সেমিনারের ফাঁকে ছোট্ট পেঙ্গুইনদের সঙ্গে আলাপ অস্ট্রেলিয়ায়

সেমিনারের ফাঁকে ছোট্ট পেঙ্গুইনদের সঙ্গে আলাপ অস্ট্রেলিয়ায়
31 Jul 2020, 06:34 PM

সেমিনারের ফাঁকে ছোট্ট পেঙ্গুইনদের সঙ্গে আলাপ অস্ট্রেলিয়ায়

ড. অমল মন্ডল

অষ্টাদশ উদ্ভিদবিদ্যার আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনু্ষ্ঠিত হয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে (২৩-৩০ জুলাই)। ভারতবর্ষে এখন ঘোর বর্ষাকাল। কিছু রাজ্যে যেমন পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ডে এখন রীতিমতো বানভাসী অবস্থা। ভৌগলিক কারণবশত দক্ষিণ গোলার্ধে কিন্তু এখন রীতিমতো শীতকাল। ঠাণ্ডা বলে ঠাণ্ডা। মাঝে-মাঝে রাতের দিকে ৫-৬ ডিগ্রিতে নেমে যাচ্ছিল। অস্ট্রেলিয়ানরা ঠাণ্ডাটা বেশ উপভোগ করছিল। আমরা কিন্তু মাফলার, শোয়েটার, চাদর, টুপি, উইনচিটার, সুট-ব্লেজার, সাধারণত শীতের যা যা পোশাক লাগে নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু ওদের দেখে কেন জানি না, আমরা এতটা ঠাণ্ডাতেও মাফলার বাঁধিনি। হয়তো মনে হতে পারে, মাফলারটা সেকেলে সেকেলে লাগে। দেখতে অনেকটা বুড়ো-বুড়ো লাগে। তাই, আমরা কিন্তু ঠাণ্ডার পোশাক খুব কমই ব্যবহার করেছি। ওদের সঙ্গে বেশ ঠাণ্ডাটা আমরাও চুটিয়ে উপভোগ করেছি।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের প্রধান আকর্ষণ অ্যাকোরিয়াম, যা কিনা শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করছে। সপ্তাহের প্রত্যেকটা দিন খুব ভিড় হয়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় শনিবার ও রবিবার। কারণ হিসেবে যেটা জানা গেল, অস্ট্রেলিয়ানরা টানা পাঁচদিন মানে, সোম থেকে শুক্র চুটিয়ে কাজ করে। বলা ভালো কাজ বেশি করে। কিন্তু শনি এবং রবিবার কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে না। এই দুটি দিন পরিবারের সঙ্গে বাচ্চাদের নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার যে বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পট রয়েছে, যেমন অ্যাকোরিয়াম, নানা প্রকার মিউজিয়াম, ওরা চুটিয়ে উপভোগ করে। সারা অস্ট্রেলিয়ায়, বিশেষ করে মেলবোর্নে পর্যটন ব্যাপারটা কোন উচ্চতায় পৌঁছানো যায়, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এতো সুন্দর রাস্তাঘাট, উন্নতমানের পরিবহন ব্যবস্থা। রাস্তায় কোনও প্রকার বাম্পার নেই। প্রত্যেকটি গাড়ি সাধারণত ৪০-৫০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিবেগে চলছে। সমস্ত গাড়িতেই কিন্তু দূষণরোধী যন্ত্র লাগানো আছে। আর ট্রাফিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ কম্পিউটারচালিত। কোথাও কোনও প্রকার ট্রাফিক নেই। সমস্ত ব্যাপারটাই কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ধূমপানের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। কেউ কিন্তু সিগারেট খেতে-খেতে রাস্তায় হাঁটে না। প্রত্যেকে শৃঙ্খলাপরায়ণ, নিয়মানুবর্তিতার সব চিহ্ন রেখে যাচ্ছে।

