বাংলার বাঙালীরা হিন্দিতে খায়, ঘুমায়! বাঙালী ও বাঙালী জাতিসত্তার মূল ধারা নিয়ে বাংলাদেশের লেখক রাকিব রহমানের ভাবনা

বাংলার বাঙালীরা হিন্দিতে খায়, ঘুমায়! বাঙালী ও বাঙালী জাতিসত্তার মূল ধারা নিয়ে বাংলাদেশের লেখক রাকিব রহমানের ভাবনা
29 Aug 2022, 07:10 PM

বাংলার বাঙালীরা হিন্দিতে খায়, ঘুমায়! বাঙালী ও বাঙালী জাতিসত্তার মূল ধারা নিয়ে বাংলাদেশের লেখক রাকিব রহমানের ভাবনা

 

রাকিব রহমান

 

পশ্চিম বাংলার বাঙালীরা বাঙালী জাতি ও জাতিস্বত্বার মূল স্রোত হ'তে পারতো। জ্ঞানে, গরিমায়, অর্থেবিত্তে, শিক্ষাদীক্ষায় তারা এগিয়েও ছিল। কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ামি, মুসলমানদের প্রতি সীমাহীন ঘৃণা, আর দাস মানসিকতার কারনে তারা বাঙালী জাতির নেতৃত্ব দিতে পারেনি।

 

১৯৪৭ সালের সমসাময়িক সময়কালের ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায় - কীভাবে অবিভক্ত বাংলাকে তৎকালীন উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ভেঙে টুকরো করার পক্ষে রায় দিয়েছিল। সেদিন বাঙলা অবিভক্ত থাকলে- বাঙালী জাতির নেতৃত্ব দিত তখনকার পশ্চিম বাংলার কোলকাতা কেন্দ্রীক এ্যংলোবাঙালীরাই। বিশ্বে আজকের প্রায় ৩০ কোটি বাঙালির একক জাতিসত্তার স্ফুরণ ঘটতো -- সাহিত্যে, শিল্পে, অর্থনীতিতে, রাষ্ট্রনীতিতে। এমনকী বিজ্ঞানে, কলায়, মানবিক উন্নয়নে। কিন্তু তা হয়নি। আর না হওয়ার পিছনে উগ্র হিন্দুরাই প্রধানত দায়ী।

 

দেশভাগের পর আজকের বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) থেকে বাঙালিত্বকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করার হীন ষড়যন্ত্রে নামে পশ্চিম পাকিস্তানিরা। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলার সর্বত্র দুর্বৃত্ত ও ষড়যন্ত্রের কাঁকর মিশাতে থাকে। বাঙালিরা তা রুখে দাঁড়ায়। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের মুখের ভাষা বাংলা কেড়ে নিতে চায়, বাঙালিরা তা রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দেয়।

পশ্চিম পাকিস্তানিরা রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ ক'রে দেয়, - বাঙালিরা তার বিরুদ্ধে জীবন পণে রাস্তায় নামে, পাকিস্তানিরা পিছু হটে যায়।

পশ্চিম পাকিস্তানিরা ধর্মের ঢাক বাজাতে থাকে, পূর্ব বাংলার বাঙালিরা বলে--

   'হিন্দু না মুসলিম-  জিজ্ঞাসে কোন জন?

     ওরা সন্তান মোর মার। '

 

   'শুনহো মানুষ ভাই -

     সবার উপরে মানুষ সত্য - তাহার উপরে নাই।'

 

পশ্চিম পাকিস্তানিরা বললো 'মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই।'

বাঙালিরা গর্জে উঠলো -

'পদ্মা- মেঘনা- যমুনা

  তোমার আমার ঠিকানা'।

'সব বাঙালি অস্ত্র ধর

  বাংলাদেশ স্বাধীন কর।'

 'তুমি কে? আমি কে?

