ধূ ধূ মরুভূমির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো জ্ঞানবৃক্ষ! রাজস্থানের মরুভূমিতে রাজকুমারী রত্নাবতী বালিকা বিদ্যালয় যেন বিশ্বের অন্যতম ভাস্কর্যও

ধূ ধূ মরুভূমির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো জ্ঞানবৃক্ষ! রাজস্থানের মরুভূমিতে রাজকুমারী রত্নাবতী বালিকা বিদ্যালয় যেন বিশ্বের অন্যতম ভাস্কর্যও
01 Aug 2021, 09:18 AM

ধূ ধূ মরুভূমির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো জ্ঞানবৃক্ষ! রাজস্থানের মরুভূমিতে রাজকুমারী রত্নাবতী বালিকা বিদ্যালয় যেন বিশ্বের অন্যতম ভাস্কর্যও

 

কল্পনায় স্বর্গের একটা রূপ রয়েছে প্রত্যেকের মনেই। তাই তো মনের গোপনে কোথাও লুকিয়ে থাকে স্বর্গে পৌঁছনোর বাসনা। কিন্তু সে স্বর্গের অস্তিত্ব কেবলই কল্পনায়। কারণ, যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ ততক্ষণ সেখানে পৌঁছনোর কথা ভাবারও উপায় নেই। অথচ, এ বিশ্বেই এমন বহু স্বর্গীয় দৃশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। প্রকৃতির সেই উজাড় করা সৌন্দর্য হয়তো কল্পনার স্বর্গকে হার মানাতে পারে। সেখানকার মানুষের আচার-আচরণ, কৃষি, অর্থনীতি, ভূপ্রকৃতি- সত্যিই অন্য অনুভূতি জাগায়। তারই পাশাপাশি মিলতে পারে অনেক অজানা তথ্য। বিশ্বজুড়ে এমন কত ছোটখাটো দেশ, ভাস্কর্য রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এমনই একটি ঘটনার কাহিনী লিখছেন-

দীপান্বিতা ঘোষ

 

 

 

ধূ ধূ মরুভূমি। অন্তহীন বালির সমুদ্র। কল্পনায় এমন দৃশ্য ভেসে উঠলে উটেদের হেলেদুলে গমনের কথাই মনে পড়বে। কিম্বা চোখের সামনে ভেসে উঠতে পারে ভয়ঙ্কর ধূলিঝড়ের কথা। আতঙ্কিত তো হয়ে বিছানা ছেড়ে হয়তো উঠে পড়বেন। জোরে শ্বাস নিতে গিয়ে বেজায় তৃষ্ণা আসবে। কিন্তু তখনও আপনি তো আপনি ধূ ধূ মরুভূমিতে। জলও পাবেন না।

ঠিক সে সময় যদি হঠাৎ মনে ভেসে ওঠে অন্তহীন ধূ ধূ মরুভূমির মাঝে হলুদ বেলেপাথরে নির্মিত অত্যাশ্চর্য স্থাপত্য। পড়ন্ত রোদে দেওয়াল বেয়ে সোনার আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। এক ঝলক দেখলে মনে হবে "সোনার কেল্লা"।

সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লায় ছিল রাজাদের কাহিনী। আর এই কেল্লার দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যাবে বাচ্চাদের খিলখিলিয়ে হেসে ওঠার শব্দ। দৌড়ে খেলে বেড়ানোর দৃশ্য বা একটানা নামতার সুর। হয়তো স্বগতোক্তি করে বসবেন, ধুৎ এমনটা কখনও হয় নাকি? স্বপ্নেরও তো একটা বিচরণ ক্ষেত্র আছে। কল্পনার গরুকে কখনও গাছে তোলা যায় নাকি?

