ভীম পুজোর কথা, মধ্যম পান্ডবই বোধ হয় বাঙালীর সবচেয়ে প্রিয়

ভীম পুজোর কথা, মধ্যম পান্ডবই বোধ হয় বাঙালীর সবচেয়ে প্রিয়
25 Feb 2021, 08:19 PM

ভীম পুজোর কথা, মধ্যম পান্ডবই বোধ হয় বাঙালীর সবচেয়ে প্রিয়

 

সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায়

 

নদীর নাম দুর্বাচটি। ছোট্ট কিন্তু মিষ্টি। খেয়াপারের নৌকা লগি ঠেলে পশ্চিম পাড়ের যেখানটায় আমাদের নামিয়ে দিত, তার নাম ঘাটগোড়া। লোকের মুখে মুখে ঘোরা নাম, পোস্ট অফিসের পিন কোডে এর কোনও খোঁজ নেই। ঘাটগোড়ার ঢাল বেয়ে উঠতে হত বাঁধে। আর এই বাঁধ আর ঢালের মুখটাতে দু’দিকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন ভীম---প্রকান্ড মহীরুহের মতো। কাঁধে ফেলা মস্ত গদা, ইয়া বড় গালপাট্টা। শিশুকালে রূপকথায় শোনা কোনও দত্যিদানোর সাক্ষাৎ স্যাঙাত যেন!

 

কিন্তু না, ইনি ভীমসেন, মধ্যম পান্ডব। তাঁরই পুজো উপলক্ষ্যে প্রকান্ড মূর্তি তৈরি করা হয়। ভীম একাদশী তিথিতে তাঁর পুজো হয়। ভীম একাদশী বলতে মনে পড়ে গেল, মায়ের কাটা একটা ছড়া, ‘সব করেছে যোশী / বাকি আছে ভীম একাদশী।’সম্ভবত ছদ্ম উচাটন আর অকর্মণ্যতা একসঙ্গে বোঝাতে কিছুটা ব্যঙ্গের সুরেই এই ছড়াটি মা বলেন। যাইহোক, এ বছর মানে ১৪২৭ সালে ভীম একাদশীর তারিখ ছিল ১০ই ফাল্গুন, ২৩ ফেব্রুয়ারী। এইদিন পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দক্ষিণ অংশের বেশ কয়েকটি জেলাজুড়ে ভীম ঠাকুরের পুজো হয়। এর মধ্যে যেমন রয়েছে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমারের টেরাগেড়া গ্রামের তিনশো বছরের ভীম মে‌লা-সহ ভীমপুজোর ঐতিহ্য, তেমনই আবার পশ্চিম মেদিনীপুরে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেটের উল্টোদিকে মাত্র ৪ বছর আগে শুরু হওয়া ভীমের পূজা। হাওড়া জেলার শ্যামপুর থানার রাধাপুরের ভীমের পুজো ও মেলা শতাব্দী প্রাচীন। বাংলাকে যতই পান্ডববর্জিত দেশ বলা হোক না কেন, মধ্যম পান্ডবের প্রতি প্রীতিপূর্ণ শ্রদ্ধার প্রকাশের ইতিহাস বাংলায় নিতান্ত অর্বাচীন নয়।

 

