ড্রাগন ঋণ-ফাঁদেই ঝুলছে শ্রীলঙ্কা, বেরোতে হলে ভারতের সঙ্গে সখ্য জরুরি

ড্রাগন ঋণ-ফাঁদেই ঝুলছে শ্রীলঙ্কা, বেরোতে হলে ভারতের সঙ্গে সখ্য জরুরি
12 Apr 2022, 11:15 AM

ড্রাগন ঋণ-ফাঁদেই ঝুলছে শ্রীলঙ্কা, বেরোতে হলে ভারতের সঙ্গে সখ্য জরুরি

 

ডঃ রাজকুমার কোঠারি

 

শ্রীলঙ্কা। ভারত মহাসাগরের একটি দ্বীপরাষ্ট্র। পশ্চিমে লাক্ষাদ্বীপ সাগর এবং পূর্বে বঙ্গোপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। দ্বীপটি ভারতের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৩০ কিমি (১৯ মাইল) দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত।  একটি প্রধান দ্বীপ এবং কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত শ্রীলঙ্কা। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত দেশটি সিলন নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭২ সালে এর নাম পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কা রাখা হয়।

 

১৯৮৩ সালে সিংহলি সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে উত্তেজনা যুদ্ধে রূপ নেয়। জাতিগত সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। দুই দশকের লড়াইয়ের পর, সরকার এবং লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলম (LTTE) ২০০২ সালে ফেব্রুয়ারিতে নরওয়ে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি আলোচনায় বসে।

 

অবশেষে ২০০৯ সালের মে মাসে সরকারী বাহিনী এলটিটিইকে পরাজিত করে। সংঘাতের সমাপ্তির পর থেকে, সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্প নেয়। উচ্চাভিলাসী কর্মসূচী প্রণয়ন করার চেষ্টা করে। আর তা করতে গিয়ে অনেকগুলি চীন সরকারের ঋণের ফাঁদে পড়ে। অর্থাৎ ঋণের টাকাতেই সেই সমস্ত প্রকল্প বাস্তবায়িত করা হয়।  রাষ্ট্রপতির বড় ভাই এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মহিন্দ রাজাপক্ষ-র সময়ে হাম্বানটোটা বন্দর সহ বেশ কয়েকটি চীনা প্রকল্প রূপায়ন করা হয়েছিল। আর তার ফলেই বিগত কয়েক বছরে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালে সেটি ছিল জিডিপির ৩০ শতাংশ। আর ২০১৯ সালে তা জিডিপির ৪১.৩ শতাংশে পৌঁছয়।

শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক সঞ্চয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। উল্টোদিকে বেড়েছে মূদ্রাস্ফীতি নাটকীয়ভাবে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের শেষে মুদ্রাস্ফীতির হার ১২.১ শতাংশে পৌঁছে যায়। নভেম্বরেও যা ছিল ৯.৯ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। যা থেকে অনেক সমালোচক মনে করেন যে, চীনের ফাঁদ অর্থাৎ ঋণ-নীতি দেশটির আর্থিক সঙ্কটের প্রাথমিক এবং গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তাঁদের যুক্তি, শর্ত সাপেক্ষে কয়েক বিলিয়ন ডলার নরম ঋণ (soft loan) বিতরণের পর, চীন শ্রীলঙ্কার চতুর্থ বৃহত্তম ঋণদাতা হয়ে উঠেছে। তাই শ্রীলঙ্কার আর্থিক সংকট এখন মানবিক সংকটের দিকেও চলেছে। যা শেষ পর্যন্ত দেশটিকে দেউলিয়া করে দিতে পারে।

 

চীনা অর্থায়নে বিকশিত হাম্বানটোটা বন্দরটির কথাই ধরা যাক। যার কোনও বাণিজ্যিক কার্যকারিতা নেই। তবুও চীন শ্রীলঙ্কাকে প্রকল্পটি তৈরি করতে রাজি করেছিল। বেইজিং এটিকে জামানত হিসাবে চেয়েছিল। ২০১৭ সালে ৯৯ বছরের লিজ চুক্তি হয়। সেটা অনেকটা শ্রীলঙ্কাকে বাধ্য হয়েই করতে হয়েছিল। কারণ, চীন নাছোড় ছিল। তাই শ্রীলঙ্কা ঋণের টাকায় গড়ে তোলা সেই প্রকল্প চিনা কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। বন্দরটির প্রথম ধাপ নির্মাণেই খরচ হয় ৩৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। 

শ্রীলঙ্কাকে সাধারণত এমন একটি দেশ হিসাবে বর্ণনা করা হয়, যেটি হল চীন দ্বারা স্পনসর করা বেস্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসাবে। যা চীনকে বিশ্বের অন্যান্য অংশের সাথে সংযুক্ত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদী সুবিধে দেবে। তাতে শ্রীলঙ্কার কতটা লাভ তা অজানা।

 শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কট যে কোনো মানদণ্ডে নজিরবিহীন। আফগানিস্তান বাদে, দক্ষিণ এশিয়ার কোনও দেশই গত ৭৫ বছরে এত বড় সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। শ্রীলঙ্কায় রান্নার গ্যাসের ঘাটতি এবং ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দৈন্যন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার আর্থিক সঙ্কট প্রকাশ পায় যখন শ্রীলঙ্কা সরকার গত বছরের আগস্টে দেশের মুদ্রার তীব্র পতনের পর জাতীয় অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। তদুপরি, কোভিড সংকটের প্রভাব, পর্যটন শিল্পে ক্ষতি, উচ্চ সরকারী ব্যয় এবং কর হ্রাস রাষ্ট্রীয় রাজস্ব হ্রাস করে। যা শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক মন্দাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

সুতরাং একটা কথাই বলা যেতে পারে, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে ড্রাগনের ঋণ-ফাঁদ নীতি থেকে নিজেকে বাঁচাতে হবে। গুরুত্ব সহকারে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রয়োজনে ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মধুর করতে হবে। এটাই একমাত্র বিকল্প পথ।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়।

ads

Mailing List