স্বামীজির স্বপ্নের আশ্রম

স্বামীজির স্বপ্নের আশ্রম
24 Nov 2022, 10:50 AM

স্বামীজির স্বপ্নের আশ্রম

 

সুদর্শন নন্দী

 

স্বদেশ ও বিদেশে স্বামী বিবেকানন্দ বেদান্তের যে প্রচার করেছিলেন তাতে স্বাভাবিক ভাবেই মনে হতে পারে স্বামীজি শুধু ছিলেন অদ্বৈতের পূজারী। আসলে এ ভাবনা আসে স্বামীজিকে সঠিক অনুধাবনের অভাব বা অজ্ঞতার জন্য। ঠিক যেমন বিদেশে স্বামীজি ঠাকুরকে নিয়ে কোনও কথা বলেন নি বলে কয়েকজন গুরুভক্ত বিশেষ করে বাবুরামের (স্বামী প্রেমানন্দ) এরকমই ধারণা হয়। কিন্তু জ্ঞান ও বিবেক দিয়ে তাঁকে যখন অনুশীলন করা হয় দেখা যায় সেসব ধারণা কতো ভুল। এ কথা ঠিক যে বিদেশ ও স্বদেশে স্বামীজি অদ্বৈত বেদান্ত বিশেষ ভাবে প্রচার করেছিলেন, কিন্তু তা বলে তিনি শুধু অদ্বৈতবাদী ছিলেন বললে সেটা ভুল ও অবিচার করা হয় এই মহান মানবপ্রেমিকের সাথে। দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত ও অদ্বৈত এই তিন ধারা যে পরস্পর পরস্পরের সাথে বিরোধী নয়, তা তিনি অনেক জায়গায় বলেছেন। একতলা, দুতলা তিনতলা হয়ে ছাদে ওঠার মতো ওগুলিও আধ্যাত্মিক জীবনের তিনটি ধাপ। চরম বা শেষ ধাপ হল  অদ্বৈতভাব। ঠাকুর সে কথা বারে বারে উদাহরণ টেনে বলে গেছেন। যত পথ তত মতের যে বিশ্বজনীন ভাব ও উপলব্ধি ঠাকুর ছড়িয়ে গেছেন তাতে তিনি কোনটিকে মিথ্যা বলেননি। সব সত্য। নিম্নতর সত্য বা চরম সত্য। আর তাই তাঁর মুখ থেকে শুনি ঈশ্বর সাকার, নিরাকার আর কতো কি বলে শেষ করা যায় না।

তাঁরই প্রধান শিষ্য, যাকে দেখিয়ে ঠাকুর বলেছিলেন নরেন হাঁক দিবে, সেই স্বামী বিবেকানন্দই ঠাকুরের শিব জ্ঞানে জীবসেবাকেই পরম ধ্যান ও কর্তব্য হিসেবে নিয়ে ছিলেন। ভারত ও ভারতবাসী স্বামীজির শ্বাস-প্রশ্বাস। আলোচ্য নিবন্ধে আসার জন্য তাঁর এই প্রেক্ষাপটটি স্বামীজির ভক্ত ও পাঠক মাত্রেই অবগত আছেন। আসি পরের বক্তব্যে। স্বামীজি একদিকে যেমন সংগঠনের অতি প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেন তেমন নির্গুণ ব্রহ্মের সাধনার ইচ্ছে স্বল্পায়ু জীবনের শেষের দিকে প্রবল হয়েছিল। সংগঠন তিনি গড়েছিলেন গুরু ভাইদের নিয়ে। যার ফলশ্রুতি হিসাব আমরা পেয়েছি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। আর বেদান্ত প্রচার, প্রসার এবং দেশ বিদেশে এই প্রচার ও প্রসারের বিকাশে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করা। আর এটা চেয়েছিলেন হিমালয়ের নির্জন স্থানে।

