‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের দেশ’, জীবন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে জলের তলায় পোস্ট অফিস! মানুষের মাংস খাওযার গল্প, অদ্ভূত ভালোলাগার সমাহার হল ৮৩ দ্বীপের দেশ ভানুয়াতু

‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের দেশ’, জীবন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে জলের তলায় পোস্ট অফিস! মানুষের মাংস খাওযার গল্প, অদ্ভূত ভালোলাগার সমাহার হল ৮৩ দ্বীপের দেশ ভানুয়াতু
11 Jul 2021, 11:15 AM

‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের দেশ’, জীবন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে জলের তলায় পোস্ট অফিস! মানুষের মাংস খাওযার গল্প, অদ্ভূত ভালোলাগার সমাহার হল ৮৩ দ্বীপের দেশ ভানুয়াতু

 

কল্পনায় স্বর্গের একটা রূপ রয়েছে প্রত্যেকের মনেই। তাই তো মনের গোপনে কোথাও লুকিয়ে থাকে স্বর্গে পৌঁছনোর বাসনা। কিন্তু সে স্বর্গের অস্তিত্ব কেবলই কল্পনায়। কারণ, যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ ততক্ষণ সেখানে পৌঁছনোর কথা ভাবারও উপায় নেই। অথচ, এ বিশ্বেই এমন বহু স্বর্গীয় দৃশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। প্রকৃতির সেই উজাড় করা সৌন্দর্য হয়তো কল্পনার স্বর্গকে হার মানাতে পারে। সেখানকার মানুষের আচার-আচরণ, কৃষি, অর্থনীতি, ভূপ্রকৃতি- সত্যিই অন্য অনুভূতি জাগায়। তারই পাশাপাশি মিলতে পারে অনেক অজানা তথ্য। বিশ্বজুড়ে এমন কত ছোটখাটো দেশ রয়েছে তা ইয়ত্তা নেই। এমনই ঘটনার বিবরণ থাকবে এই কলামে। লিখছেন-

 

 

দীপান্বিতা ঘোষ

 

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের শান্ত জলের মাঝে রয়েছে পৃথিবীর "সবচেয়ে সুখী মানুষের দেশ" ভানুয়াতু (Vanuatu)। নির্জন দ্বীপের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, শান্ত পরিবেশের স্নিগ্ধতা, অপার জলরাশির সাথে পাথুরে উপকূল ও বেলাভূমির খেলা.....বাড়তি পাওনা আগ্নেয়গিরির রূপ পরিদর্শন.... এই স্বপ্নের জগতে হারিয়ে গিয়ে.... নিজেকে নূতন করে ফিরে পেতে যেতেই হবে দ্বীপদেশ ভানুয়াতুতে।

   

 মাত্র ২.৫ লাখেরও কম জনসংখ্যার দেশটির অধিবাসীরা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী আমেরিকা ও ব্রিটিশ দের পিছনে ফেলে "পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ"এর খেতাব পেয়েছে।

 

এটি Happiest place in the Earth.  New Economics Foundation (NEF) পরিচালিত "Happy Planet Index" অনুযায়ী এটি বিশ্বের সবচেয়ে সুখী রাষ্ট্র। তৃতীয় বিশ্বের এই দেশটির মানুষের মনে বেশি শান্তি। ছোট্ট দেশটির মধ্যে একের পর এক আশ্চর্য লুকিয়ে রয়েছে।

 

মাত্র আড়াই লক্ষ মানুষের বসবাস। কিন্তু ভাষার সংখ্যা ১১০টি। জাতীয় ভাষাও তিনটি! দেশটির মধ্যে সমুদ্রের মধ্যে থাকা একাধিক দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশ। আশ্চর্যের বিষয় হল, সে দ্বীপ কিন্তু পর্বতময়। অর্থাৎ দ্বীপ জয়ও সহজ নয়। রয়েছে জীবন্ত আগ্নেয়গিরিও।

       

দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ, প্রাকৃতিক সম্পদ নেই বললেই চলে.... এর পরেও কেনো দেশটির মানুষ সুখী, এ নিয়ে বিশেষজ্ঞ দের মনে কৌতূহলের শেষ নেই।

 

গবেষণায় দেখা গেছে মাটির সাথে এখানকার অধিবাসীদের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। মাটি তাদের অনুপ্রেরণা যোগায়। পকেটে টাকা না থাকলেও এখানকার কাউকে অভুক্ত থাকতে হয় না।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, অর্থ উপার্জন ভানুয়াতুদের জীবনের মূল লক্ষ্য নয়। বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

পূর্বপুরুষদের পেশা জেলে জীবন তাদের কাছে আনন্দদায়ক।

অল্পেতে ফসল ফলে এ মাটিতে। শুধু আবাদী জমির উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে অনেক মানুষ। বিষয় টি তাদের আত্মিক প্রশান্তি যোগায়।

          

দ্বীপ বাসীর জীবনে সংগীত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কাঠের খোদাই করা বাদ্যযন্ত্র ঘরে ঘরে পাওয়া যায়। শৈশব থেকে বয়সের ধাপগুলোকে এখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বরণ করা হয়।

      

ভানুয়াতুতে সর্বাধিক জনপ্রিয় খেলা হলো ফুটবল। এছাড়াও এখানে কিছু ঐতিহ্যগত খেলা প্রচলিত রয়েছে।

        

দেশটিতে কিছুদিন আগে পর্যন্ত মানুষের মাংস খাওয়ার রীতি প্রচলিত ছিলো। আজও প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু মানুষের মধ্যে এই রীতি রয়ে গেছে। এইসব কিছু বাদ দিলে শহুরে যান্ত্রিকতা ও তথাকথিত সভ্যতার মেকি আধুনিকতা থেকে মুক্ত পৃথিবীর একপ্রান্তে থাকা দেশটির সহজ, সরল দিলখোলা আমুদে মানুষগুলির হৃদয় স্বর্গীয় প্রকৃতির থেকেও সুন্দর।

 

ভানুয়াতুর অবস্থান

পূর্বে---অস্ট্রেলিয়া

উত্তর পূর্বে---নিউ ক্যালিডোনিয়া

পশ্চিমে---ফিজি

উত্তরে---সোলেমান দ্বীপপুঞ্জ।

 

 

ইতিহাস:

     

খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ১৩০০ বছর আগে দেশটিতে জনবসতির প্রত্নতাত্বিক তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ৩৩০০ বছর আগে মেলানেশিয়ানরা ভানুয়াতুতে আবাস গড়তে শুরু করে। এখানে ইউরোপীয়দের প্রথম আগমন ১৬০৬ সালে। তবে ১৮৬৫ সালের আগে কোনও ইউরোপীয় দেশটিতে বসতি গড়েনি। এরপর ১৮৮০ সালে ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য উভয়েই দ্বীপটির উপর তাদের অধিকার দাবি করে। পরে ১৯০৬ সালে তারা যৌথভাবে দ্বীপটি শাসন করতে সম্মত হয়।

 

এরপর ১৯৮০ সালে স্বাধীনতা লাভের আগে পর্যন্ত ভানুয়াতু যৌথভাবে ফরাসী ও ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিলো। তখন এর নাম ছিলো নিউহিব্রাডিস।

 

আয়তন:

 

 ৮৩ টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের আয়তন প্রায় ১২,১৯০ বর্গকিমি।

 আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের ১৫৭ তম দেশ।

জনসংখ্যা:

 

দেশটির জনসংখ্যা খুবই কম। ২,৪৩,৩০৪ জন (২০১৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী)। পুরুষের তুলনায় মহিলা অনেক বেশি।

 

প্রতি বর্গকিমিতে ১৯.৭ জন লোক বাস করেন। জনসংখ্যা মূলতঃ গ্রামাঞ্চলে বেশি।

তবে বন্দর ভিলা, লোগান ভ্যালি-তে হাজার হাজার লোক বাস করেন।

ভূপ্রকৃতি:

