মৌলিক কিছু ভুল আজ শ্রীলঙ্কার বিপর্যয়ের জন্য দায়ী

মৌলিক কিছু ভুল আজ শ্রীলঙ্কার বিপর্যয়ের জন্য দায়ী
17 Apr 2022, 01:00 PM

মৌলিক কিছু ভুল আজ শ্রীলঙ্কার বিপর্যয়ের জন্য দায়ী

 

ড.গৌতম সরকার

 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের খবর একটু গতি হারাতেই সংবাদমাধ্যম জুড়ে এই মুহূর্তে ভাইরাল হচ্ছে শ্রীলঙ্কার আর্থিক বিপর্যয় এবং উদ্ভূত রাজনৈতিক অস্থির পরিস্থিতি। ভয়ংকর একটা দ্রোহকালের মধ্যে দিয়ে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তিক দ্বীপরাষ্ট্রটি। চরম আর্থিক সঙ্কটে জর্জরিত দেশটিতে মূল্যবৃদ্ধি ইতিমধ্যেই নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই মুহূর্তে দুধ সোনার চেয়েও মহার্ঘ্য হয়ে উঠেছে। দুবেলা রুটি জোগাড়ের জন্য মানুষ পাগলের মত এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটে বেড়াচ্ছে। জিনিসপত্রের যোগান সাংঘাতিক কমে যাওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির কোনও নিয়মনীতি না মেনে যেমন খুশি তেমনি হচ্ছে। রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ায় এক হাজারের বেশি বেকারী বন্ধ হয়ে গেছে। একটা ছোট পাউরুটির দাম এখন ১৫০ শ্রীলঙ্কান রুপি, ভারতীয় মূল্যে ৫৭ টাকা ১৯ পয়সা। মুরগীর মাংসের দাম এতটাই বেড়ে গেছে, সাধারণ মানুষ তাদের বাজেট থেকে চিকেন বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে।

   

দেশটিতে বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে ঠেকেছে, পেট্রোল, ডিজেল, বিদ্যুৎ আমদানি করার মত অর্থ সরকারের হাতে নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের মানুষকে দৈনিক ১৩-১৪ ঘন্টা লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যবস্থা থমকে গেছে, ঘরে বসেই অফিস-আদালতের কাজ করতে হচ্ছে। অর্থের অভাবে কাগজ আমদানি করতে না পারায় এবছরের জন্য স্কুল-কলেজের সমস্ত পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে। নিউজ প্রিন্টের অভাবে বেশ কিছু সংবাদসংস্থাকে সপ্তাহে একদিন করে প্রকাশনা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই চারদিকে এত নেই নেই-এর মধ্যে দেশের মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে এবং তাঁর সরকার। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে একের পর এক বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রথম দেশটির ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে ভয়ংকর সঙ্কটের সামিল হয়েছে এবং সমবেত কণ্ঠে স্লোগান তুলছে, 'প্রেসিডেন্ট, তুমি দূর হঠো!'

     

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য, শ্রীলঙ্কা বহুমুখী অর্থনৈতিক আক্রমণের শিকার। খাদ্য, জ্বালানি এবং বৈদেশিক মুদ্রাসঙ্কটের ত্র্যহস্পর্শে দেশটি হাঁসফাঁস করছে। আগেও গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আর্থিক মন্দা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাবের সাথে দেশটি যুদ্ধ করেছে, কিন্তু কখনও এভাবে অর্থনীতির দশদিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণের শিকার হয়নি। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এতটা দুরবস্থার মধ্যে দিয়ে দেশটিকে যেতে হয়নি।

     

