তিস্তা-তোর্সার সাঁতার শেখা / গল্প

তিস্তা-তোর্সার সাঁতার শেখা / গল্প
26 Jun 2022, 12:15 PM

তিস্তা-তোর্সার সাঁতার শেখা / গল্প

 

সুদীপ সরকার

 

মেয়েদের উৎসাহ আর তাদের মায়ের উদ্দীপনায় শেষ পর্যন্ত দুই কন্যাকে সাঁতার ক্লাবে ভর্তি করলাম। নতুন কিছু শুরুর ব্যাপারে আমার চিরকালীন অনীহা বাতিক নিয়ে আমার স্ত্রী মেধা রীতিমতো ওয়াকিবহাল।

সোসিওলজি পড়ার সময় জেনেছিলাম, এটা নাকি মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কোনও পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে মেনে নেওয়া মানুষের স্বভাব বিরুদ্ধ। আমার নির্লিপ্ত থাকার নেপথ্যে হয়তো সেভাবে কোনও যুক্তি খাড়া করতে পারি না। কিন্তু ভেবে দেখেছি, ওই ক্লাবে যাওয়া, কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা, সাঁতারের কস্টিউম কিনতে গিয়ে স্পোর্টসের দোকানে লাইন দেওয়া, এই সব বাড়তি ঝক্কি এড়ানোর ভাবনা থেকেই বোধহয় আমার এই নিরুত্তাপ দশা।

সব কিছু ছাপিয়ে, মধ্যবিত্ত সংসারী মানুষ হিসেবে হাজার পাঁচেক টাকা খসানোর চিন্তাটিও যে উঁকি মারেনি তাই বা বলি কি করে। তবে উইমেন্স লিব এর যুগে মা-মেয়ের সম্মিলিত দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর দেখি না। শেষমেশ মেয়েরা ভর্তি হল সুইমিং ক্লাবে। ভর্তির সময় এককালীন হাজার পাঁচেক আর কস্টিউমের খরচা মিলিয়ে বেশ ভালোই গচ্চা গেল। মেধার সামনে এই ব্যাপারে উচ্চবাচ্চ করার জো নেই। ভুলেও যদি বলে ফেলি দু-এক কথা, অমনি বাক্য বাণে জর্জরিত হওয়ার আশঙ্কা ষোল আনার জায়গায় আঠারো আনা।

তবে এত গুলো টাকা জলে দিলেও সময়াভাবে কন্যাদের জল কেলি দেখার সুযোগ আমার হয়নি। সকাল সকাল যখন তারা মায়ের তত্বাবধানে সন্তরণে যায়, আমি তখন ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘণ্টা খানেক কসরত করে তারা যখন ফেরে তখন আমি অফিস যাওয়ার তোরজোড় করতে ব্যস্ত। সন্ধ্যে রাতে অফিস থেকে ফেরার পর কন্যাদের কাছে শুনি তাদের সাঁতার শেখার ইতিবৃত্ত।

ছোট কন্যা তোর্সা খুব হইহই করে বলতে থাকে ওর অভিজ্ঞতা, “আমি এখন ফ্লোট করতে পারছি বাবা। স্যার আমাকে রোজ দশটা করে ববিং নিতে বলেছে। ববিং নিতে গিয়ে আমি রোজ খানিকটা করে জল খেয়ে ফেলি।’’

মেয়ের কথা শুনে প্রথমে বুঝতে পারিনি। ববিং জিনিসটা কি বস্তু জানা ছিল না। মেধার কথায় যা বুঝলাম, ববিং মানে জলে চুবনি খাওয়া। আমাদের সময়টা ছিল ভিন্ন। সাঁতার শেখার জন্য পয়সা খরচা ছিল ভাবনার বাইরে। আমরা জানতাম, ছেলেপুলে জলে পড়লে নিজে নিজেই সাঁতার শিখে যায়। পাড়ার দাদা দিদি কাকা পিসি, এঁরাই ছিল কোচ।

ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। আমাদের বাড়িতে পেল্লায় এক পুকুর ছিল। লোকের মুখে মুখে নাম হয়েছিল দীঘি পুকুর। আসলে আমাদের পুকুর আর মজুমদারদের পুকুর দুটো পাশাপাশি ছিল। মাঝে বাঁশের খুঁটি দেখে সীমানা বোঝা যেত। ভরা বর্ষায় সীমানা দেওয়া বাঁশের খুঁটি গুলো চলে যেত জলের তলায়, তখন সরকারদের পুকুর আর মজুমদারদের পুকুরের ভাইভাই ভাব দেখে মনে হত বিশালাকার দীঘি বুঝি।

