নদী পাড়ের বাসিন্দাদের দুঃখের প্রবাদ সুখে বদলে দিতে পারে উদ্ভিদ চয়ন, ‘নদীর তীরে বাস, সম্পদ বারো মাস’

নদী পাড়ের বাসিন্দাদের দুঃখের প্রবাদ সুখে বদলে দিতে পারে উদ্ভিদ চয়ন, ‘নদীর তীরে বাস, সম্পদ বারো মাস’
13 Sep 2020, 02:24 PM

নদী পাড়ের বাসিন্দাদের দুঃখের প্রবাদ সুখে বদলে দিতে পারে উদ্ভিদ চয়ন, ‘নদীর তীরে বাস, সম্পদ বারো মাস’

বর্ষা মানেই আতঙ্ক। বৃষ্টির জলে নদী যে তখন পূর্ণ যৌবন ফিরে পায়। আর তাতেই যত বিপত্তি। জলের স্রোত ও ধাক্কায় ভাঙতে থাকে বাঁধ। এ বাঁধ ভাঙার যেন শেষ হয় না। আর ভাঙনের চোটে নদীগর্ভে চলে যায় কৃষি জমি, বসতভিটে, মন্দির-মসজিদ থেকে স্কুল। এর থেকে কী নিষ্কৃতি নেই? তা নিয়ে দীর্ঘ ২০০৭ সাল থেকে গবেষণা করে চলেছেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তাঁদের মতে, প্রকৃতি দিয়েই রুখতে হবে প্রকৃতিকে। নদীর পাড়ে লাগাতে হবে উপযুক্ত উদ্ভিদ। আর সেই উদ্ভিদই পারে নদী ভাঙন রুখতে। কিভাবে তা সম্ভব? তা নিয়েই আলোচনা করলেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা ও বনবিদ্যা বিভাগের অধাপক ড. অমলকুমার মন্ডল এবং তাঁর অধীনে গবেষনারত সায়ন্তন ত্রিপাঠী

ড. অমলকুমার মন্ডল

সায়ন্তন ত্রিপাঠী

থায় আছে "নদীর তীরে বাস, ভাবনা বারো মাস"। এই প্রবচনটি দক্ষিণ বঙ্গের ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য। বৃষ্টি শুরু হলেই শীর্ণ নদী গুলি ফুলে ফেঁপে ওঠে। জল ধারণ করতে পারে না। বাঁধ ভাঙে, জল ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় সবকিছু। সর্বহারা মানুষ সাহায্যের প্রত্যাশায় দিন গোনে। কিন্তু ভেবেও দেখে না এই ভয়ঙ্কর বন্যা তার নিজেরই তৈরি। নিজেই সে পারে বাঁধ ভাঙা রুখতে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পনার, সদিচ্ছার আর প্রকৃতির আদরের দুলাল উদ্ভিদের সঙ্গে ভাব করা, তাকে ভালবাসার। প্রয়োজন - নির্দিষ্ট উদ্ভিদ বেছে নেওয়া, যারা আঁকড়ে ধরবে বাঁধের মাটি, রোধ করবে ভূমিক্ষয়। সেই লক্ষ্যেই এই গবেষণা মূলক উদ্যোগ। সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, যে নদী বাঁধে কিছু বিশেষ ধরনের ঘাস বেশী পরিমাণে রয়েছে তার ক্ষয় অনেক কম। কেলেঘাই, কংসাবতী, শিলাবতী নদী বাঁধের যে যে অংশে Vetiveria zizynoides, Eragrostis cynosuroides, Saccharum spontaneumSaccharum munja ঘাসগুলো রয়েছে সেখানে ভূমিক্ষয় অপেক্ষাকৃত অনেক কম। সমীক্ষায় এও দেখা গিয়েছে, এই ঘাসগুলি রোপণ করলে নদী বাঁধে খুব দ্রুত মানিয়ে নেয় ও বেড়ে ওঠে। এদের শিকড় মাটিতে এত দৃঢ় ভাবে আটকে রাখে যে, ভূমিক্ষয় লক্ষ্যনীয় ভাবে হ্রাস পায় এবং বন্যার সম্ভাবনা অনেক কমে।

