শ্রাবণ গহনে

শ্রাবণ গহনে
07 Aug 2022, 10:00 AM

শ্রাবণ গহনে

 

 

শবরী মুখোপাধ্যায়

 

সেদিন ছিল অমাবস্যা! শহরের আলোও কেমন ম্লান। শ্রাবণধারা ও অশ্রুধারার এক নির্ভেজাল বন্ধুতা। একে অপরের চোখ মুছিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস। শুধু ফাঁক থেকে যায় লোনা স্বাদের। একে আমি কী যে বলি! আনন্দ না বিরহ না প্রেম না উদ্ভাস! তবে হৃদয়ের দক্ষিণ দুয়ারে কিছু জমা রাখতে পারি না, উজাড় করে দিয়ে যে মহত্ব, আগলে রাখায় সে উদারতা নেই।

    

শ্রাবণ আসে কাঁদতে না কাঁদাতে জানি না, শুধু এইটুকু জানি---আমার একান্ত চোরকুঠুরিতে, বিলম্বিত চরণপাতে সর্বদা যিনি ঘুরে বেড়ান তিনি শুধু আপনি! যার ক্ষয় নেই, অক্ষয় ,অমলিন। সে শুধু বারবার মনে করিয়ে দেয়--"দুঃখেরে দেখেছি নিত্য, পাপেরে দেখেছি নানা ছলে, অশান্তির ঘূর্ণি দেখি, জীবনের স্রোতে পলে পলে"--

হ্যাঁ কবি! আপনার কথাই বলছি--আমি একুশ শতকের নারী। আমাদেরও হৃদয়ের গোপন খামে আপনার নিমন্ত্রণ পত্রটি লুকানো থাকে।

   শ্রাবণ এলেই মন বড় ব্যাকুল। বিদ্যুতের ঝিলিকে চমকে ওঠে চোখ।কি হারিয়েছি আরও কী যে হারাতে হবে! মনের মুকুরে তারই ছবি দেখতে পাই। এমনই এক শ্রাবণসন্ধ্যায় ছটফট করছে মনটা। যে আলমারীতে সযত্নে আটকে রেখেছি আপনার গোরাকে, বিনোদিনীকে, কুমুদিনীকে কীংবা বিমলাকে--তাদের আগলমুক্ত করে, চারপাশে ছড়িয়ে বসে পড়েছি। কখন নিজের অজান্তেই নবজাতকের গায়ে হাত বুলিয়ে আপনার স্পর্শ পেতে চাইছি;

     শ্রাবণ এলেই আমার কান্না আসে--সেই সর্বনাশী মেঘকে গাল পারি --যে কালো আঁচল দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলো রবির কিরণ!

এইভাবে একেরপর এক আপনাকে ছুঁয়ে যাচ্চি-- অনন্তকে ছোঁয়ার আকুল আকুতি; নিরেট মাথার মানুষী বলেই কখনো প্রবন্ধতে হাত বাড়াই না। আজ অবাক চোখে আপনার সৃষ্টিকে দেখছি---কিন্তু আশ্চর্য এই যে-- কোনদিন আমাদের সাক্ষাৎ হয়নি! হলে কি হত জানিনা-- তবে কতদিন যে স্বপ্নে দেখেছি---ভোরবেলায় সূর্য ওঠার আগে, ছাতিম তলায় আপনি ! আমার হাতে গীতাঞ্জলি! কোথাথেকে একটি সাঁওতালি ছেলে আমার হাতে ধরিয়ে দিলো একটি শ্বেতপদ্ম! আমি ধীরপায়ে এগিয়ে এলাম আপনার দিকে--শ্বেতপদ্মটি সমর্পণ করলাম আপনার নিরাভরণ পায়ে। আপনি স্মিত হেসে বললেন--"ওঁ পিতা নোহসি"--আমি অশ্রুজলে ভেসে গেলাম।মন্ত্রের মতো কানে বাজতে লাগলো--আজ যেমনি করে গাইছে আকাশ---এক চটকায় স্বপ্ন ভেঙে গেল।

অচলিত সংগ্রহের ফাঁক থেকে কোলে এসে পড়লো, বিবর্ণ এক সংবাদপত্র। বিষ্ময়ে খুলে ফেললাম-- একি! পাতায় পাতায় শুধু আপনি! কেমন করে এগিয়ে চলেছে মরণের ফুলদোলা-- আপামর বাঙালীর হৃদয়কে স্তব্ধ করে দিয়ে এগিয়ে চলেছেন আপনি! আমার চোখ বাঁধা মানছে না।এযে সেই অসীমের সেই অনন্তের জন্য হাহাকার!

 কতক্ষণ পেরিয়ে গেছে জানি না। ঘড়ির ঘন্টা নিস্তব্ধতা ভেঙে দিলো। চমকে দেখি--চোখ বুজে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আমার আইন মোতাবেক মা। চোখে তাঁরও শ্রাবণধারা। পাথুরে মেঝেতে তখন ছড়িয়ে পড়েছে বিরহের গান। দুজনে শুধু একসাথে বলে উঠলাম--আজ ছিল ২২শে শ্রাবণ।

.......

লেখক- বাচিক শিল্পী

Mailing List