পরবর্তী কালে, আমার দাদুর জমানা শেষ হলে, ওই বংশ জাত খুঁটি গুলি আর নতুন করে প্রতিস্থাপন করার তাগিদ আমার বাবা কাকার ছিল না। মজুমদারদের তরফেও ছিল না সেই তাগিদ। আড়েবহরে পুকুরের চেহারাটা ছিল অতিকায়। তাই লোকে বলত দীঘি পুকুর।

আমাকে নিয়ে আমার মায়ের খুব ভয় ছিল, কেউ নাকি হাত দেখে বলেছিল জলে ফাঁড়া, তাই আমি যাতে পুকুরের কাছাকাছি না যাই, সেই ব্যাপারে মায়ের ছিল কড়া নজরদারি। এদিকে বাবা ছিল উল্টো মেরুর মানুষ। মায়ের চোখ এড়িয়ে আমাকে নিয়ে জলে ফেলে দিল একদিন, প্রথমটায় ভয় পেলেও হাত পা ছুড়ে কি ভাবে ভেসে থাকা যায়, শিখলাম খেলতে খেলতে। তারপর দিন কয়েকের ঝাপাঝাপি, ব্যাস। মায়ের অজান্তেই শিখে গেলাম সাঁতার। মা জানতে পেরে রাগ করেছিল বাবার হঠকারিতায়। কিন্তু বাবার যুক্তি ছিল, জলে ফাঁড়া কাটার সব থেকে ভালো উপায় জল কে ভয় না পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া।

সাঁতার শেখার পর থেকে পাড়ার অন্যান্য ছেলেদের সাথে কত যে দীঘি পুকুর পারাপার করেছি! তিস্তা তোর্সা র কাছে শুনি, ওদের নাকি ববিং করতে হয়, তারপর পুশ, ক্রল ইত্যাদির পর শিখতে হবে ফ্রিস্টাইল, ব্যাক ক্রলিং। মেধা অবশ্য ক্লাবের ব্যাবস্থাপনায় খুব খুশি। এদের নানা মাপের পুলে নানা মাপের ছেলে পুলের শেখার ব্যবস্থা। ড্রেস চেঞ্জিং রুম থেকে শুরু করে গার্জিয়ানদের বসার ব্যাবস্থা, ফিল্টার করে জল পরিশোধন, নিয়মিত কোচের উপস্থিতি ইত্যাদি ইত্যাদি। মুখে না বললেও, মনে মনে ভাবি, আমাদের ছিল ন্যাচারাল পুল, প্রাকৃতিক ফিল্টার আর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কোচ।

বলতে দ্বিধা নেই, আমি আমার বাবার মতো হতে পারিনি। অন্তত বাবা হিসেবে তো নয়ই। বাবার কথা বলতে গিয়ে আরেকজনের বাবার কথা এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল। সম্পর্কে পিতৃস্থানীয় হলেও, মেধার বাবাকে কোনদিন বাবা সম্বোধন করিনি সচেতন ভাবেই। এই নিয়ে মেধার কিছু ক্ষোভ বিক্ষোভ যে নেই তা নয়। তবে অন্যের বাবাকে বাবা ডাকা আমার ধাতে সইবে না সেটা ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম প্রথম থেকেই।

সে যাই হোক, বুড়ো কত্তার আবার এক বাতিক। জামাই কে দেখলেই তিনি তাঁর গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন। এদিকে মুশকিল হল, এই একই গল্প শুনে শুনে আমার কানের পোকা গুলো পর্যন্ত চঞ্চল হয়ে পড়ে। আজকাল সময়াভাবে তেনাদের পাড়ায় খুব একটা যাওয়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু কদাচিৎ কয়েক ঘণ্টার জন্য গেলেও তিনি আমাকে পাকড়াও করার তাল করেন। আজকাল অবিশ্যি নাতনিদের এগিয়ে দিয়ে আমি সটকে পড়ি কায়দা করে। তো যে গল্প টা বলার জন্য এই কথার অবতারণা, সেটা বলি।

