দীর্ঘতম প্যাসেঞ্জার ট্রেনে রেকর্ড গড়লো সুইজারল্যান্ড! কিভাবে? জেনে নিন ইতিহাস

দীর্ঘতম প্যাসেঞ্জার ট্রেনে রেকর্ড গড়লো সুইজারল্যান্ড! কিভাবে? জেনে নিন ইতিহাস
07 Nov 2022, 12:45 PM

দীর্ঘতম প্যাসেঞ্জার ট্রেনে রেকর্ড গড়লো সুইজারল্যান্ড! কিভাবে? জেনে নিন ইতিহাস

 

দীপান্বিতা ঘোষ

 

আমরা সবাই ঘড়িতে সময় দেখে ট্রেন ধরতে যাই। কিন্তু বেশীরভাগ সময় ট্রেন লেট থাকে। সেটা এক ঘন্টা হোক বা এক মিনিট। কখনো আবার অনেক বেশী। কিন্তু পৃথিবীতে এমনও রেল পরিষেবা আছে, যেখানে ট্রেন আসার সময় দেখে ঘড়ির টাইমও মিলিয়ে নেওয়া যায়। সেই রকমই একটি রেল পরিষেবা হলো "সুইস রেল পরিষেবা"। এতোটাই সময় সচেতন সুইজারল্যান্ডের রেল দপ্তর। ইউরোপের অতি উন্নত এবং বিত্তশালী দেশ হলো সুইজারল্যান্ড।

সুইজারল্যান্ড এর রেল, ঘড়ি এবং চকলেট পৃথিবী বিখ্যাত। সুইজারল্যান্ডের প্রশাসনিক রাজধানী বের্ন হলেও সবচেয়ে পরিচিত শহরগুলো হলো জুরিখ ও জেনেভা।

 

ভূপ্রকৃতি:

সুইজারল্যান্ডকে জুরা, সুইজারল্যান্ডীয় মালভূমি এবং আল্পস পার্বত্য অঞ্চল এই তি‌ন ভাগে ভাগ করা যায়। সুইজারল্যান্ড তার পর্বতমালার জন্য পরিচিত। (দক্ষিণে আল্পস পর্বতমালা, উত্তর-পশ্চিমে জুরা), তবে এটিতে পাহাড়, সমভূমি ছাড়াও  বড় হ্রদের একটি কেন্দ্রীয় মালভূমিও রয়েছে।

জলবায়ু:

জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ তবে উচ্চতার সাথে সাথে উষ্ণতা পরিবর্তিত হয়। সুইজারল্যান্ডে শীতল রৌদ্রকারোজ্জ্বল, তুষারময় শীতকাল এবং মাঝে মাঝে ঝর্ণা সহ উষ্ণ-আর্দ্র-মেঘলা গ্রীষ্মকাল থাকে।

কল্পলোকে হারিয়ে যাওয়ার সমগ্র আয়োজন:

তুষারে ঢাকা ছোট-বড়ো পাহাড়, বড়ো বড়ো পর্বতশ্রেণী, অন্ধকার-শীতল দীর্ঘ টানেল, বিপদজনক ঝুলন্ত সেতু, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গড়ে ওঠা ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম, কারিগরি দক্ষতায় গড়ে ওঠা বিরাট বিরাট শহর; নীল জলের হ্রদের উপর বৃষ্টি পড়া, গাছের পাতায় তুষার ঝরা, পাহাড়ের উপর বরফ জমা।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার সুনিপুণ মিলন চোখে পড়ে সুইস রেলের জানলায় চোখ রাখলে। প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর মোহময়ী রূপের সঙ্গে কারিগরি দক্ষতার উন্নত প্রকৌশলীর মিলন প্রকৃতির সৌন্দর্যকে আরো মোহময়ীকরে ধরা দেয়। রেলের কামরার বাইরের দিকে চোখ রেখে বসে থাকলে প্রকৃতি এবং মানুষের অপূর্ব সৃষ্টি সিনেমার পর্দার মতো সরে সরে যেতে থাকে পিছনের দিকে। তখন মানুষ আর বাস্তব জগতে থাকতে পারে না যেন কোনো কল্প লোকে হারিয়ে যায়।

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গভীর সুড়ঙ্গ রেলপথ:

