বাঙালির দুর্গাপুজোর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের সোনালী ইতিহাস, কলকাতার আদি দুর্গাপুজো কোনটি?  

বাঙালির দুর্গাপুজোর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের সোনালী ইতিহাস, কলকাতার আদি দুর্গাপুজো কোনটি?   
23 Sep 2022, 12:45 PM

বাঙালির দুর্গাপুজোর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের সোনালী ইতিহাস, কলকাতার আদি দুর্গাপুজো কোনটি?

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল

 

বাঙালির কাছে দূর্গাপুজো মানে শুধু পুজো নয়, বাঙালির সমস্ত আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা সব কিছু এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত। ইতিহাসের  তথ্যানুসারে  বাঙালির দুর্গা  পুজোর সূচনা হয়েছিল বহু প্রাচীন কালেই। দুর্গা পুজো শুরুর যথার্থ তথ্যভিত্তিক নথি না পাওয়া গেলেও, বৈদিক সাহিত্যে দুর্গার পরিচয় আছে। অনেকেরই মতে, সম্ভবত মোঘল আমল থেকেই বাংলার ধনী পরিবারগুলিতে দুর্গা পুজো করা হত।অতীত  ইতিহাস বলছে দেবীর পুজো সম্ভবত ১৫০০ শতকের শেষ দিকে প্রথম শুরু হয়। সম্ভবত দিনাজপুর- মালদার জমিদার স্বপ্নাদেশের পর প্রথম পারিবারিক দুর্গা পুজো  শুরু করেছিলেন। তবে এই দুর্গার রূপ ছিল অন্যরকম। লোককথা মতে আদি দুর্গার চোখ গোলাকার ও উজ্জ্বল এবং দেবী সাদা বাঘ ও সবুজ সিংহের উপর বিরাজ করেন।

 

অন্য সূত্রানুসারে, তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ন বা নদীয়ার ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় প্রথম শারদীয়া বা শরৎ দুর্গা পূজা সংগঠিত করেন। এরপরে রাজশাহির রাজা এবং বিভিন্ন গ্রামের হিন্দু রাজারা প্রতি বছর এই পুজো আরম্ভ করেন। আবার কলকাতায় ১৬১০ সালে বরিশার রায়চৌধুরী পরিবার প্রথম দূর্গাপুজার আয়োজন করেছিল বলে জানা যায়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর রাজা নবকৃষ্ণদেব লর্ড ক্লাইভের সন্মানে কলকাতার শোভা বাজার রাজবাড়িতে দূর্গাপূজার মাধ্যমে বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছিলেন এবং তাঁর জন্য বিদেশ থেকে নিকি বাঈ নামে এক নর্তকীকে আনিয়ে ছিলেন। ব্রিটিশ বাংলায় এই পূজা ক্রমশ বৃদ্ধি পায় এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দূর্গাপুজো স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে জাগ্রত হয়।

১৯১০ সালে কলকাতায় প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাবে বারোয়ারি পুজোর শুরু হয়। সনাতন ধর্মতসাহিনি সভা, বাগবাজারে সার্বজনীনে একটি দুর্গোৎসবের সূচনা করেন যা সম্ভব হয়েছিল জনসাধারণের সহযোগিতার সাহায্যে। তারপর থেকে গোটা বাংলায় দুর্গা পুজোর প্রবল প্রচার হয় এবং বর্তমানে এটি বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাই বাংলা ছাড়িয়ে এই উৎসব পাড়ি দিয়েছে  বিদেশেও ।দুর্গাপূজা  পশ্চিমবঙ্গের  রাজধানী কলকাতার বাঙালিদের বৃহত্তম উৎসব। কলকাতা বাঙালি হিন্দুপ্রধান শহর হওয়ায় দুর্গাপূজাই কলকাতার বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। বর্তমান কলকাতার সবচেয়ে পুরনো দুর্গাপূজাটি হয় বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়িতে। কলকাতার দ্বিতীয় প্রাচীনতম দুর্গাপূজাটি হল শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজা।

