‘বালক রাজা’ তুতানখামেনের মমি আবিষ্কার ও রহস্যে মোড়া মৃত্যুর সারি –শতবর্ষেও উত্তর কী মিলেছে?

‘বালক রাজা’ তুতানখামেনের মমি আবিষ্কার ও রহস্যে মোড়া মৃত্যুর সারি –শতবর্ষেও উত্তর কী মিলেছে?
15 Nov 2022, 11:42 AM

‘বালক রাজা’ তুতানখামেনের মমি আবিষ্কার ও রহস্যে মোড়া মৃত্যুর সারি –শতবর্ষেও উত্তর কী মিলেছে?

 

দীপান্বিতা ঘোষ

 

কে ছিলেন তুতেনখামেন?

তুতানখামেন ছিলেন মিশরের "বালক রাজা"। বালক বলার কারণ তিনি খ্রিস্টপূর্ব 14 শতকে মাত্র 9 বা 10 বছর বয়সে সিংহাসনে বসেছিলেন। তিনি ছিলেন মিশরীয় অষ্টাদশ রাজবংশের ফারাও। তাঁর আসল নাম তুতানখাতুন। অর্থ "আতেনের জীবন্ত ছবি। মাত্র 17 বছর বয়সে তিনি মারা যান। তার এই অকাল মৃত্যুর পিছনে কি রহস্য তা আজও অজানা।

 

তুতেনখামেন এর পিতৃপরিচয়:

 

তুতানখামেনের বাবা আখেনাতেন, যার পূর্ব নাম আমেনহতেপ। রাজা হওয়ার পর আখেনাতেন নাম নেন। এবং মা ছিলেন রানী নেফেরতিতি। তবে মা কে তা নিয়ে রয়েছে অন্যমতও। অন্য মতে, আখেনাতেনের প্রধান পত্নী ছিলেন নেফেরতিতি তুতেনখামেনের মা হলেন রানী "কিয়া"। তিনি আবার এক সম্পর্কে নাকি তুতানখামেনের পিসি। তাহলে তাঁর গর্ভে কিভাবে জন্ম হল? ওই পরিবারে পারিবারিক বৈবাহিক সম্পর্কের চল ছিল। 

নেফারতিতি বিখ্যাত ছিলেন তার দৈহিক সৌন্দর্যের জন্য। মিশরীয় ভাষায় নেফারতিতি শব্দের অর্থই হচ্ছে "সুন্দরীর আগমন"। নেফারতিতি এবং আখেনাতেনের সময়টাকেই মিশরের ইতিহাসে "স্বর্ণযুগ "হিসেবে ধরা যায়। "তুত" 1332 খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরের ফারাও হন। মিশর এবং প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যখন জমি নিয়ে যুদ্ধ চলছিল সেই সংঘাতের সময়ে তিনি দেশ শাসন করেন।

তুতেনখামেনের স্ত্রীর নাম আনখেনসেনেমুন। তাদের দুই কন্যা সন্তান ছিল । দুই সন্তানেরই মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে মৃত্যু হয়। সন্তানদের মমি পাওয়া গেছে তুতেনখামেনের সমাধিতে। মমি দুটির সিটিস্ক্যান করে বয়স নির্ধারিত হয়েছে 5/6 মাস এবং 9 মাস।

        

"তুত"এর অকাল মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা;

তাঁর অকাল মৃত্যুর কারণ হিসাবে যে যে তথ্য বা অনুমানগুলি উঠে এসেছে সেগুলি হল—-

i) সমাধি আবিষ্কারের পর এক্স-রে করে জানা যায় তার মাথার পিছনের অংশে আঘাতের চিহ্ন ছিলো, সেই সঙ্গে তার হাড়ের মধ্যেও ছিল একাধিক ফাটল।

ii) একদল গবেষকের অনুমান রাজা তুতেন খামেন কে হত্যা করা হয়েছিল।

iii) আবার অনেকের দাবি সিরিয়ার যুদ্ধে মৃত্যু হয়েছিল এই ফারাওয়ের।

iv) আবার একদল গবেষক মনে করেন তুতেনখামেনের মাথায় ভারী পাথর দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল।

