‘ঝড়’ – মৌমিতা বিশ্বাসের কলমে

‘ঝড়’ – মৌমিতা বিশ্বাসের কলমে
01 May 2022, 01:55 PM

‘ঝড়’ – মৌমিতা বিশ্বাসের কলমে

মৌমিতা বিশ্বাস

 

দিগন্ত জুড়ে বিছিয়ে থাকা মাঠের শিওর থেকে অজগরের কুন্ডলির মতো একটা মেঘ আস্তে আস্তে পাকিয়ে উঠছে। মাথা তুলে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরী হচ্ছে ধীরে ধীরে। মহাপ্রলয়ের আগের মুহূর্তে বোধ হয় এরকমই থমথমে হয়ে থাকে পৃথিবী।

মাঠ পেরোলেই আপাতশান্ত একটা ছোট গ্রাম। অবশ্য গ্রাম বলতে ওই গ্রামের আধুনিক সংস্করণ যেমন হয় আর কি। অঢেল পাকা বাড়ির ভিড়ে এখনও জবরদস্তি রয়ে গেছে বেশ কিছু মাটির একতলা, দোতলা বাড়ি। মাঠের বুক চিরে সিঁথি কাটা রাস্তাটা যেখানে গিয়ে ছুঁয়েছে সেখানে বেশ কিছু আম কাঁঠাল আর নারকেল গাছের আড়ালে একটা দু কোঠার মাটির বাড়ি। এটা হরে বোষ্টমের বাড়ি। মা মরা একমাত্র বিধবা মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। অল্প কিছু জমি জমা আছে তা চাষবাস করে আর টুকটাক লোকের বাড়ি শ্রাদ্ধ বা বাৎসরিকের সময় তার ছোট কীর্তনের দলটার বায়না নিয়ে বাপ বেটির ছোট্ট সংসার চলে যায় তাদের। রোজ এই বিকেল ঘেঁষা সময়টায় চাষবাসের কাজের তদারকি শেষে বাড়ি এলে বাপ বেটিতে দাওয়ায় বসে কথা বলে কিছুক্ষন। সারাদিনের জমে থাকা বিষয়ে টুকটাক কথাবার্তা চলে। বাবা কে চা জল এগিয়ে দেয় মেয়ে।

কিন্তু আজ কিছুদিন ধরে সেই বাড়ির ওপরেও ঘনিয়ে উঠেছে ঠিক অজগরের কুণ্ডলীর মতোই আরো একটা মেঘ। শহরে পড়তে যাওয়া গ্রামেরই বেশ উঁচু জাতের এক ছেলের সাথে হঠাৎ ঘনিষ্ঠতা শুরু হয় মেয়ের। একটা বয়স থাকে যখন ভালোবাসা কোনো বাধা মানতে চায় না। ভালোবাসার আকাঙ্খা আর তার অমোঘ টানটাই যেন তখন মুখ্য হয়ে ওঠে।  কিন্তু এই অপূর্ব বয়স আর ভালোবাসার মোহাঞ্জন মাখা চোখ তো আশেপাশের বাকি লোকজনদের নেই। বিধবা মেয়ের প্রেম, তাও আবার গ্রামের মান্যগণ্য উচ্চ বংশের কুল-প্রদীপের সাথে! এ তো মেনে নেওয়া অসম্ভব। বিশেষ করে তাদের পক্ষে যারা জীবনে কখনও ভালোবাসার স্বাদই পায়নি। যাদের কাছে শরীর আর বংশবৃদ্ধিই হলো নারী পুরুষের সম্পর্কের একমাত্র সমীকরণ আর উদ্দেশ্য।

