The Great Migration, তিন হাজার কুমীর ওঁৎ পেতে রয়েছে, তবু নদী পেরিয়ে চলেছে লক্ষ লক্ষ তৃণভোজীর দল

 The Great Migration, তিন হাজার কুমীর ওঁৎ পেতে রয়েছে, তবু নদী পেরিয়ে চলেছে লক্ষ লক্ষ তৃণভোজীর দল
12 Sep 2021, 02:30 PM

 The Great Migration, তিন হাজার কুমীর ওঁৎ পেতে রয়েছে, তবু নদী পেরিয়ে চলেছে লক্ষ লক্ষ তৃণভোজীর দল

 

কল্পনায় স্বর্গের একটা রূপ রয়েছে প্রত্যেকের মনেই। তাই তো মনের গোপনে কোথাও লুকিয়ে থাকে স্বর্গে পৌঁছনোর বাসনা। কিন্তু সে স্বর্গের অস্তিত্ব কেবলই কল্পনায়। কারণ, যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ ততক্ষণ সেখানে পৌঁছনোর কথা ভাবারও উপায় নেই। অথচ, এ বিশ্বেই এমন বহু স্বর্গীয় দৃশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। প্রকৃতির সেই উজাড় করা সৌন্দর্য হয়তো কল্পনার স্বর্গকে হার মানাতে পারে। সেখানকার মানুষের আচার-আচরণ, কৃষি, অর্থনীতি, ভূপ্রকৃতি- সত্যিই অন্য অনুভূতি জাগায়। তারই পাশাপাশি মিলতে পারে অনেক অজানা তথ্য। বিশ্বজুড়ে এমন কত ছোটখাটো দেশ, ভাস্কর্য রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এমনই একটি ঘটনার কাহিনী লিখছেন-

দীপান্বিতা ঘোষ

 

তানজানিয়ার সেরেংগেটি থেকে কেনিয়ার মাসাইমারা লক্ষ লক্ষ প্রাণী লাফাচ্ছে, দৌঁড়াচ্ছে। কিন্তু কেন? কি তাদের উদ্দেশ্য? গন্তব্যই বা কোথায়? এই সব প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের যেতে হবে আফ্রিকা মহাদেশে।

 

 

সেরেংগেটি ন্যাশনাল পার্ক:

   

আফ্রিকার তাঞ্জানিয়ায় এই জাতীয় উদ্যানটি 1951 সালে নির্মিত হয়। তানজানিয়া জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষ দ্বারা এই পার্ক টি নিয়ন্ত্রিত হয়। এর আয়তন 14,750 বর্গকিমি। 1981 সালে UNESCO এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে।

     

সেরেংগেটিতে বিদ্যমান প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড়, বানর, হায়না, বনবিড়াল, বুনোকুকুর, হাতি, জেব্রা, জলহস্তি, বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ।

      

উদ্যানটিতে ঢুকলেই Big Five Horn শুনতে পাওয়া যায়। Big Five পাঁচটি হিংস্র প্রাণী হল সিংহ, চিতাবাঘ, বুনো গন্ডার, বুনো মহিষ, ক্রুদ্ধ হাতি। এখানে প্রায় তিন হাজারের বেশি সিংহ এবং ৯ হাজার হায়না জীবন ধারণ করে।

 

 

মাসাইমারা জাতীয় উদ্যান:

 

আফ্রিকার কেনিয়াতে অবস্থিত এই অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর নাম মাসাই। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাফারিগন্তব্যগুলোর মধ্যে মাসাইমারা রয়েছে শীর্ষে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হোলো বৈচিত্র্যময় বুনো প্রাণীর সহাবস্থান। এখানেও আফ্রিকান Big 5 ছাড়াও রয়েছে হরিণ, জেব্রা, হায়না, জিরাফ, কুমির, জলহস্তি, পাঁচশ প্রজাতির পাখি ও নানান ছোট বড়ো প্রাণী।

 

কেনিয়া হল পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্বের পাঁচটি শীর্ষ দেশের মধ্যে একটি। এর আয়তন 1500 বর্গকিমি। 1961 সালে উদ্যানটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

Great Migration:

 

প্রাণী বৈচিত্রের ব্যাপকতার কারণে সেরেংগেটি আফ্রিকার সপ্তম আশ্চর্যের একটি এবং সারা বিশ্বের দশটি আশ্চর্যের একটির স্থান দখল করে আছে। The Great Migration এমনই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, যা পৃথিবীর মধ্যে শুধুমাত্র সেরেংগেটিতেই ঘটে।

 