১৬১০ সাল থেকে সাবর্ণরায়চৌধুরী পরিবার বড়িশায় তাদের আদি বাসভবনে দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছেন। এটিই সম্ভবত কলকাতার প্রাচীনতম দুর্গোৎসব। বর্তমানে এই পরিবারের সাত শরিকের বাড়িতে সাতটি দুর্গাপূজা হয়। এগুলির মধ্যে ছয়টি বড়িশায় ও একটি বিরাটিতে। ১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়িতে নবকৃষ্ণ দেব দুর্গাপূজা শুরু করেন। তার নির্দেশিত পথেই দুর্গাপূজা পরবর্তীকালে কলকাতার ধনিক বাবু সম্প্রদায়ের মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে। শাস্ত্রাচার এই সব পূজায় গৌণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যে পূজায় যত বেশি সংখ্যক আমন্ত্রিত ইংরেজ অতিথি উপস্থিত হতেন, সেই পূজার মর্যাদা ততই বাড়ত। দেবীপ্রতিমার সম্মুখেই মুসলমান বাইজি নাচের আসর বসত। ইংরেজরা এসে নাচগান করতেন, তাদের জন্য উইলসন হোটেল থেকে গোরু ও শূকরের মাংস আনানো হত এবং মদ্যপানের আসরও বসত। রানি রাসমণি এই প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে শুদ্ধাচারে তার জানবাজারের বাড়িতে দুর্গাপূজা শুরু করেন। তিনি ইংরেজ অতিথিদের চিত্তবিনোদনের বদলে তার দেশীয় প্রজাদের বিনোদনের জন্য পূজা উপলক্ষে যাত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। ১৮৬১ সালে তার মৃত্যুর পর রানির জামাতাগণ নিজ নিজ বাসভবনে রানির প্রদর্শিত পথেই দুর্গাপূজার আয়োজন করতে থাকেন। কলকাতায় আরো অনেক বাড়িতে এই ভাবে দুর্গাপূজা শুরু হয়।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে কলকাতায় বারোয়ারি দুর্গাপূজার সূচনা ঘটে। ১৯১০ সালে ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট রোডে ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার পক্ষ থেকে বারোয়ারি দুর্গাপূজা আয়োজিত হয়। এই পূজাটি আজও হয়ে আসছে। এরপর ১৯১১ সালে শ্যামপুকুর আদি সর্বজনীন,১৯১৩সালে শ্যামবাজারের শিকদারবাগান, ১৯১৯ সালে নেবুবাগান অর্থাৎ বর্তমান বাগবাজার সর্বজনীন এবং ১৯২৬ সালে সিমলা ব্যায়াম সমিতির বারোয়ারি দুর্গাপূজা শুরু হয়। ২০২১ সালের হিসাব অনুসারে, কলকাতায় কয়েক হাজারেরও বেশি বারোয়ারি পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সঙ্গে পারিবারিক  দুর্গা পুজো হয়।

উত্তর কলকাতার কুমারটুলি এলাকায় কলকাতার অধিকাংশ দুর্গাপ্রতিমা তৈরি হয়। কলকাতায় দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণ ও দুর্গাপূজার প্রস্তুতির সঙ্গে কুমারটুলি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কুমারটুলির শিল্পীদের দুর্গাপ্রতিমার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। বর্তমান কালে কুমারটুলির দুর্গাপ্রতিমা আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রিকায় প্রবাসী বাঙালিদের কাছে সরবরাহ করা হয়। ১৯৮৯ সালে প্রথম অমরনাথ ঘোষের তৈরি করা শোলার দুর্গাপ্রতিমা সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও নাইজেরিয়ায় পাঠানো হয়। মাত্র তিন কিলোগ্রামের এই প্রতিমাগুলি বিমানযোগে প্রেরণের ক্ষেত্রে আদর্শ ছিল।২০০৬ সালে কুমারটুলি থেকে ১২,৩০০টি দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহ করা হয়। প্রতি বছর বিশ্বের ৯৩টি রাষ্ট্রে কলকাতার এই পটুয়াপাড়া থেকে প্রতিমা প্রেরণ করা হয়ে থাকে। এই সংখ্যা বর্তমানে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

