চায়ের গুঁতো না ছুতো

চায়ের গুঁতো না ছুতো
10 Aug 2022, 10:00 AM

চায়ের গুঁতো না ছুতো

 

তনুম

 

ক্লান্ত বিকেলের উপরে সন্ধ্যে লাফালাফি করছে। অসিতের চায়ের দোকান বেশ জমে উঠেছে। তবে মন সবারই ভালো, তেমন টাও নয়। কেউ এসেছে, কেউ অপেক্ষা করেছে কেউবা আসতে পারেনি। টলমলো কাপে প্রত্যাশার চা মাঝেমধ্যেই ঠান্ডা হয়েছে। গাঢ় হয়েছে অভিমান, নিস্তেজ হয়েছে চা।

সময়ে চা গুলোলে সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই কবে থেকে শৈশবের চায়ের কাপে আধটা ভাঙ্গা বিস্কুট তুলতে গিয়ে বাকি অর্ধেকটাও ডুবে যাওয়ার পর হাহুতাশ থেকে শুরু। কৈশোরে চায়ের দোকানে রোমাঞ্চকর আলোচনাগুলোই তো যৌবনের দিকে নিয়ে গেছে। আর কলেজ ক্যান্টিনে প্রেয়সীর চোখের আয়নায় ক্রমাগত চা বাষ্পে ঝাপসা হয়েছে চশমার কাঁচ। সেই কাচ মুছতে কারো সময় গেছে বিস্তর। চশমা পরে আর দেখা মেলেনি উল্টোদিকে বসে থাকা মানুষটার। আবার কেউবা দ্রুততার সঙ্গে চা বাষ্প সরিয়েছে। আর বার্ধক্যের বাকিটা সময় তো চা চাইতেই যায়।

ইতিহাসের চা, বিজ্ঞানে চা, প্রেমে চা, ভালবাসায় চা, সমালোচনার চা, আড্ডায় চা থেকে সময়ে সময়ে চায়ের গুরুত্ব বেড়েছে। অতিথি এলে চা দিয়ে আপ্যায়ন করাটা বেশ সহজ। তবে যে অতিথি চা খায় না, তাকে আপ্যায়ন করা বিড়ম্বনা নয় কি। ১৬৫৭ সালে থমাস গারে নামক এক ইংরেজ সাহেব সম্ভবত প্রথম অতিথিদের চা দিয়ে আপ্যায়নের প্রথা শুরু করেন। বাঙালিরা সেই সাহেবের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে পারেন। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে চীনের এক রাজা সেন নাং গাছের তলায় চিন্তিত হয়ে বসেছিলেন। তাঁর ভৃত্য সামনেই ফোটাচ্ছিলেন জল। আচমকা হাওয়ায় সেই জলে উড়ে এসে পড়ে কিছু পাতা। চিন্তান্বিত রাজার মস্তিষ্কে সেই গন্ধ গুললে টনক নড়ে। সেই শুরু। রাজার গাছগাছড়া নিয়ে ছিল অসীম আগ্রহ। খুঁজে বের করলেন সেই সুগন্ধি পাতা। যার সুগন্ধে ভর করে বাঙালি তথা ভারতীয়দের সম্পর্ক এর গ্রাফ অদৃশ্য খাঁজে ওঠানামা করে।

শুধু তাই নয়, বিস্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবার পরে সমস্ত চীনা বাসীদের উৎসাহিত করে এই গাছ চাষ করবার জন্য। আজ তাঁকে ফাদার অফ টি মানা হয়। খ্রিস্টের জন্মের ১০০০ বছর পর চীনে তাং সাম্রাজ্যে চায়ের জনপ্রিয়তা বাড়ে। ১৩০০ থেকে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে মিং সাম্রাজ্যের অধীনে চায়ের চাহিদা, খ্যাতি ও সুগন্ধে ভরপুর হয় চীন। শুধু তাই নয়, চায়ের বিশ্ব ভ্রমণের শুরুটাও এই মিং সাম্রাজ্যের সময় থেকেই। ডাচরা প্রথম চা খেলেন ১৬১০ এ। ইংল্যান্ডের সাহেবরা আরো পরে। ১৬৫০ এ। উনিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত সাহেবরা যা খেয়েছিলেন সবই চীনের পাতা। তবে সাহেবদের ঠোঁটে চা ওঠার কিছু বছর আগে কফি উঠেছিল। আর সেই কফি দোকান গুলো থেকেই ভবিষ্যতে চায়ের গুণগ্রাহিতার শুরু।

প্রথমদিকে ঔষধি গুনেই চা জনপ্রিয় ছিল। গন্ধশীল পানীয় হিসেবে তার কদর কিছুটা পরে। কদর সময়ের সঙ্গে আদর হয়েছে। উনিশ শতকের শুরুতে ভারতবর্ষের আসামে প্রথম স্থানীয় চা গাছ আবিষ্কার করা হয়। ১৮৩৯ এ প্রথম ভারতে উৎপাদিত চা লন্ডনে বিক্রি হয়। ১৬৮৭ তে আফ্রিকায় চা চাষ হয়। তবে তা জনপ্রিয় হয় ১৯ শতকের গোড়ায়। কেনিয়া তানজানিয়া - এই দুটি দেশ যা উৎপাদনে ভূমিকা নিয়েছিল। জনৈক এক উৎসাহী জাপানি চীন থেকে চায়ের বীজ নিয়ে ১১০০ খ্রিস্টাব্দেই পশ্চিম জাপানে চা চাষ শুরু করেছিলেন। চা সুতোয় বাধা বিশ্ব মানব। চীনের উৎপাদিত দ্রব্য নিয়ে নাক সিঁটকালেও চা নিয়ে কোনও ছুতমার্গ বিশ্ববাসীর নেই। চায়ের কোন রং নেই, রং অনুভূতির। চায়ের উষ্ণতায় গলুক হৃদয়, নয়তো চায়ের ছুতো ফিরবে হয়ে গুঁতো।

Mailing List