এই ঘটনার মাধ্যমে সবচেয়ে যোগ্য বন্যজন্তু প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকে। অপরদিকে অভাগাদের জায়গা হয় অন্য কোনো হিংস্র জন্তুর পাকস্থলী। সেরেংগেটির অদ্ভুত বাস্তুতন্ত্র লক্ষ লক্ষ প্রাণীর আশ্রয়স্থল। এইসব প্রাণী তাঞ্জানিয়ার সেরেংগেটি থেকে কেনিয়ার মাসাইমারা পর্যন্ত প্রায় 800 km এলাকা জুড়ে একটি জীবনচক্রে পরস্পরের সাথে আবদ্ধ থাকে।

 

মানুষ সহ যেকোন প্রাণীই সহজে তাদের আশ্রয়স্থল ছেড়ে অন্য কোথাও যখন যায় বুঝে নিতে হবে যে সে তার আশ্রয়স্থল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সেরেংগেটির প্রাণীদের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটে। বছরের একটা সময় খাদ্যের অভাবে তারা পাড়ি দেয় মাসাইমারার তৃণভূমিতে।

 

এখানকার অদ্ভুত জীবনচক্র Timeline এর মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

 

        

ডিসেম্বর----এপ্রিল/মে

 

 দি গ্রেট মাইগ্রেশন এর যাত্রা শুরু হয় উত্তর সেরেংগেটি থেকে। যেখানে নু-হরিণ বাচ্চা প্রসব করে। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ হোলো হরিণ ও মহিষের মাঝামাঝি এক ধরণের প্রাণী, যার নাম উইল্ডবিস্ট। বাংলায় একে বলে নু-হরিণ। লাখো লাখো এই হরিনে মুখরিত হয় উত্তর সেরেংগেটি।

নভেম্বর-ডিসেম্বরে অল্প বৃষ্টিপাত নু-হরিণকে এখানে আসতে উৎসাহী করে। এছাড়া ফেব্রুয়ারী মাস এদের বাচ্চা প্রসবের উপযুক্ত সময়। সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুদের নিয়ে হরিণের পাল এখানে বেশ কয়েক মাসের জন্য আটকে যায়। দীর্ঘ এই বৃষ্টিপাত মে মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।এই সময় শুধু হরিণ নয় অন্যান্য তৃণভোজীরাও বাচ্চা প্রসব করে। এবং জিরাফ, জেব্রা, দাড়িওয়ালা মহিষ সহ অসংখ্য শাবকে ভরে ওঠে উত্তর সেরেংগেটি।

           

তবে এর আড়ালে আর একটি গোত্রও কিন্ত নিজেদের ভুরিভোজের জন্য ওঁৎ পেতে বসে থাকে। কারণ, বনের রাজা কিন্তু সিংহ, সঙ্গে আছে হায়না, চিতা। তারাও বুঝতে পারে আবার এসেছে ফেব্রুয়ারি মাস, আর শিশু হরিণের মাংসের মতো সুস্বাদু আর কিই বা হতে পারে!!

           

পরিদর্শক হিসেবে ফেব্রুয়ারি-মার্চ সবচেয়ে উপযোগী। কারণ, এই সময় অভাবনীয় জীববৈচিত্র্য দেখা যাবে এখানে। এমনকি সিংহ বা হায়নার শিকারের দৃশ্যেরও দেখা মিলতে পারে এই সময়।

মে---জুলাই

 

              

টানা বৃষ্টির মরশুম শেষ হয় এপ্রিলের শেষ বা মে মাসের শুরুতে। দেখা দেয় তীব্র ক্ষরা। এমন ক্ষরার কবলে শিশু শাবক গুলো তো বটেই এমনকি পরিণত জন্তু গুলোর পক্ষেও বেঁচে থাকা বেশ দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃতির এই বৈরিতা এড়াতে তারা প্রস্তুতি নেয় দীর্ঘ এক সফরের। এপ্রিলের শেষ থেকে জুন মাস পর্যন্ত তারা আটশত কিমি (800km) দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। মূলত খাদ্যের খোঁজেই তাদের এই দীর্ঘ সফর। কারণ তীব্র ক্ষরায় এখানের ঘাস সব শেষ।যাত্রাপথে ছোট, মাঝারি সবুজ ঘাস গলধকরণ করতে করতেই এগিয়ে চলে যোদ্ধার দল। বড়ো ঘাসগুলো থাকে জিরাফদের জন্য। এই যাত্রায় থাকে প্রায় 20 লক্ষ নু-হরিণ, সঙ্গে জিরাফ, জেব্রা, বড়ো দাড়িওয়ালা বুনো মহিষ মিলিয়ে দেখা যায় সারি সারি সুবৃহৎ প্রাণীদের পদযাত্রা। মনে হবে প্রাচীন কোন যোদ্ধাবাহিনীর বিশাল বহর এগিয়ে চলেছে। কারণ, এই যোদ্ধাদের সারি প্রায় 40 km মতো লম্বা হয়। এই যোদ্ধারা শুধুমাত্র টিকে থাকার যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এদের গন্তব্য আর লক্ষ্য মাসাইমারার তৃনভূমিতে জন্মানো সতেজ ঘাস। স্তন্যপায়ীদের বার্ষিক পরিক্রমনের বিচারে এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো পরিযান।