 

৮৩ টি দ্বীপের ৬৫ টি দ্বীপ (Island) মানুষের বসবাসের উপযোগী। অধিকাংশ দ্বীপই পর্বতময় (hill)। রয়েছে অসংখ্য আগ্নেয়গিরি।

 নিকটবর্তী সমুদ্রেও রয়েছে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি (Living volcanoes)।

    

কিছুদিন আগেও মাউন্ট মানরো নামক আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত থেকে বাঁচতে মানুষজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়, একটি দ্বীপ থেকে।

 

আবাদী জমির পরিমান যেমন কম, তেমনি ফসলও ফলে কম।

 

জলবায়ু:

    

দেশটিতে মূলত একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু বিদ্যমান। দেশটির গড় বার্ষিক তাপমাত্রা ২০ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

        

 ভানুয়াতু অত্যন্ত বৃষ্টি প্রবণ দেশ। বার্ষিক গড় বৃষ্টি ২০০০মিমি-র উপরে। উত্তরের দ্বীপ গুলোতে কখনও এর দ্বিগুন বৃষ্টি হয়। সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় দেশটির আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন হতে পারে না।

 

ভাষা:

  

কম জনসংখ্যার দেশ ভানুয়াতু তে ভাষার বৈচিত্র্য রয়েছে। ভাষার ঘনত্ব বিচারে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভাষার দেশ। এদেশে মোট ১১০ টি ভাষার প্রচলন রয়েছে। এগুলোর মূল ভিত্তি অস্ট্রেলেশিয়ান ভাষা। প্রতিটি ভাষাতেই মানুষ কথা বলে। গড়ে প্রতি ২০০০ মানুষের জন্য একটি করে ভাষা রয়েছে।

           

তবে ভানুয়াতুর সরকারি ভাষা মোট ৩ টি। বিসলামা, ইংরেজী ও ফরাসী। তবে জাতীয় ভাষা বিসলামা। দেশের প্রতিটি মানুষই বিসলামা ভাষায় কথা বলেন। ইংরেজী ও ফরাসী সাধারণত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পড়াশুনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।

 

ধর্ম:

     

দেশটির প্রধান ধর্ম খ্রীস্ট ধর্ম। দেশটির প্রায় ৮৩% মানুষ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। বাকিদের মধ্যে ৪%বৌদ্ধ, ৩% ইসলাম এবং ১০% অন্য ধর্মে বিশ্বাসী।

 

মুদ্রা:

   

ভানুয়াতুর সরকারী মুদ্রা ভানুয়াতু ভাতু। যা ০.৬৪ ভারতীয় রুপির সমান। দেশটির মোট GDP প্রায় $৯৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু আয় প্রায় $ ৩,৩২৭ মার্কিন ডলার।

 

রাজধানী:

            

পোর্ট ভিলা ভানুয়াতুর রাজধানী এবং বৃহত্তম শহর। শহরটি দেশটির এফাতে দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে শেফা প্রদেশে মেলে উপসাগরের তীরে অবস্থিত।

শহরটির আয়তন মাত্র ৫.৩৭ বর্গকিমি। উন্নত বন্দরের সুবিধা বিশিষ্ট পোর্টভিলা ভানুয়াতু দেশটির অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দু। এখানে সমস্ত ভানুয়াতু রাষ্ট্রের প্রায় এক পঞ্চমাংশ মানুষ বাস করে। বর্তমানে শহরটিতে প্রায় ৫১,০০০ মানুষের বসবাস। এখানে বেশ কিছু হাসপাতাল,বাণিজ্যিক হোটেল, ক্যাসিনো, বাজার, মাছ-মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত। মহাসাগরীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষায়তন বা ক্যাম্পাস অবস্থিত।

 

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য:

                     

দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত নয়। সাক্ষরতার হার মাত্র ৭৪%.দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও তুলনামূলক কম।

                     

দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মোটামুটি উন্নত হলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছানো এক বিরাট চ্যালেঞ্জ.