তিনবছর আগে রাজাপক্ষে ক্ষমতায় আসার সময়ে দেশটির বিদেশি মুদ্রার সম্ভার ছিল ৭.৫ বিলিয়ন ডলার। তারপর থেকে ক্রমশ কমতে কমতে ২০২১ সালের জুলাই মাসে মজুত দাঁড়ায় ২.৮ বিলিয়ন ডলারে এবং গত নভেম্বর মাস নাগাদ আরও হ্রাস পেয়ে হয় মাত্র ১.৫৮ বিলিয়ন ডলার। কলম্বো বন্দরে আটকে থাকা বিভিন্ন দেশ থেকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ে আসা জাহাজগুলির পণ্য কেনার মত বৈদেশিক মুদ্রা শ্রীলঙ্কা সরকারের হাতে নেই। বারবার সতর্ক করার পরও অর্থনীতিবিদদের পরামর্শে কর্ণপাত না করে অবশিষ্ট বিদেশিমুদ্রা দিয়ে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য না কিনে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে বৈদেশিক বাণিজ্যের পাওনা মেটাচ্ছেন গোতেবায়া রাজপক্ষে।

    

দেশজুড়ে চলতে থাকা বিক্ষোভ সম্মেলনকে দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে রোখার অমানবিক পন্থা গ্রহণ করায় আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় বিভিন্ন অস্বস্তিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে শ্রীলঙ্কা সরকার। জরুরি অবস্থা জারির পাশাপাশি গত শনিবার ভোর থেকে ৩৬ ঘন্টা কারফিউ ঘোষণা করেছে সরকার। এই অস্থির পরিস্থিতিতে সেটি মানুষের জন্য আরও নিষ্ঠুর ও অমানবিক বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল। এই ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের বক্তব্য, 'জননিরাপত্তা, জনগণের সুরক্ষা এবং সরবরাহ এবং যোগানের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতেই জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।' ২০১৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শক্ত হাতে দেশের আর্থিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন রাজাপক্ষে। আজকের বিক্ষোভ ও সহিংসতা প্রমান করছে তিনি তাঁর প্রতিশ্রতি রক্ষায় সফল হননি। দেশটির অর্থনৈতিক বনিয়াদ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ দূর্বল হয়ে উঠছে, আর সেই দূর্বল বুনিয়াদের উপরই বিজয়ী সমস্ত সরকার জনসাধারণকে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের ইমারত গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। এখানেই দেশটির বারংবার ভুল হচ্ছে।

    

বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেশটির সমূহ আর্থিক বিপর্যয়ের নানান কারণ খুঁজে বের করেছেন।

 

এক, অলাভজনক এবং অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিনিয়োগ:

 

ব্যক্তিমালিকানাধীন থিঙ্কট্যাঙ্ক লার্ন এশিয়ার সভাপতি রোহন সমরজিভার মতে, ২০০৭ সাল থেকে দেশটি শুধু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে কম প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগই করছে না, সেটা করছে বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে। গত ১৫ বছরে শ্রীলঙ্কান সরকার বেশ কিছু মেগা প্রকল্প শুরু করেছে, যেমন- সমুদ্র বন্দর, বিমানবন্দর, সড়ক ও আরও সামাজিক পরিকাঠামো উন্নয়ন যেগুলোতে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। হংকং, সিঙ্গাপুর, এবং দুবাইকে টেক্কা দেবার জন্য রাজধানী কলম্বোর কাছে সমুদ্র থেকে জমি বের করে কলম্বো পোর্ট সিটি নামের এক বন্দর শহর গড়ে তোলা হচ্ছে, যেটার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে দেড় মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সময়কাল ২৫ বছর। এগুলো সবই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প এবং বিশ্লেষকদের মতে এই প্রকল্পের অধিকাংশই আর্থিকভাবে লাভজনক হয়নি বা ভবিষ্যতে হবার কোনও সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

 

কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির বরিষ্ঠ অধ্যাপক শ্রিমাল আবিরত্নের মতে, গৃহিত বেশ কিছু বড় বড় প্রকল্প ইতিমধ্যেই দেশটির জন্য হাতিপোষার সামিল হয়ে গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর। ড. আবিরত্নের মতে, গত দুই দশক ধরে শ্রীলঙ্কায় বিদেশি বিনিয়োগ তেমন হয়নি বললেই চলে। দেশের সরকার বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনও চেষ্টা না করে দিনদিন বিদেশি ঋণের নব নব উৎস সন্ধানে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছে। গত এক দশকে শুধু চিনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণই পাঁচ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও শ্রীলঙ্কাকে ঋণ জুগিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডার, এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক, এবং জাপান। বিশ্লেষকদের মতে এই ঋণের বেশিরভাগটাই অপ্রয়োজনীয় এবং অলাভজনক প্রকল্পে ব্যয় করায় দেশটিতে মূলধনের স্বাভাবিক আবর্তন প্রবাহ থমকে গেছে। আজকের এই চরম দুরাবস্থা অনেকটাই অযৌক্তিক ও অনুপযুক্ত নীতির ফল বলে মনে করেন অধ্যাপক শ্রিমাল।