মেলবোর্নে ভারতীয় ছাত্রদের ওপর কী কারণে বর্বরোচিত আক্রমণ হয়েছিল, তার সঠিক কারণ কিছু বোঝা গেল না। হয়তো আমরা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমন্ত্রিত ছিলাম বলেই কোনও প্রকার কোনও বিদ্বেষ লক্ষ্য করলাম না। তবে এ কথা বলা যায় অস্ট্রেলিয়ানরা সবচেয়ে বেশি পরিবেশ সচেতন। বলা ভালো উদ্ভিদ ও প্রাণীদের কোনও প্রকার ক্ষতি করে না। উল্টে ওদের কী করে ভালো রাখা যায়, কী করে ওরা ভালো থাকবে, প্রত্যেক জায়গায় ঘুরতে গিয়ে প্রতিপদে আমরা সেটা লক্ষ্য করেছি। রাস্তায় কোনও প্রকার স্ট্রিট ডগ দেখা যাবে না। কোনও ভিখারির দেখা পাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবে হঠাৎ করে মেলবোর্ন শহরের প্রাণকেন্দ্র স্থলে রাতের দিকে গিটার হাতে গান গাইতে শুনলাম। পরিবর্তে সেই গান শুনে কেউ কেউ পথচারী সেই রাস্তার গায়ককে কিছু অস্ট্রেলিয়ান ডলার উপহার হিসেবে দিয়ে যাচ্ছেন। রাস্তার ধারে সুন্দর সুন্দর ফুটপাথ রয়েছে হেটে যাওয়ার জন্য। মানুষের হাটার ঠিক পাশে সাইকেল আরোহীদের যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রত্যেকটা বিষয় ভীষণ পরিকল্পনা করে করা হয়েছে।

মানুষজনও ভীষণ রকম সচেতন। যেখানে-সেখানে ওরা থুতু ফেলে না। রাস্তা নোংরা করে না। দু’বেলা করে রাস্তাঘাট ধোয়া-মোছা হচ্ছে। ট্রাম বা বাসে কোনও প্রকার কন্ডাক্টর নেই। ট্রামে বা বাসে চড়ে তারপর নির্দিষ্ট পরিমাণ অস্ট্রেলীয় ডলার দিয়ে টিকিট বক্সে ফেললে একটা এটিএম কার্ডের মতো টিকিট বেড়িয়ে আসবে। এছাড়াও আপনি এক বছরের জন্য বা এক মাসের জন্য স্ক্যাচকার্ড কিনে নিয়ে সারা বছর ট্রামে যাতায়াত করতে পারেন। মেলবোর্নে সমস্ত জায়গায় বেশকিছু অন্তর একটা করে ফ্রি ট্রাম রয়েছে। আপনি চাইলে খোঁজ খবর নিয়ে সেই ফ্রি ট্রামে করে সারা মেলবোর্ন শহর ঘুরে দেখতে পারেন। এটা একটা অভিনব লেগেছে আমার কাছে।