যদিও কুমারটুলির প্রতিমাশিল্পীরা অনেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে দিনযাপন করেন। কুমারটুলির প্রতিমাশিল্পীদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় হলেন মোহনবাঁশী রুদ্রপাল ও তার দুই পুত্র সনাতন রুদ্রপাল ও প্রদীপ রুদ্রপাল, রাখাল পাল, গণেশ পাল, অলোক সেন, কার্তিক পাল, কেনা পাল প্রমুখ। বর্তমান যুগে ‘থিম শিল্পী’দের রমরমা সত্ত্বেও সনাতন প্রতিমার গুণগ্রাহী আজও কুমারটুলির মৃৎশিল্পীদের দিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করান। পুরুষদের পাশাপাশি কুমারটুলিতে প্রায় ৩০ জন মহিলা প্রতিমাশিল্পী রয়েছেন। এঁদের মধ্যে মিনতি পাল, সোমা পাল, কাঞ্চী পাল ও চম্পারাণী পাল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এঁরা দীর্ঘকাল ধরে প্রতিমানির্মাণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। কুমারটুলি অঞ্চলের নিজস্ব সর্বজনীন দুর্গাপূজার সূচনা হয় ১৯৩৩ সালে। সে যুগের বিশিষ্ট প্রতিমাশিল্পী গোপেশ্বর পাল ছিলেন কুমারটুলি সর্বজনীনের প্রতিমার নির্মাতা]

উল্লেখযোগ্য সর্বজনীন পূজার তালিকা

কলকাতার দুই হাজারেরও বেশি সর্বজনীন পূজা সমিতিগুলির মধ্যে থেকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সর্বজনীন পূজার নামের তালিকা নিচে দেওয়া হল।

দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্ট্রিট পল্লি সমিতি, পাথুরিয়াঘাটা ৫-এর পল্লিহাটখোলা, গোঁসাইপাড়া সর্বজনীন দুর্গোৎসব, মানিকতলা চালতাবাগান লোহাপট্টি সর্বজনীন দুর্গোৎসব, আহিরিটোলা বি কে পাল পার্ক সর্বজনীন দুর্গোৎসব, বাগবাজার সর্বজনীন, আহিরিটোলা শীতলাতলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব, কুমোরটুলি পার্ক সর্বজনীন, কুমোরটুলি সর্বজনীন দুর্গোৎসব, শোভাবাজার বেনিয়াটোলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি, নিমতলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব, হাতিবাগান নলিন সরকার স্ট্রিট সর্বজনীন দুর্গোৎসব, হাতিবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব হাতিবাগান নবীন পল্লি সর্বজনীন দুর্গোৎসব, মানিকতলা হরীতকীবাগান দুর্গোৎসব, গৌরীবাড়ি সর্বজনীন ১ নং ওয়ার্ড সাধারণ দুর্গোৎসব (জগৎ মুখার্জি পার্ক) সিমলা ব্যায়াম সমিতিসিমলা বিবেকানন্দ স্পোর্টিং রবীন্দ্রকানন, লেকভিউ পার্ক সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি, সিঁথি সর্বজনীন দুর্গোৎসব বাঙালি সংঘ, নবজীবন যুবক সংঘ, উত্তর বরাহনগর সর্বজনীন শ্রীশ্রীমাতৃপূজা সমিতি, টালা বারোয়ারিপূর্ব কলকাতা ও বিধাননগর (সল্টলেক)সম্পাদনা, তেলেঙ্গাবাগান করবাগান, শুড়ির বাগান, উল্টোডাঙা বিধানসংঘ, মিতালি, কাঁকুড়গাছি আবাসিকবৃন্দ, কাঁকুড়গাছিশ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবলেকটাউন অধিবাসীবৃন্দ, নতুন পল্লি প্রদীপ সংঘ,আমরা সবাই, ১ নং পল্লিশ্রী কলোনি, লেকটাউনপাতিপুকুর রেলওয়ে কোয়ার্টার্স ও দিঘিরপাড় অধিবাসীবৃন্দ, লেকটাউন নেতাজি স্পোর্টিং,জপুর ব্যায়াম সমিতি, কালিন্দী১৪-এর পল্লি সর্বজনীন, দমদম রোড তরুণ সংঘ, দমদম পার্ক, দমদম পার্ক ভারতচক্র, দমদম পার্ক যুবকবৃন্দ, দমদম তরুণ দল, লাবণী এস্টেট, এফডি ব্লক, সল্টলেক, বিকে ব্লক, সল্টলেক, এইচবি ব্লক, সল্টলেক, এজে ব্লক সর্বজনীন, সল্টলেক, বিই (ইস্ট), সল্টলেক আইএ ব্লক, সল্টলেক,ফোর আর দুর্গোৎসব কমিটি, সল্টলেক, মধ্যকলকাতা সম্পাদনা শিয়ালদহ রেলওয়ে অ্যাথলেটিক ক্লাব, তালতলা যুব গোষ্ঠীতালতলা সর্বজনীন শারদোৎসব কমিটি, এন্টালি উদয়ন সংঘ,সুবোধ মল্লিকস্কোয়ারতালতলা ডাক্তার লেন, মহম্মদ আলি পার্ক, পার্কসার্কাস বেনিয়াপুকুর সংযুক্ত সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি,উদ্দীপনীকলেজ স্কোয়ার সর্বজনীনমধ্য কলকাতা সর্বজনীন দুর্গোৎসব, তালতলা সর্বজনীন দুর্গোৎসবমোহন বৃন্দাবন, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার, নেবুতলাপার্ক, বেহালা সম্পাদনা বেহালা ক্লাব, দেবদারু ফটকমুকুল সংঘ, বড়িশা ক্লাব, আদর্শ পল্লি, আচার্য প্রফুল্ল সংঘ, বড়িশা যুবক বৃন্দ, ঐক্য সম্মিলনী, বেহালা ২৯ পল্লি, সাহাপুর মিতালি সংঘ, সবেদা বাগানবড়িশা তরুণ তীর্থ, বেহালা প্রগতি সংঘ, বড়িশা উদয়ন পল্লি, বেহালা নূতন দল, ঘোলসাহাপুর ইয়ংস্টার, দক্ষিণ কলকাতার উল্লেখযোগ্য পুজো -সুরুচি সংঘ, সন্তোষপুর লেকপল্লীহরিদেবপুর অজেয় সংহতি ৬৬ পল্লি,বাদামতলা আষাঢ় সংঘ, বাবুবাগান অবসারিকা, ভবানীপুর মুক্তদল, পদ্মপুকুর বারোয়ারি সমিতি, বালিগঞ্জ সমাজসেবী সংঘ, ত্রিকোণ পার্ক সর্বজনীন দুর্গোৎসব, শিব মন্দির বোসপুকুর তালবাগান, খিদিরপুর ২৫ পল্লি, ৯৫ পল্লি কালীঘাট সংঘশ্রী৬৪ পল্লি, হরিদেবপুর বিবেকানন্দ স্পোর্টিং, হরিদেবপুর ৪১ পল্লি, রাজডাঙা নব উদয় সংঘ, পল্লিমঙ্গল সমিতি, সেলিমপুর পল্লি, গড়িয়া মিতালি সংঘ, সংঘশ্রী ক্লাব,২১ পল্লি, একডালিয়া এভারগ্রিননাকতলা ভ্রাতৃমিলন সংঘ, নাকতলা সম্মিলনী, চক্রবেড়িয়া সর্বজনীন, মুদিয়ালি ক্লাববোসপুকুর শীতলা মন্দির ত্রিধারা সম্মিলনী, যোধপুর পার্ক শারদীয়া উৎসব কমিটি, দেশপ্রিয় পার্ক সর্বজনীন, বালিগঞ্জ কালচারাল, সিংহী পার্ক, হিন্দুস্তান ক্লাব, বালিগঞ্জ পূর্বপল্লি, হিন্দুস্তান পার্ক, গড়িয়া বিধানপল্লি পূর্বপাড়া, নাকতলা উদয়ন সংঘ, আদি বালিগঞ্জ, ভবানীপুর বকুল বাগান, হরিদেবপুর আদর্শ সমিতি, ম্যাডক্স স্কোয়ার, সোদপুর প্রগতি সংঘ, চেতলা অগ্রণী, ভবানীপুর ২২ পল্লিসূর্যনগর।