v) অনেক গবেষকের ধারণা, ঘোড়ার গাড়ি থেকে অসাবধানবশত পাথরের উপর পড়ে গিয়ে রাজার মৃত্যু হয়েছিল।

vi) 2005 সালে গবেষক জাহিহাওয়াস বলেন হত্যা বা অপমৃত্যু নয় বরং যুবক রাজা তুতেন খামেনের মৃত্যু হয় ম্যালেরিয়ায়।

vii) 2010 সালের এক গবেষণায় গবেষকরা দাবি করেন রাজার শরীরের রক্তে লোহিত-রক্ত কণিকার অভাব ছিল।

viii) 2014 সালে তাঁর ভার্চুয়াল অটোপসি করে দেখা হয় তুতেনখামেনের বাম পায়ের একটি হাড়ের রোগ ছিল এবং সেটি ছিলো জিনগত। মূলতঃ ভাই বোনের বিয়ে হওয়ার কারণেই এই রোগ।

 

 সমাধি আবিষ্কারের শতবর্ষ পূর্তি:

তাঁর ধনসম্পদ ভরা সমাধিটি বেশির ভাগই অক্ষত অবস্থায় আবিষ্কৃত হয়েছিল। এই অক্ষত অবস্থায় সমাধিটির আবিষ্কার হয় 1922 খ্রিস্টাব্দের 4 নভেম্বর। সেই হিসাবে আজ 2022 এর নভেম্বরে তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কার 100 বছর পূর্ণ করল

রাজা তুতানখামুন তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনে যতটা না খ্যাতি অর্জন করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি খ্যাতি অর্জন করেছেন তার মৃত্যু এবং সমাধির মধ্য দিয়ে।

তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কার:

ঐতিহাসিকরা 1922  সাল পর্যন্ত "তুত" সম্পর্কে তেমন কিছু জানতেন না।

তুতেনখামেনের সমাধি যখন উদ্ধার করা হয় তখন সেটি ছিল মিশরের রাজধানী কায়রো থেকে 650 কিলোমিটার দূরে। সর্বপ্রথম তার সমাধিতে প্রবেশ করেন পুরাতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার এবং তার সঙ্গী লর্ড কর্নারভন। অনেক চেষ্টা করে 1923 সালের 17 ফেব্রুয়ারি তারা সমাধির দরজা ভাঙেন। দরজা ভেঙে কফিন খুলে সবাই হতবাক….. স্বর্ণের তৈরি আটটি কফিনের মধ্যে রাখা ছিল তার মমি।

           

একে একে সাতটি ছোট-বড় কফিন খুলে অবশেষে তুতেনখামেনের মমি বের করেন গবেষকরা। সবগুলো কফিনে স্বর্ণ, মনি মুক্তার আবরণ ছিল এবং তুতেনের মুখে একটি স্বর্ণের মুখোশ পরানো ছিল। তার বুকের উপর ছড়ানো ছিল শুকনো ফুলের পাপড়ি। গবেষকরা তুতেনখামেনের মমির ঠিক পাশে একটি চিরকুট খুঁজে পান তাতে হায়ারো গ্লিফিক লিপিতে যা লেখা ছিল তার অর্থ "রাজার শান্তি বিনষ্টকারীদের মৃত্যু"। 

                     

