ভসরাঘাটের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে  বর্গী নেতা ভাস্কর পণ্ডিতের নাম

ভসরাঘাটের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে  বর্গী নেতা ভাস্কর পণ্ডিতের নাম
01 May 2022, 05:03 PM

ভসরাঘাটের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে  বর্গী নেতা ভাস্কর পণ্ডিতের নাম

 

 

সৌরভ চক্রবর্তী

 

 

শাল, মহুল, পিয়াল ঘেরা অরণ্যসুন্দরী ঝাড়গ্রাম জেলার নয়াগ্রাম ব্লকের ভসরাঘাটের ওপরে নির্মিত নয়াগ্রাম-কেশিয়াড়ির সংযোগকারী জঙ্গলকন্যা সেতু।

কেন এই জায়গার নাম ভসরাঘাট? শুনতে অবাক লাগলেও এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে একটি অজানা ইতিহাস।

জঙ্গলকন্যার বুক থেকেই টাইম মেশিনে চড়ে চলে যাওয়া যাক সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি।

 

নৃশংস মারাঠা বর্গীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি খেলাড় নয়াগ্রাম, অত্যাচারিত হয়েছে রাজা থেকে রাঙ্গিয়ামের কঁদা সরেন পর্যন্ত।

ব্যাপক লুঠতরাজের পরেও ধুলিস্যাৎ করা হয়েছে নয়াগ্রামের শেষ সফল রাজা চন্দ্রকেতুর ষোড়শ শতাব্দীর নির্মিত খেলা গড়।

ধংস করেছে রামেশ্বর শিবের ভোগমণ্ডপ , রেহাই পায়নি রাঙ্গিয়ামের লোকদেবী রাঙ্গিবুড়ির পূর্নাঙ্গ মূর্তি। সহস্রলিঙ্গ মন্দিরের শিবলিঙ্গকেও উৎপাটনের চেষ্টা করা হয়েছে সাত সাতটা ঘোড়া দিয়ে। ধ্বংস করেছে লাঙ্গুল নরসিংহ দেব-এর রাইবনিয়া ক্যাসল।

শয়ে শয়ে লুঠ করে নেওয়া হয়েছে জংলি সাঁওতাল মা বোনেদের শরীর ও সম্ভ্রমটুকু। মাটির ভেতরেই ইতিহাস হয়ে গিয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন।

 

বর্গীরা আসলে মারাঠা জাতি এবং তারা কথা বলে মারাঠী ভাষায় । মারাঠী ভাষায় খাজনা শব্দটিকে বলা হয় ‘চৌথ’। প্রথমেই বলে রাখছি মারাঠারা প্রধানত ভারতের মহারাষ্ট্রের অধিবাসী হলেও তারা ভারতবর্ষের গোয়া, গুজরাট, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু  ও মধ্যপ্রদেশেও বাস করে। সনাতন ধর্মের অনুসারী মারাঠারা মুঘল আমলে ছিল ক্ষত্রিয় যোদ্ধা।

 

মারাঠাদের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন ছত্রপতি শিবাজী। তিনিই ১৬৭৪ সালে মহারাষ্ট্রের মারাঠী সাম্রাজ্যটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । মারাঠী সাম্রাজ্য রাজধানী ছিল মহারাষ্ট্রের রাইগাড। ১৮১৮ অবধি মারাঠী সাম্রাজ্যটি টিকে ছিল। পতনের কারণ? ভারতবর্ষে নতুন শক্তির আগ্রাসন।

 

মুগল সম্রাট আওরঙ্গজেব (১৬১৮) সম্রাটের দক্ষিণ ভারতের সামরিক অভিযানের সময় মারাঠা সাম্রাজ্যটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। যার ফলে মারাঠারা মুগল শাসনের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকে। মুঘল আমলে মারাঠারা ছিল হিন্দু ক্ষত্রিয় যোদ্ধা। সম্রাটদের মাথা গরম করলে চলবে কেন? সম্রাট আওরঙ্গজেব মনসব পদ দিয়ে মারাঠা সৈন্যদের মুঘল সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে মারাঠাদের রোষ প্রশমিত করার চেষ্টা করেন। লাভ হয়নি।

 