সারা শহর খুঁজে একটা মাত্র ভারতীয় রেস্টুরেন্ট পাওয়া গেল, সেখানেও কিন্তু ভারতীয়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অস্ট্রেলিয়ানদের সঙ্গে ভিড় লক্ষ্য করলাম। তাছাড়া সেখানে বেড়াতে আসা পর্যটকদরেও ভিড় রয়েছে। হয়তো সবসময় পাউরুটি, ডিম, চিজ জেলি জ্যাম বাটার খেতে –খেতে ওরাও মনে হয় এক ঘেয়ে হয়ে পড়েছে। তাই, বোধহয় আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ওরাও ভারতীয় রেস্টুরেন্টে সপরিবার ভিড় জমাচ্ছেন। দেখে তো ভালো লাগছিল। যে ওরা ভারতীয়দের খাবার ওরাও পছন্দ করে। তবে এটা হলফ করে বলা যায় যে ওদের খাবার আমরা খুব তৃপ্তি করে খেয়েছি, তা কিন্তু নয়। যতোদিন ভারতীয় রেস্টুরেন্ট খুঁজে পাইনি, ততদিন যাকে বলে চোখ-কান বন্ধ করে চালিয়ে দিয়েছি। তবে সম্মেলনস্থলে কিন্তু অস্ট্রেলীয় খাবারের সঙ্গে সঙ্গে ওখানকার ফলের মধ্যে আপেল, বিশেষ করে গ্রিন আপেল, চেরি, স্ট্রবেরি ইত্যাদি ভালো ছিল। আর কফি একেবারে নানান বৈচিত্র্যের কফি। একেবারে হাতে গরম বানিয়ে দিচ্ছিলেন এক সুন্দরীরা। সঙ্গে একগাল হাসি। সেটা দেখে মনে হচ্ছিল কফির সঙ্গে এই সুন্দর হাসি একবারে ফ্রি। শুধু কেমন কফি আপনার প্রয়োজন, সেটুকু বললেই হবে। বাকিটা শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। চায়ের তুলনায় অস্ট্রেলিয়া কিন্তু কফির প্রচলন বেশি। মাংসের মধ্যে গোমাংসা ও শুকরের মাংস বেশি খাওয়া হয়। আর নানা প্রকার সামুদ্রিক মাছ। তবে একটা কথা বলতেই হয়, ঝিনুকের কাঁচা মাংসের সঙ্গে মুসাম্বি লেবুর রস দিয়ে ভারতীয়রা ছাড়া বিশ্বের সব দেশের প্রতিনিধিরাই সেই ঝিনুকের কাঁচা মাংস উপভোগ করে খেতে দেখেছি। অবাক একটু লাগছিল। কেন না। কেন না এই ধরনের দৃশ্য আমরা তো ডিসকভারি চ্যানেল, অ্যানিমেল প্ল্যানেট ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে দেখে অভ্যস্ত। এভাবে সামনা-সামনি দেখব ভাবিনি।

সম্মেলন শুরু হত সকাল সাড়ে আটটা থেকে। মানে ভারতীয় সময় দুপুর একটা তিরিশ মিনিটে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আমাদের থেকে এগিয়ে। এই ঠাসা অনুষ্ঠান সত্ত্বেও আমরা ছ’জন মিলে মানে আমি ও আমার পাঁচজন গবেষক সময় বের করে নিজেদের প্রেজেন্টেশন শেষ করে একটা গাড়ি ভাড়া করে একদিন গেলাম আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট্ট ও সুন্দর পেঙ্গুইন দেখতে। সঙ্গে যোগ করলাম অস্ট্রেলিয়ান ক্যাঙারু দেখবার জন্য। মনে মনে ভাবছিলাম, ভারতবর্ষে ফিরে গিয়ে সেখানকার মানুষদের যদি বলি ক্যাঙ্গারু দেখা হয়ে ওঠেনি, কেউ কি আমাদের কথা মেনে নেবে? অস্ট্রেলিয়া ছাড়া নিউজিল্যান্ড এবং সামান্য চিলি আইল্যান্ডেও এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ছোট্ট পেঙ্গুইন দেখা পাওয়া যায় । অস্ট্রেলিয়ান শহর থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরে ফিলিপ আইল্যান্ডে একটা নেচারপার্ক তৈরি হয়েছে যেখানে সন্ধ্যা ছটার পর দলে দলে পেঙ্গুইন দেখা পাওয়া যায়। আমরা আমাদের দেশের কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ বলে থাকি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার এই নেচারপার্কে গিয়ে পেঙ্গুইনদের সহজ-সরলভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে সুন্দরভাবে সেনাবাহিনীর মার্চপাস্ট করার মতো এগিয়ে আসছে। দেখে মনে মনে ঈশ্বরকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ দিয়ে জায়গাটা উপভোগ করতে লাগলাম। সেই জায়গা থেকে চলে আসতে মন চাইছিল না। বারবার শুধু আমার বাড়ির সবার কথা মনে পড়ছিল। সেখানে হাজার হাজার পর্যটক ওদের ওই প্যারেড করে আসা দেখার জন্য প্রত্যেকদিন ভীড় করছেন। সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখার জন্য। ওখানে গেলে আপনি ওদের ঠিক দেখতে পারবেন। খালি হাতে ফিরতে হবে না। পেঙ্গুইনরা আপনাকে নিরাশ করবে না। সারারাত পেঙ্গুইনরা ওই দ্বীপে কাটিয়ে ভোর বেলা সূর্য ওঠার ঠিক আগেই প্রত্যেক সমুদ্রের তলায় চলে যায়। এই সময়টা আসলে পেঙ্গুইনদের প্রজননের সময়। তাই তারা নির্জনদ্বীপ পছন্দ করে। প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা ছয় থেকে দশ ডিগ্রির মধ্যে থাকে। পেঙ্গুইনরা এই ধরনের তাপমাত্রাও ওদের বেশ পছন্দের তালিকায় রয়েছে। এই বার এই পেঙ্গুইনদের সম্বন্ধে কিছু তথ্য আপনাদের জানাই।