মহামূল্যবান সম্পদ ছাড়াও সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি হস্তশিল্প খুঁজে পাওয়া যায় তার সমাধিক্ষেত্রে। 1933 সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে সুস্থতার জন্য মিশরে চিকিৎসার জন্য যান ইংল্যান্ডের ধনকুবের লর্ড কার্নারভন। প্রত্নতত্ত্ববিদ থিওডোর ডেভিসের নেতৃত্বে মিশরের "ভ্যালি অফ কিংস"- এ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ চলার সময় লর্ড কার্নারভনের নেশা চাপলো পুরাকীর্তি আবিষ্কারের। সে জন্য তিনি যোগাযোগ করলেন মিশরের সরকারের সাথে। থিওডোর ডেভিসের আমন্ত্রণে প্রায় দশ বছর আগে ফারাওদের আঁতুড়ঘর মিশরে এসেছিলেন হার্ডওয়ার কাটার। এই সময় তার নিকট দেবদূতের মত এসে উদয় হলেন লর্ড কর্নারভন। প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক হওয়ায় তিনি কার্টারকে বললেন নতুনভাবে খনন কাজ শুরু করতে। খরচের ব্যাপারটা তিনি একাই সামলাবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন। কার্টারের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এই এলাকার কোন স্থানেই স্বনির্মিত কফিনে শায়িত আছে কিশোর সম্রাট তুতেনখামেন। তাই "ভ্যালি অফ কিংস" খনন করার কথা ভাবলেন কার্টার। 1917 সালের ডিসেম্বর মাসে শুরু হল খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। কিন্তু 5 বছর কেটে গেলেও কোনও  হদিস না মেলায় একপ্রকার নিরাশ হয়ে লর্ড কার্নারভন জানালেন এই খনন কাজের পেছনে আর কোনও পয়সা খরচের ইচ্ছে নেই তার।

      

কিন্তু কার্টার বহু অনুরোধ করে আরেকটি বছর চেয়ে নিলেন কার্নারভনের কাছ থেকে। 1922সালের নভেম্বরে আবারো শুরু হল কাজ, নভেম্বরের 4 তারিখ সকাল 10 টা কার্টারের এক শ্রমিক ঘুরতে গিয়ে একটি সিঁড়ির সন্ধান পান। এই সিঁড়ি থেকে বড় বড় ভারী পাথর ছড়ানোর পর দৃশ্যমান হয়ে উঠল বন্ধ দরজার একটি অংশ। দরজাটির উপর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল মিশরের রাজকীয় কবরখানার সিল।

        

কার্টারের উত্তেজনা এবং হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন কয়েক গুণ বেড়ে গেল তবে কি তিনি বহু- প্রতীক্ষিত তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কার করে ফেলেছেন??? কর্মীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছেন কালজয়ী ইতিহাসের প্রথম সাক্ষী হওয়ার। 29 নভেম্বর এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ…..কার্টার, তার খনন দল, লর্ড কার্নারভন, মিশরের যুবরাজ, সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মিশরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সামনে রেখে খুলে ফেলা হোলো সেই সিল। অফুরন্ত বিস্ময়, অগণিত সোনা-দানা-হিরে-জহরত-মূল্যবান ধনরত্ন সহ তুতেনখামেনের মমি।

       

সাধারণত মিশরীয় ফারাওদের মমির সমাধি গুলি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যেত না। কারণ ডাকাতের দল সব ধনরত্ন লুট করে নিয়ে চলে যেত। ব্যতিক্রম ছিল তুতানখামেনের সমাধি। কারণ কার্টারের আগে কেউ এই সমাধিতে যায়নি। শোনা যায় সমাধিকক্ষে প্রবেশের পরই কার্টার প্রাচীন মিশরীয় লিপিতে কিছু লেখা দেখতে পান। হায়ারোগ্লিফিক লেখা থেকে এর মর্মার্থ উদ্ধার করলে দাঁড়ায় "যে রাজার চিরশান্তির ঘুম ভাঙ্গাবে তার উপর নেমে আসবে অভিশাপ"।

 

অভিশপ্ত সমাধি

ধারণা করা হয় তুতানখামেনের সমাধি নাকি অভিশপ্ত।

এর কিছু উদাহরণও আছে ……

             

রাজা তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের কাজে যারা জড়িত ছিলেন তারা সবাই রহস্যজনকভাবে মারা গিয়েছেন। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, অভিশাপ নয় বরং হাজার বছরের বিষাক্ত জীবাণুর কারণে মৃত্যু হয়েছে উদ্ধারকর্মীদের। তবে তথ্য মানতে নারাজ অন্যান্যরা।

 

