পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক ‘আমিই সে’ / শেষ পর্ব

পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক ‘আমিই সে’ / শেষ পর্ব
14 Nov 2021, 12:30 PM

আমিই সে’

(পুরাণভিত্তিক ধর্মীয় ধারাবাহিক রচনা)

 

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

শেষ কিস্তি

 

এখানে একটা প্রশ্ন আসতে পারে।

মার্কন্ডেয় প্রথমে জলমগ্ন অবস্থায় ভাসতে ভাসতে পুরুষোত্তমের বালক রূপের কন্ঠে তাকে 'বালক' বলে আহ্বান করে 'তুমি আমার কাছে আশ্রয় লাভ কর' --- ইত্যাদি অবজ্ঞা-সূচক ব্যবহার পেল হয়েছিল বলে খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছিল, সসে-ই মার্কন্ডেয় আবার শ্রীভগবানকে স্তব-স্তুতি করে অন্তরের শ্রদ্ধা-ভক্তি জ্ঞাপন করল, এটা কেমন একটা বেমানান নয় কি?

 

মার্কন্ডেয় ঐ বালক-রূপী শ্রীকৃষ্ণকে দেখে প্রথমে খুব রেগে গিয়েছিল। খুবই স্বাভাবিক; তার ওপর ওই ধরনের অবজ্ঞা-অবহেলার সুরে বলা কথায় তার রাগ আরও বেড়ে গিয়েছিল। সর্বোপরি সে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে জলের দীর্ঘ সময় ধরে একনাগাড়ে ভেসে বেড়িয়েছে।

 

এটা তো গেল বাস্তব জীবনের কথা।

কিন্তু ভাববাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম।

মার্কন্ডেয় সংসারের মায়াময় জগতের ভোগী জৈবিক সত্ত্বা-বিশিষ্ট মানুষ। সংসারের মায়াময়তা বলতে লৌকিক ধর্মাধর্ম, পাপপুণ্য, সুখ-দুঃখ, বিধিনিষেধ, অহং বোধ----- সবকিছুই বোঝায়। মার্কন্ডেয়র ক্ষেত্রে তাই জৈবিক তারণার সাথে অহং বোধ-ও ছিল। তাই সে পরমপুরুষ পরমাত্মার প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করতে পারেনি; তাচ্ছিল্যের সাথে জাতক্রোধ-ও জাগ্রত হয়েছিল তার মনে।

 

এই অহং-জ্ঞান তাকে এতটাই মোহাবিষ্টের ঘোরে রেখে দিয়েছিল যে, সে উপলব্ধি করতে পারে নি: সমগ্র বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের ধ্বংসের পরও সে কি ভাবে জীবিত অবস্থায় থাকতে পারে!!

 

তার বোঝা উচিত ছিল, নিশ্চয়ই এমন কোনো শুভ শক্তির দ্বারা সে ঐহেন পরিস্থিতিতে জীবনের আনন্দ উপভোগ করতে পারছে। তার বিনিময়ে মনে বাসা বেঁধেছিল অহঙ্কার--- এই ভেবে যে, সে শিবের বরে অমর--- জাগতিক কোনো কিছুতেই তাকে জীবনের ক্ষতি করতে পারবে না।

 

এই অহং-জ্ঞানের-ই বশবর্তী হয়ে ভ্রান্ত জ্ঞান বা শুভ চেতনার অভাবে ব্রহ্মের অস্তিত্ব চিনতে পারেনি।

শ্রীগীতা এই অবস্থার সম্পর্কে সন্ন্যাসযোগ অধ্যায়ের পনেরো নম্বর শ্লোকে  বলেছেন:

 " নাদতে কস্যচিৎ পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ।

  অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ।।"

 

অর্থাৎ, 'সর্বব্যাপী আত্মা (জগতের সৃষ্টি -কর্তা) কারও পাপ বা পুণ্য গ্রহণ করেন না; অজ্ঞানতা দ্বারা জ্ঞান আচ্ছন্ন থাকে বলে জীব মোহপ্রাপ্ত হয়।'

ঠিক তার পরের শ্লোকেই বলা আছে, কখন সেই অজ্ঞানতা দূর হয়:

"জ্ঞানেন তু তদ্জ্ঞানং যেষাং নাশিতমাত্মনঃ।

 তেষামাদিত্যবজ্ জ্ঞানং প্রকাশয়তি তৎপরম।। "

 

অর্থাৎ, যাদের আত্ম-বিষয়ক জ্ঞানদ্বারা সেই অজ্ঞান নষ্ট হয়, তাদের সেই আত্ম-জ্ঞান সূর্যের মত পরম তত্ত্বকে প্রকাশ করে দেয়, অর্থাৎ সূর্য যেমন অন্ধকার হরণ করা সবকিছুই প্রকাশিত করে, সেই রকম আত্ম-জ্ঞান জীবের সমস্ত মোহ দূর করে পরম - পুরুষকে প্রকাশ করে দেয়।'

 

এই কারণেই মার্কন্ডেয় বালক-রূপী জগৎবন্ধু শ্রীহরির স্বরূপ চিনতে পারে এবং তাঁর স্তুতি করে সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করেছিল। পরমেশ্বর মহাত্মার কৃপা হলে তবেই জৈবিক প্রবৃত্তি, তথা মিথ্যা অহমিকার জাল ছিন্ন করে পরম সত্যে পৌছাতে পারা যায়।

 

ads

Mailing List