ঠাকুরের ত্যাগী সন্ন্যাসী স্বামী ব্রহ্মানন্দ

ঠাকুরের ত্যাগী সন্ন্যাসী স্বামী ব্রহ্মানন্দ
31 Jan 2021, 02:45 PM

ঠাকুরের ত্যাগী সন্ন্যাসী স্বামী ব্রহ্মানন্দ

 

সুদর্শন  নন্দী

 

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন, “বিষয়ী সংসারী লোকেদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে জিভ জ্বলে গেল।” মা ভবতারিণী তথা জগন্মাতা সে কথা নিশ্চয়ই শুনেছিলেন। তাই আমরা দেখি সংসারী ভক্তদের পাশাপাশি একঝাঁক তরুণ যুবক ভিড় জমাচ্ছেন দক্ষিনেশ্বরে ঠাকুরের ঐশ্বরিক  আড্ডায়। যেখানে পরচর্চা নয়, ঈশ্বরচর্চা এবং মানবকল্যাণই একমাত্র আলোচ্য বিষয়। আলোচ্য বিষয় অধ্মাত্মিক জাগরণের।  সেই একঝাঁক যুবকের মধ্যে ছিলেন ঠাকুরের মানসপুত্র রাখাল যিনি যথা সময় উত্তীর্ণ হবেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ রূপে। ঠাকুর ভক্তদের বলছেন যে, তিনি দেখেছেন মা তার কোলে এক বালককে রেখে বলছেন, এই তোমার পুত্র। ঠাকুর আঁতকে উঠলে মা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে পুত্র মানে এক ত্যাগী মানসপুত্র। এরপর রাখাল আসার পর ঠাকুরের কাছে সব স্পষ্ট হয়েছিল যে সেই কোলে বসানো মানসপুত্র আর কেউ নয় স্বয়ং  রাখাল। এই রাখাল ছয়জন ইশ্বরকোটিদের অন্যতম।

১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জানুয়ারি বসিরহাট মহকুমার শিকরা-কুলীন গ্রামে জন্ম রাখালের। পুরো নাম রাখালচন্দ্র ঘোষ। বাবা আনন্দমোহন ঘোষ ছিলেন ধনী জমিদার। রাখালের যখন পাঁচ বছর বয়স তখন মাতৃহারা হন তিনি। পরে বাবা বিবাহ করলে সৎমা হেমাঙ্গিনী দেবীর কাছে মানুষ হন। পাশেই  স্থানীয় স্কুলে ভর্তি হলেন রাখাল। শীঘ্রই তার বুদ্ধিমত্তা আর বন্ধু বাৎসল্যের পরিচয় পাওয়া যায়। খেলাধুলা থেকে কুস্তি সবেতেই পারদর্শিতার স্বাক্ষ্য লক্ষ্য করা গেল। অন্যদিকে গ্রামের প্রান্তে কালিমন্দিরেও তাকে দেখা যেত। কখনো পূজা কখনো শ্যামা সঙ্গীতে ব্যস্ত। পাঠশালা-বিদ্যা শেষ হবার পর ১২  বছর বয়সে কলকাতায় এসে মামাবাড়ি ( বিমাতা সম্পর্কে) বারানসী ঘোষ স্ট্রিটে ট্রেনিং একাডেমিতে ভর্তি হন তিনি। সেখানে পরিচিত হন ঠাকুরের প্রধানশিষ্য  কর্মযোগী সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে। তিনি তখন শুধু নরেন। আর নরেনের হাত ধরে শুরু হল ব্রাহ্মসমাজে যাতায়ত। বিধির লেখা বোধ হয় অন্য কিছু ছিল।  আত্মীয়স্বজনরা ব্যবস্থা করলেন সংসারের শেকলে বেঁধে রাখার। ১৮ বছর বয়সে বিবাহ সম্প্পন্ন হল ১১ বছরের বিশ্বেশ্বরীর সাথে কলকাতার কাঁসারি পাড়ায়। বিশ্বেশ্বরীর দাদা মনমোহন মিত্র  ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব অনুগামী। আর সেই সুত্র ধরে রাখালের যাতায়ত শুরু হল দক্ষিনেশ্বরে –ঠাকুরের ভগবৎ ডেরায়। ঠাকুর বলতেন ব্রজের রাখাল এসেছে। মনমোহনকে বলতেন বেশ সুন্দর আধার। রাখালের বাবা মাঝে মাঝে দক্ষিনেশ্বর এসে রাখালকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেও কোন লাভ হয়নি। রাখাল বারে  বারে  ছুটে আসতেন ঠাকুরের পদস্পর্শ পাবার জন্য। দক্ষিনেশ্বরেই মনপ্রাণ নিবেদন করলেন তিনি। জারিত হতে লাগলেন ঠাকুরের ভাবধারায়। মাঝে মাঝে কুটকাচালি বা মনোমালিন্য হলে  ঠাকুরই  ঘুরিয়ে দিতেন মোড়। আর ঠাকুরই একদিন বললেন -রাখালের রাজবুদ্ধি  আছে, ইচ্ছা করলে সে একটা রাজ্য চালাতে পারে। গুরু ভাইরা ঠিক করলেন এবার থেকে রাখালকে সবাই ডাকবেন রাজা বলে। তা শুনে ঠাকুর যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন। পরে রামকৃষ্ণ সংঘে তার সর্ব পরিচিত নাম হয়েছিল ‘মহারাজ’। সবাই তাঁকে রাজা মহারাজ বলেই ডাকতেন।

