একেই বলে বন্ধুত্বের টান! বিপ্লবী রামপ্রসাদ-আসফাকুল্লার ফাঁসি হয়েছিল একই দিনে, স্বাধীন ভারত কী মনে রেখেছে

একেই বলে বন্ধুত্বের টান! বিপ্লবী রামপ্রসাদ-আসফাকুল্লার ফাঁসি হয়েছিল একই দিনে, স্বাধীন ভারত কী মনে রেখেছে
05 Jun 2022, 01:30 PM

একেই বলে বন্ধুত্বের টান! বিপ্লবী রামপ্রসাদ-আসফাকুল্লার ফাঁসি হয়েছিল একই দিনে, স্বাধীন ভারত কী মনে রেখেছে

 

বাসবী ভাওয়াল

 

স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে মনের অলিন্দে উঁকি মারে এই কি সেই স্বাধীনতা! যার স্বপ্নে বিভোর হয়ে নিজের প্রাণকে উৎসর্গ করে দিতেও কুন্ঠা করেননি যাঁরা, তাঁরা আজ বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। হয়তো তাঁরা জ্বাজ্জল্যমান নক্ষত্র হয়ে লক্ষ্য করছেন আমাদের গতিবিধি। দেখছেন আমাদের দেশের বর্তমান নেতৃত্বকে। আর মিটমিট করে হাসছেন করুণ হাসি। বলছেন, ওরে পামর! এই কি সেই স্বাধীনতা, যার জন্য আমরা জীবন মরণ পণ করেছিলাম।

 

আজ ব্যক্তিসুখে লালায়িত জাতি, ভোগবাদ চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে আমাদের। কেউ বা চায় পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য কেউ বা ব্যক্তি সুখ আবার কেউ ধর্মীয় মোহে আচ্ছন্ন। অথচ একসময় বিপ্লবীরা ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া সঁপে দিয়েছিলেন দেশমাতৃকার চরণে। স্বাধীনতার সৈনিক এমন এক বীর সন্তান আসফাকুল্লা খান। রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে তাঁর প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, এই বন্ধুত্বে ফাটল ধরাবার প্রয়াসকে ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন তিনি।

 

অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী এই বীর বিপ্লবীর রূপে অনেক নারী আকৃষ্ট হয়ে যেতো। এতো সুন্দর ও নিখুঁত ভাবে  সৃষ্টি কর্তা তাঁকে তৈরি করেছিলেন যা তার রাজনৈতিক দর্শনের জন্য ছিল প্রতিকূল। তবে সেই প্রতিকূলতা কাটিয়ে ছিলেন তিনি তাঁর অবিচল লক্ষ্যে স্থির  থেকে। ধর্মপ্রাণা মায়ের প্রভাব তাঁর জীবনে ছিল অপরিসীম। বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এই বিপ্লবী মৃত্যুর সময় ফাঁসির দড়িতে চুম্বন করে আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েন। মাত্র সাতাশ বছর বয়সে হারিয়ে গেল বিপ্লবের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

 

রামপ্রসাদ বিসমিলের উর্দু কবিতার ভক্ত ছিলেন আসফাক। দুই বন্ধুর বন্ধুত্ব ছিল অটুট। এ যেন হিন্দু মুসলিম বন্ধুত্বের এক গৌরবময় গাথা। মৃত্যুতেও দুই বন্ধুর বন্ধুত্ব ছাপ রেখে যায় ইতিহাসের পাতায়। ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৯ শে ডিসেম্বর একই দিনে দুই বন্ধুর দুই ভিন্ন জেলে ফাঁসি হয়। রামপ্রসাদ বিসমিলের গোরখপুর জেলে আর আসফাকুল্লার ফৈজাবাদ জেলে।

 

আজ স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর দেখা যায় ধর্মীয় বিভেদের রাজনীতিকে কৌশল করে ক্ষমতায় থাকার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে ক্ষমতাসীন শক্তি, তখন মনে হয় এই দুই বিপ্লবীর আত্মবলিদান দেশবাসী আজ বিস্মৃত। স্বাধীনতার জন্য জীবন বিপন্ন করেছেন যাঁরা, তাঁরা যদি জানতে পারতেন যে এই স্বাধীনতা নামক সুমিষ্ট ফলের স্বাদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কুক্ষিগত। তাহলে তাঁদের জীবন বিস্বাদে ভরে যেত। ইতিহাসের পাতায় যে মুখগুলো দেখে গর্বে বুক ভরে ওঠে তা থাক হৃদয়ের গহীনে রত্নখচিত সিংহাসনে। চির দীপ্যমান থাকুক সম্প্রীতির সুদৃঢ় বন্ধন।

১৯০০ খ্রীষ্টাব্দের ২২ শে অক্টোবর আসফাকুল্লা খান উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরে জন্মগ্রহণ করেন। চৌরিচৌরা ঘটনার প্রেক্ষিতে গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলে দেশের যুবসমাজের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। আসফাকুল্লাও এই যুবসমাজের প্রতিনিধি। এ সময়েই তিনি বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দেন এবং বিসমিলের সঙ্গে পরিচিত হন। কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত এই বিপ্লবীদের উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুস্তান সোসালিষ্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের কাজকর্মের জন্য অর্থ সংগ্রহ। ১৯২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিসমিল গ্রেপ্তার হলেও আসফাকুল্লা পালিয়ে যান, দিল্লিতে গ্রেফতার হন তিনি।

রামপ্রসাদ বিসমিলের জন্ম ১৮৯৭ খ্রীষ্টাব্দের ১১ জুন, শাহজাহানপুরে। দুজনে এক জায়গায় জন্মেছিলেন। তিনি ছিলেন কবি। কিন্তু হাতে তুলে নিয়েছিলেন মাউজার পিস্তল। তাঁর কবিতা আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল আসফাকের বুকে। এক বন্ধুর সঙ্গে বিসমিলের গোপন ডেরায় পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। বিসমিল পুলিশের চর ভেবে চোখা চোখা প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন যুবক আসফাকুল্লার দিকে। মাথা উঁচু করে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর দাদা রিয়াসাতুল্লা বিসমিলের সহপাঠী ছিলেন। আর্য সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় স্থানীয় মুসলিম সমাজের কাছে তিনি কাফের হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কাছে পাখির চোখ বৃটিশ মুক্ত ভারত।

 

আসফাকুল্লা ফৈজাবাদ জেলে নিজেকে বদলে ফেলেছিলেন, নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন পবিত্র কোরানে। গোরক্ষপুর জেলে বসে মাকে চিঠি লিখেছিলেন বিসমিল। চোখে মুখে আতঙ্কের লেশমাত্র ছিল না। দুজনে দেখতে চেয়েছিলেন বৃটিশ মুক্ত ভারত। এখন ভারত নিশ্চয় ব্রিটিশমুক্ত। কিন্তু তাঁদের কথা ক’জন স্মরণে রেখেছেন?

 

লেখক: প্রধান শিক্ষিকা। শালবনি নিচুমঞ্জরী বালিকা বিদ্যালয়।

ads

Mailing List