আসলে মেদিনীপুরের এই ভূখন্ডটির সঙ্গে ভীমের নানা কাহিনী জুড়ে আছে। গড়বেতার গনগনির ডাঙার ফসিল হয়ে যাওয়া গাছের পাথুরে কাঠামোকে লোকে বলে বকরাক্ষসের পাঁজর। কোনওটা আবার ভীমের প্রদীপ। আদিতে এই অঞ্চলের নাম ছিল বগড়ী পরগণা। বগড়ী এসেছে বক্ ডিহি থেকে। অর্থাৎ বক রাক্ষসের ডাঙা। আর গনগনির ডাঙাতেই হয়েছিল ভীম আর বকরাক্ষসের তুমুল মল্লযুদ্ধ। শীলাবতীর ওপর পাড়েই রয়েছে একচরা গ্রাম। মহাভারতের যুগ স্মরণ করে কেউ কেউ বলেন, এটিই সেই একচক্রা গ্রাম, যে গ্রামে অজ্ঞাতবাস কালে আশ্রয় নিয়েছিলেন পঞ্চপান্ডব। লোকমুখে ফেরা এই সব কাহিনীর কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মেদিনীপুর শহর ছাড়িয়ে রাঙামাটির প্রান্তে গোপগড়। অতীতচারী বিশ্বাস এই গোপগড়কেই বলেছে, বিরাট রাজার রাজধানী। এই রাজ্যেই ছদ্মবেশে থাকার সময় ভীমসেন হত্যা করেন কীচককে। মল্লবীর মহাবলশালী ভীমের আরও একটি বিখ্যাত কাহিনীর আশ্রয় হয়েছে এই মেদিনীপুরের মাটি। কাহিনীটি হল, হিড়িম্ব নিধন। সেই সঙ্গে মহাবীর ভীমের মহোত্তম প্রেমকাহিনীর ক্ষেত্র এটি। খড়্গপুরের খড়্গেশ্বর মন্দিরের অদূরেই আছে হিড়িম্বেশ্বরীর মন্দির। একদা এই অঞ্চলের ভূমিপুত্র ছিল ‘মেদ’ জাতির দেশজরা- যাদের থেকে মেদিনীপুর নাম হয়ে থাকতে পারে। যেমন বগড়ীর মানুষ থেকে বাগদি। এই মানুষেরা যেমন নিজেরাও ছিলেন সরল ও শক্তিশালী- তাঁদের ভালোবাসার মানুষ ভীমসেনও ছিলেন উদার, সরল আর মহা বলশালী। ফলত, ভীমকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে যেন নিজেদের সামর্থ্যের প্রতিরূপটিকে তাঁরা সম্মান করে ফেলেছেন। এই ভীম তাঁদের কাছে কৃষক বা হালুয়া ভীম, ক্ষেত্রী ভীম বা হুলা ভীম। কৃষিজমির তথা ফসল রক্ষার মানসে তাঁরা যেমন ভীমের উপাসনা করেন, তেমনই রোগব্যাধি নিরসনেও ভীমের স্মরণাপন্ন হন স্থানীয় মানুষ। নন্দকুমারে ভীমের স্থায়ী মন্দিরে বাবাকে পুজো দিতে আসেন কাতারে কাতারে মানুষ। আবার যুবক কুলের কাছে শক্তি পুরুষকারের প্রতিভূ ভীমসেন। কোনও কোনও আলোচক, পূর্ব মেদিনীপুরের বণিক সমাজের কাছে ভীমের কদর পবনপুত্র রূপে, এমনটিও বলেছে‌ন। নদী সমুদ্র পথে বানিজ্য বায়ু নির্ভর ছিল। পবনপুত্র ভীম ছিলেন তাঁদেরও ত্রাতা।

 

ভীম একাদশীর দিনটিকে নির্জ‌লা একাদশী ব্রতেরও দিন বলা হয়। কথিত আছে, মহর্ষি বেদব্যাস ভীমসেনকে ওইদিন নির্জলা ব্রত করার উপদেশ দেন। ওই ব্রত করলে, সারা বছরের সমস্ত একাদশী ব্রতের ফল একটি মাত্র ব্রতেই পাওয়া যায়। এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তা হল, পুরুষ মানুষের ব্রত পালন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রতকে মূলত মেয়েলি আচার বলেছেন। বাস্তবে, ব্রত মেয়েরাই পালন করে থাকে। একমাত্র অসিধার ব্রত ছাড়া পুরুষ পালনীয় ব্রতের কথা পাওয়া যায় না। সেখানে ভীম কর্তৃক এই নির্জলা ব্রত পালনের কাহিনী নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী। ভীম একাদশী ব্রতের আরও একটি কাহিনী শোনা যায়। ভীমের মাতা কুন্তিকে একাদশী করতে হয় সকালে শীতল জলে অবগাহন করে। শীতে কুঁকড়ে যাওয়া মাকে দেখে, ভীম এতটাই রেগে গেলেন যে, লাঙলের ফাল গরম করে জলে চোবাতে লাগলেন। অচিরেই জল উত্তপ্ত হয়ে উঠল। এই কুসুম গরম জলে স্নান করে মাতা কুন্তি খুবই তৃপ্ত হলেন। এদিকে জলের উত্তাপ তো বেড়েই চলেছে। বরুণদেবের শরীরে জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে গেল। বরুণদেব স্মরণাপন্ন হলেন শ্রীকৃষ্ণের। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পরামর্শ দিলেন ভীমকে বোঝানোর। ভীম যদি এই একাদশীতে ব্রত পালন করেন তাহলেই বরুণদেবের গাত্রদাহ কমবে। বরুনদেব ভীমকে সম্মত করতে সমর্থ হলেন। সেই থেকেই এই একাদশীর নাম হল ভীম একাদশী।

 

শুরু করেছিলাম গাঁয়ের কথা দিয়ে। ভীমের পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে মামার বাড়ি যেতাম। তখন কি জানতাম, কত কাহিনীর ডালপালা জড়িয়ে রয়েছে সেই মহাদ্রুমের শরীরে। আজ আর মামার বাড়ি যাওয়া হয় না। কিন্তু, ভীমসেনের পাশ দিয়ে আমার কর্মক্ষেত্রের দিকে এগোতে থাকি। সেই গাছের থেকে একটি দু’টি করে পাতা খসে পড়ে। আর আমি সেই পাতা কুড়োতে কুড়োতে চলতে থাকি। আমার পেছনে পড়ে থাকে শৈশব, ছেলেবেলার কথকতা। জানি না, সেই কথামালা কতটা বলতে পারলাম।   

 

লেখক – অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক  

ছবি: লেখক

Mailing List