◾রেহান কৌশিকের ছ’টি কবিতা

◾রেহান কৌশিকের ছ’টি কবিতা
13 Feb 2022, 10:15 AM

◾রেহান কৌশিকের ছ’টি কবিতা

 

◾সাপ

 

বিষমুখে ঘুরি, একা। অনন্তসময়।

সুসময় আসেনি কখনো।

পাতাঝরা অরণ্যের প্রগাঢ় বিষাদ

                   জেগে থাকে ফণার ওপর!

 

চুম্বনেও বিষ। বিষ, সঙ্গমেও।

 

কে যেন দূরের পথে বাজায় বাঁশিতে

                          নিবিড়ের ধ্বনি!

কাকে ডাকে? কার কাছে সেই সুর

উড়ে যায় চিঠির মতন?

 

আমাকে ডাকো না কেন, বলো?

জাগিয়ে তোল না কেন ধ্রুপদে-ধামারে?

 

অরণ্যের ডাকবাক্সে কেন কেউ মোহের আগুনে

 রাখে না সুরম্য বর্ণমালা?

 

একবার রেখে দ্যাখো। একবার নদী বলে ডাকো।

একবার বিষমুক্ত জলে

                আমি সাজাব উৎসব।

 

একবার, একবার শুধু

স্নান দিয়ে পুনরায় ফেরাব তোমাকে।

 

নিজের ভিতর আমি চিরস্থায়ী রাখি না কিছুই।

.........

 

◾ছাই

 

ভাঙনে বিষাদ কেন এত?

ভেঙে-ভেঙে সহস্র একক হেঁটে যায়

                 গানে ভাসে বাউল-পাঁজর।

 

একাকী থাকে কি কেউ? একা হয় শ্রাবণের দিনে?

কত চিঠি উড়ে আসে। কত ধুলো ভিতরে কোথাও

রেখে যায় বদলের ঝড়।

 

সময় কেবল ভরে--- যত ক্ষত, প্রিয়-অভিমান

যেভাবে বৃক্ষের দেহ খুঁজে নেয় ত্রাণ।

 

এ-কেবল চিহ্ন ধরে রাখা

এ-কেবল নিজের খোদাই--- বিন্দুজাত আয়ু।

 

বাকি সব ছাই, ছাই। অনন্তের ছাই।

..............

লেখো

 

দূরে কই! কাছে আছি

সামান্য যা-কিছু কথা সশব্দ পায়রা হয়ে

                          উড়ে যায় ভিনদেশে

বাকি যা পড়ে আছে সমস্তই তুমি।

 

রাস্তাগুলো ঘুরে যায় মিছিল ও মাকর্সবাদ বুকে নিয়ে

আমাদের সমস্ত মুঠো রাত্রিদিন রেখে আসি সেইসব রাস্তার বুকে।

কে বলেছে বিপ্লবের দিনে

ভালোবাসা খ'সে যায় বয়স্ক পালকের মতো একাকী, বিজনে?

 

এই তো দিব্যি পাহাড়ি বস্তিতে

খাপখোলা তরবারি হয়ে চাঁদ আলো দেয়

আমাদের হাতের ওপর,

খুলে যায় অসরল দুঃখের সমস্ত ভ্রুকুটি।

পাইনবনের পাশে গাঢ়তর কুয়াশায় গেঁথে তুলি পাথুরে দেয়াল

                    সহজ ঘরবাড়ি।

 

আভুবন মানুষের ভিতর এমন মুহূর্ত এসেছে বলেই

ভালোবাসা থেকে মরেনি মানুষের প্রবল বিশ্বাস।

 

কতদিন ভেবেছি, আবিশ্বের কাছে রেখে যাব

আমাদের দ্রোহ আর ভালোবাসবার কথা... দুর্দান্ত রুটমার্চ

তুমি আরও স্থির হও, কাছে এসো... লেখো, লিখে ফেল সমগ্র আমাকে...

...........

 

যুদ্ধগাথা

 

তাহলে এবার বলে দাও

আমার ঘোড়ার মুখ কোন দিকে ফেরাব এখন

কোন পথে চলে যাব আজন্মের ইতিহাস ভুলে?