 

তা হয়তো যায় না। কিন্তু এই ঘটনাটি সত্য। রাজস্থানের মরুভূমিতে এমনই একটি আশ্চর্য কীর্তি আজ স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেটি আবার বাচ্চাদের স্কুল। যার নাম দেওয়া হয়েছে  "রাজকুমারী রত্নাবতী বালিকা বিদ্যালয়"। এবার বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে নিশ্চয় প্রশ্ন আসছে, ধূ ধূ মরুভূমির ওই উত্তাপ থেকে বাঁচা যেখানে কঠিন, সেখানে বাচ্চারা পড়াশোনা করবে কী করে? তৃষ্ণায় জল পাবে কোথায়? সেই অদ্ভূত স্থাপত্যের কাহিনীই তুলে ধরা হল।

স্কুলটির নামকরণ হয়েছে জয়সলমীরের রাজকন্যা ‘রত্নাবতী’র নামে। তিনি ছিলেন মহারাওয়াল রতন সিংহের কন্যা।

 

রাজস্থানের জয়সলমীরে থর মরুভূমির মাঝে কানাই গ্রামের অদূরে এই স্কুল। দেখতে উপবৃত্তাকার এই স্কুলটিতে কিন্ডারগার্টেন থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৪০০ জন মেয়ের পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে।

 

জয়সলমীরের রাজপরিবার এবং মানবেন্দ্র সিং শেখাওয়াত বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করেছিলেন। ডায়ানা কেলোগ আর্কিটেক্ট সিআইটিটি এর সহযোগীতায়, যা নিউইয়র্ক এর একটি অলাভজনক সংস্থা, স্কুলটি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। আমেরিকান ডিজাইনার মিশেল দুবে সিআইটিটি তৈরি করেন। তিনি ১৯৮৮ সালে মাদার টেরিজার সঙ্গে ভারতে এসেছিলেন। সে সময় গিয়েছিলেন নেপালেও। ভারতের ভাস্কর্য তাঁর ভীষণ মনে ধরেছিল। তাঁকেই ডায়ানা ও তাঁর সংস্থা ডিজাইন তৈরি করতে অনুরোধ করেন।

 

সালটা ২০১৪। রাজস্থানে ঘুরতে এসে এখানকার স্থাপত্য ভাস্কর্য আকর্ষণ করে ডায়ানাকে। তিনি জানিয়েছিলেন, জয়সলমীরের প্রতিটি বাড়ি, দুর্গ, মন্দিরের কারুকাজ তাঁকে মুগ্ধ করেছে। একই সঙ্গে তিনি ব্যথিতও। কারণ, এখানকার মেয়েদের অশিক্ষা, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস তাঁকে বিচলিত করে। তখনই তিনি ভেবেছিলেন, বিশাল মরুভূমির মাঝে এমনই এক স্কুল তৈরি করতে হবে, যার সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে গোটা বিশ্বকে। আবার এখানকার মেয়েরাও সুশিক্ষা পাবে। কারণে, ভারতের মধ্যে রাজস্থানে মহিলা সাক্ষরতার হার ভীষণ কম। মহিলা সাক্ষরতার হার মাত্র ৫৭.৬ শতাংশ।

 

থর মরুভূমির বুকে দিনের বেলা তাপমাত্রার পারদ চড়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কথা নেই, বার্তা নেই হঠাৎ হানা দেয় ভয়ঙ্কর বালির ঝড়। অর্থাৎ যেখানে স্কুল তৈরির কথা ভাবাই যায় না, সেখানে গোটা স্কুলটিই রয়েছে ঝলসানো রোদ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষিত। রাজস্থানের নানা গ্রাম থেকে আসা মেয়েদের জন্য স্কুলে থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে!