নদীমাতৃক দেশ আমাদের এই ভারতবর্ষ। কোনও কোনও নদীর উৎস পর্বত শীর্ষের বরফগলা জল, আবার কোনও কোনও নদীর উৎপত্তি মালভূমি থেকে। কেউ কেউ আবার বড় নদীর শাখা। নদীগুলির অববাহিকা অঞ্চল পলি সমৃদ্ধ এবং উর্বর। স্বাভাবিক ভাবেই নদী কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জনপদ।

সেই জনপদের ক্রমবর্ধমান বিপুল চাহিদা মেটাতে গিয়ে নদী হয়েছে শীর্ণ। ধীরে ধীরে লুণ্ঠিত হয়েছে নদী বাঁধের সবুজ অরণ্য। তার বদলে গড়ে উঠেছে কংক্রিটের জঙ্গল। ফলে বর্ষার আতিরিক্ত জল যেমন ভৌম জলে পরিণত হতে পারছে না তেমনই শীর্ণ নদী বইতে পারছে না অতিরিক্ত জলভার। আবার সভ্যতার উচ্ছিষ্ট পলিথিন, প্লাস্টিকের জঞ্জাল নদীর গতিপথকে করেছে রুদ্ধ। ফলস্বরুপ নদীর দু’কূল ছাপিয়ে জল ঢুকে পড়ছে জনপদে। নদী বাঁধের মাটি আলগা হয়ে ভেঙে যাচ্ছে। প্রবল বন্যার প্রলয় নাচন জনজীবনকে করছে বিপর্যস্ত। এই সমীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ বন্যার কারণ অনুসন্ধান নয়। বন্যা প্রতিরোধে উদ্ভিদের সাহায্য গ্রহণ। বিশেষ প্রজাতির উদ্ভিদ সনাক্তকরণ, নদী বাঁধে ওই উদ্ভিদ রোপণ ও সংরক্ষণ। মূলতঃ দক্ষিণবঙ্গের, বিশেষ করে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নদীগুলির আর্থ ভৌগোলক গঠন, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, নদীবাঁধ গুলির উদ্ভিদ বৈচিত্র্য এবং বন্যা রোধে বিশেষ বিশেষ উদ্ভিদের কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ, বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণে বন্যা প্রতিরোধকারী উদ্ভিদ সমৃদ্ধ বনাঞ্চল তৈরি হল এই প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য।

বিশেষ পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় মানুষজনের সহায়তা এবং তাদের বংশানুক্রমিক অভিজ্ঞতার সাহায্য গ্রহণ এবং বিশেষ ধরনের উদ্ভিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিভাত হয় যে নদীর থিতিয়ে পড়া পলি মাটিতে স্বচ্ছন্দে জন্মাতে পারে, নদীর জলে বহুদিন ডুবেও বেঁচে থাকতে পারে, বিশেষ করে পলিমাটি কে দীর্ঘগুচ্ছমূলের সাহায্যে দৃঢ়ভাবে আটকে রাখতে পারে এক ধরনের ঘাস, যার স্থানীয় ভাষায় নাম 'গাঙ ধানি'।

এছাড়াও এই ধরণের 'Vetever' গোষ্ঠীর চার প্রকার ঘাসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সেগুলি হল-

১. Saccharum spontaneum (কাশ, কাঁশি, কাঁস): Poaceae গোষ্ঠীর এই ঘাস জলা জমিতে জন্মায়। এমনকি পাথুরে জমিতেও স্বচ্ছন্দে জন্মাতে পারে। মূল অত্যন্ত দৃঢ় ও শক্ত। যা মাটির ২-৩ ফুট পর্যন্ত গভীরে ছড়িয়ে যায় এবং ভূমিক্ষয় রোধ করে।