বিংশ শতাব্দীতে কলকাতায় বারোয়ারি বা সার্বজনীন পূজা জনপ্রিয় হয়। কলকাতায় প্রায় ২০০০ সার্বজনীন পূজা হয়।এছাড়া বিভিন্ন পুরনো বাড়িতেও দুর্গাপূজা হয়। দুর্গাপূজার সময় কলকাতা শহর আলোকমালায় সাজানো হয়। অধিকাংশ অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চার দিন বন্ধ থাকে। রাতে শহরবাসী বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন করতে ভিড় জমান। দুর্গাপূজার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে কলকাতা পুলিশকে বিশেষ টাস্কফোর্স নিয়োগ করতে হয়। কলকাতার দুর্গাপূজাকে পূর্ব গোলার্ধের রিও কার্নিভাল বলা হয়। বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গাপুজো। শুধু কি বাঙালির! দুর্গাপুজো আসলে সার্বজনীন। তার মধ্যে রয়েছে 'বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য'-র এক অমলিন ছোঁয়া। আর ইউনেসকো বিচারে বিশ্বের সংস্কৃতি বিভাগের তালিকায় উঠে এল আমাদের সাধের দুর্গাপুজোর নাম।

উল্লেখ্য, প্রতি বছরই ইউনেসকোর তরফে বিশ্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলির ওপর নজর দেওয়া হয়। ঐতিহ্যের তালিকায় সংযোজন হয় নতুন নতুন নাম। এবারের নামটি হচ্ছে দুর্গাপুজো। এর আগে ভারত থেকে ২০১৬ সালে সেই তালিকায় যোগ হয়েছে যোগব্যায়াম, ২০১৭ সালে কুম্ভমেলা, ২০১৯ সালে সোয়া রিগপা সেই তালিকার অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।ইউনাইটেড নেশনস এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন প্রতিবছর এই স্বীকৃতি তুলে দেয় সারা পৃথিবীর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, ধার্মীয় অনুষ্ঠানকে। কেন্দ্রীয় সরকার চালিত সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি দুর্গাপুজোর নাম ২০২০ সালের জন্য মনোনীত করেছে। অ্যাকাডেমির মতে, দুর্গাপুজো তো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এতে শিল্প লুকিয়ে আছে সর্বত্র। সেগুলোও পৃথিবীর মানুষ জানলে আরও প্রসার হবে শিল্পীদের কাজ।আর এই কারণেই বাঙালির গর্বের মুকুটে যুক্ত হচ্ছে নতুন পালক।

 

গত বছরের মতো এ বছরেও করোনার রক্তচক্ষুর মাঝেই এ বছর দুর্গাপুজো উৎসব পালনে মাততে চলেছে শহর। তবে মহামারী পরিস্থিতিতে কীভাবে হবে শারদ-উদযাপন। সে বিষয়ে বেশ কিছু নির্দেশিকা দিয়েছে ফোরাম ফর দুর্গোত্‍সব। ইতিমধ্যেই বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবে প্রস্তুতির সলতে পাকানো শুরু হয়ে গিয়েছে। বিগত বছর প্রশাসনিকভাবে যেসব বিধি-নিষেধ আরোপিত হয়েছিল সেগুলোকে সামনে রেখেই প্রস্তুতি শুরু করেছে পুজো কমিটিগুলো। এ ব্যাপারে ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের তরফেও কমিটিগুলোকে ইতিমধ্যেই বেশকিছু নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। তবে পুজোর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত মানুষদের টিকাকরণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের সাধারণ সম্পাদক শাশ্বত বসু বলেন, "পুজো সংগঠকদের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যথাসম্ভব খোলামেলা মণ্ডপ করতে হবে। যাতে বাইরে থেকে ঠাকুর দেখা যায়।"