প্রথমত, এরা পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট্ট পেঙ্গুইন। লম্বায় প্রায় ৩৩ সেন্টিমিটার।

দ্বিতীয়ত, এই ধরনের সুন্দর পেঙ্গুইন শুধুমাত্র দক্ষিণ গোলার্ধে দেখা যায়।

তৃতীয়ত, এরা সমুদ্রের জলে থাকাকালীন জলের মধ্যে ঘুমোতে পারে। সারা সপ্তাহ ধরে সমুদ্রের জলে থাকতে পারে।

চতুর্থত, এদের শরীরে জলপ্রতিরোধী পালক রয়েছে। যা কিনা পেঙ্গুইনদের শরীরের চামড়াকে শুষ্ক রাখতে সাহায্য করে এবং ছোট ছোট সমুদ্রের মাছ শিকার ধরার জন্য সমুদ্রের অনেক গভীরে বিচরণ করতে পারে।

পঞ্চমত, পেঙ্গুইনরা সাধারণত দলবেঁধে সারাদিনে ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার সমু্দ্রে ঘুরে বেড়াতে পারে।

সপ্তমত, এই ছোট্ট পেঙ্গুইনদের খুব ঘন পালক রয়েছে যেগুলো দেখতে খুব কালো রঙের নয়, কিন্তু খুব ঘন উজ্জ্বল নীল রঙের হয়ে থাকে। এই অতি উজ্জ্বল নীল রঙ কিন্তু পেঙ্গুইনদের সমুদ্রের জলের সঙ্গে মিশে থাকতে সাহায্য করে। এই ভাবে নিজের পালকের এবং সমুদ্রের জলের রঙ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার জন্য সমুদ্রের জলের ওপর থেকে খুব সহজে এদের বোঝা যায় না।

অষ্টমত, পেঙ্গুইনদের বিপদের মধ্যে সার্ক, যা কিনা পেঙ্গুইনদের ধরে খেয়ে ফেলে এবং দলে দলে সার্ক (হাঙর মাছ) এসে অতর্কিতে পেঙ্গুইদের আক্রমণ করে। তাছাড়া সমুদ্রের মধ্যে ছোট ছোট মাছের আধিক্য কমে গেলে (যে মাছগুলো পেঙ্গুইনদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে) তখন এই পেঙ্গুইনদের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। এছাড়া প্লাস্টিক ও তৈল কণিকা জলের মধ্যে মিশে থাকলে এদের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকছে। এই পেঙ্গুইনরা যখন সমুদ্রের জলে থেকে আইল্যান্ডে উঠে আসে তখন বেড়াল, কুকুর ও শেয়াল এদের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে পারে। একটা শেয়াল এক রাতের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০টা পেঙ্গুইন মেরে ফেলতে পারে। এতো বেশি পরিমাণে এই অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ফিলিপ আইল্যান্ডে আসার প্রধান কারণ যে সংগঠক এই প্রকৃতির পার্ক সৃষ্টি করেছেন সঙ্গে যে স্বেচ্ছাসেবকদের রয়েছেন, তাদের সব সময় তীক্ষ্ন দৃষ্টি থাকে এই ধরনের শেয়াল কুকুর ও বেড়ালদের উপদ্রব থেকে এই ছোট্ট পেঙ্গুইনদের বাঁচানোর জন্য।