 

দুই, ২০১৯ আর্থিক বছরে ট্যাক্স ছাড়:

 

গোতাবায়া রাজপক্ষে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। প্রথমেই তিনি সেই আর্থিক বছরের জন্য ভ্যাট ও ইনকাম ট্যাক্স কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। ভ্যাটের পরিমান ১৫ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশ হয়, এছাড়া আয়করেরও উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটে। কর কমানোর পিছনে উদ্দেশ্য ছিল মন্দাক্রান্তা অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় গতি সঞ্চয় করা। একই নীতি ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে গ্রহণ করেছিলেন এবং অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের কর সংক্রান্ত নরম নীতি শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে ব্যুমেরাং হয়ে দেখা দিল, বিশ্বজুড়ে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ মহামারীকেই এর জন্য দায়ী করা যায়।

     

অর্থনীতিবিদদের হিসেব অনুযায়ী, আয়কর ও ভ্যাটের যুগ্ম হ্রাসে সরকারের রাজস্ব আদায় প্রায় ২৫ শতাংশ হ্রাস পায়। তার উপর করোনা সংক্রমণের কারণে দেশটির আভ্যন্তরীণ এবং বহির্বাণিজ্য সাংঘাতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া এর মধ্যেই আগের নেওয়া ঋণগুলোও

শর্ত মেনে শোধ করতে হয়েছে। এই কর ও করোনার যুগ্ম ফলায় ২০২২-এ শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছে।

 

তিন, পর্যটন খাতে বিপর্যয়:

   

বৈশ্বিক সূচক সংস্থা মুডির ইনভেস্টর সার্ভিস জানিয়েছে, পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দেরি হওয়ার কারণে শ্রীলঙ্কার বিপর্যয় এতটা তীব্র রূপ ধারণ করেছে। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার বড় যোগান আসে এই ক্ষেত্র থেকে। গত দুই বছর অতিমারীর কারণে এই খাত সম্পূর্ণভাবে শুকিয়ে গেছে। অতিমারী শুরুর আগে শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসতো চিন থেকে। করোনা ভাইরাসের আঁতুরঘর বলে প্রমাণিত চিন দেশে পর্যটন সংক্রান্ত বিধিনিষেধ যথেষ্ট কড়াকড়ি হওয়ায় পর্যটন সমাগম শূন্যে নেমে আসে৷ পর্যটন খাতে এই বিপর্যয় শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে দেয়। করোনা ভাইরাস সংক্রমনের আগে পর্যটন এবং রেমিটেন্স খাতে দেশটির বার্ষিক আয় হত ১২ বিলিয়ন ডলার। আজ সারা দেশ জুড়ে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসের হাহাকার মানুষের জীবনযাত্রায় চরম অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০১৯ সালে ইস্টার সানডেতে চার্চগুলোতে সিরিজ হামলার ঘটনাও দেশটির পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে ।

 

চার, বিদেশি ঋণের উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা:

 

শ্রীলঙ্কার এই সমস্যা রাতারাতি তৈরি হয়নি। বিগত ১৫ বছরে এই সমস্যা একটু একটু করে পুঞ্জীভূত হয়েছে। যে সরকার যখনই ক্ষমতায় এসেছে, আভ্যন্তরীণ উন্নয়ন বা দেশীয় সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহারের দিকে না গিয়ে চটজলদি বিদেশি ঋণের সাহায্যে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটিয়ে জনসাধারণকে চমকে দিতে চেয়েছে। এই উদ্দেশ্যে ২০০৭ সাল থেকে শ্রীলঙ্কান সরকার অর্থ সংগ্রহের জন্য সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করতে শুরু করেছিল।