কিছু কিছু মারাঠা সেনাপতি সম্রাট আওরঙ্গজেব-এর অনুগত থাকলেও বেশির ভাগ মারাঠা সৈন্যই রোষবশত ভারতবর্ষে মুঘল শাসিত প্রদেশগুলিতে লুঠপাঠ আরম্ভ করে। রোষের শিকার মুঘল শাসিত প্রদেশগুলিতে সুবা বাংলা ছিল অন্যতম। মারাঠা সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈন্যরা বরগির নামে পরিচিত ছিল। মারাঠা নেতা ছত্রপতি শিবাজী মারাঠী প্রশাসন কর্তৃক এদের ঘোড়া ও অস্ত্র সরবরাহ করা হত। এই ‘বরগির’ শব্দ থেকেই বর্গী; এবং বাংলায় মারাঠা আক্রমনকারীরাই বর্গী নামে পরিচিত।

বাংলা মুঘলশাসিত প্রদেশ বলেই ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত বার বার বাংলায় বর্গীদের আক্রমন সংঘটিত হতে থাকে। নওয়াব আলীবর্দী খান ১৭৪০ সালে বাংলার নওয়াব নিযুক্ত হন। ১৭৪২ সালের ১৫ এপ্রিল বর্গীরা বর্ধমান (বর্তমান পশ্চিম বাংলা) আক্রমন করে। জরুরি সংবাদ পেয়ে নওয়াব আলীবর্দী খান সসৈন্যে বাংলার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। বর্গীদের নেতা ছিল ভাস্কর পন্ডিত, তার নির্দেশে বর্গীরা নওয়াব-এর রসদ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কোনও রকমে বর্গী বেষ্টনী ছিন্ন করে কোনওমতে প্রাণে বাঁচেন নওয়াব ।

বর্গী আক্রমনকালে বাংলার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদাবাদ-এর অবস্থান ছিল কলকাতার ৩৪৭ কিলোমিটার উত্তরে মালদা জেলায় । মুগল প্রাদেশিক শাসনের দুটি প্রধান শাখা ছিল নিজামত ও দীউয়ানি। নিজামত সাধারণ প্রশাসন এবং দীউয়ানি রাজস্ব প্রশাসন। বাংলার দীউয়ান মুর্শিদকুলী খান ১৭০৪ সালে দীউয়ানি প্রশাসনের কেন্দ্র ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন।

৬ মে, ১৭৪২। মুর্শিদাবাদের দ্বারপ্রান্তে সশস্ত্র বর্গীরা এসে উপনীত হল। নওয়াব আলীবর্দী খান সে সময় মুর্শিদাবাদে ছিলেন না। নির্মম বর্গীরা মুর্শিদাবাদ নগরের বড় একটি বাজার পুড়িয়ে দেয়। এবং এভাবে বর্গীদের নির্বিকার ধ্বংসযজ্ঞ বাংলার মানসে চিরতরে প্রোথিত হতে থাকে: যে রুদ্ধশ্বাস অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছিল মনোরম বিষন্ন একটি ছড়ার আকারে...

"খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো

বর্গী এল দেশে,

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে

খাজনা দেব কীসে?"

মুর্শিদাবাদ নগরে বাস করত জগৎ শেঠ নামে এক ধনী সওদাগর । বর্গীরা তার কাছ থেকে ৩ লক্ষ টাকা আদায় করে নেয়। পরের দিনই, অর্থাৎ ৭ মে নবাব আলীবর্দী খান মুর্শিদাবাদ উপস্থিত হন। ততক্ষণে মুর্শিদাবাদের অনেকটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে বর্গীরা পালিয়ে গেছে আরও দক্ষিণে।

এবার বাংলার ইতিহাসের এক বিচিত্র প্রসঙ্গে আসি। মীরজাফরের আগেও বাংলায় আরও একজন বিশ্বাসঘাতক ছিল! বিশ্বাসঘাতক সেই পাষন্ড লোকটার নাম মীর হাবিব। পারস্য সেই অভিজাতটি এক সময় নওয়াব আলীবর্দী খানের ঘনিষ্ট ছিল । অথচ, এই লোকটিই ‘লোকাল এজেন্ট’ হিসেবে বর্গীদের সাহায্য করত! আসলে মীর হাবিব ছিল রাজাকার।  বাংলা সম্বন্ধে খুঁটিনাটি জ্ঞান ছিল তার। বর্গীরা সে জ্ঞান প্রয়োগ করে সহজেই বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত!