আমাদের এই বুড়ো কত্তা জোয়ান কালে নাকি রীতিমতো শরীর চর্চা করতেন। গঙ্গাপারে বাড়ি। তাই নিয়মিত গঙ্গায় সাঁতরে বেড়াতেন ঘণ্টা খানেক। একদিন উনি গঙ্গায় সাঁতার দিচ্ছেন, সেই সময় হঠাৎ জোয়ার চলে আসে। জলের তোড়ে ঘাটে স্নান করতে আসা কয়েকজন লোক এদিক সেদিক ভেসে গেল। সাঁতার দিয়ে সবাই মোটামুটি সামাল দিলেও একজন তরুণী নাকি সামলাতে না পেরে ডুবতে বসল। ব্যস, হিরো নম্বর ওয়ান অমনি ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই মেয়েকে জল থেকে তুলে আনলেন। সাত পাড়ায় নাকি হিরো কে নিয়ে মাতামাতি হয়েছিল টানা কিছুদিন। গল্পের সেই তরুণী মেয়েটি বুড়ো কত্তাকে পরবর্তী কালে প্রেম নিবেদন করেছিল কিনা জিজ্ঞেস করেছিলাম মেধাকে। মেধা কিছু বাছাই করা বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বেশ কিছু দিন বাক্যালাপ স্থগিত রেখেছিল।

কিন্তু সিনেমার গল্প হতে হতেও হল না ভেবে আমার কিন্তু ভদ্রলোকের জন্য দুঃখ-ই হয়েছিল। জল থেকে ডুবতে বসা তরুণী কে তুলেও কিছুই ঘটল না, মাঝখান থেকে ভদ্রলোক আমার শাশুড়িকে বিয়ে করে বসলেন। অন্যদিকে মজার ব্যাপার হল, আমার শাশুড়ি মাতা আবার এই বীরত্বের কাহিনী নিয়ে বেশ গর্ব বোধ করেন, তিনি যে তিস্তা তোর্সা কে এই গল্প কতবার শুনিয়েছেন তার হিসেব নেই।

যাক, সেসব পুরনো কথা ছেড়ে বর্তমানে ফিরি। মাস খানেক হয়ে গেলেও সুইমিং ক্লাবে আমি গিয়ে উঠতে পারিনি। সবটাই সময়ের অভাব সেটা বললে সত্যের অপলাপ হবে। রবিবার অফিস ছুটি থাকে, ইচ্ছে করলেই যেতে পারতাম। কন্যাদ্বয়ের সন্তরণ প্রশিক্ষণ দেখার শখ যে হয় নি তাও না। শুধুমাত্র আলস্যের কারণে, নির্ধারিত সময়ের আগে নিদ্রা ভঙ্গের বিড়ম্বনা এড়াতে ও পথে পা বাড়ায়নি। মেধা এমনিতে খুব সাবধানী, মেয়েদের পিছনে পড়ে আছে দিনরাত। সে দিক থেকে দেখলে আমার উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়নি কারুর কাছেই। সেদিন কথায় কথায় মেধা বলল, রবিবার করে নাকি থানার বড়বাবু নিজে আসেন ক্লাবে। ওনার কন্যাটিও সাঁতার শেখে তিস্তা তোর্সার সাথে।

এই তথ্যটি জানার পরে পরেই মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। পাশের বাড়ির দাস বাবু মানুষ ভালো। কিন্তু ওনার স্ত্রী করুণা দেবী হলেন ওই কানা ছেলে কিন্তু নামে পদ্ম লোচন টাইপের মহিলা। সোজা করে বললে, অতি দজ্জাল প্রকৃতির মানুষ। দুই বাড়ির সীমানা লঙ্ঘন করে তিনি আমার বাড়ির দিকে ফুট খানেক সরে এসে জোর পূর্বক একটি গ্যারেজ ঘর তৈরির মতলব করছেন। মৌখিক আপত্তি বা স্বাভাবিক বাক্যালাপে লাভ হোল না দেখে পৌরসভাকে জানিয়েছি। তবে সুরাহা হবে এই আশা কম। ভাবলাম, ক্লাবেই বড় বাবুর সঙ্গে একবার আলাপ জমিয়ে নিতে পারলে এই ব্যাপারে পুলিশের সাহায্য প্রার্থনা করা যাবে।