উনিশ শতকের প্রথম দিকে সুইজারল্যান্ডের প্রকৌশলীরা যখন ভেবেছিলেন নানান সুড়ঙ্গ ও ঝুলন্ত ব্রিজের মাধ্যমে পুরো সুইস-আল্পস-পার্বত্য অঞ্চলকে এক সুতোয় বেঁধে দেবেন। তখন মনে হয়েছিল সেটা নিতান্তই ভাবনার কথা বা পাগলের প্রলাপ…..বাস্তবে তা কখনোই সম্ভব নয়। কিন্তু অতি উন্নত-প্রকৌশল কিভাবে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলকে সুড়ঙ্গ আর ঝুলন্ত সেতু দিয়ে দুর্গম প্রকৃতিকে হাতের মুঠোয় এনেছে তা সুইজারল্যান্ডের আল্পস পার্বত্য অঞ্চলকে না দেখলে কখনোই বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময় ঘটিয়েছে 57 কিমি দীর্ঘ রেলপথ। যা ইউরোপকে উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম অতি দ্রুত জুড়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এর জন্য নানা সুড়ঙ্গ, নানা ঝুলন্ত ব্রিজ তৈরি হলেও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হোলো আল্পস পর্বতের নিচ দিয়ে 57 কিমি দীর্ঘ সুড়ঙ্গ রেলপথ। এটি দুর্গম অঞ্চলে দ্রুতগতির রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।

বিশ্বের দীর্ঘ ও গভীর সুড়ঙ্গের উদ্বোধন:

সুইজারল্যান্ডের এর মধ্যবর্তী ইউরি ক্যান্টনের এর্স্টফিল্ড থেকে আল্পসের নীচ দিয়ে তিসিনো ক্যান্টনের বোদিও পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে 57 কিমি দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ। গোথার্ড পাসের নিচ দিয়ে রেল সুড়ঙ্গ নির্মাণে 1947 সালে প্রথম খসড়া নকশা তৈরি করেন সুইস প্রকৌশলী গার্ল এডুয়ার্ড গ্রানার। কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও নির্মাণ খরচের ব্যাপকতার কারণে নির্মাণের কাজ পিছিয়ে যায়। 1999 সালে পুনরায় এর কাজ শুরু হয়। পরে 17 বছর সময় আর 12 বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ খরচে অবশেষে গোথার্ড বেজ টানেল তার প্রথম যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়েছে।

কোথাও কোথাও গভীরতা ভূপৃষ্ঠ থেকে 2 থেকে 3 কিমি। প্রকৌশলীদের 73 ধরনের পাথর খুঁড়তে হয়েছে। যেগুলোর কোনও কোনটি ভীষণ শক্ত গ্রানাইট। ভূ-গর্ভ থেকে খোঁড়া এই পাথরের পরিমাণ 2 কোটি 80 লাখ টন।

প্রায় 2 দশক ধরে নির্মাণ কাজ চলার পর সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ইউহান স্নেইডার আম্মান বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গভীর গটহার্ট সুড়ঙ্গ রেলপথের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের আগে মুসলিম, খ্রিস্টান এবং ইহুদি ধর্মীয় যাজকদের নিয়ে বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়।

ফলাফল:

i) ইউরোপের পণ্য পরিবহনে এই রেলপথ এক নতুন বিপ্লব ঘটায়। সুড়ঙ্গটি তৈরীর ফলে এখন নেদারল্যান্ডসের বন্দর শহর রটারডাম থেকে ইটালির জেনোয়া বন্দর পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।

ii) সুইজারল্যান্ডের জুরিখ থেকে ইতালির মিলান পর্যন্ত ভ্রমণের সময়সীমা বর্তমানের চেয়ে এক ঘন্টা কমেছে।

iii) এছাড়া এই সুড়ঙ্গটি বিশ্বের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডে পা রেখে ট্রেনের পাস নিয়ে নিলেই টুরিস্টদের জন্য সুইস যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্ত দরজা খুলে যায়। ট্রেন থেকে শুরু করে স্টিমার, বোট, বাস সবই এক সূত্রে গাঁথা। তাই সুইস রেলের পাস নিয়ে নিলেই দেশটির এক প্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত ট্রেনে বসেই দেখে নেওয়া যায়।

Mailing List