 

১৭৪২ সালের মাঝামাঝি বাংলা থেকে বর্গীদের নির্মুল করার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন নওয়াব আলীবর্দী । নাঃ, নওয়াবের এই সিদ্ধান্ত বাঙালিদের ভালোবেসে নয়, দিল্লির প্রাপ্য খাজনায় বর্গীরা ভাগ বসাচ্ছিল বলেই। যা হোক। ১৭৪৩ সালে বর্গীরা মেদিনীপুর আক্রমন করে। নওয়াব আলীবর্দীর নেতৃত্বে মুগল সৈন্যরা মেদিনীপুরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ৯ ফেব্রুয়ারি দুপক্ষের তুমুল সংর্ঘষ হয়। নওয়াব আলীবর্দীর উন্নততর রণকৌশলের ফলে মেদিনীপুর থেকে বর্গীরা উৎখাত হয়ে যায়। তবে লাভ হয়নি। ১৭৪৪ সালের ফেব্রয়ারি মাসে বর্গী নেতা ভাস্কর পন্ডিত আবার বাংলা আক্রমন করে বসে। নওয়াব আলীবর্দী খান বাধ্য হয়ে এবার ষড়যন্ত্রের পথ ধরেন। বর্গী নেতা ভাস্কর পন্ডিত কে বৈঠকের আহ্বান জানান নওয়াব । বৈঠকে ২১ জন বর্গীসহ ভাস্কর পন্ডিত এলে তাঁবুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা মুগল সৈন্যদের আক্রমনে বর্গীরা নিহত হয়। তবে লাভ হয়নি। ১৭৫০ সালের বর্গীরা আবার বাংলায় হানা দেয়। ১৭৫১ সালে বর্গী আক্রমনের তীব্রতা এতই বেড়ে যায় যে আলীবর্দী খানকে মারাঠা-বর্গীদের হাতে উড়িষ্যা ছেড়ে দিতে হয়।

১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত মারাঠা বর্গীরা ঊড়িষ্যা হয়ে বাংলার বুকে বার বার আক্রমণ করে লুঠতরাজ ও নির্মম অত্যাচার চালাতে থাকে অনেকটা সময় ধরে।

বাংলায় মারাঠা বর্গী আগ্রাসন ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত ঘটেছিল, রঘুজী ভোঁসলের নেতৃত্বে মারাঠা ছয় বার বাংলাকে আক্রমণ করে। ১৭৪২ সালে প্রথম এবং ১৭৪৩ সালে দ্বিতীয় ১৭৪৪ সালে তৃতীয়টিও রঘুজি ভোঁসলের বর্গী দলপতি পণ্ডিত ভাস্কর ও রাম কলহাটারের নেতৃত্ব হয়েছিল। এবং ১৭৪৫ সালে চতুর্থ আক্রমণটিতে রঘুজি ভোঁসলে নিজে নেতৃত্ব দেন।

বিশেষজ্ঞদের দাবি ঘোড়ার পিঠে চড়ে অস্ত্রশস্ত্র সহকারে যে সৈন্যরা ঊড়িষ্যা হয়ে বাংলায় প্রবেশ করেছিল তারা আসলে মহারাষ্ট্র থেকে আসা কুরমি সম্প্রদায়ভুক্ত মারাঠা বর্গীর দল। পরবর্তীকালে এই লুঠেরা বর্গীর অল্পসংখ্যক কেউকেউ দুর্বিষহ যুযুধান জীবনের ওপর আস্থা হারিয়ে নয়াগ্রামের বাঁশপাট, চুনখুলিয়া আর ওডিশ্যার চুড়ামনিপুরে কৃষি কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে স্বজাতিদের সাথে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

এবার আসি ভসরাঘাট নাম করনের বিষয়ে। নয়াগ্রামে মারাঠা বর্গীদের প্রবেশপথ ছিল সুবর্ণরেখা নদীর এই নদীঘাট। মারাঠা দলপতি ভাস্কর পণ্ডিত-এর নামানুসারেই এই নদীঘাটটির নাম হয় ভাস্কর ঘাট। পরে যার বিকৃত রূপ ‘ভসরাঘাট’ হিসেবে পরিচিত হয়। বর্গী আক্রমনের স্মৃতিবাহী এই ভসরাঘাটের ওপরেই কেশিয়াড়ী ও নয়াগ্রাম ব্লকের মহাসংযোগ স্থাপনকারী জঙ্গলকন্যা সেতুটি আজ ঐতিহাসিক পটে আরেক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এটি বর্তমানে বাংলার দীর্ঘতম নদীসেতুও বটে।

ads

Mailing List