তাঁর মাথার দাম তখন এক লক্ষ টাকা! আর তিনি ট্রেনে সফর করছেন ব্রিটিশ পুলিশের চিফ কমিশনারের ঠিক উল্টো দিকে!

তাঁর মাথার দাম তখন এক লক্ষ টাকা! আর তিনি ট্রেনে সফর করছেন ব্রিটিশ পুলিশের চিফ কমিশনারের ঠিক উল্টো দিকে!
14 Aug 2022, 11:18 AM

তাঁর মাথার দাম তখন এক লক্ষ টাকা! আর তিনি ট্রেনে সফর করছেন ব্রিটিশ পুলিশের চিফ কমিশনারের ঠিক উল্টো দিকে!

বাসবী ভাওয়াল

 

দু’জনের মায়ের নামই এক। ভূবনেশ্বরী দেবী।

দু’জনেই জন্মেছিলেন বসু পদবি নিয়ে। দু’জনেই বিদেশিনীর প্রণয়ে আবদ্ধ হন।

দুজনের কর্মকাণ্ড ১৯৪৫ পর্যন্ত পরিলক্ষিত। দুজনেরই কর্মকাণ্ড এক সংগঠনের সাথে যুক্ত। তা হল, আজাদ হিন্দ ফৌজ। একজন প্রতিষ্ঠাতা আর অন্যজন পরিচালক।

নিশ্চয়ই এতক্ষণে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, কারা এই দুই মহান ব্যক্তিত্ব। একজন বিপ্লবী রাসবিহারী বসু। আর অন্যজন হলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

রাসবিহারী বসুর জন্ম ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ২৫ মে। বর্ধমান জেলার সুবলদহ গ্রামে। পিতা বিনোদবিহারী বসু। আর মাতা ভুবনেশ্বরী দেবী। জীবনের প্রথম দিকে তিনি বিপ্লবী কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে আলিপুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি দেরাদুন যান এবং সেখানে প্রধান করণিক হিসাবে বন্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে যোগদান করেন। দেরাদুনে তিনি গোপনে বাংলা, উত্তরপ্রদেশ ও পাঞ্জাবের বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন।

 

রাসবিহারী বসুর জীবন ছিল নাটকের মতো বিচিত্র। তিনি ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অগ্রগণ্য বিপ্লবী নেতা। দিল্লিতে গভর্ণর জেনারেল ও ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর এক বোমা হামলায় নেতৃত্ব দেবার কারনে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে তিনি পালিয়ে যান।

উত্তর ভারতে ব্রিটিশ পুলিশ ও তাঁর মধ্যে চলতো বিড়াল-ইঁদুর খেলা। কথিত আছে, যখন তাঁর মাথার দাম একলক্ষ টাকা, সে সময়ে পুলিশের চিফ কমিশনারের ঠিক উল্টো দিকে বসে ট্রেনে সফর করছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ১৯১৫ সালে প্রিয়নাথ ঠাকুর ছদ্মনামে তিনি জাপানে পালিয়ে যান।

১৯১৫-১৯১৮ সালের মধ্যে তিনি বহুবছর নিজের পরিচয় ও বাসস্থান বদলান। ব্রিটিশরা তাঁর প্রত্যর্পণের ব্যাপারে জাপ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। টোকিও তে নাকামুরায়া বেকারির মালিকের বাড়িতে লুকিয়ে থাকার সময়ে তাঁর মেয়ে তোশিকো সোমাকে বিয়ে করেন। সুভাষচন্দ্র বসু কে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ করতে মুখ্য ভূমিকাও পালন করেছিলেন। ১৯২৩ সালে জাপানের নাগরিকও হয়ে যান। তারপর সাংবাদিক তথা লেখক পরিচয়ে সেখানে বসবাস করতে থাকেন। জাপানে ভারতীয় রান্না জনপ্রিয় করার ব্যাপারেও তাঁর অবদান ছিল। সেই সময়ে তিনি রাসবিহারী নাকামুরায়ার বোস নামে পরিচিত ছিলেন।

 

রাসবিহারী বসুর জীবন ছিল বর্ণময়। এবং তিনি ছিলেন অকুতোভয়। জাপানের লোকেরা তাঁকে 'টেনারাই' নামে অভিহিত করেছিল। যার অর্থ 'স্বর্গীয় সত্তা'। ১৯২৫ সালে স্ত্রী বিয়োগের পর মানসিক যন্ত্রণা ভুলতে নিজেকে আবার পুরোপুরি নিয়োজিত করেন স্বাধীনতা আন্দোলনের কাজে। ১৯৩৩ সালে তিনি প্রথম ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের আয়োজন করেন। ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে জাপানি এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করে।

রাসবিহারী বসু জাপান এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া জুড়ে সমর্থকদের একত্রিত করার জন্য তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি কয়েক হাজার ভারতীয় বন্দিকে মোহন সিং এর নেতৃত্বে জাপানিদের পাশাপাশি লড়াইয়ের জন্য নিয়োগ দেন। ১৯৪৩ সালে সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্ব গ্রহণ করলে তাঁর সর্বাগ্রে উপস্থিতি ম্লান হতে শুরু করে।

 

জীবনের শেষ পর্যন্ত ভারতকে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি দৃঢ়প্রত্যয়ী লড়াই করে গেছেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁকে জাপানি সরকার সম্মানসূচক 'সেকেন্ড অর্ডার অব দি মেরিট অব দি রাইজিং সান' খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৪৫ সালের ২১ শেষ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। জাপানে তাঁর আবাসস্থল নাকামুরায় একটি চমৎকার কারি ডিশে তিনি অমর হয়ে আছেন। তিনি থাকাকালীন জাপানে এই খাবারটি জনপ্রিয় ছিল।

মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু জাপান ও ভারতে নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধাভাজন খ্যাতিমান ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পঁচাত্তর বছর হয়ে গেলেও স্বাধীন ভারত কি প্রদান করেছে এই সংগ্রামী ব্যক্তিত্বকে যথার্থ মর্যাদা। আজকের ভারতের ভাগ্যবিধাতারা কি স্মরণ করেন এই বিপ্লবী কোহিনুরকে। স্বাধীন দেশের খেয়াতরী - কি তাঁর স্মৃতিও বহন করতে অক্ষম!

Mailing List