অন্যদিকে মাংসাশী প্রাণীরা তাকিয়ে থাকে তাদের যাত্রাপথের দিকে। এইসব প্রাণীরা খাবার খুঁজতে গিয়ে নিজেরাই অন্যের খাদ্যে পরিণত হয়।

        

সেরেংগেটি থেকে পশ্চিমে যেতে প্রথম বাধা হোলো একটি নদী, যার নাম গ্রূমেতি(Grumeti)। এই নদীতে দীর্ঘদিন ধরে উপোষ বসে আছে কুমীরের দল। এরা জানে এদের খাদ্য এদের দিকেই আসছে। অন্যদিকে হরিণ এবং মহিষের পাল জানে, যে করেই হোক তাদের কে এই নদী পাড়ি দিতে হবে। পালের সকল হরিণ প্রথমে নদীতীরে সমবেত হয়, প্রায় দু’সপ্তাহ সময় নিয়ে। নানা দ্বিধা নিয়ে দু’সপ্তাহ এপারে কাটানোর পর সমস্ত জল্পনা ও কুমীরের ভয় উপেক্ষা করে নদী পার হওয়ার জন্য পা বাড়ায়। ক্ষুধার্ত কুমীরের দল এই সুযোগ নষ্ট করে না। ফলতঃ প্রচুর শাবক এখানে প্রাণ হারায়। এই নদী পাড়ি দিতে গিয়ে আবারো তাদের সংখ্যা কমে।

গ্রূমেতির পর যে বাধা আসে তা হল মারা নদী। মারা নদী পাড়ি দেওয়াও গ্রূমেতি নদীর মতোই কঠিন। এখানে প্রায় তিন হাজার কুমীর অধীর আগ্রহে ধৈর্য্য সহকারে অপেক্ষা করে থাকে খাদ্যের আশায়। এদিকে এইসব প্রাণীর দল জানে কুমীরের মুখের উপর দিয়েই তাদের যেতে হবে, এছাড়া কোনো বিকল্প পথ নেই। গ্রূমেতির অভিজ্ঞতার আলোকে তারা মারা নদীতে পা বাড়ায়।

 

তাদের দলে সদস্য সংখ্যা ভয়াবহ ভাবে কমে। প্রায় আড়াই লক্ষ (2.5 lack) তৃণভোজী এই যাত্রাপথে প্রাণ হারায়। এই নির্মম প্রাকৃতিক আয়োজনে একমাত্র যোগ্যরাই টিকে থাকে।

 সেপ্টেম্বর--অক্টোবর

 

800 কিমি যাত্রাপথের যুদ্ধ শেষে জয়ী-যোদ্ধারা অবশেষে কেনিয়ার মাসাইমারায় পৌঁছায়। এখানে পর্যাপ্ত খাদ্যগ্রহণ করে কিছুটা বিশ্রামের পর তারা পুনরায় সেরেংগেটির উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়। আবারো একই বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিতে হয়।

 

           

নভেম্বর

 

নভেম্বরে তারা আবার নিজেদের স্থানে ফিরে আসে। ধীরে ধীরে মুখরিত হতে থাকে উত্তর সেরেংগেটি। আবার এখানে দীর্ঘ বৃষ্টিপাতের সূচনা হয়। বৃষ্টি শেষে ক্ষরার সূচনাতে আবার এখান থেকেই শুরু হয় পরবর্তী বছরের The Great Migration.

তাদের যাত্রাপথে অসংখ্য হায়না, চিতা, সিংহ, বুনো শেয়াল, কুমীর, শকুন ইত্যাদি মাংসাশী প্রাণীর খাদ্য সংস্থান হয়। তৃণভোজীদের সংখ্যা কমলে মাংসাশী প্রাণীদের খাবার কমে যেত। মাংসাশী প্রাণীর সংখ্যা কমলে তৃণভোজীদের শিকারী কমে ফলতঃ এদের সংখ্যা বেড়ে যায়। আবার তৃণভোজীর সংখ্যা বাড়লে হিংস্র প্রাণীদের ভুরিভোজ নিশ্চিত হয়। এভাবে এক অদ্ভুত সম্পর্কে তারা পরস্পরের সাথে শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে।

          

শেষে বলি আপনি কখন সেরেংগেটি ভ্রমণ করবেন, সেটা পুরোটাই নির্ভর করছে আপনি কোন প্রাকৃতিক ঘটনা দেখতে চান তার উপর। বছরের শুরুতে অসংখ্য নবীন প্রাণে মুখরিত সেরেংগেটি। জুলাইতে সুদীর্ঘ লাইনের লক্ষ লক্ষ প্রানের লংমার্চ। বছরের শেষে তাদের ঘরে ফেরার দৃশ্য।

ads

Mailing List