২. Saccharum munja (সারকান্দ, জুন): এই ঘাস খরাপ্রবন এলাকাতেও দ্রুত বেড়ে ওঠে। এই ঘাস যেমন খরা এবং আগুন সহ্য করতে পারে তেমনই বন্যার জলেও মাসের পর মাস বেঁচে থাকতে পারে, শুষ্ক মাটিতে যেমন জন্মাতে পারে তেমনই ঘন কাদায় বংশবৃদ্ধিতেও কোনও অসুবিধা হয় না।

৩. Eragrostis cynosuroides (কুশ): এই ঘাস পৌরাণিক কাল থেকে নদীমাতৃক ভারতবর্ষের জনজীবন ও ধর্মীয় জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। এখনও পূজা পার্বণ, পারলৌকিক ক্রিয়া কর্ম, আচার অনুষ্ঠান প্রভৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে এর ব্যবহার অব্যাহত। এই ঘাস লবণাক্ত জমিতেও স্বচ্ছন্দে জন্মাতে পারে। মূল ও তার মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অতি অল্প সময়ে ঘন ঝোপের সৃষ্টি করে ভূমিক্ষয় রোধের মাধ্যমে বন্যা প্রতিরোধ করতে পারে। কারণ এর মূল মাটির গভীরে ৩-৩.৫ ফুট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

৪. Vetivaria zizaniodes (খাস, ঊষিরা, রেশিরা): এই ঘাস খরাপ্রবণ এলাকাতেও স্বচ্ছন্দে জন্মায় এবং বেড়ে ওঠে। শক্ত ও দৃঢ় শিকড় মাটির ৩-৪ ফুট গভীর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কাদা, পলি, ধুলোর আস্তরণে ঢেকে গেলে নতুন মূল দ্রুত গজায় এবং নতুন জমা আস্তরণ কে আটকে রাখে।

এই সমীক্ষার আওতাধীন নদীগুলি হল- কেলেঘাই, শিলাবতী, কাংসাবতী, সুবর্ণরেখা। সবগুলি নদীই বিহারের ছোটোনাগপুর মালভূমি থেকে সৃষ্ট। মূলতঃ বৃষ্টির জলে পুষ্ট। খরা মরশুমে প্রায় শুকিয়ে যায়। কিন্তু ভরা বর্ষায় নদীগুলি ফুলে ফেঁপে ওঠে। জলস্রোত প্রতিনিয়ত গতিপথ বদলায়। ফলে কখন কোন অঞ্চলের নদী বাঁধ ভাঙবে তার নিশচয়তা থাকে না। উক্ত নদীগুলির ভূমির গঠন বৈচিত্র্য ভিন্ন ভিন্ন। ফলে নদীর স্রোতের বেগ, ঢেউ এর প্রকৃতি, গভীরতার পার্থক্য বিশেষ ভাবে লক্ষনীয়। তাই চিরাচরিত প্রথায় বন্যা প্রতিরোধ কখনোই সম্ভব নয়। তাই প্রাকৃতিক ভারসাম্য যুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ ও নদী বাঁধের ওপর বিশেষ ধরণের উদ্ভিদ সমৃদ্ধ অরণ্য সৃষ্টিই বন্যা প্রতিরোধের এক মাত্র উপায়।

এই সমীক্ষায় যে অঞ্চল গুলির উপর বিশেষ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে সেগুলি হল- কাঁটাখালি, ভগবানপুর, ট্যাংরাখালি – (কেলেঘাই নদী); মেদিনীপুর, তেরপেখিয়া, পাঁশকুড়া – (কংসাবতী নদী); ঘাটাল, খাড়ল – (শিলাবতী)।