    

অর্থনীতি শাস্ত্রের মতে, একটি দেশের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়ে গেলে অতিরিক্ত ব্যয় বহনের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে এই সার্বর্ভৌম বন্ড বিক্রি করে অর্থের সংস্থান ঘটাতে পারে। শ্রীলঙ্কা সেভাবেই তাদের বাজেট ঘাটতি মেটাতে অর্থ যোগাড় করেছে। কিন্তু সেই অর্থ কিভাবে পরিশোধ করবে সেই উপায় খোঁজার জন্য অর্থনীতিবিদদের মতামত নেয়নি। এই মুহূর্তে সার্বভৌম বন্ড বাবদ দেশটির ঋণের বোঝা সাড়ে বারো মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া দেশীয় উৎস থেকেও সরকার ঋণ করেছে। সব মিলিয়ে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কাকে চুক্তিমতো সাত বিলিয়ন ডলার ঋণ শোধ করতে হবে। চলতে থাকা আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে এই বিশাল অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করার ক্ষমতা দেশটির নেই, বলাই বাহুল্য। যদিও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তারা জানিয়েছে, গত দুইবছরে সার্বভৌম বন্ড বাবদ যে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে আড়াই বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যেই পরিশোধ করা হয়ে গেছে এবং জানুয়ারি মাসে সর্বশেষ ৫০০ মিলিয়ন ডলার শোধ করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেটি বলছে না সেটি হল, এই ঋণ শোধের কারণেই দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে টান পড়েছে, আর তার ফলশ্রুতিতেই দেশ জুড়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে জ্বালানি তেলে আকাল দেখা দিয়েছে।

 

পাঁচ, অনুপযোগী অর্থনৈতিক নীতি:

  

শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর ভি এ ভিজেওয়াদানা বলেছেন, ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ অবসানের পর শ্রীলঙ্কা বেশ কিছু মৌলিক ভুল করেছে। তিনি বলেছেন, ২০০১ সালে জিডিপির ৩০ শতাংশ আসতো রপ্তানি থেকে। সেটা এখন ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। এমত পরিস্থিতিতে দেশের সরকার শ্রীলঙ্কান রুপির অবনমন ঘটায়নি। এর ফলে নিট রপ্তানিতে কোনও ইতিবাচক প্রভাব না পড়ায় বৈদেশিক মুদ্রা সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই ২০১৯ সালে বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ সাড়ে সাত বিলিয়নের মত থাকলেও এই মুহূর্তে সেটা দুই বিলিয়নেরও নিচে নেমে এসেছে। এর মধ্যে ব্যবহারযোগ্য মুদ্রার পরিমান মাত্র তিনশ মিলিয়ন ডলার। তেল কেনার মত অর্থও এখন সরকারের নেই, ফলে চরম বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে বাণিজ্য, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।

 

ছয়, অর্গানিক চাষে বিপর্যয়:

   

ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে দেশ জুড়ে অর্গানিক কৃষিকাজ চালু করেন। পরিবেশগত কারণে এবং দূষণ প্রতিরোধে এটি অতীব তারিফযোগ্য সিদ্ধান্ত সে ব্যাপারে কোনও সংশয় নেই। এই অর্গানিক চাষে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ঔষধ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কৃষির উৎপাদনশীলতায়। ফলস্বরূপ চালের উৎপাদন ২০ শতাংশ কমে যায়। সেই কারণে একদা খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশটিকে বাধ্য হয়ে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার চাল আমদানি করতে হয়। দেশীয় বাজারে চালের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। শুধু চাল নয়, অর্গানিক চাষের প্রভাব দেশের চা-শিল্পতেও পড়েছিল। চা রপ্তানি করে শ্রীলঙ্কা ভালো পরিমাণ বিদেশিমুদ্রা অর্জন করে, উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেখানেও একটা জোরদার ধাক্কা লাগে। অন্যদিকে কৃষকদের ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারকে ২০০ মিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হয়। ফলত দেশ জুড়ে খাদ্য ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করে। অধ্যাপক আবিরত্নে বলেছেন, অর্গানিক চাষ শুরু করার আগে সরকার পদ্ধতির ভালো-মন্দ নিয়ে কারোর সাথে আলোচনা করেনি। এর ফলে দেশবাসীদের উল্টো ফল ভোগ করতে হচ্ছে৷ তিনি আরও জানিয়েছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষকেরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে এবং খাদ্যের অভাব মেটাতে খাদ্যশস্য আমদানি করতে গিয়ে বিদেশিমুদ্রার তহবিলে আরও চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

