গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রোটিন খামারের গুরুত্ব

গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রোটিন খামারের গুরুত্ব
17 Jan 2021, 11:18 PM

গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রোটিন খামারের গুরুত্ব

প্রণব সাহু

কোনও দেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নির্ভর করে সেই দেশের গ্রামীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর। মূলত কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে গ্রামীণ উন্নয়ন ঘটে থাকে। তাই গ্রামীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা'র অগ্রগতি সম্ভব হয়ে উঠে। তাই গ্রামীন অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। তা অবশ্যই আঞ্চলিক পরিকল্পনার মাধ্যমে। আঞ্চলিক পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হলো সঠিক ভাবে স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার এবং স্থিতিশীল উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখা। আঞ্চলিক পরিকল্পনা মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপাদান গুলি যথাযথভাবে আবিষ্কার করে বিজ্ঞানভিত্তিক অভিনব পরিকল্পনা ও  আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়ে সু স্থায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে গড়ে তোলা। আঞ্চলিক পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হল স্থানীয় অঞ্চল বিশেষে সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য সঠিক ভাবে স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার, বাস্তবায়ন এবং স্থিতিশীল উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখা।

 

তাই গ্রামীন অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে আমাদের যে পরিকল্পনা তা হল, প্রোটিন খামার গড়ে তোলা। মূলত প্রাণিজ প্রোটিন এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিন জাতীয় খাদ্য দ্রব্য এই খামার গুলিতে উৎপাদন করা হয়। এই ধরনের খামারের জন্য যে কোন ভূমি ও স্বল্প জায়গার প্রয়োজন। সীমিত জলের ব্যবহার এবং স্বল্প অর্থ বিনিয়োগ করে এই ধরনের খামার গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রধানতঃ ডিম, মাংসের জন্য হাঁস মুরগির প্রতিপালন, জলাশয়ে মৎস্য প্রতিপালন, কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ করে বায়োফ্লক মৎস্য চাষ এবং ভেড়া ও ছাগল প্রতিপালন করা।  মাশরুম, সয়াবিন,ডাল জাতীয় শস্য এবং জৈব- পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আদর্শ প্রোটিন খামার গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা জানি প্রত্যেক মানুষের প্রতিদিন যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালরি যুক্ত পুষ্টি এবং প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের প্রয়োজন হয়ে থাকে। সেখানে এই খামার ব্যবস্থা থেকে গ্রামীণ অধিবাসীরা সহজে পেতে পারে এবং বর্ধিত উৎপাদিত ফসল বিক্রয় করে যথেষ্ট পরিমাণে অর্থনৈতিক রোজগারের বন্দোবস্ত করা যাবে। মাত্র এক হাজার স্কয়ার ফিট জায়গা জুড়ে এই ধরনের প্রোটিন ফার্ম করে তোলা সম্ভব।

যেখানে বায়োফ্লক মৎস্য চাষ, মাশরুম চাষের বন্দোবস্ত ও তাক চাষাবাদ ইত্যাদি গড়ে তোলা সম্ভব। তাছাড়া হাঁস-মুরগির প্রতিপালনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে। এই ধরনের ফার্ম থেকে সারা বছর ধরে অর্থের যোগান যথেষ্ট থাকে। অর্থাৎ স্বল্প ভূমি, স্বল্প বিনিয়োগ এবং স্বল্প সময়ে অধিক পরিমাণে অর্থের সংস্থান স্হায়ী ভাবে  সহজেই করা সম্ভব। তাছাড়া ছোটো ছোটো ডোবা বা জলাভূমি গুলিতে বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবে দেশীয় মাছ চাষ করা সম্ভব। সয়াবিন থেকে দুধ, ছানা,পনির ও সয়াফ্রাই ইত্যাদি উৎপাদন করে গ্রামীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজার জাত করা যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।  বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্কুল গুলিতে মিড ডে মিলে মাশরুম, সয়াবিন ও জৈব শাক সবজি ইত্যাদি প্রোটিন জাতীয় খাদ্য যোগান দেওয়া যাবে। আমার ভাবনা ভূমির সঠিক ব্যবহার, মাটি পরীক্ষা, জল সংরক্ষণ ও জলের পুনঃব্যবহার, আধুনিক কৃষি পদ্ধতি এবং জৈব পুষ্টি বাগানের সাহায্যে কৃষিভিত্তিক স্থায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তাছাড়া সঠিক আঞ্চলিক পরিকল্পনার মাধ্যমে স্হানীয় সম্পদের উপর ভিত্তি করে পরিবেশবান্ধব স্থিতিশীল উন্নয়নের একটি উল্লেখযোগ্য প্রকল্প এই খামার ব্যবস্থা। যে কোনো গ্রামীণ এলাকা স্বনির্ভর হতে পারবে।

     

এই ধরনের প্রকল্প ও মডেলটি বাস্তবায়নের জন্য ঝাড়গ্রাম জেলার জামবনী ব্লকের ধড়সা গ্রাম পঞ্চায়েতের জামডহরী গ্রাম টি দত্তক নেওয়া হয়েছে। মূলত অতিমারি করোনা পরিস্থিতি তে আমাদের পরিবেশ সংস্থা  ট্রপিক্যাল ইনষ্টিটিউট অফ আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ -এর পক্ষ থেকে এক বছরের জন্য দত্তক নিয়েছি।

প্রধানত কৃষি ভিত্তিক স্বনির্ভর ও স্থায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে। গ্রামবাসীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে মাছ, মাশরুম, ফলের বাগান ও শাক সবজি প্রভৃতি র চাষাবাদ গড়ে তোলা হয়েছে। আগামী দিনে এই গ্রামটি'তে একটি আদর্শ প্রোটিন খামার গড়ে উঠবে এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বনির্ভর গ্রাম হিসাবে গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান, ভূগোল বিভাগ, সেবাভারতী মহাবিদ্যালয়, কাপগাড়ি, ঝাড়গ্রাম এবং সম্পাদক, ট্রপিক্যাল ইনষ্টিটিউট অফ আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ।

Mailing List