পরীক্ষামূলক ভাবে চার প্রকার ঘাসের বীজ ওই এলাকায় বপন করা হয়। উল্লিখিত ভাঙন প্রবণ এলাকাগুলির উদ্ভিদায়ন টানা চার বছর ধরে লক্ষ্য করে দেখা যায় যে, ওই এলাকাগুলিতে ঘাসের বৃদ্ধি যথাযথ হয়েছে। পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চল গুলি অপেক্ষা ঐ অঞ্চল সংলগ্ন অন্যান্য অঞ্চল গুলি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল ভূমিক্ষয় অপেক্ষাকৃত বেশি। যে অঞ্চল গুলির মাটিতে সরুবালির পরিমাণ বেশি সেখানে ভূমিক্ষয় অনেক বেশি। কিন্তু যেখানে বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ রয়েছে সেখানে ভূমিক্ষয় অপেক্ষাকৃত কম। নদী বাঁধের যে অঞ্চলে ভূমিক্ষয় ঘটছে ঠিক তার বিপরীত পাশে বাঁধের মুখে নতুন করে পলি জমা হচ্ছে। সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, নদী বাঁধের ভূমিক্ষয় ওই অঞ্চলের উদ্ভিদের সংখ্যা, প্রকৃতি এবং প্রজাতির উপর বিশেষ ভাবে নির্ভরশীল। নদী বাঁধের গাছ গুলি ধসের থেকে বাঁধকে রক্ষা করে, অন্য দিকে বাঁধে ঘাসের আস্তরণ ভূমিক্ষয় রোধ করে। 

নদী বাঁধে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট বনাঞ্চল অপেক্ষা বিজ্ঞান ভিত্তিক পদ্ধতি তে সৃষ্ট কৃত্রিম বনাঞ্চল অনেক বেশি কার্যকরী। দক্ষিণ বঙ্গের বহু নদী, শাখা নদী, ঝোরা এই অঞ্চলে প্রবাহিত ও বহু অঞ্চলের বন্যার কারণ।

বন্যা রোধ এবং নদী বাঁধের ভূমিক্ষয় রোধের জন্য সমীক্ষার সুপারিশ

১. যে অঞ্চলে ঘাস রোপণ করা হবে সেখানকার মাটি, আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঘাসের প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে।

২. সঠিক পদ্ধতিতে ঘাস রোপণ করতে হবে।

৩. দ্রুত বেড়ে ওঠা এবং দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করতে পারে এমন প্রজাতির ঘাস বেছে নিতে হবে।

৪. ঘাসগুলি যাতে বেশি দিন বেঁচে থাকে এবং তাদের মূলগুলি যাতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

৫. স্বল্প মেয়াদী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভাঙন প্রবণ এলাকার বনাঞ্চল এবং ঘাসের আস্তরণের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

-এক্ষেত্রে PWD, Rail, বনদপ্তর, সেচ দপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত উদ্যোগ বিশেষ কার্যকরী হতে পারে।

  • বন্যার মূল কারণ হল- পলি জমে ভর্তি হয়ে যাওয়া নদী খাত এবং অনিয়ন্ত্রিত বেআইনি বালি খনন। পরিকল্পিত খনন কার্যের সাহায্যে নদী খাতের গভীরতা বৃদ্ধি করতে হবে।
  • ভাঙণ প্রবণ অংশে বিভিন্ন আকারের পাথর বসিয়ে নদী বাঁধকে দৃঢ় করতে হবে।
  • দ্রুত বেড়ে ওঠা ও শক্ত মূল যুক্ত ঘাস বসাতে হবে।
  • এই প্রতিবেদনে যে চার প্রকার ঘাসের কথা বলা হয়েছে তা ছাড়াও ওই ধরনের অন্যান্য ঘাস যা ওই অঞ্চলে বেড়ে ওঠে তা ব্যাবহার করতে হবে।

সর্বোপরি স্থানীয় মানুষজনের সক্রিয় সহযোগিতা এবং উদ্যোগ এই কাজকে সফল করতে তুলতে পারে। এই পদ্ধতিতে অল্প খরচে স্থায়ী ভাবে ভূমিক্ষয় রোধ সম্ভব। সরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা, সর্বোপরি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক পরিকল্পনা দক্ষিন বঙ্গের বাৎসরিক বন্যার ভয়াবহতার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।

'বারো মাসের ভাবনা' নতুন প্রবচন সৃষ্টি করুক- "নদীর তীরে বাস, সম্পদ বারো মাস"

Mailing List