স্বামীজি বললেনঃ “হিমালয়ে আমার চিন্তা আরও স্বচ্ছ হয়। স্নায়ু গুলি আরও শান্ত হয়”।  স্বামীজি যেটি বলতে চাইলেন সেটি হল- অদ্বৈত সাধনার সর্বোত্তম স্থান হিমালয়। হিমালয়ের উত্তুঙ্গতা ও শুভ্র সাত্বিকতা মনকে নিরাকার ব্রহ্ম অনুধ্যানের উপযোগী করে তোলে। এই অদ্বৈত সাধনার এই প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে স্বামীজি একবার এক শিষ্যকে বলেছিলেন- হিমালয় কি বিরাট, কি অতুলনীয় এর সৌন্দর্য, কিন্তু হিমালয়কে যিনি সৃষ্টি করেছেন- বিরাটের সেই সৃষ্টি কর্তা তাহলে কতই না সুন্দর! তাই হিমালয়ে বাস করে বা হিমালয়কে দেখে সেই বিরাটের ধ্যান করা এবং ক্ষুদ্র আমিকে অতিক্রম করে বিরাটের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করার জন্যই এই আশ্রম। আর ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ দেব বলতেন খোলা আকাশ, বিশাল সমুদ্র আর উন্মুক্ত প্রান্তর দেখলে অনন্তের ধারণা হয়। অর্থাৎ গুরুর ভাবনার সাথে শিষ্যের চিন্তার সমান ও সমান্তরাল টিউনিং। আর ঠাকুরও তো ছিলেন অদ্বৈতের সাধক। মা সারদা সে কথা আরেকবার মনে করে দিয়েছিলেন যখন অদ্বৈত আশ্রমে ঠাকুরের ফটো বা মূর্তি রেখে ধুপ ধুনো দেওয়া নিয়ে আশ্রমিকদের মতান্তর হয়।

হিমালয়ে এই আশ্রম গড়ার বাসনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে ইউরোপ ভ্রমণের সময়। আমরা জানি ১৭ই জুলাই ১৮৯৬, স্বামীজি সদলবলে ইউরোপ ভ্রমণে বের হন। ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে প্যারিস হয়ে স্বামীজি পৌঁছন সুইজারল্যান্ডে। সুইজারল্যাণ্ডের আল্পস পর্বতমালা ভ্রমণের সময় সেখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে হিমালয়ের তুষারমণ্ডিত পর্বতশৃঙ্গ পরিবেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁর স্মরণে উদ্বেলিত হতে থাকে। গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে হিমালয়ে একটি মঠ স্থাপন করার বাসনা তাঁর তীব্র হয়। একথা তিনি আলমোড়ায় বদ্রি শাহ কে জানান এবং অতি নির্জন জায়গা খোঁজার কথাও বলেন। এ প্রসঙ্গে স্বামীজির আল মোড়া ভ্রমণের উপর আমরা একটু আলোকপাত করব।

১৮৯০ সালের মাঝামাঝি গুরুভাই স্বামী অখণ্ডানন্দকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীজি প্রথম হিমালয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন। সেবার তাঁরা দুর্গম পার্বত্যপথ পায়ে হেঁটে নৈনিতাল হয়ে আলমোড়ায় যান। আলমোড়ার পথে তৃতীয় দিনে স্বল্প দূরে কাঁকড়িঘাটে এক ঝর্ণায় স্নান করে এক অশ্বত্থ গাছের নিচে স্বামীজী ধ্যানে বসলেন। এবং সে ধ্যানে তাঁর বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডর বিষয়ে এক গভীর অনুভূতি হয়। তাঁর অনুভূতি হয় যে এই বৃহৎ-জগৎ ও অণু-জগৎ একই সুতোয় গাথা। বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড ও অণু-ব্রহ্মাণ্ড একই নিয়মে সংগঠিত। আলমোড়ায় পৌঁছে স্বামীজি লালা বদ্রি শাহ-র আতিথ্য গ্রহণ করে কিছু দিন ছিলেন। 