যেমন ভাবনা তেমন কাজ। গত রবিবার কষ্ট করে ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম, মেয়েদের সঙ্গে সুইমিং ক্লাবে পৌঁছেও গেলাম। মেয়েরা দিব্যি জলে নেমে ববিং নিতে শুরু করল, নানা কায়দায় ভাসা ভাসির পালা চাক্ষুষ করতে করতেই দেখলাম বড় বাবু ঢুকলেন, সঙ্গে একজন ষণ্ডা মত লোক। আগে ভদ্রলোক কে কখনো দেখিনি বটে, মেধার ইশারায় চিনে নিলাম সহজে। থানার বড় বাবু বলে কথা, ক্লাবে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই দু-একজন কর্মকর্তা ব্যাস্ত হয়ে পড়ল, একজন চেয়ার এগিয়ে দিল চট করে। বড় বাবু বসলেন জুত করে। ষণ্ডা লোকটি দেখলাম ওনার থেকে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে থাকল। আমি সুযোগ বুঝে একটা চেয়ার নিয়ে বড় বাবুর পাশটি তে এসে বসলাম। আলাপ করার জন্য নমস্কার জানিয়ে বললাম, “আমার মেয়েরাও শিখছে দিন কয়েক হল। ওদের মায়ের কাছেই শুনলাম আপনি নিজেও আসেন মেয়েকে নিয়ে।’’

বড় বাবু বেশ অমায়িক মানুষ দেখলাম। বাবা হিসেবে খুব কর্তব্যপরায়ণ মনে হল। হেসে বললেন, “আমাদের চাকরি জানেন তো, সময়ই পাই না, রাত তিনটের আগে ঘুমোতে যেতে পারি না। সকালে আসা কঠিন। রোববারটা মাঝে মাঝে আসি আর কি।’’

আমি এটা সেটা বলে চললাম, দাস বাবুর খান্ডান্নি গিন্নির কথাটা সুযোগ বুঝে তুলব তুলব করছি। হঠাৎ ওনার ফোন বেজে উঠল, বড় বাবু উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত ভাবে কিছু কথা বললেন কারো সাথে তারপর আবার বসলেন চেয়ারে। পরিস্থিতি অনুকূল মনে হল না, কিছুক্ষণ চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে হোল।

খানিক পরে বড় বাবু নিজেই মুখ খুললেন, নিচু স্বরে বললেন, “দিন কয়েক আগে জামতলা স্টেট ব্যাঙ্কে ডাকাতি হয়েছে শুনেছেন তো? একজন ধরা পড়েছে বটে কিন্তু সে ব্যাটা নিতান্তই ভাড়াটে সৈনিক। মাস্টার মাইন্ড এখনো নাগালের বাইরে রয়েছে। ইন্টেলিজেন্স এর খবর, লোকটি অতি ধুরন্দর, এমনিতে গৃহস্ত, ছেলে বউ নিয়ে সংসার করছে আর পাঁচটা লোকের মতো। এই ধরুন আপনি, মেয়েদের নিয়ে সুইমিং ক্লাবে আসছেন সাঁতার শেখাতে, থানার দারোগার পাশে বসে গল্প করছেন, আপনার ওপর কি কেউ সন্দেহ করবে বলুন? তবে যা জাল বিছিয়েছি, ব্যাটা ধরা পড়বেই দিন কয়েকের মধ্যেই, তখন দেখাবো কত ধানে কত চাল।’’

বড় বাবুর চোখের ভাষায় এক অদ্ভুত কাঠিন্য লক্ষ্য করলাম। এর মধ্যেই ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠল, বাচ্চারা দুড়দাড় করে জল থেকে উঠে আসতে শুরু করল। বড় বাবুও উঠে পড়লেন, স্বাভাবিক ভদ্রতা বশত নমস্কার জানালাম। উনিও প্রতি নমস্কার জানিয়ে হাঁটা দিলেন। পিছনে ষণ্ডা লোকটা চলল রোবটের মতো। আমার শিরদাঁড়া বয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে এলো। দাস বাবুর দজ্জাল গিন্নির মুখ ঝামটা এই শিরশিরানি ধরানো চাহনির থেকে ঢের বেশি সহনীয় মনে হোল। থানার কথা আর ভাবব না মনে মনে ঠিক করলাম। জমি দখল হলেও না। মেধা মেয়েদের নিয়ে পা বাড়াল বাড়ির দিকে, আমিও ওদের পিছনে চললাম সন্তর্পণে।

………

 

লেখক: অতিরিক্ত জেলাশাসক, পশ্চিম মেদিনীপুর।

ads

Mailing List