 

একদিকে হলুদ বেলেপাথর, অন্যদিকে বাতাস চলাচলের বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি। এমন আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি যে, আলো ঢুকবে, বাতাসও ঢুকবে। কিন্তু ভেতর থাকবে ঠান্ডা। আবার গরম বাতাস বেরিয়েও যাবে। ফলে দিনের প্রবল উত্তাপেও স্কুলের ভেতরটা ঠান্ডা থাকবে। আর রাতে যখন বাইরে হিমশীতল ঠান্ডা, তখন স্কুলের ভেতরের পরিবেশ থাকবে আরামদায়ক। বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসানো রয়েছে। সেখান থেকেই তৈরি হবে সৌর বিদ্যুৎ। আর সেই সৌর বিদ্যুৎ দিয়েই চলবে আলো, পাখা।

রাজকুমারী রত্নাবতী শুধু স্কুল নয়, এ এক অসামান্য ভাস্কর্য। যার প্রতিটি পাথরে গরিব পরিশ্রমী মানুষগুলোর ভালোবাসা গেঁথে আছে। মার্কিন স্থপতিদের নকশা হলেও এতে স্থানীয় ভাস্করদেরই পরিশ্রম মিশে আছে।

    

 সিআইটিটি এর কর্ণধার মাইকেল দুবে বলেছেন, এখানে যে গরীব মেয়েরা পড়তে আসবে তাদের অনেকেরই বাবা মা বা আত্মীয়রা পাথরের কাজ করেন। তারাই হলুদ বেলেপাথরের যোগান দিয়েছেন। পাথরের পর পাথর কেটে ৯০০০ বর্গফুটের বিশাল স্কুল বাড়ি তৈরি করেছেন। স্কুলের দেওয়ালের প্রতিটি কারুকাজ স্থানীয়দেরই তৈরি।

স্কুলের ভেতরে জল সংরক্ষণ করে রাখারও ব্যবস্থা আছে। স্কুল বাড়ি নির্মাণের দায়িত্বে থাকা করিম খান বলেছেন, ৩.৫ লক্ষ লিটার জল স্কুলের ভেতরেই সংরক্ষণ করে রাখা আছে। তাছাড়া বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থাও আছে। স্কুলের ভেতরে প্রতিটি ঘরে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা আছে।

    

ফলে দিনের বেলা প্রখর রোদেও বাচ্চাদের কষ্ট হয় না। পড়ুয়াদের স্কুল পোশাকও বিশেষ ভাবে ডিজাইন করা। বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় নিজে বাচ্চাদের স্কুলের পোশাক তৈরি করেছেন। তাঁর হাতের সেলাই করা পোশাক পরেই স্কুলে যাবে বাচ্চারা।

স্কুলের ভিতর অডিটোরিয়াম ও মিউজিয়াম আছে। GYAAN centre নামে বিশাল একটা কমপ্লেক্স আছে। যেখানে পড়ুয়া ও রাজস্থানের মহিলাদের হাতের কাজের নানা জিনিস প্রদর্শিত হয়।

    

২০১৮ সালের অক্টোবরে এই স্কুল তৈরির কাজ শুরু হয়। এক বছরের মধ্যে স্কুলের নির্মাণ কাজও শেষ হয়। এরপরেও নানা বাধা পেরোতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডায়ানা। স্কুলের জন্য অনুমোদন পাওয়া থেকে শুরু করে মেয়েদের ঘরে ঘরে গিয়ে বোঝানো, স্কুলে পড়াশুনার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া, সবটাই খুব কঠিন ছিলো।

রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রাম, যেখানে শিক্ষার হার তলানিতে। যেখানে কুসংস্কার আর অন্ধ বিশ্বাসের পর্দা টাঙানো রয়েছে প্রতিটি ঘরে। সেখানে মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে রাজি করানো যে আদৌ সহজ ব্যাপার ছিল না, তা সকলেরই জানা।

   

তবে এখন উৎসাহ দেখা দিয়েছে। বাচ্চারা স্কুলে আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ডায়ানার সোনার কেল্লা কোনও যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে নয়, নব দিগন্তের সূচনার দিকে তাকিয়েই মাথা উঁচুকরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ধূ ধূ মরুভূমির বুকেও যে এভাবে জ্ঞানের মশাল জ্বালা যায় "রাজকুমারী রত্নাবতী বালিকা বিদ্যালয়" না দেখ‌লে হয়তো কেউ বিশ্বাসই করতেন না। এ যেন মরুভূমিতে নদী ডেকে নিয়ে আসার থেকেও আরও বড় কিছু।

ads

Mailing List