শেষকথাঃ

বাঙালির জাতীয় উৎসব শারদীয়া দুর্গোৎসব। আবহমান কাল ধরে এর আলাদা ব্যঞ্জনা, আলাদা মাত্রা। বাঙালি জাতির প্রাণের উৎসব।জাতিধর্মনির্বিশেষে  পুজোর দিনগুলো কাটে প্রাণের আবেগে, প্রাণপ্রাচুর্যে।তবে এবারের মতো এমন দুঃসময় ও কঠিন সময় আগে কখনও আসেনি।পুজোর আবেগ ও যুক্তি একদিকে যেমন আছে তেমনি অন্যদিকে আছে সনাতন-শাশ্বত ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের অভাবনীয় মেলবন্ধন।সময় কঠিন ও পরিবেশ প্রতিকূল হলেও তবু তিনি আসছেন। তিনি তো সবার মঙ্গলময়' মা'--- 'মা'কে ছাড়া জীবন পূর্ণ হতে পারে না।এই ভয়াবহ করোনা আবহে করুণাময়ীর আশীর্বাদ লাভে  আট থেকে আশির বাঙালি সকলেই স্বপ্নপূরণে উন্মুখ। পরিস্থিতি ও সময় কঠিন বলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে মাতৃ আরাধনা।সময় বলছে পিতৃপক্ষের অবসান দেবী পক্ষের শুভ সূচনা হয়ে গেছে বেশকিছু দিন আগে। পারিবারিক ও বারোয়ারি পুজোর কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম ব্যস্ততার ছবি পরিলক্ষিত হচ্ছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গের সরকারি রেজিস্ট্রার পুজোর সংখ্যা ৩৭ হাজার, এছাড়াও রেজিস্ট্রেশন নেই এমন পুজোর সংখ্যা খুব কম নয়। পারিবারিক পুজোর সংখ্যা কয়েক হাজার। সমগ্র ভারতে ও বিশ্বে পুজোর সংখ্যা আনুমানিক ৬০-৭০হাজার। পুজোর সঙ্গে কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে খরচ করতে হবে এটাই দস্তুর। করোনা আবহে বেহাল অর্থনৈতিক অবস্থা। বারোয়ারি পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের জীবন ও জীবিকার । কোটি--কোটি  বাঙালি ও বাংলা ভাষা-ভাষি মানুষের আজন্ম লালিত আবেগ জড়িয়ে আছে শারদীয়া দুর্গোৎসব-এর সঙ্গে। এটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

যুগ ধরে বাঙালি মেতে ওঠে তার প্রাণের উৎসব দুর্গাপুজোয় (Durga Puja)৷ যুগের পরিবর্তন, সময়ের অভাবে পুজোর অনেক বিধি নিয়মে বদল এসেছে। উদযাপনে এসেছে বিস্তর ফারাক। তবুও দু্র্গাপুজোর  সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাঙালির সেন্টিমেন্ট এতটুকুও ফিকে হয়নি৷ কর্পোরেটের বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপের মতো বাণিজ্যিক শব্দবন্ধ আজ দুর্গাপুজোর অঙ্গ। সবচেয়ে বড় ঠাকুর থেকে শুরু করে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে সেরা হয়ে ওঠার লড়াই।