ঠাকুরের মহাসমাধির পর কাশিপুর উদ্যানবাটি ছেড়ে তিনি বলরাম মন্দির ও পরে বরানগর মঠে আসেন। পরে যান আঁটপুরে। ফিরে সন্ন্যাসগ্রহণ ও নামকরণ ব্রহ্মানন্দ। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে রাখাল শ্রী সারদামায়ের সাথে নীলাচলে গিয়েছিলেন। পরে শরীর ভালো না থাকায়  ফিরে আসেন তিনি।  তিনি  বারাণসী, হরিদ্বার, ওঙ্কারনাথ, বৃন্দাবন ও অন্যন্য জায়গায় সাধনায় রপ্ত থাকেন।

রামকৃষ্ণ মঠ ট্রাস্ট হিসাবে নথিভুক্ত হবার পর স্বামী ব্রহ্মানন্দ  হলেন তার প্রেসিডেন্ট। তাঁর সভাপতিত্বে রামকৃষ্ণ ভাবধারার ব্যাপক প্রসার ঘটে। এবং তা দেশে ও বিদেশে উভয় ক্ষেত্রেই । তাঁর  তত্বাবধানে রামকৃষ্ণ মিশন ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে ৪ঠা মে রেজেস্ট্রিকৃত হয়। অত্যন্ত সাহসী, দৃঢ় চেতা, শিষ্যবৎসল ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই ত্যাগী সন্ন্যাসী ১০ই এপ্রিল ১৯২২-এ ৫৯ বৎসর বয়সে এই ধরাধাম থেকে রামকৃষ্ণলোকে গমন করেন।

   

তাঁর কিছু উপদেশামৃত:  

কর্মের ফল অনিবার্য। হেলায় হোক আর খুব ভক্তির সহিতই হোক, নাম করলে তার ফল হবেই।

মনুষ্য জন্ম তো জ্ঞান ভক্তি লাভের জন্যই। তা যদি না হল, মিছে বেঁচে থেকে লাভ কি! পশুর মতো খেয়ে, ঘুমিয়ে, কতকগুলি ছেলেপিলে নিয়ে থাকার জন্য এ জীবন  নয়।

সৎ পথে থাকার বাধা অনেক-মহামায়া সহজে ছেড়ে দেন না। তাঁর কৃপা পাবার জন্য অনেক কাঁদতে হয়, অনেক প্রার্থনা করতে হয়।

মানুষের ভিতর দুটি বৃত্তি আছে – কু আর সু। এদের দুজনের খুব লড়াই চলে। একটি ভোগের দিকে টানতে চায়, অপরটি ত্যাগের দিকে নিয়ে যেতে চায়। এদের হার-জিতের উপর মানুষের মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব নির্ভর করছে।

শুধু কার্য করলেই হবে না, ভগবদ্ভাব আশ্রয় করে কর্ম করতে হবে।  

সংসারে থাকিতে গেলে নানাপ্রকার ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়া জীবনযাপন করিতে হয়। এই সংসারের এরূপই ধারা। তবে যিনি সেই পরমপদ আশ্রয় করিতে পারেন, তিনিই কেবল বীরের মতো সহ্য করিয়া যান। 

( ছবি: বেলুড় মঠের সৌজন্যে  )

 

Mailing List