ামের উদ্যোগে।

 

চতুর্থত, আঞ্চলিক নানা জনগোষ্ঠীর ভাষা নিয়ে চর্চা, প্রকাশনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই আঞ্চলিক সংগ্রহশালা বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। এই সমস্ত গোষ্ঠীর নিজ নিজ ভাষা এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে লিপিতে প্রকাশিত গ্রন্থ, পত্রিকা, প্রচার পুস্তক ইত্যাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণও সম্ভব এই সংগ্রহশালাগুলির দ্বারা।

পঞ্চমত, সংগ্রহশালার নতুন ভাবনায় অর্থাৎ যে নিও মিউজিয়াম মুভমেন্ট, যেখানে মিউজিয়াম চার দেওয়ালের পরিসরে আবদ্ধ নয়, সেখানে সংগ্রহ, সংরক্ষণ অংশভাগী। কোনও অঞ্চলের প্রতিটি ব্যক্তিই এই সংরক্ষণ কর্মে ব্যাপৃত। নিজ নিজ সংস্কৃতি সম্পর্কে শ্রদ্ধা ও সচেতনতা বৃদ্ধির যে আন্দোলন, তা একদিকে যেমন সংগ্রহশালাকে চার দেওয়ালের থেকে বেড়ামুক্ত করতে পারে, তেমনই ঐতিহ্য সংরক্ষণে আরও সফল ভাবে হতে পারে। এক্ষেত্রে সংগ্রহশালা শুধু বস্তু সামগ্রীর আধার নয়, তা স্থানীয় মানুষদের জীবন্ত সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত। এই সচেতনতা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাতৃভাষা প্রসার ও সংরক্ষণের মূল্যবান ভূমিকা গ্রহন করে। এইভাবে স্থানীয় আঞ্চলিক স্তরের সংগ্রহশালাগুলি- বড়শূলের হিমাদ্রী দে-র ব্যক্তিগত উদ্যোগে হোক, বাগনানের আনন্দ নিকেতন সংগ্রহশালার মতো সরকারি জেলা মিউজিয়াম হোক কিম্বা বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী চর্চা কেন্দ্র ও সংগ্রহশালা- মাতৃভাষার ঐতিহ্য সংরক্ষণে এগুলির অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে একথা অনস্বীকার্য।

 

লেখক - ডাইরেক্টর, সেন্টার ফর আদিবাসী স্টাডিজ এণ্ড মিউজিয়াম, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Mailing List