     

দেশটির সার্বিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার কোনও আশু সমাধানের রাস্তা এই মুহূর্তে খুঁজে পাওয়া মুশকিল, তবে এটা ঠিক, আগামী দিনে দেশের প্রবৃদ্ধির পুনরুদ্ধারের জন্য সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলিকে একযোগে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ দেশটির পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। সম্ভাব্য ঋণ সহায়তা নিয়ে ইতিমধ্যেই শ্রীলঙ্কার সাথে আইএমএফ-এর আলোচনা শুরু হয়েছে। আইএমএফ-এর কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার জন্য দেশটি অবশেষে মুদ্রার ১৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছে। এছাড়া এই মাসেই শ্রীলঙ্কার অর্থমন্ত্রী ওয়াশিংটন সফর করছেন। আশা করা যায় ওই সফরে আমেরিকা দেশটির আশু সমস্যা সমাধানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ধ্যান দেবে।

  

অতি প্রত্যাশাবাদিও দেশটির এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার আশু সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন না। যেভাবে দেশটির উপর উত্তরোত্তর ঋণের বোঝা চেপে চলেছে, সেই চাপ ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসা একইসঙ্গে কষ্টসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অর্থনীতিবিদ শ্রিমাল আবিরত্নে মনে করেন, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের সঠিক প্রয়োগ এবং পরিচালনার মধ্যে দিয়ে আগামী দিনে আর্থিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারে দেশটি। তার জন্য রপ্তানি বাড়ানো খুব জরুরি, আর রপ্তানি বাড়ানোর জন্য পণ্যের বৈচিত্র্য আনা দরকার। এ সব কিছুই ঘটবে যদি বিদেশি বিনিয়োগের আমদানি ঘটে, কারণ দেশটির আভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সেই পরিমান মূলধন সরবরাহের মতো জায়গায় নেই। সবথেকে বেশি যেটা দরকার সেটি হল, মধ্যমেয়াদি বাজেট এবং রাজস্ব ব্যবস্থা জনহিতকর করার পাশাপাশি সরকারকে অপ্রয়োজনীয় খাতে খরচ কমাতে হবে।

   

ঋণের ভারে জর্জরিত দেশটির এই মুহূর্তে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হল জনগণের মুখে দুবেলা দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়া। বিশ্বের অনেক দেশই এই কঠিন সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, ভারত এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ভারতসরকার জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, ঔষধ এবং জ্বালানি কেনার জন্য গত সপ্তাহে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের একটি তেলের ট্যাঙ্ক ওই দেশে পৌঁছে গিয়েছে। গত শনিবার ৬ হাজার মেট্রিক টনের একটা জাহাজও প্রয়োজনীয় সাহায্য নিয়ে পৌঁছেছে। বিশ্বের আরও অনেক দেশ ভারতের দেখাদেখি এগিয়ে আসছে। আপাতত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করায় দেশটির শাসনভার সেনাবাহিনীর হাতে। তবে সেনা দিয়ে নয়, আগামী দিনে দেশটিকে আর্থিক সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সঠিক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে শিল্পায়ন, বিশ্বায়ন ও উদারিকরণের প্রেক্ষিতে একদিকে বিদেশি বিনিয়োগের আগমন ঘটাতে হবে এবং অন্যদিকে বিদেশি ঋণের উপর নির্ভরতা কমাতে হবে।

                                        ......xxx.......

লেখক: অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক

তথ্যঋণ: ইন্টারনেট

Mailing List