চিন্তাভাবনায়, সৃজনশীলতায় কোন পুজো কতটা উচ্চমানের, কোন পুজো দেখতে মানুষ বেশি ভিড় জমাচ্ছে, ভিড়ের মধ্যে থেকে আঁচ করে নেওয়া মাথার সংখ্যা কাদের বেশি,  কোন পুজো পেল সেরার শিরোপা, এগুলোই নতুন ট্রেন্ড। যদিও করোনাকালে মানুষ তাও হারিয়েছে। অনলাইন বা ভার্চুয়াল পুজোয় গিয়ে ঠেকেছে। তবে আজ থেকে দু’শো বছর আগে দুর্গাপুজো  একেবারেই এমনটা ছিল বাংলায় ঠিক কবে দুর্গাপুজো (Durga Puja)  শুরু হয়েছিল তা নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে৷ সঠিক তথ্যও সেভাবে পাওয়া যায়নি৷ ইতিহাস বলছে  আনুমানিক ১৫০০ শতকের শেষের দিকে বাংলায় প্রথম দু্র্গাপুজো শুরু হয়। সম্ভবত, দিনাজপুর-মালদার এক জমিদার স্বপ্নাদেশ পেয়ে পর পারিবারিক ভাবে দুর্গা পুজো প্রথম শুরু করেছিলেন। আবার শোনা যায় সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে উত্তরবঙ্গের রাজশাহি জেলার তাহিরপুর অঞ্চলের রাজা কংসনারায়ণ দুর্গার  আরাধনা শুরু করেন।

কারও মতে, মনুসংহিতার টীকাকার কুলুকভট্টের পিতা উদয়নারায়ণের হাত ধরেই প্রথম দুর্গাপুজোর (Durga Puja)  সূচনা হয়েছিল৷ পৌত্র কংসনারায়ণ তা অনুসরণ করেন। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, আজ থেকে দুশো বছর আগে দুর্গাপুজোর আয়োজন হতো আরও ধুমধাম করে। তখন ছিল তোষামোদের পুজো। ব্রিটিশ শাসনকালে ইংরেজদের তোষামোদে রাখতে দুর্গাপুজোকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসেন জমিদাররা। প্রায় সমস্ত জমিদার বাড়িতেই ঘটা করে দুর্গাপুজোর  আয়োজন হতো। আড়ম্বরের কোনও খামতি থাকত না৷ খাওয়াদাওয়ার এলাহি আয়োজন থেকে এবং নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, তখনকার দুর্গাপুজোর মেনুতে সবই হাজির থাকতো।