বেশ কিছু অলৌকিক ও কাকতলীয় ঘটনা:

   

 তুতানখামেনের সমাধি সৌধ উন্মুক্ত করার দিন হার্ডওয়ার্ড কার্টারবাসায় ফিরে দেখেন তার পোষা পাখি ক্যানারি কোবরা সাপের কামড়ে মারা গিয়েছে। কোবরা সাপ হলো ফেরাউনদের মুখোশের শিখরের প্রতীক।

ii) তুতানখামেনের সমাধি খোলার ছয় সপ্তাহ পরে লর্ড কার্নারভন একটি সংক্রামিত মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

iii)কার্নারভনের মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা পরে ইংল্যান্ডে তার প্রিয় সুসি কুকুর প্রচন্ড গর্জন করতে করতে মৃত্যু হয়।

iv) এরপর অভিশাপের শিকার হয় মিশরের যুবরাজ আলী কামেল গাহমি বে। যুবরাজের স্ত্রী তাকে গুলি করে হত্যা করে।

v) তারপর একটি হোটেলে কার্নারভনের ভাইয়ের মৃতদেহ পাওয়া যায়। তার রক্তে বিষক্রিয়া পাওয়া যায়।

vi) তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকার ধনকুবের ওলফ জয়েল তুতানখামেনের সমাধি তে গিয়েছিলেন। এর কয়েক মাস পরেই তিনি হত্যার শিকার হন ।

 Vi)  মার্কিন ফিনান্সর জর্জ জে গোল্ড 1922 সালের শেষদিকে তুতানখামেনের সমাধি তে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে জ্বরে আক্রান্ত হন এবং 6 মাস জ্বরে ভুগে মৃত্যু হয়।

 vii)  স্যার আর্কিবাল্ড ডগলাস রেড একজন বিখ্যাত রেডিওলজিস্ট ছিলেন। তিনি তুতেনখামেনের মমি এক্সরে করেন। এক্সরে করার কিছুদিন পর তিনি রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে মারা যান।

 viii) সমাধি আবিষ্কারের চার মাস পর কার্টারের ব্যক্তিগত সচিবকে তার বিছানায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

ix)কার্টারের খনন দলের সদস্য এ সি ম্যাস আর্সেনিক বিষ ক্রিয়ায় মারা যান।

x) তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারক দলের নেতৃত্ব দানকারী হাওয়ার্ড কার্টার মৃত্যুবরণ করেন 1939 সালে।

xi) তুতেনখামেনের সমাধিমূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের একটি বিখ্যাত প্রদর্শনীতে আনা হয়। জাদুঘরের পুরাকীর্তি বিষয়ক পরিচালক ডঃ গামাল মেহরেজ উপহাস করে বলেন, তুতানখামেনের অভিশাপ সম্পর্কিত সমস্ত ঘটনায় দুর্ঘটনা এবং কাকতালীয়। অভিশাপের কারণেই হোক বা কাকতলীয় ভাবেই হোক তুতানখামেনের সমাধির প্রাচীন দ্রব্য সামগ্রীগুলি পরিদর্শন শেষে পরের রাতেই ডঃ গামাল মেহরেজের মৃত্যু ঘটে। এসব দ্রব্য বহনকারী বিমানের ফ্লাইট পরিচালনাকারীরাও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মারা যান।

  2011 সালে তুতুনখামেনের সমাধি অন্যত্র সরানো হয়। যেহেতু তার সমাধি অভিশপ্ত হিসেবে বিবেচিত তাই মন্ত্র পড়ে 12 জন মিলে সরানো হয়েছিল তুতেন খামেনের কফিন। এই যুবক রাজার জীবনী, মৃত্যুর কারণ, মমির বিবরণ, মমি টি অভিশপ্ত কিনা সমস্ত বিষয়গুলি জানতে গবেষকদের আগ্রহ এখনো তুঙ্গে। 

লেখক: শিক্ষক, নান্দারিয়া হাইস্কুল, শালবনি, পশ্চিম মেদিনীপুর

Mailing List