স্বামীজি দ্বিতীয়বার আলমোড়া যাত্রা শুরু করেন ৬ই মে ১৮৯৭। কাঠগোদাম থেকে নৈনিতালের পথে ১১ই মে আলমোড়ায় পৌঁছন। উদ্দেশ্য হিমালয়ে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করা। সেবার বিপুল সম্বর্ধনা দেওয়া হয় আলমোড়াতে। সেই সম্বর্ধনার উত্তরে যে অভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন স্বামীজি, তাঁর বেশির ভাগ জুড়ে ছিল হিমালয়-বন্দনা। হিমালয় যে বৈরাগ্য ভূমি, ত্যাগভুমি, আধ্যাত্মিক স্থান তা বার বার বললেন। আর এই হিমালয়ে একটি আশ্রম গড়তে চান তাও জানালেন তিনি। আর সেই ইচ্ছের কথা শুনে আলমোড়াবাসীরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, আশ্রমের সলতে পাকানোর কাজে যে তিন জনের নাম আগে আসে তাঁরা হলেন বিদেশ থেকে আগত শিষ্য সেভিয়ার দম্পতি ও স্বামী স্বরূপানন্দ। 

 স্বামীজি তৃতীয়বার আলমোড়া আসেন ১১ই মে ১৮৯৮, হাওড়া থেকে ট্রেনে। তাঁর বহু আকাঙ্খিত স্বপ্নবীজ এবার বপন সম্ভব হবে। ১৭ই মে তিনি আলমোড়া পৌঁছন এবং ছিলেন ১১ই জুন পর্যন্ত। এরপর সেভিয়ার দম্পতি, স্বামী স্বরূপানন্দ ও লাল বদ্রি শাহ উঠে পড়ে লাগেন আশ্রম স্থাপনের আদর্শ জমির খোঁজে। অবশেষে সেই জমি পাওয়া গেল মায়াবতীতে। তারপর অনেক পরিশ্রমের ফলস্বরূপ নির্মিত হল স্বামীজির স্বপ্নভুমি অদ্বৈত আশ্রম মায়াবতী। ১৮৯৯ সালের ১৯ শে মার্চ সূচনা হল অদ্বৈত আশ্রমের। তবে স্বামীজি মায়াবতী এসেছিলেন এবং ছিলেন ১৯০১ সালের ৩রা জানুয়ারি থেকে ১৮ই জামুয়ারি পর্যন্ত। সেটাই শেষবার। ২৮শে ডিসেম্বর কাঠগোদাম পৌঁছে রওনা দেন মায়াবতীর উদ্দশ্যে। সেবার আর আলমোড়া নয়, ডান্ডিতে চেপে কখনো বৃষ্টিপাত কখনো তুষারপাতের মধ্যেও অত্যন্ত আনন্দের সাথে মায়াবতী পৌঁছন ৩রা জানুয়ারি। মায়াবতীতে তিনি কাটান ১৮ই জানুয়ারি পর্যন্ত। তবে বরফ পড়ার জন্য বাইরে বেশি বেরনো সম্ভব হয়নি স্বামীজির।

পরিশেষে বলি অদ্বৈত অনুভূতি হল বেদান্তের সরব শ্রেষ্ঠ অনুভূতি। তাই দ্বৈতভাবের দুর্বলতা ও নির্ভরতা কাটিয়ে এবার অদ্বৈতভাবের অনুশীলন সম্ভবের স্বপ্নের আশ্রম নির্মিত হওয়ায় স্বামীজি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। 

ঋণ স্বীকারঃ ১) স্বামী বানীশ্বরানন্দের সাথে এই নিবন্ধকারের কথোপকথন, অদ্বৈত আশ্রম, মায়াবতী।  ২) চিন্তানায়ক বিবেকানন্দঃ সম্পাদনাঃ স্বামী লোকেশ্বরানন্দ। ৩) বিবেকানন্দের স্বপ্নভূমিঃ স্বামী অনীশানন্দ 

ছবিঃ সুদর্শন নন্দী

Mailing List