 

আজও দেখি রক্তপাত। কুরুক্ষেত্রের সেই কৌশল

জেগে আছে মানুষের গভীর মুঠোয়!

এখনো বারাণাবত গর্ভ খুঁড়ে দাহ্য জমা করে

সে আগুন বুকে হাঁটে

                         রৌদ্রমেঘে, মাটি ও মানুষে…

 

এই তো নেমেছে সান্ধ্যকাল

সমস্ত প্রান্তর জুড়ে মৃতপশু, ভাঙা-অস্ত্র,  মানুষের শব।

 

কোনওদিন কোনও রাষ্ট্র জয়চিহ্ন নয়

অন্ধকার যুদ্ধগাথা। শোষকের নিজস্ব উৎসব…

 

তাহলে এবার বলে দাও

আমার ঘোড়ার মুখ কোন দিকে ফেরাব এখন

কার হাতে হাত রেখে চলে যাবো সীমান্ত পেরিয়ে?

...............

 

◾একতারার গল্প

 

ছিল এক নদী। তারপাশে গ্রাম। কুয়াশা-সবুজ ছায়া।

পাখিরাও ছিল। ছিল মজা-দিঘি। পুরোনো দেউল। মাঠ।

ছিল না কেবল সময়েরা স্থির, রাস্তারা নিশ্চুপ।

দিন যত গেছে নিজেকে ভেঙেছে দৃশ্যের পাখশাট।

 

দৃশ্য কি ওড়ে? পাখিরা যেমন সারাদিনমান ভাসে?

নতুনের দিকে হেঁটে গেলে সব, পুরোনোরা যায় নিভে?

হয়তো-বা নেভে। অথবা নেভে না। সবকিছু থাকে স্থির।

ভিতরে কোথাও রয়ে যায় মাটি, আদম এবং ইভে...

 

দিন ভেঙে গেলে রাত্রিরা জাগে। স্মৃতিঘোর জন্মায়।

যাকে এতদিন একাকী ভেবেছি, সেই-আমি একা নই।

নদী আর গ্রাম, দিঘি আর পাখি মিলেমিশে একাকার

সব রেখা থেকে জেগেছে যে-মুখ, আজ তাকে খুঁজবই।

 

দেখছি নিজেকে--- কত ভাঙা আমি, কত বাঁকে গেছে মিশে!

সব-আমি গেছে তোমাকেই ছুঁতে, পথ থেকে প্রান্তরে।

তুমিও ততই রেখে গেছ শুধু রহস্যময় ছায়া

সেই ছায়া যেন কুয়াশা-সবুজ। ক্রমাগত ঝরে পড়ে।

 

আফশোশ নেই। সবই শূন্যতা। নয় তো অটুট কিছু।

জানি আজ নেই। তবু আছ ভেবে হাঁটি দেশ-গাঁও-পাড়া।

পায়ে ধুলো লাগে। ধুলো অভিসার। অভিসার শাশ্বত।

বুকজোড়া শুধু সুরখানি ধরে জেগে আছে একতারা।

 

বুকজোড়া শুধু সুরখানি ধরে জেগে আছে একতারা।

...........

 

 

 

এপিটাফ

 

আবার কোনো সুদূর পথের বুকে

লিখতে পারো নতুন বসন্তকে।

আমার যত গাছপালাদের মন

স্থবির হয়ে থমকে আছে শোকে।

 

যা-ছিল খুব চেনা এবং শোনা

সবকিছুরই বয়স হল খুব।

পাগল-চিঠির অসাড় ডানাগুলো

ইমোজি আর মেসেজে দেয় ডুব!

 

এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল?

'ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার'

মধ্যরাতে গাইবে যখন ফের

'পরাণসখা' বন্ধু পাবে আর?

 

সেই শিলংয়ের রাস্তা কি আর আছে?

গল্প বলে পাইনগাছের চোখে?

সময় এখন গভীর গ্লুকোমায়

পায় না খুঁজে অমিত-লাবণ্যকে।

 

সময় যেন যাচ্ছে ভেঙে দ্রুত

দেখাচ্ছে মুখ নিউজব্রেকের ফাঁকে।

এমনভাবেই হয়তো লেখার রীতি

একটা জীবন একলা এপিটাফে...

.........

Mailing List