                

এই দেশে মেয়েরা বেশি দিন বাঁচে। অপেক্ষাকৃত পুরুষদের গড় আয়ু কম। দেশের মানুষের গড় আয়ু, ছেলেদের ৬৭ বছর এবং মেয়েদের ৭০ বছর।

 

  নিরাপত্তা:

                

ভানুয়াতুতে কোনও নিয়মিত সেনাবাহিনী নেই। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে Vanuatu Police Force। আর তাদের সাহায্য করে আধাসামরিক মোবাইল ফোর্স।

পর্যটন:

          

ভানুয়াতু দেশটির অর্থনৈতিক ভিত্তি অনেকাংশে পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। বছরে ৬০,০০০ এর বেশি পর্যটক এখানে ভ্রমণ করেন। দেশটির প্রাণকেন্দ্র Harbour side পোর্টভিলা। এই শহরের আইল্যান্ড অফ ফেট, পোর্ট ভিলা ক্যাথেড্রাল, ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্ক, সিটি হল, মেইন পোষ্ট অফিস, আর্ট গ্যালারি, জাতীয় জাদুঘর, কবরস্থান, অ্যাডভেঞ্চার পার্ক, কচ্ছপের অভয়ারণ্য, জলের তলদেশে ডাকঘর বিখ্যাত।

      

নিম্নলিখিত স্থান গুলি আলাদা করে উল্লেখ না করলেই নয়----

১) জীবন্ত আগ্নেয়গিরি কে চাক্ষুস করতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন তান্না আইল্যান্ড-এর মাউন্ট ইয়াসুর আগ্নেয়গিরি। শতাব্দীর পর শতাব্দী, এমনকি বর্তমানেও তার অগ্ন্যুৎপাত চলছে।

 

২) বাঁশ নির্মিত ব্রিজ ধরে পৌঁছে যেতে পারেন গভীর জঙ্গলে, জঙ্গলের গভীরে প্রাচীন গুহার অজানা ইতিহাস জানতে পারেন।

 

৩) পার্বত্য অঞ্চলের ঝর্না নির্মিত জলাশয়ের অপার শোভা দেখে আসতে পারেন।

 

৪) সাঁতার কেটে ভানুয়াতুর ভূগর্ভস্থ পোস্ট অফিস টি পরিদর্শন করে আসতে পারেন।

 

৫) ফেট দ্বীপপুঞ্জের পূর্বে অবস্থিত সমুদ্র দ্বারা প্রাকৃতিক ভাবে নির্মিত উপহৃদ টি দর্শন করে আসতে পারেন।

৬ মিটার গভীর এই হ্রদের জল বেশ স্বচ্ছ ও পরিষ্কার।

 

৬) বাঞ্জি জাম্পিং করতে চাইলে পেন্টেকোষ্ট আইল্যান্ড পৌঁছে যেতে পারেন।

  কীভাবে ও কখন যাবেন:

                

বিনা ভিসায় যেকোন ভারতীয় নাগরিক ৩০ দিন ভানুয়াতু ভ্রমণ করে আসতে পারেন। এমনকি এখানকার নাগরিকত্ব নেওয়ার প্রক্রিয়াও জটিল নয়। বাড়িতে বসেই অনলাইনে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জানানো যায়। তারপর নির্দিষ্ট নথি ও ফি জমা দিলেই মিলে যাবে নাগরিকত্ব।

ভানুয়াতু ভ্রমণের শ্রেষ্ঠ সময় এপ্রিল থেকে অক্টোবর। ভারতের বড়ো শহর গুলি থেকে কানেক্টিং বিমান সহযোগে পৌঁছে যেতে পারেন বাউরফিল্ড ইন্টারন্যাশনাল বন্দরে।

বিমানবন্দর থেকে মাত্র ৬.৬ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করলেই পৌঁছে যাবেন পোর্টভিলা।

                         ..........................

লেখক – ভূগোলের শিক্ষিকা

ads

Mailing List