কাজেই এই বিষয় জানাজানি হওয়ার পর ছোটো জনপদ টি তে বেশ আলোড়ন পড়ে গেছে। ছেলের বাড়ির লোকের প্ররোচনা আর প্রোৎসাহন মিশে সে আলোড়ন আন্দোলনে পরিণত হতে বেশী সময় নেয়নি। গতিক সুবিধের নয় দেখে ইতিমধ্যেই প্রেমিক প্রবরটিও বেমালুম সুবোধ বালক বনে আপাতত পাকাপাকিভাবে গ্রাম ছেড়ে শহরের ভাড়া ফ্ল্যাট এ আশ্রয় নিয়েছে। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার সালিশি সভা বসেছে। আজ ছিলো সেই সভার ফলাফল প্রকাশের দিন। অর্থাৎ আজ ছিলো এই কুকর্মে জড়িত যাবতীয় বিজাতীয় অন্যায়ের জন্য এক এবং একমাত্র দায়ী বিধবা বাচ্চা মেয়েটিকে শাস্তি প্রদানের দিন। আজ তাকে মাথার একঢাল চুল ন্যাড়া করে মুখে কালি মাখিয়ে সারা গ্রাম ঘোরানোর কথা ছিল। যাতে তাকে দেখে বাকি সব বউ ঝি-রা শিক্ষা নিতে পারে। জানতে পারে যে এ হেন অন্যায়ের পরিণতি কি হতে পারে। সেই রকমই চলছিলো।

কিন্তু এই নিরামিষ শাস্তিপ্রদানে কিছু রসিক লোকজনের ঠিক মন মানছিল না। আরে শাস্তি যদি এমন না হয় যা অন্যায়কারীর মাথা চিরদিনের মতো পাতালের অতল তলে তলিয়ে দিতে পারে, যা তার সমস্ত সত্ত্বাকে চরমতম অপমানের অসম্মানের শলাকায় বিদ্ধ করে ফালাফালা করে দিতে পারে, তাহলে সে আর কিসের শাস্তি? তাই অর্ধেক গ্রাম ঘোরানোর পরে তাদের মন্ত্রণায় এবং কর্মতৎপরতায় টেনে খুলে দেওয়া হলো মেয়েটির পরনের শাড়ি। লজ্জায় অপমানে হতচকিত অসহায় শুধুমাত্র অন্তর্বাস পরিহিত মেয়েটি তখন বুকের কাছে হাত জড়ো করে উবু হয়ে বসে পড়ে মাটিতে মুখ গুঁজে কি প্রার্থনা করছিলো তা জানা গেল না।

শাস্তি প্রদানকারীদের সহর্ষিত উল্লাস আর চিৎকার কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই যেন কড়কড় করে ভীষণ আওয়াজে বাজ পড়লো কোথাও। মাঠের শেষ প্রান্তে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা অজগর তখন তার শত সহস্র মাথা প্রসারিত করে দিয়েছে আকাশ জুড়ে। নীল চেরা জিভে এফালা ওফালা করে দিচ্ছে আকাশের সুবিশাল শুন্যতাকে। ষড়রিপুর অসম্ভব তৃপ্তিতে মগ্ন বেহুঁশ মানুষ গুলোর এতক্ষণে বোধগম্য হলো প্রলয় ঘিরে ধরেছে তাদের। যে যেদিকে পারলো ছুটলো বাঁচার জন্য। অসম্ভব আক্রোশে প্রকৃতি তখন নিক্ষেপ করে চলেছে বজ্র। মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেলো পথঘাট। শুধু মেয়েটি তখনও মুখ গুঁজে পড়ে রইলো একইভাবে। আর সেই একপ্রান্তের বাড়ির দাওয়ায় বোবা হয়ে ঝড়ের তাণ্ডবের দিকে ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে বসে রইলো প্রায় বৃদ্ধ বাবা।

বেশ কিছুক্ষণ তাণ্ডবের পরে চূড়ান্ত ধ্বংসলীলা চালিয়ে আস্তে আস্তে ঠান্ডা হলো প্রকৃতি। চারপাশ জুড়ে তখন গাছপালার ছিন্নভিন্ন লাশ আর শ্মশানের স্তব্ধতা।

স্তব্ধতা মাঠের কিনারে থাকা বাড়িটা জুড়েও। চারিদিক তছনছ করে নিজের প্রতিবাদ জানিয়ে চলে যাওয়ার আগে সে সঙ্গে নিয়ে গেছে এই বাড়ির লজ্জিত লাঞ্ছিত প্রাণ প্রতিমাটিকেও। সারাজীবনের জন্য অপেক্ষা করে থাকা অসহ্য যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে তাকে বজ্রপাতের এক সুতীব্র আঘাত। কিছুটা দূরে শুধু গল্পের শেষ না হওয়া অংশটুকুর মতো পড়ে আছে তার পরনের মলিন শাড়িটি......

......

লেখিকা – অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার (রেভিনিউ)

ads

Mailing List