নবমত, ওই খানে যে হাজার-হাজার পর্যটক প্রত্যেকদিন ওদের প্যারেড দেখতে যাচ্ছেন, তাঁদের উদ্দেশে বলা রয়েছে, কোনও প্রকার ছবি তুলবেন না, পেঙ্গুইনদের হাত দিয়ে ছোঁবেন না। কোনও প্রকার বিরক্ত এরা পছন্দ করে না। বিরক্ত করলে ওরা আর এই ফিলিপ আইল্যান্ডে আসবে না। প্রত্যেক পর্যটক কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে সেই সব সাবধানবাণী পালন করছেন। সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য ফিলিপ আইল্যান্ড নেচারপাকর্কে ২০০৬ সালে ভিক্টোরিয়ান ট্যুরিজিম পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

এই ছোট্ট পেঙ্গুইনকে জীববিজ্ঞানের শ্রেণি বিন্যাসের জন্য এরা কর্ডাটা পর্বের। শ্রেণি এভিস, বিভাগ স্পিনিসসিফোরমেস, গোত্র স্পিনিসসিডি এবং ইডিপটুলা এবং প্রজাতি মাইনর।

অষ্টাদশতম আন্তর্জাতিক উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়ক সম্মেলন যা কিনা বারো দিনের অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে  আন্তর্জাতিক সম্মেলন সম্পূর্ণ করে ফিরে আসতে যেন মন চাই না। কতো কিছুই তো যেন স্মৃতিতে জলজল করছে। বলতে, জানাতে ইচ্ছে করছে। ওরা যদি এতো ভালোভাবে দেশটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে, আমাদের দেশ ভারতবর্ষ তো বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। আমরা কি ওই ভাবে আমাদের দেশটাকে ওইরকম সুন্দর ভাবে গড়তে পারি না। আসুন না আমরা সকলে মিলে আমাদের দেশটাকে একটা সুন্দর পরিচ্ছন্ন গড়ে তুলি। কবি সুকান্তের ভাষায় যেন বলতে ইচ্ছে করে এই ভারতবর্ষকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব। এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

আমি যে সত্যি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে যেতে পারব ভাবিনি। কেননা, বেশ কিছু সমস্যা, যেমন টাকা-পয়সার অপ্রতুলতা একটা বড় কারণ ছিল। তেমনই যেখানে অস্ট্রেলিয়ার ভিসার জন্য আবেদনপত্র জমা দিয়েছিলাম সেই এক প্রাইভেট কোম্পানি আমার সমস্ত তথ্য সঙ্গে পাসপোর্টটাও হারিয়ে ফেলে।  বিষয়টা জানতে পারি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার চারদিন আগে। আমি তখন ডিপার্টমেন্টে প্রথম সেমেস্টারে একটা ক্লাস আমার নিজের ল্যাবরেটরিতে বসে নানা বিষয়ে ভাবছি।  ঠিক তখনই রনজিৎ বসু আমাদের বিভাগের কর্মী এসে বললেন স্যর, একটা ফোন এসেছে দিল্লি থেকে। সম্ভবত ভিসা অফিস থেকে। ইংরেজিতে কথা বলছেন ভদ্রমহিলা, আপনাকে চাইছেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা ধরে কথোপকথন চলল বেশ কিছুক্ষণ। ওনার ফোন করার উদ্দেশ্য ছিল, আমার সঙ্গে যে পাঁচজন অস্ট্রেলিয়া যাবেন তাঁরা সত্যি গবেষণার কাজে যুক্ত আছেন কি না। বা থাকলে কতদিন। কী কারণে অস্ট্রেলিয়া যাওয়া এই সব নানা বিষয়, যা ভিসার জন্য জরুরি।