সেকাল থেকে একালে বারোয়ারি/সর্বজনীন দুর্গোপুজোয় যে শুধু একটা রূপান্তর এসেছে তাই নয় ,বলা যায় ঘটে গেছে একটা মহাবিপ্লব। এখনকার বড় পুজো মানেই প্যাণ্ডেলের কারুকার্যে, লাইটিং-এর জাঁকজমকে প্রতিমার রূপ সজ্জায় একে অপরের টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা। ঢুকেছে রাজনীতির নানা প্যাঁচ পয়জারও।এখন তো আবার রমরমা করে চলছে 'স্পনসরশিপের' পুজো। গত বিশ-ত্রিশ বছরের মধ্যেই একালের পুজো  প্লাস্টিকের শিউলি ফুলের মতোই আমূল বদলে গেছে। নব্বই দশকে এই বদলের শুরু। আজকের সময়ে তা পল্লবিত হয়েছে  ব্যাপক ভাবেই।বড়পুজো মানেই তাক লাগিয়ে দেওয়ার একটা অশুভ প্রতিযোগিতা। চাঁদার সীমাহীন দাপট।ছত্রে ছত্রে রাজনীতির  অনুপ্রবেশ।  লাইটিং -এর মাধ্যমে কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা,  বিতর্কিত বিষয়বস্তু দেখিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা। প্রতিমার সাজসজ্জা ও রূপসজ্জা এবং বিন্যাসে নতুন আঙ্গিকের সৃষ্টি করা। রাজ্যপাল,কোন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী, বা বিখ্যাত সিনেমার অভিনেত্রী-অভিনেতাদের দিয়ে পুজো উদ্বোধন করানো।একটা ভালো দিক লক্ষ্য করা যায়, পুজোর উদর্বৃত্ত অর্থে আ্যম্বুলেন্স, শববাহী গাড়ি কেনা কিংবা কোন সৎ কাজে অর্থ দান করা। সর্বোপরি এই গোটা ব্যাপারটা করার জন্য যে বিশাল ব্যয়ভার তাঁর পুরো টাকাটাই 'স্পনসরশিপ' দান বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তোলা। এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি।  ধীরে  ধীরে বাণিজ্যিক করণ ঘটেছে। বড়বড় কোম্পানী নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে নেমে পড়েছে।সব রাজনৈতিক দল পুজোকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।ফলে সমাজ জীবন দূষিত হচ্ছে।  ভক্তিভাবনার আড়ালে নিজেদেরকে বিজ্ঞাপিত করাই মূল উদ্দেশ্য পুজো কমিটির সদস্যদের ও কর্মকর্তাদের। এইভাবেই সময়ের হাত ধরে সেকালের বারোয়ারি পুজো বদলে গিয়ে আজকের সর্বজনীন পূজার মহিমা লাভ করেছে। একালের পুজোয় প্যাণ্ডেল, লাইটিং,জলসা,সমাজসেবা, রাজনৈতিক প্রচার ও ভি আই পি দিয়ে উদ্বোধন একটা অভিনবত্বের আমদানি ঘটেছে ভীষণ ভাবে।গত ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে এমনটা ছিল না।পুজোর আসল মাহাত্ম আজ গৌণ হয়ে পড়েছে, বেড়েছে পাল্লাদিয়ে দেখানদারির ব্যাপার। যদিও সমস্ত বারোয়ারি পুজোর কমিটির কর্মকর্তারা মনে করেন তাঁরা পুজোর আয়োজন করেন একেবারে শুদ্ধাচারে।  সেখানে সেকাল-একালের কোন প্রভেদ নেই।আর কয়েক দিন বাদেই বাঙালি জাতি  শারদীয়া দুর্গোৎসব-এ মেতে উঠবে কম-বেশি যতই করোনার আবহ থাকুক, সেটাই স্বাভাবিক। পূজার সময় চারিদিকে যে পরিবর্তিত পরিস্থিতি দেখবো, তা থেকে ভাবছি, আমরা কোথায় যাচ্ছি? এই নিবন্ধটি লিখতে গিয়ে একবার কৈশোরের ভালোলাগা বর্ণময় অনুভূতির কথা মনে পড়ছে, বয়স তখন খুব কম।খুব ভোরবেলা উঠে শিউলিতলায় গিয়ে দাঁড়াতাম। কমলা বোঁটার সাদা ফুলের চাদর বিছানো থাকতো গাছটার চারিপাশে। সেই সঙ্গে শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ। খুব ইচ্ছে করতো আঁজলা ভর্তি নরম শিউলি ফুল নিয়ে গন্ধ শুঁকি। আঁজলা ভরে ফুল নিতাম। কিন্তু তারপরেই ঘাড় ফিরিয়ে দেখতাম মাথার পিছনে মা দাঁড়িয়ে আছেন। মিষ্টি হেসে বলতেন, শুঁকতে নেই। তাহলে পুজোয় লাগে না। সেই ফুলে অবচেতন মনে মালা গাঁথতাম।পনের-বিশ হাতের। একেবারে যাতে প্রতিমার  মুকুট থেকে নীচে মায়ের ঘট পর্যন্ত এসে পড়ে। খুব বেশি দিন নয়,কুড়ি-পঁচিশ বছর আগেকার কথা।তারপর মালা গাঁথার দিন কবে শেষ হয়ে গেছে নিজেই জানি না। বছর খানিক আগে প্রতিমার গলায় অমনি বিশ ফুটের লম্বা শিউলি ফুলের মালা নবমীর রাতে সদ্য ফোটা ফুলের মতো তরতাজা দেখে অবাক হলাম। পূজারী ডেকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি আমাকে বললেন ,ওতো প্লাস্টিকের শিউলি ফুল!গন্ধ নেই, কিন্তু শুকিয়ে যায় না। গত বিশ-ত্রিশ বছরের মধ্যেই বাঙালির  পুজো ওই প্লাস্টিকের ফুলের মতোই আমূল বদলে গেছে। 

লেখক: শিক্ষক, লোক গবেষক

Mailing List