শস্য উৎপাদনে যেন বাধা না পড়ে, পুরুলিয়া জেলা জুড়ে পালিত হল রোহিনী উৎসব

শস্য উৎপাদনে যেন বাধা না পড়ে, পুরুলিয়া জেলা জুড়ে পালিত হল রোহিনী উৎসব
28 May 2022, 06:24 PM

শস্য উৎপাদনে যেন বাধা না পড়ে, পুরুলিয়া জেলা জুড়ে পালিত হল রোহিনী উৎসব

 

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, রঘুনাথপুর

 

একটি বিশেষ দিন। আর সেই দিনটিতে পুরুলিয়া জেলায় আনুষ্ঠানিক ভাবে আমন ধানের চাষের জন্য ধান বীজ রাখা হয়। তার জন্য চলে আসছে রোহিনী পরব। সেই পরবের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে পালিত হয় এটি। প্রচলিত একটি কথা আছে, "বারো মাসে বারুনি তোরো দিনে রইইন বা রহিন ৷ জ্যৈষ্ঠ মাসের তেরো তারিখে বীচ পুহ্না বা বীজ বপন উপলক্ষে রহিন উৎসব উদ্‌যাপন করা হয়। কৃষকদের বিশ্বাস, রোহিনী নক্ষত্র সেই দিন পৃথিবীর নিকটবর্তী এসে পড়ায় ঐ দিন বীজ বপন করলে শস্য উৎপাদনে কোন বাধা থাকে না।

এদিন বিশেষ করে বাগদি, বাউরি, মাহাত, কোড়া, মুদি সম্প্রদায়ের মানুষেরা উপোস করে পুকুরে স্নান সেরে ধানের বীজ মাথায় করে নিয়ে মাঠে গিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে ধানের চারার জন্য বীজ রাখার কাজ শুরু করেন। এই সব সম্প্রদায়ের মানুষজন নিজের নিজের বাড়িতে পায়রা বাচ্চা বলিদান করেন দেবতার উদ্দেশ্যে। পাশাপাশি গ্রামের নিজের নিজের বাড়ির দেওয়ালে গোবরের দাগ দিয়ে গন্ডি এঁকে দেওয়া হয়। এই বিশেষ কাজের জন্য এদিন সূর্য উঠার আগেই বাড়ির মহিলারা বাড়ির চারপাশে দেওয়ালে গোবর দিয়ে দাগ কেটে দেন। তাঁদের বিশ্বাস, এর ফলে বাড়ির মধ্যে কোনও বিষাক্ত পোকা মাকড় প্রবেশ করতে পারবে না। এছাড়া কু নজর বাড়ির মধ্যে কেউ ফেলতে পারবে না। এর জন্যই এই বিশেষ দিনে এই কাজ করা হয়।

এছাড়া এদিন সকাল সকাল গ্রামের ছেলেরা বিশেষ বিশেষ সাজে সেজে বাড়ি বাড়ি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে রোহনীর গান গেয়ে এই উৎসব পালন করে থাকে।       

           

পূর্বপুরুষদের প্রাচীন রীতি এবং আচার বিধি মেনে শনিবার ঘটা করে রোহিণী উৎসব পালিত হলো পুরুলিয়া জেলায়।  আমন ধানের বীজতলা দেওয়ার সূচনাপর্বের এই প্রক্রিয়াকে রোহিণী পরব বা রোহিণী উৎসব বলে থাকেন পুরুলিয়া জেলার চাষাভূষা মানুষেরা। মূলত এ দিন থেকেই জমি কর্ষণ করে তারমধ্যে আমন ধানের বীজবোনার কাজ শুরু করে থাকেন জেলার কৃষকেরা। তাই এদিন জঙ্গলমহলের গাছগাছালি ঘেরা আবাদি জমি থেকে অযোধ্যা পাহাড়তলির অসমতল কৃষিজমি এবং সমতলের ধানি জমিগুলিতে সকাল থেকেই বলদ জোড়া ও লাঙ্গল নিয়ে জমি চসার কাজে নেমে পড়তে দেখা গেল চাষীদের।  জেলায় কোন ভারী শিল্প না থাকায় খরাপ্রবন পুরুলিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ চাষবাসের উপর নির্ভরশীল। আর আমন ধান হল জেলার কৃষিজীবী মানুষদের কাছে প্রধান অর্থকরী ফসল। সারা বছরের সংসার খরচ আসে এই আমন ধানের চাষ থেকেই।

rohini festival

তাই শনিবার সকাল থেকেই আমনধানের বীজতলা দেওয়ার সূচনাপর্বের প্রাচীন প্রক্রিয়ায় মা লক্ষ্মী এবং অন্যান্য ইষ্ট দেবতার পুজোয় মেতে উঠতে দেখা গেল জেলার বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের পুরুষ ও মহিলাদের। শুধু বড়োরাই নন এই উৎসবকে ঘিরে উন্মাদনা ছিল কচিকাচাদের মধ্যেও। রোহিণী উৎসবকে ঘটা করে পালন করার জন্য গ্রামগঞ্জের একটি সম্প্রদায়ের ছোট ছোট ছেলেরা সারা গায়ে রং লাগিয়ে মুখোশ পরে কৃত্রিম বাজনার তালে তালে হয়ে উঠলো নাচে মাতোয়ারা। সারা বছর যাতে বসতবাড়ি গুলির মধ্যে বিষাক্ত সাপ বা পোকামাকড় প্রবেশ করতে না পারে সেই কামনায় ইষ্ট দেবতার এবং মা মনসাকে স্মরণ করে গ্রামের বিশেষ একটি শ্রেণীর মহিলারা তাদের মেঠো বাড়ির চার দেওয়ালের উপর গোবরের গণ্ডি একে দিয়ে শঙ্খধ্বনির মধ্য দিয়ে প্রাচীন রেওয়াজ মেনে রোহিণী উৎসব পালন করলেন। 

Mailing List