   বাঙালি - বাঙালি।'

 

একদিন পূর্ব বাংলার বাঙালীরা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা করলো। নিজস্ব পতাকা, নিজস্ব সীমানা, নিজস্ব জাতি সত্তার জন্ম, নিজস্ব পরিচিতি, নিজস্ব সংগ্রাম আর ঐতিহ্যের ঠিকানা। স্বাধীনভাবে স্বপ্ন বোনার সুবর্ণ সুযোগ পেল পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের বাঙালিরা।

 

কিন্তু পশ্চিম বাংলার বাঙালী ক্রমেই স্বকীয়তা হারাতে লাগলো। পূর্ব বাংলার বাঙালীকে যখন পশ্চিম পাকিস্তানি উর্দু আক্রমণ করে - পূর্ব বাংলার বাঙালিরা তাদের শানিত বাঙালিত্বের রক্তের বিনিময়ে রুখে দেয়!

আর পশ্চিম বাংলার কোলকাতা কেন্দ্রিক সংস্কৃতি সেবি আর তথাকথিত প্রগতিশীলরা হিন্দি কে ডেকে এনে কার্পেট গালিচায় বসতে দিল। প্রাণ ভরে আপ্যায়ন করলো। পূর্ব বাংলার বাঙালী যুবকেরা যখন নিজস্ব স্বকীয়তা রক্ষায় দিনরাত শ্লোগান দিচ্ছে --,

পশ্চিম বাংলার যুবকেরা তখন আন্তর্জাতিকতাবাদের ভ্রান্ত ভাবধারায় হাবুডুবু খাচ্ছে।

এভাবেই পশ্চিম বাংলার ক্রমাগতভাবে নিম্নমুখী পতন।

ক্রমাগতভাবে স্বকীয়তার বিপরীতে অবস্থান, এবং ধীরে ধীরে -------!

কী সাহিত্যে, কী অর্থনীতিতে, কী বিজ্ঞানে, কী রাষ্ট্রিকদেয় ভাবনায় - পশ্চিম বাংলার উজ্জ্বলতা আজ ফিকে হ'তে হ'তে পলেস্তারাহীন রঙচটা কোলকাতার দেয়াল। তারা বাংলা চর্চাটা পর্যন্ত আজ করতে পারেনা।

তারা হিন্দিতে খায়, হিন্দিতে ঘুমায়, হিন্দিতে স্বপ্ন দেখে।।

 

অন্যদিকে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশ আজ একটি গর্বিত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।

১৭ কোটি মানুষের এই দেশটি পৃথিবীতে ৩৭ তম অর্থনীতির দেশ, এবং বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়- কিংবা মানব উন্নয়ন ও সামাজিক উন্নয়নের নানাবিধ সূচকে এই উপমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে অবস্থান করছে।বাংলাদেশের পাট, আম, মিঠাপানির মাছ, ইলিশ, জামদানী, ঢাকার মসলিন সহ অনেক কিছুতেই জিনম আবিষ্কার করেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ভারত পাকিস্তানের চেয়ে ঢের বেশি। আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আজ পৃথিবীর ইতিহাস হিসেবে প্রতিবছর সম্মানিত হচ্ছে, ৭ মার্চের ভাষণ আজ মানবজাতির হেরিটেজের অংশ।

 

এককথায় অর্থনীতিতে, সাহিত্যে, ঐতিহ্যে, মানবিকতায় এবং স্বাতন্ত্র্যে বাংলাদেশ আজ সমস্ত পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৩০ কোটি বাঙালির পরিচিতি ও গর্বের জায়গা। বাংলাদেশকে নিয়ে ৩০ কোটি বাঙালী আজ মাথা উঁচু ক'রে গর্বের সাথে নিজস্ব পরিচয় দিতে পারে। এই বাংলাদেশ সকল বাঙালির চেতনার আধার। এই বাংলাদেশ সকল বাঙালির অস্তিত্বের শেষ ঠিকানা। সকল বাঙালির হৃদয়ের সোপান আজ বাংলাদেশ।

যে যে দেশেরই হোক সকল বাঙালি ও বাঙালী  জাতিস্বত্বাকে ধারণ করায় হোক বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতির মূল ধারা।

..........

লেখক রাকিব রহমান বাংলাদেশের একজন কবি ও প্রাবন্ধিক

Mailing List