মমতাকে হারাতে শুভেন্দুরও ভরসা জাতপাতের রাজনীতি

মমতাকে হারাতে শুভেন্দুরও ভরসা জাতপাতের রাজনীতি
20 Jan 2021, 05:28 PM

মমতাকে হারাতে শুভেন্দুরও ভরসা জাতপাতের রাজনীতি

 

আনফোল্ড বাংলা বিশেষ প্রতিবেদন: "নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হারবে, হারবে, হারবে।" মঙ্গলবার খেজুরির সভার এটাই ছিল শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের মূল সুর। তিনি আরও বলেছেন, "মাননীয়া, আপনি কার ভরসায় সেখানে দাঁড়িয়েছেন? ৬২ হাজারের ভরসায় তো! সেই ভোটেও সিঁধ কাটব। আর পদ্ম বাকি ২ লাখ ১৩ হাজার ভোট পাবেই। ২ লাখ ১৩ হাজার কারা? জয় শ্রীরাম বলে যারা।"

এবার একটু ভোটের হিসাবে নজর দেওয়া যাক। কেননা শুভেন্দু অধিকারী এই ভোটের হিসাবের ওপর দাঁড়িয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ করেছেন পরাজিত করার।

 

নতুন সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে গত ১৫ জানুয়ারি, ২০২১। এই তালিকা অনুযায়ী নন্দীগ্রামের ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার। এর ভেতর ৬২ হাজার সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। কাজেই বোঝাই যাচ্ছে শুভেন্দু অধিকারী এই হিসেব কষেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ৬২ হাজারের ভরসার কথা বলেছেন। শুভেন্দু অধিকারীর কথায় আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক পুরোপুরি মমতার পক্ষে, সেখানে সিঁধ কাটতে পারলেও বিজেপি থাবা বসাতে পারবে না। তাই রাজ্যের সব আসনেই ৩০% ভোটার বাদ দিয়ে ৭০% ভোটারকে নিয়েই বিজেপির ভোটের ময়দানে মমতার মোকাবিলা করতে হবে। এক্ষেত্রে শুভেন্দু অধিকারীর কথা ধরে বলা যায়, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট প্রত্যাশা ১০০% ভোটারের ওপর থাকলেও বিজেপির নন্দীগ্রাম কেন সারা রাজ্যেই ৭০% ভোটারের ভরসায় ২০২১-এর নির্বাচনী যুদ্ধে নামতে হবে। এটাই যে বিজেপির কৌশল শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

 

তবে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী হলে ভোট ভাগাভাগি ধোপে টিকবে না বলে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা তৃণমূলের বক্তব্য।

এই প্রসঙ্গে প্রবীণ তৃণমূল নেতা ও দমদমের সাংসদ সৌগত রায় বলেন, "শুভেন্দু যা বলেছেন এটা অশ্লীল সাম্প্রদায়িক মন্তব্য। ভোটার কী হিন্দু-মুসলিম অনুযায়ী হয় নাকি? সুতরাং খুবই খারাপ মন্তব্য। শুভেন্দু বিজেপিতে যেতে না যেতেই ওদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিটা খুব অ্যাডাপ্ট করে ফেলেছে।" শুভেন্দু অধিকারীর এই বক্তব্যকে সাম্প্রদায়িক তকমা দিয়ে পূর্ব মেদিনীপুরের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বলছেন, শুভেন্দু অধিকারী মানুষে মানুষে বিভাজন সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। এটা বাংলার রাজনীতিতে সম্ভব হবে না। শুভেন্দু অধিকারী ভুল পথে হাঁটছেন।

 

এই প্রসঙ্গে রাজ্যের বিদ্যুৎ মন্ত্রী ও রাসবিহারীর বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বলেন, "শুভেন্দু অধিকারী এখন যে দলে গেছেন,  সেই দলের অভিমুখটাই হচ্ছে জাতপাত ধর্ম। স্বভাবিকভাবে ও যে দলে গেছে সে দলের বক্তব্যই বলবে। আমাদের বক্তব্য সর্বধর্ম সমন্বয়। আমরা সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথা ভাবি। সব জাত, সব ধর্ম মিলে দেশ গড়া যায়। স্বামীজি বলেছিলেন, লাঙলের ফলা থেকে বেরিয়ে আসবে নতুন ভারতবর্ষ। ডোম, জোলা, বাগদি, এদের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসবে ভারতবর্ষ। আমরা সেটাই ভাবি স্বপ্ন দেখি। সমন্বয়ের মধ্য থেকে,  সমস্ত জাত, ধর্মের মানুষের সমন্বয়েই ভারতবর্ষ গড়ে উঠবে। সেই ভারতবর্ষ আগামী দিনে গোটা বিশ্বকে আঙুল তুলে দেখাবে। এটা আমি বলতে চাইছি। কিন্তু যে দলের লোক যে রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, যে দলের লোক যে মতাদর্শে বিশ্বাস করে সেই দলের লোক সেই কথাই বলছে। বাংলার মানুষ, ভারতবর্ষের মানুষ এসব গ্রহণ করবে?" এর পর শোভনদেববাবু বলেন, "টম-ডিক-হ্যারির সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুলনা চলে না। এই তুলনা চলে না। আমি এর তীব্র বিরোধী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কারও তুলনা করতে হলে নরেন্দ্র মোদির তুলনা করা উচিত। যার মনতার সঙ্গে তুলনা হয়না, যে মমতার অধীনে রাজনীতি করেছে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরে তাকে প্রচারে আনা হচ্ছে। আমি এতে রাজি নই।" এরপর শোভনদেববাবু বলেন, "ভারতবর্ষকে যারা জাতপাতের ভিত্তিতে ভাগ করতে চায় সেই পথে আমরা চলি না। আমরা ভারতবর্ষের যুগযুগান্তের যে বানী সেই বানীকে নিয়েই চলি। সেই বানী হল ঐক্যের বানী। স্বামীজি বলেছিলেন হিন্দুর মস্তিষ্ক ও মুসলমানের দেহ যদি ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে এই ভারতবর্ষ বিশ্বকে পরিচালনা করবে। আমি বলব শুধু হিন্দু মুসলমান নয়। শিখ, খ্রিস্টান, জৈন, বৌদ্ধ যত আছেন তাঁদের সম্মিলিত শক্তিই ভারতবর্ষের শক্তি। আর যারা কেবলমাত্র ধর্ম ও জাতপাতের রাজনীতি করতে চায় তাঁদের মানুষ তীব্রভাবে বর্জন করবে বলে আমার বিশ্বাস।"

 

বিজেপিও কিন্তু পাল্টা বক্তব্য রাখতে ছাড়ছেন। তাঁরা সরাসরি নিশানা করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই। বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, ভোটের আগে মতুয়া বোর্ড, বাউড়ি বোর্ড কিসের ইঙ্গিত? বিভিন্ন সম্প্রদায়ের গুণীজনদের জন্মদিনে ছুটি ঘোষণাও কী জাতপাতের ইঙ্গিত বহন করছে না? এক বিজেপি নেতার কথায়, ‘‘ইমাম ভাতা দিয়ে মুসলিম তোষণ শুরু করেছিল তৃণমূল। এখন ভোটের সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে কাছে টানতে নতুন নতুন পন্থা বের করছেন। শুভেন্দু অধিকারী সেটা ধরিয়ে দিয়েছেন মাত্র।’’

Mailing List