সব কথাবার্তা শেষ হয়ে যেতে আমার কেমন যেন মনে হল, আচ্ছা আমার ভিসার বর্তমান কী পরিস্থিতি রয়েছে। বা কবে নাগাদ আমি ভিসা পেতে পারি? উনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, প্রফেসর মণ্ডল কতদিন আগে আপনি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন? আমি বললাম, প্রায় দুমাস আগে। উনি তৎক্ষনাত আমার পাসপোর্ট নম্বর জানতে চাইলেন। আমি ওনাকে জাস্ট হোল্ডঅন বলে ল্যাবে ঢুকে পাসপোর্ট নম্বরটা নিয়ে গিয়ে বললাম, সঙ্গে সঙ্গে উনি উত্তর দিলেন, দুঃখিত আপনার এই নম্বরে কোনও তথ্য অস্ট্রেলিয়ান ভিসা অফিসে জমা পড়েনি। আমি সঙ্গে সঙ্গে যে সংস্থায় আমার সমস্ত তথ্য জমা দিয়েছিলাম, সেখানে যোগাযোগ করে বিভাগীয় প্রধানকে জানিয়ে দিয়ে ওই দিন বিকেলেই গোয়েন্দা দফতরের প্রধান রাজীব কুমারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। উনি বিষয়টা শুনে তাজ্জব বনে গেলেন। এতো বড় রেপুটেড সংস্থা কিনা সব কিছু হারিয়ে ফেলল? আর যদি মিসপ্লেসড হয়েই থাকে তা হলেও প্রার্থীকে সঠিক সময়ে জানানো হল না কেন? উনি নিজে কিছু ফোর্স নিয়ে সেই সংস্থার মেন গেটে তালা লাগিয়ে সংস্থার প্রধানকে ডেকে লিখিত নিলেন ২১ জুলাই ফ্লাইট আর ২০ তারিখের মধ্যে আমার পাসপোর্ট-ভিসা সঙ্গে ফ্লাইটের টিকিট রেডি করে দেবেন। এই ভাবে সমস্ত বাধা সরিয়ে আমার স্ত্রী ও কন্যাকে রাতে সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার উদ্দেশে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইট ধরলাম। পুরো ঘটনাটাই আমার কাছে অলৌকিক মনে হল। আর অসম্ভব মনের জোরে আমি অস্ট্রেলিয়ায় অষ্টাদশতম উদ্ভিদবিদ্যার আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে পেরেছিলাম।

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। আমার বাবা-মাকে ধন্যবাদ, সব সময় যাঁরা আমাকে উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন। আমার স্ত্রী, আমার ছোট্টো মেয়ে তাতাই, আমার প্রিয় দাদা-বৌদি, আমার প্রিয় গবেষকেরা যাঁরা সবসময় আমাকে বলে গিয়েছেন- স্যর, আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি না যেতে পারলে সম্মেলনই হবে না। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

যাক, শত বাধার মধ্যেও আমি গেলাম, দেখলাম আর জয় করলাম। কেননা, এত বড় মঞ্চে কোনওদিন গবেষণার জন্য আলোকপাত করিনি। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি। কিন্তু এখানে সরাসরি বিশ্বমঞ্চে। বিশ্বের তাবড় তাবড় উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, টেক্সোনমিস্ট, যাঁদের কথা আমরা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পঠন-পাঠনের সময় শুনে এসেছি, এখন আমি অধ্যাপক হয়ে সেই সব বিজ্ঞানীদের কথাও বলে থাকি। তাঁদেরকে এতো কাছে থেকে দেখব তাঁদের সঙ্গে কথা বলব। কিছু অজানা বিষয় নিয়ে কথা বলার সৌভাগ্য আমি কোনওদিন ভাবিনি।, তাই ঈশ্বর তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই। আমি তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ, চিরঋণী।

                 .................................

লেখক বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটানি বিভাবের অধ্যাপক

Mailing List